LOOPER

Looper 27x40 Movie Poster (2012)

ঠিক এই সময়ের সায়েন্স ফিকশন মুভিগুলার দুটা ভিন্ন রূপ খুব দেখা যাচ্ছে। প্রথম রূপটায় অসাধারণ গ্রাফিক্সের সাথে দুর্দান্ত এ্যাকশন থাকছে কিন্তু অনেক সময়ই গল্প খোঁড়া হয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু যে ভালো গল্প থাকছে না, তা নয়। তবে অধিকাংশ সময়ই চাকচিক্যের সাথে গল্পের গভীরতার সরল রৈখিক সম্পর্ক দেখা যায় না। অন্যদিকে আরেকটা রূপ দেখা যাচ্ছে যেখানে গল্পই মুভির মূল উপজীব্য। মুভিকে চাকচিক্য দিয়ে সাজানোর দিকে পরিচালকের নজর তেমন একটা থাকে না। 

“ডিসস্ট্রিক্ট নাইন”-এর কথা হয়তো মনে আছে অনেকের। এরপর এসেছে “মুন”, “সোর্স কোড”, “সুপার এইট” কিম্বা একদম নূতন “লুপার”। এই মুভিগুলোতে সায়েন্স ফিকশনের মাধ্যমে শুধুই চাকচিক্য দেখানোর পরিবর্তে মানবিক আবেদনকে একটা বড় ফ্রেমে বাঁধিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ভূমিকাটা মনে হয় বড় হয়ে যাচ্ছে। তাই কথা না বাড়িয়ে যে মুভির রিভিউ লিখতে বসেছি সেটা নিয়েই কথা বলা ভালো। হ্যা, লুপার এমনই একটা সায়েন্স ফিকশন। 


সাদাসিধে সেটে ২০৪৪ সন। “পৃথিবী অসাধারণ উন্নত হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে” না দেখিয়ে বরং ধনী ও গরীবের বৈষম্য যে আরো প্রকট হয়ে উঠবে সেটা নগ্ন ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তখনও মানুষ খাবারের জন্যে অন্যের কাছে হাত পাতে, তখনও সন্ত্রাস ছড়িয়ে আছে সমাজের বুকে। কিছু মানুষ কল্পনাতীত ধনী, তো কিছু মানুষ চরম দরিদ্র। ঠিক এরকম প্রেক্ষাপটে এক ধরনের কর্মজীবি মানুষের দেখা পাওয়া যায়। তাদের নাম “লুপার”। ২০৭৪ সনের একটা মাফিয়া সংস্থা রয়েছে চীনের সাংহাইতে। সে সময়ের সমাজে খুন করে ডেডবডি গায়েব করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু হত্যা-হানাহানি তো আর বন্ধ থাকতে পারে না! তাই “রেইনমেকার” বলে একজন একটা সমাধান বের করে। সমাধানটা এরকম – মাফিয়ারা ভিকটিমকে না মেরে বরং হাত-পা-মাথা বেঁধে টাইম মেশিনে করে ২০৪৪ সনের কেনসাস সিটিতে পাঠিয়ে দিত। সেখানে ভিকটিমকে মারার জন্য অস্ত্র হাতে প্রস্তুত থাকতো একজন, যার পরিচয় আগেই দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ লুপার। সে ভিকটিমকে মেরে ডেডবডি পুড়িয়ে দিত। ভিকটিমকে ভবিষ্যত থেকে পাঠানোর সময় তার পিঠে বেঁধে দেয়া হত রূপার বার। ওটাই ছিল লুপারের পেমেন্ট। লুপারদের দেখাশোনা করতো ভবিষ্যত থেকে আসা একজন যে কঠিন হাতে নিয়ন্ত্রণ করতো পুরো ব্যবস্থাটা। প্রত্যেক লুপারের জন্যে সে একটা কঠিন শর্ত বেঁধে দিয়েছিল। ভিকটিম যেন কোন ভাবে মুক্তি না পায়, এমন কি ভিকটিম তার নিজের ভবিষ্যতের সংস্করণ হলেও!
তবে লুপারদের জন্যে হত্যার কাজটা চলতেই থাকতো না। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তারা হত্যা করতো। ঐ নির্দিষ্ট সময়টাকে বলা হয় “লুপ ক্লোজ” করা। অর্থাৎ যখন তারা তাদের নিজেদের ভবিষ্যত সংস্করণকে হত্যা করে, তখন একটা লুপ বন্ধ হয়ে যায়। তাদের কাজেরও ছুটি তখন থেকে। এরপর তাদের জন্যে বিশেষ রিটায়ারমেন্ট প্যাকেজ থাকে। শেষ হত্যার জন্যে তারা রূপার পরিবর্তে পায় সোনার বার; এবং তারপর শুরু করে এক আয়েসী জীবন। চিন্তাহীন আনন্দময় জীবন। 


Joe: I work as a specialized assassin, in an outfit called the Loopers. When my organization from the future wants someone to die, they zap them back to me and I eliminate the target from the future. The only rule is: never let your target escape... even if your target is you.



জো হচ্ছে এমনই এক লুপার যে এই আনন্দময় জীবনের অপেক্ষায় ছিল। রূপার বার দিয়ে সে তার ফ্ল্যাটের নীচে স্তুপ করে তুলছিল আর দিন গুনছিল সোনার বারের। এক সময় সেদিন এলো, কিন্তু সোনার বারেই ঘায়েল হলো জো। ভিকটিম ছিল জো-এর ২০৭৪ সংস্করণ। কিন্তু হাত-পা-মাথা বাঁধা থাকার পরিবর্তে ভিকটিম দিব্যি খোলামেলা অবস্থায় ২০৪৪-এ এসে ল্যান্ড করে।  নিজের আরেক অস্তিত্বকে হত্যা না করলে ওকে হত্যা করবে মাফিয়ারা। আর অন্য দিকে জোর ভবিষ্যত সংস্করণ খুঁজতে থাকে এই পুরো প্রক্রিয়াটার মাস্টারমাইন্ড রেইনমেকারের শিশু সংস্করণকে; কেননা সে বিশ্বাস করে এই শিশুকে যদি হত্যা করা হয় তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের হত্যা-ব্যবস্থার প্রচলনই হবে না। অনেকে মনে করছেন হয়তো গল্পের অনেকটা বলে ফেলেছি। আসলে তা নয়। ঠিক যতটুকু বললে প্রেক্ষাপটটা পরিষ্কার হয়, ততটুকুই বলেছি। প্রশ্ন অনেকগুলো এরই মধ্যে উত্তর খুঁজে পায় নি। জোর ২০৭৪ সংস্করণ কেন হাত খোলা অবস্থায় ছিল? সে রেইনমেকারকে মেরে এই প্রক্রিয়াটা বন্ধ করতে চাচ্ছে কেন? এবং সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন – সে কি সফল হয়েছিল?


Older Joe: The Rainmaker came out of nowhere and in the span of six months took total control of the five major syndicates.
Joe: That would take an army.
Older Joe: But he didn't have an army. Legend is he did it alone.



Young Joe: "So you're me in 30 years?"
Old Joe: "It's hard staring into your eyes. It's too strange."
Young Joe: "Your face looks backwards... So do you know what's going to happen? You done all this already? As me?"
Old Joe: "I don't want to talk about time travel because if we start talking about it then we're going to be here all day talking about it, making diagrams with straws."
Young Joe: "We both know how this has to go down. I can't let you walk away from this diner alive. This is my life now. I earned it. You had yours already. So why don't you do what old men do and die?"
Old Joe: "Why don't you just take your little gun out from between your legs and do it, boy?"



ঠিক এই সময়ে লাইমলাইটে থাকা – ডার্ক নাইট রাইজেস, প্রিমিয়াম রাশ, জি আই জো ২ এর মার্কিন অভিনেতা – জোসেফ গর্ডন-লিভিট ২০৪৪ সনের জোর ভূমিকার অভিনয় করেছে লুপারে। ব্রুস উইলিস অভিনয় করেছে জোর ২০৭৪ ভূমিকায় এবং ব্রিটিশ অভিনেত্রী এমিলি ব্লান্ট অভিনয় করেছে রেইনমেকারের মার ভূমিকায়। তবে সবচেয়ে দুর্দান্ত অভিনয় করেছে রেইনমেকারের শিশু ভূমিকায় পিয়ার্স গ্যাগনন।  পুরো সিনেমা হাসিতে ফেটে পড়ছিল একেক সময়। মাত্র ৩০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে মুভিটা। বক্স-অফিসের কথা জানি না, কিন্তু ক্রিটিকরা বেশ ভালো রিভিউ দিয়েছে। রোটেনটমাটো-তে ১৭০ জনের রিভিউতে ৯৩ শতাংশ পজেটিভ ভোট পেয়ে বসে আছে। ইউকে-তে কয়েকটা নাম করা ম্যাগাজিন দেখলাম পাঁচ তারা দাগিয়ে দিয়েছে লুপারকে।

আমার ব্যক্তিগত রেটিং-এ পাঁচে অন্তত চার দেব আমি। পয়সা খরচ করে দেখলে পয়সা উসুল হবে, ঘরে বসে দেখলে সময় নষ্ট হয়েছে মনে হবে না মোটেও। বরং মুভিটা শেষ হলে একটা অনুভূতি কাজ করবে। ঐ যে শুরুতে বলেছিলাম, একটা মানবিক আবেদন। একটা প্রশ্ন মনের মাঝে ঘুরতে শুরু করবে। একটা শিশু ভবিষ্যতে কেমন হবে, খারাপ নাকি ভালো, সেটা কে নির্ধারণ করে – নিয়তি নাকি সমাজের হয়ে আমরা?

V FOR VENDETTA - ভালোবাসা ও বিপ্লবের ইতিহাস

“Remember, Remember, The Fifth Of November,
The Gunpowder Treason And Plot;
I know Of No Reason, Why the Gunpowder
Treason, Should Ever Be Forgot.”

সিনেমাটা শুরু হয় এই অসাধারন কথাগুলো দিয়ে। শুধু এই সংলাপটুকু নয়,ভি পুরো মুভিতেই অসাধারন সব বানী দিয়ে গেছে,নিয়ে গেছে ৪০০ বছর পুরোনো এক ইতিহাসে।যদিও আজ ৫ নভেম্বর না,, তাও সবাইকে গানপাউডার প্লট দিবসের শুভেচ্ছা।
V_for_Vendetta_by_Rub_a_Duckie

১৬০৫ সালের লন্ডন।অত্যাচার, বর্বরতা দিয়ে ভরা ব্রিটেন খোদ ব্রিটিশ সরকারই। সবাই অতিস্ঠ কিন্ত প্রতিবাদ করার মত কেউ নেই। এ সমময়ে রাজা প্রথম জেমসকে হত্যা ও ব্রিটেনের পার্লামেন্ট হাউস অফ লর্ডস উড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করে ক্যাথলিকদের একটি দল। তৎকালীন ব্রিটিশ সমাজে বিদ্যমান বর্বরতার জন্য সরকারকে দায়ী করে তারা এ কাজ করতে চেয়েছিল।এই চক্রান্তের বিস্ফোরক বারুদের মজুত দেখার দায়িত্বে ছিলেন দলের সদস্য গাই ফক্স। ১৬০৫ সালেই পার্লামেন্ট এর কাছে একটি সেলার ভাড়া নেয় ফক্স ও তার দল। বলা হয় সেখানে ‘আলু মজুদ করা হবে। পার্লামেন্টের অধিবেশন বসার কথা ছিল ৫ নভেম্বর।তারা প্লান করতে থাকে, এরইমধ্যে ষড়যন্ত্রকারীদের সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৩ তে। বেশি লোক হবার কারনে তাদের মধ্যে ঝামেলাসহ অনেক সমস্যা শুরু হয়। অক্টোবরের ২৩ তারিখ হামলার কথা ফাস হয় এমনকি এই কথা পার্লামেন্ট পর্যন্ত চলে যায়। তারা সাবধান হয়ে অনুসন্ধান চালাতে থাকে। ওদিকে ফক্সের দল ভাবে যেহেতু তাদের হামলার কথা ফাঁস হয়েছে প্ল্যান ফাস হয় নি তাই তারা কাজ চালিয়েই যাবে।অনুসন্ধান দল ৪ঠা নভেম্বর রাতে সেলারের নিচে প্রচুর পরিমানে বারুদসহ ফক্সকে আবিস্কার করে। তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়, ক্যাথলিকদের আস্তানায় হামলা করা হয় অনেক মানুষ মারা পড়ে। ফক্সের কাছ থেকে ষড়যন্ত্রকারীদের নাম বের করার জন্য অত্যাচার করা হলেও তিনি কারোর নাম বলেননি। ১৬০৬ সালের ৩০ জানুয়ারি তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

হতভাগ্য মানুষটার প্লান কাজে লাগে নি। কিন্ত কিছু মানুষ তাকে মনে রেখেছে। ১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে পরিকল্পিত গান পাউডার
ষড়যন্ত্রের বিপদ থেকে রাজা প্রথম জেমস ও তার পার্লামেন্ট রক্ষা পাওয়ার ঘটনাকে মনে রেখে ৫ নভেম্বর ব্রিটেনে গাই ফক্স দিবস হিসেবে পালিত হয়। ১৮ শতকে কমিক চিত্রশিল্পী ডেভিড লয়েড জন্ম দেন এই মুখোশের। তারপর এটিকেই গাই ফক্সের মুখোশ হিসাবে ধরা হয় যখন লেখক অ্যালান মুরে তার কমিক ভি ফর ভেনডেট্টা তে নায়ক ভি কে এই মুখোশ পরিয়ে জনপ্রিয় করেন।
Screenshot (10)


২০৩৮ সাল ইংল্যান্ড। চারিদিকে নোংরা শান্তি।কুৎসা,কুরুচিপুর্ন চরিত্রের সরকারি মানুষ লন্ডনে। বিশ্রী স্বৈরাচারী শাসন চলছে। রাত ১১ টার পর সেখানে কারফিউ জারি হয়। চারিদিকে সেই কুরুচিপুর্ন পুলিশ টহল দেয় যাদের বলে ফিঙ্গারম্যান। এমন সময় গাই ফক্সের মুখোশ পড়ে উদয় হয় ভি (V)। এক রাতে ফিঙ্গারম্যানদের হাত থেকে ইভি হ্যামন্ড নামে এক মেয়ে কে বাচায় ভি। অদ্ভদ এক সংলাপে পরিচয় হয় তাদের। ৫ নভেম্বর সরকারি এক চ্যানেল অবরুদ্ধ করে এক বক্তব্য রাখে ভি।যাতে বলা হয় আগামী একবছর পর ঠিক ৫ নভেম্বর সকল জনগনকে পার্লামেন্ট এর সামনে জড়ো হতে। কারন হিসেবে সে বলে আমরা একসাথে এমন এক পাঁচ নভেম্বরের আয়োজন করবো, যেটা কখনও কেউই ভুলে যেতে পারবে না।এতেই চুপ হয় না ভি তখনকার ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের খুন করতে আরম্ভ করে। ভি কে ধরার জন্য পাগল হয়ে যায় ফ্যাসিস্ট সরকার।ভি কে খোজার দায়িত্ব পালন করত থাকে পুলিশ ইনেস্পেক্টার ফিন্চ। এই কাহিনী ধীরে ধীরে খোলসা হতে থাকে, ভি এর পেছনের কাহিনী জানা যায়। মাঝখান থেকে এর মধ্যে জরিয়ে পরে ইভি হ্যামন্ড ও। পাঁচ নভেম্বর কি করবে ভি? সেকি নতুন যুগের গাই ফক্স হিসেবে এসেছে? মুভি শেষ করার মধ্য দিয়ে এর জবাব আপনি পাবেন।।
01

আপনি কি বলতে চাচ্ছেন ভি (V) মানেটা কি? ভি এই সিনোমার সব, প্রত্যেকটা লাইনে এর অস্তিত্ব। ভি একটি ইংরেজি বর্ণ। সারা মুভিতে এর  ব্যাবহার করা হয়েছে, ভি এর সাথে যখন ইভির দেখা হয় তখন ভি প্রায় ৫০ টা V দিয়ে বানানো শব্দ দিয়ে অসাধারন এক সংলাপ বলেন। ভয়ঙ্কর ছিল এটুকু। প্রথমবার যখন দেখি জাস্ট হা করে গিলেছি বাক্যগুলো। অনেক চেস্ট করেছি ঐটুকুর বাংলা অনুবাদের। কিন্ত আমার দ্বারা হয় নি, আমি সঠিকভাবে করতে পারি নি। 🙁 আমার মাঝে মাঝে মনে হয় এই সংলাপটুকু শোনার জন্য একবার হলেও মুভিটা দেখা উচিত।

ভি একটি রোমান বর্ণ যার অর্থ পাঁচ। ভি পাঁচ নভেম্বর বক্তব্য দেয়। পরের পাঁচ নভেম্বর ই সে একটা কিছু করে দেখাতে চায়, সে পাঁচ নম্বর রুম থেকেই এসেছিল বুঝতে পেরেছেন? ভি এর গুরত্ব কতটুকু?

মুভিতে পরিচালক যতটুকু চেয়েছিল,ভি চরিত্রে হুগো ওয়েভিং তার থেকেও উতরে গেছে। আমার মনে হয় খোদ পরিচালক জেমস ম্যাকতেগুই ই অবাক হয়েছেন। অসাধারন এর উপর এ কি আছে জানি না,, ওয়েভিং সেই লেভেল এর অভিনয় করেছেন। একটা মাস্ক পড়ে শান্ত ভাবে যে এভাবে কাজ করা যায় তা এই মুভি না দেখলে বোঝা সম্ভব ছিল না।। চিত্রনাট্য এর গতি ছিল প্রবল আকারে,তাও এর সাথে সুন্দরমত মানিয়ে নিয়েছে ওয়েভিং।আর ছিল তার শক্তিশালী মোহনীয় এক কন্ঠ,আর অসাধারন শব্দের উচ্চারন যা মুভির শেষ পর্যন্ত আপনাকে মাত করে রাখবে। মুভির দুইঘণ্টা দশ মিনিটের ভেতর তার সত্যিকার মুখটি একটিবারও দেখানো হয় নি। কিন্তু ভি চরিত্রে তার অভিনয়,দর্শন একদম নিখুত ছিল এটা আমি স্পস্ট করে বলে দিতে পারি।।

আহ আর নার্টালি পোর্টম্যান।। :* সেইইই কি বলব। একই রকম বাস্তব অদম্য অভিনয়। সরল সাবলীল, ভাবলেশহীন কিন্ত দুর্দান্ত। নার্টালি কোন বাজে কাজ দেখলাম না,আবার অভিনয়ে কোন নতুনত্ব পেলাম না,যেমন ছিল ব্লাক সোয়ান তেমনি লিওন দ্যা প্রফেশনাল তেও।
V-for-Vendetta-Evey-Hammond
ভেনডেট্টা তেও একই রকম,,  যেন বলতে চাচ্ছিল দ্যাখ দ্যাখ আমি নার্টালি পোর্টম্যান যে কোন চরিত্রেই আমি দুর্দান্ত।

আর একজনের কথা বলতেই হবে মিস্টার ক্রিডি চরিত্রে টিম প্রিগট্টি স্মিথ। হয়ত অনেকেই বলবে এত্ত ছোট চরিত্র নিয়ে কেনন বলছি?কারন তারর এমন মানানসই উচ্চারন অসাধারন বাচনভঙ্গি চোখে লেগে থাকার মত। Not So Funny Now,is it,Funnyman?? অথবা Die! Die! Die! Why Wont You Dieee?! Why wont You Die??
এর মত সংলাপে দুর্দান্ত লেগেছে, যেন কথাগুলো তার মুখ নয় চোখ ই বলে দিচ্ছে।।মানতে হবে তিনি একজন গুনী অভিনেতা।

আসলে এই মুভিটি এমন এক মুভি যার পরিচালনার থেকে চিত্রনাট্য খুবই গুরত্বপুর্ন। তবুও পরিচালনার দিক থেকে জেমস ম্যাকতেগুই তার নতুন দলবল নিয়ে বেশ ভাল রকম কাজ করেছেন।সুন্দর উপস্থাপনা, গল্পকে সঠিক সময়ে গতি দেওয়া এদিক থেকে তিনি সফল। ভাল মিউজিক আর এমন ভি ওয়ালা শব্দ দিয়ে গল্প রেডি করা তো চাট্টিখানি কথা না।। আতশ বাজি, ডমিনো চিপসেরর দৃশ্যগুলো মারাত্নক ছিল।
Screenshot (15)
এর আগে তিনি ম্যাট্রিক এর প্রথম পার্ট আর স্টার ওয়ার্স সিরিজের কোন এক মুভি পরিচালনা করেছেন। আমি পরিচালকের কাজ আর টেকনিক্যাল দিক নিয়ে বিশেষ কোন কথা বলতে চাচ্ছি না। কারন এক কথায় সবকিছু দিয়েই সিনেমাটা সেরা হয়েছে।

সিনেমা টা শুধু এক রিভেন্জ অথবা থ্রিলার বলব না। কারন মুভিটি প্রেমের ও। ইভির ঠোট যখন ভি এর রক্তমাখা নকল ঠোটে ঠোট ছোয়ায় তখন যে প্রেমের দৃশ্য উপস্থিত হয় তা অভাবনীয়।
Screenshot (23)
ভি এর কঠোর মুখের রক্তিম হাসি দেখে একলাফ দিয়ে যে কেউ ওয়েভিং এর ফ্যান হয়ে যাবে। আর সেই ভরাট কন্ঠ বাদই দিলাম।গাই ফক্সের মুখোশ যাতে লেগে আছে প্রাচীন রক্তের আগুন,সে আগুন প্রতিবাদের সে আগুন সাম্যের সে আগুন প্রতিরোধেরও। সাদা রং, ছোট ছোট চোখ,একোনা হাসির এ মুখোশ প্রতিবাদের।আসলে এ মুভিটি নিয়ে খুব বলতে পারব আবার বলার পর মনে হবে অনেক কম বল্লাম অনেক কিছু তো বাকি। আসলে এখানে শেষ করে আমি শান্তি পাচ্ছি না। মনেহচ্ছে,,
“শেষ হয়েও হইল না শেষ”


সিনেমাটা খুবই প্রিয়। আমি প্রথম দেখি ২০১৪ সালের প্রথম দিকে। এরপর ২ টা ৫ নভেম্বর গেসে আমি দেখতে বসে গেসি ভি ফর ভেনডেট্টা। যারা দেখেন নি তারা দেখে ফেলুন এ মাস্টারপিস টা। কারন অপেক্ষা করতে পারার কথা না পাঁচ নভেম্বর অনেক দেরি। 🙂 মুভির শেষের দিককার  ক্লাইম্যাক্স এর একটি সংলাপ দিয়ে লেখা শেষ করি।

“You cannot kill an idea, cannot touch it or hold it. Because Ideas are bullet proof”

নন্দিনীকে শীতের কবিতাগুচ্ছ

ydi-mele-dhri-kthaa-dio-phurobaar-aagei-brsstti-debe

ব্যস্ততা নিয়ে রাস্তায় চলতে চলতে হুট করেই নাকে এসে লাগে খুব চেনা একটা গন্ধ!না, এই গন্ধ কোনো পারফিউমের নয় ! এই গন্ধ খুব কাছের কারো শরীরের গন্ধ!পায়ের ধাপ থেমে যায়!উৎসুক চোখ তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে চারিপাশ টা!চলন্ত গাড়ি, ব্যস্ত মানুষ, টুংটাং রিকশার শব্দ সবকিছু এড়িয়ে চোখ দুটো খুঁজে ফিরে ওই গন্ধটার উৎস!খুঁজেও যখন ব্যর্থ হতে হয়, তখন রাস্তাভরা হাজারো লোকের মাঝে নিজেকে খুব একা লাগে!শূন্যতায় অনুভূতিতে ভেতরটা খা খা করে উঠে!চোখের কোণে টের পাওয়া যায় অশ্রুবিন্দু... তারা নিচে গড়িয়ে পড়ে না, চোখে থেকে ঝাপসা করে রাখে সামনের সবকিছু...দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবার ব্যস্ত হয়ে পা বাড়াতে হয়...এই ব্যস্ত শহরে চেনা গন্ধের খোঁজ করা বোধহয় বড্ড বেমানান! বড্ড অনুচিত!

মন খারাপ করা বিষন্ন মেঘে ভরে ছিলো কাল আমার আকাশ। চোখের সমুদ্রের নোনা জলে ভেসে যাচ্ছিলো সব। অবহেলা করেছিলো কেউ! অবহেলার মত করুণ কিছু কে আছে? সন্ধ্যা নামছিলো যখন, চাঁদটা হাসছিলো আকাশে। আমি পাখি হয়ে যাই। কষ্টগুলোকে পাখির ডানায় সপে দিয়ে
উড়তে থাকলাম। জ্যোছনার আলোতে ভিজবো বলে। জ্যোছনা ছুঁলেই সব কষ্টরা বিলীন হবে।
আসলে স্পর্শ ব্যপারটাই এমন। আমার মনে পড়ে যায় এক আকাশের গল্প।  অন্য এক আকাশ। এই আকাশ পোড়ায় না। বারুদের মত জ্বলতে থাকা হৃদয়টাকে শান্ত করে দেয় । আকাশটাকে দু'হাতের
মধ্যে ধরে রেখেই আবারো দু"চোখে বর্ষা নামে। আর কি আর্শ্চয্য জ্যোছনার আকাশ থেকেও বৃষ্টি নামে অঝোরে; ভেসে যায় অবহেলার মত অনেক কিছু। 

একটা অসময়ের খুব দরকার, যখন চুল এলোমেলো করা হাওয়া সময়ের হিসেব রাখবেনা। পুরোনো আড্ডা সবই ভেঙ্গে গেছে। বাইরের পৃথিবীটা আর আগের মত নেই। বড্ড পর হয়ে গেছে সব। বেলা গড়িয়ে যায়। রৌদ্রতপ্ত ঘাসে নিবিড় গাছপালায় বনের গন্ধ ঘনিয়ে ওঠে। তাপ মরে আসে। ঘামে ভেজা শরীরে শীতের বাতাস এসে লাগে। বুঝতে পারি ফেরার সময় হল।

হারিয়ে যাব? হঠাৎ আমাকে ঘিরে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। নিজেকেই প্রশ্ন করি, হারিয়ে যাব? 
নিশুতিরাতে এসেছিল এক ডাকপিয়ন। আমার সারাজীবনের সব স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়ে গেছে সে। বোধহয় আমার আর কোনো চিঠি আসবে না। আমি যেন মোহানার কাছে পৌঁছানো এক নদী, যার স্রোতের আর কোনো ঢল নেই। সামনে মহা সমুদ্র।
আমি মুন্নির জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু আমার দিকে তার কোনো মনোযোগ নেই। আমি একটু হাসি, তারপর এগিয়ে যেতে থাকি। মুন্নি একা আসতে পারবে। আমি যখন থাকবোনা, তখনওতো মুন্নিকে একাই হাঁটতে হবে।



দিনগুলি কেটে যায়। কিন্তু কিভাবে যায় কেউ কি তা জানে? বুকের মাঝে উড়ন্ত প্রজাপতির মত একটুখানি সুখ বা ছোট্ট কাঁটার মত একটুখানি দুঃখ-এ তো থাকবেই। তবু দিন যায়। কথাগুলো থেকেই যায়।
অলক্ষ্যে হাওয়া বন্দুক নামিয়ে পরাজিত এক অচেনা পুরুষ ফিরে যায়। তার লক্ষ্যভেদ হয় না। কোনওদিন আবার সেই বন্দুকবাজ ফিরে আসবে। লক্ষ্যভেদ করার চেষ্টা করবে বারবার। হয়তো লক্ষ্যভেদ করবেও সে। ততদিন পর্যন্ত পৃথিবীর এই রঙ্গীন মেলায় আনন্দিত বাতাস বয়ে যাক এই কথা বলে-ঠিক আছে, সব ঠিক আছে। 

মেঘলা দিনের সকালে অকারনে মনখারাপ, কারন খোঁজার চেষ্টা করোনা, পাবেনা। মনে আছে সেই প্রথম ডায়েরী, বা হারিয়ে যাওয়া সেই রাস্তা, বা ফেলে আসা সেই মুহুর্ত? শুধু মনে কর একবার। দেখতে পাচ্ছ? অকারনের মনখারাপ  ফানুস হয়ে উড়ে যাচ্ছে ভীনদেশে। 

আমার বিশ্বাস, মানুষের জীবনে ইচ্ছাপুরনের ঘটনা এক-আধবার ঘটে। যেন তখন সমস্ত পৃথিবীকে উপেক্ষা করে ঈশ্বর অলক্ষ্যে তার কাছেই এসে দাঁড়ান। তখন মানুষের মনে যে পার্থনা থাকে তা পুরন করে দিয়ে চলে যান। সেই শুভক্ষনটাকে মানুষ অবশ্য চিনতে পারেনা। সে হয়ত তখন ভাবছে, ইস, কাল যে ছাতাটা অফিসে ফেলে এলাম তা কি আর ফিরে পাওয়া যাবে?

পাওয়া যায় এবং শেষ পর্যন্ত কেবল ছাতাটাই সে পায়।
ঈশ্বর আর কিছুই দিতে পারেন না, দেওয়ার অসীম ক্ষমতা থাকলেও।

আমি একটা মেয়েকে জানতাম, একবার চাইবাসায় নিরালা দুপুরে ঘুম থেকে উঠে একটা ঘুঘুর করুন ডাক শুনে তারমনে হয়েছিল, ইস, এখন যদি হেমন্তের সেই গানটা হত। ভাবতে ভাবতেই সে আনমনে ট্রানজিস্টার ছাড়তেই, আশ্চর্য্য, হেমন্তের সেই গানটাই বেজে উঠলো। মেয়েটা এতই অবাক যে, দীর্ঘ্যকাল ব্যাপারটা ভুলতে পারেনি সে।
আমি ঘটনাটা শুনে একটা দীর্ঘ্যশ্বাস ফেলেছিলাম। সে কি হারিয়েছিল তা সে জানত না।

আমি কতদূর বিষন্ন ও হতাশ হয়েছি তা ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে বুকে মাঝে মাঝে একটা পেরেক ঠোকার যন্ত্রনা হচ্ছে। আমার চারিদিকের পৃথিবীটা ছাইবর্ণ। আমার শহরে বৃষ্টি আসে, ভিজে যাই। একচাপ সাদা অবয়বহীন কুয়াশা গড়িয়ে নেমে আসছে। শরীরের ভেতরকার প্রতিরোধ কমে যাচ্ছে। টের পাই সর্দি আর ভিটামিনের লড়াইতে ভিটামিনের জোর মার খাচ্ছে সর্দির হাতে।
হায়, আমি ভিজলে শুধু আমিই ভিজি,
তুমি ভিজলে পুরো শহর ভিজে যায়।। 
আপাদমস্তক কুয়াশায় ডুবে গিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ি। চারিদিকে বৃষ্টির ফোঁটারা হেঁটে চলেছে। সেই শব্দে একটু উন্মুখ হয়ে উঠি। জোর বৃষ্টিতে যদি রাস্তায় ধ্বস নেমে রেলগারিটা আটকে যায়। বুকের ভেতরটায় দপ করে আলো জ্বলে ওঠে, সঙ্গে সঙ্গে ভিটামিনেরা দ্বিগুন উৎসাহে আক্রমন করে সর্দির ভাইরাসকে। সর্দি পিছু হঠে যায়। পরমুহুর্তেই ভাবি কী লাভ! কি লাভ? ভাবতে ভাবতেই বুকের ভেতরকার আগুনটা নিভে যায়। ভিটামিনেরা মাথা নিচু করে সরে আসে। সর্দির ভাইরাস লুঠেরার মতো শরীর দখল করতে থাকে। আমি ভিজতে থাকি...

শৈশবের মতোই, বিকেলের গন্ধে গন্ধে- সন্ধ্যা নামে।সূর্য্যটা রং হারাতে হারাতে,তোমার টিপের মতোই- কমলা-গোলাপীতারপর ডুব, ছাই আকাশের গায়!
পাটখড়ির গন্ধ, আগুনের সাথে তার কথা বলাবলি-গরম ভাঁপা-পুলি,মুখ বেয়ে নামা গুড়ের স্বাদ,সুদূর শৈশব! 
এ' নগরীতে বিকেলের গন্ধে আজো সন্ধ্যা নামে,নীড়ে ফেরে দুষ্টু শালিক,ভুবন চিল ঘুরে ঘুরে নামে ঋজু গাছটাতে,ফেরে না শৈশব!প্রতীক্ষাতে তুমি নেই,পলিথিন-পুলি হারিয়েছে আবেদন,অথবা বদলেছে স্বাদ বয়সের সাথে- আমার একার!
জনারন্যে একা হেঁটে যাওয়া- প্রতীক্ষাতে তুমি নেই!মাঝরাতে এ'পাশ-ওপাশ, ছেঁড়া ঘুম, নগরী ঘুমায়!কেউ এসে দেয় নাতো টেনে- ফেলে দেয়া কাঁথা, তুমি নেই!
শৈশবের মতোই, বিকেলের গন্ধে গন্ধে-টুপ করে নামে পৌষের সাঁঝ, এ শহরেও!শুধু প্রতীক্ষাতে উদ্বিগ্ন তুমি নেই।তুমি নেই-কতোদিন হয় না বকা খাওয়া,কতোদিন বই নিয়ে হয় না কথা বলা।

দরজা থেকে বিছানায় আসার পথে ভাবি,কেউ কি জানে আমি প্রায়ই এভাবেই খুব একলা হয়ে যাই মাঝেমাঝে মধ্য দুপুরে, মাঝেমাঝে মাঝরাতে । ঝিরঝির দখিনা বাতাস বয়ে যায় আমলকী বনে।কোনদিন কোন বৈশাখী দুপুরে আমাদের দেখা হয়নাই; তোমার চুলের ভাঁজে লুকিয়ে থাকে হারানো সময়। আমাদের দেখা হবে একদিন, সোনালী দুপুর! এসো একটি বসন্ত কাটাই পাশাপাশি ; আরো একটি বসন্ত না হয় আসুক কিছুটা ধীরে,  আমরা চোখে চোখ রেখে অপেক্ষা করবো; হিমালয় থেকে হিমালয়ের শীত বুকে নিয়ে  আসুক না উড়ে পুঞ্জ পুঞ্জ বিবর্ন বাতাস!  ঝরা পাতার মতন মৃত্যুর হলুদ রঙ গায়ে মেখে  আমরাও গা ভাসাবো অতল স্পর্শী কোন বাতাসী সমুদ্রে। পৃথিবীর অন্য কোন পাড়ে 
ফেরারী বসন্তের সাথে উড়ে উড়ে  নবজাতক কোন সুঘ্রান ফুলের বৃন্তে অথবা গাছের ডালে মুখোমুখি কচি দুটি পাতা  চোখে চোখ রেখে বলছে- এসো একটি গাড় বসন্ত কাটাই পাশাপাশি ; আরো একটি বসন্ত না হয় আসুক কিছুটা ধীরে।  আমি পুনর্জন্মের গান শুনি পাখিদের মুখে মুখে  তারা বলে “আবার দেখা হবে বন্ধু প্রিয় বসন্ত সুখে”। 

এক আকাশ গল্প



ভুলেই গেছি
যন্ত্রনার বাইরে
আকাশটা কি এখনো নীল আছে?
শোনার কথা ছিলোনা,তবুও
শেষ মুহুর্তের প্রতীক্ষারা বলে গেলো
উজাড় করার শেষে
অপেক্ষাই সম্বল!!!

জীবনে চলার পথে কখনও কখনও উদাসীন হতে হয় ,তা না হলে জীবনটা বড্ড জটিল হয়ে যায়। জটিল জীবন কেই বা চায় বকুল ? এর থেকে উদাসীনতাই বেশ ভালো। চারপাশটা এলোমেলো করে রেখে একটাই শব্দ গুছিয়ে রাখি...বড়ই দুঃখের বিষয় তার নামও উদাসীনতা। জীবনটা এতো মূল্যবান করে দিয়ে গেলি  বুঝতেই পারলাম না। না দিতে পারি...না নিতে। তবুও হিসেব দিতে পারি সব বেহিসেবি যন্ত্রনার।

ভুলেই গেছি যন্ত্রনার বাইরের  আকাশটা কি এখনো নীল আছে? শোনার কথা ছিলোনা,তবুও শেষ মুহুর্তের প্রতীক্ষারা বলে গেলো উজাড় করার শেষে অপেক্ষাই সম্বল! বকুল তুমি জানোনা, আমি সেখানেই আছি, শুরু হওয়ার দৌড়ে এগিয়েছিলে তুমি, শেষ হওয়ার দৌড়েও.....সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও এককোনা জানালা খোলা থাকে ...শুধু আকাশ দেখার জন্য...বকুল আমি এখনো গলির মোড়ে বখাটে ছেলেদের সাথে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে গান গাই। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি তোর জানালার পর্দাটা আজও নামানো। চায়ের কাপে তোকে নিয়ে তর্ক জুড়ি...
কিছু একটা দরকার, একটা কালো বলপেন দরকার। নতুন করে কিছু পুরাতন কথা লিখতে হবে...নতুন আংগিকে, আমার মা কে দরকার, কাছে থাকা বাবার মায়াবী রক্তচক্ষু দরকার। নতুন করে জ্বলে উঠার জন্য একটু পুরাতন প্রেম...

বকুল, একদিন তোর দখিনের জানালা খুলে দেখিস...দেখতে পাবি, একটা মানুষ হেঁটে যাচ্ছে কাউকে কিছু না বলেই। তোমাকে একদিন আমার শূন্যতার গল্প শোনাবো, শোনাবো আমার জলোচ্ছাস্বের স্বর।যখন নির্জীব, নিস্পন্দ বসে থাকি সেই জলোচ্ছাস্বের স্বর আচ্ছন্ন করে আমাকে, তোমাকে একদিন ধুধু তেপান্তরের দৃশ্য দেখাবো, যেখানে সারি সারি এপিটাফ, বন্ধুর কবর, ভীষন একঘেয়ে শূন্যতা খাবি খেতে খেতে কেমন গড়িয়ে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে। তোমাকে একদিন এক রাত্রি নিবিড় অঅলিঙ্গনে
জড়িয়ে রাখবো অন্ধকার মুড়ে; আমার ভেতরের অন্ধকার, আমার ভেতরের ঘর, আমার ভেতরের খাদ
আমার ভেতরের শূন্যতায় আছড়ে পড়া স্মৃতির ভয়াবহ স্রোত...

যে জীবন্ত শহরে ফেলে রেখে এলাম
টুকরো অভিমান , সে শহরে
জড়িয়ে থাকে প্রেমিকার নীল চিঠি ।
একটা একটা দুপুর সেখানে ভস্মীভূত হয় প্রেয়সীর লাল টিপে ।

দীঘল চুলে কেবলই
সন্ধ্যে নেমে যায় , নিয়ন আলোয় রাত
হয়ে যায়, কেবলই রাত হয়ে যায় ।।

আমার একাকীত্বের চিলেকোঠায় তুই অবহেলায় পড়ে থাকা একটা বই। যার নতুনত্বের গন্ধ আজও রয়ে গেছে  বহুব্যবহারের পর।  একদিন মুছে ফেলতে চেয়েছিলাম তোর বুকে লেগে থাকা আহত, বিষাক্ত, কলঙ্কিত অধ্যায়গুলো। আমার চোখের জল দিয়ে; পারিনি। আজ ইচ্ছে করে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফুঁ দিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিতে তোর কিছুটা হলদে-কিছুটা বিবর্ণ পৃষ্ঠাগুলো; কিন্তু পারিনা। এখানে অশ্রু জাগে প্রাণপনে, জীবনের উর্ধ্বশ্বাসে, উদ্দেশ্যহীন ভ্রান্ত পথে । কোলাহলের ভিড়ে, নিরব মুর্হূতখানি- দিয়ে যায় তার ঘুগান্তরের মন্ত্রবাণী। একফোঁটা অশ্রু জলের করুণায় শেষ হয়ে যায় জীবনের গোধূলি অনন্ত ছায়াপথের প্রান্ত সীমানায় ।
তোমায় বুঝতে সেদিন চায়ের কাপে ঝড় তুলেছিলাম,  একদিন পাতার ভাষা শিখতে হাওয়ার দ্বারস্থ হয়েছিলাম, গুমোট পরিবেশটা বলছিল সেদিন হাওয়াটাও হাওয়া হয়ে গেছে।  আসলে না বলা কথা বোঝার অনেক সন্ধিক্ষন আছে।শুধু ছায়াটাও বলতে পারে কাছে থাকার অনুভুতি।  তাই বুঝতে অসুবিধে হয়নি প্রলেপ দেওয়ার জন্যই প্রলাপ বকেছিলে সেদিন।  প্রলাপের পেছনের আলাপটা বোঝার জন্য আজ আবার গাছের নীচে এসে দাঁড়ালাম।  এইমাত্র মৃদু হাওয়া বইতে শুরু করলো...




এক হলুদ পাতার গল্প



কে যেন বাইরে থেকে ডাক দেয়
জ্যোৎস্নার মত শাড়ি, সরু পাড়।
ফেলে আসা শৈশবের রোদ,
ইস্কুলবেলার ধুলো
আঁচলে সাজানো আছে থরে থরে।

সুন্দর মলাটের হলুদ পাতাওয়ালা ডায়েরী নেই আমার। নেই নীল কালির বলপেন। আমার স্মৃতির ছবি নেই...আমার শূণ্য এক দীঘির পাড় আছে। আছে শিরীষের ছায়া,একলা এক পদ্ম। আর চারিপাশের আধ লম্বা ঘাস। তাদের পাশে চলে যাই...সব দুঃস্বপ্ন তো আর আড়ালে থাকে না। সেদিন শহুরে এক ভর দুপুর....বলেছিলাম অনেক আগে, হয়ত অভিমান কিংবা অনুরাগে। ভুলে যেতে চাই- সেই শেষ বিকেলের একাংশ কিংবা পুরোটাই। যে বিকেলে তোমার জন্য চিলের ডানায় বেঁধেছিলাম রোদ,
দুরন্ত এই হৃদয়্টাও হয়েছিল সুবোধ। যে সাঁঝের বেলা ভেঙে জোনাকি পোকা এনেছিলাম তোমার জন্য
তোমার জন্য যে বিকেলে হয়েছিলাম সুনীল। দশ-দিগন্ত খুঁজে এনেছিলাম চোদ্দটি গোলাপ নীল। কিন্তু বরুনারা কথা রাখেনা...

আমি মায়াবী হতে পারিনা
মায়াটা আমার ধরন নয়…
তবুও তোকে জড়াতে চাই।।

মাঝরাতে আমার বাগানের ছায়াগুলো বেঁকে ভেঙ্গে যাচ্ছিলো। জ্যোৎস্না তীব্র হয়েছে। ফুলের গন্ধ গাঢ়, মন্থর হয়েছে বাতাস। দুঃখীদের জন্য স্বপ্নের সন্ধানে বেরিয়েছেন ঈশ্বর, আনাচে-কানাচে ঘুরে তিনি চরাচর থেকে স্বপ্নদের ধরেন নিপুন জেলের মতন। আঁজলা ভরা সেই স্বপ্ন তিনি আবার ছড়িয়ে দেন। মাঝরাতে তারার গুঁড়োর মত সেই স্বপ্নেরা ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীতে; কই সেই স্বপ্নেরা আমার ঘরে আসেনাতো।
বহু বছর আগে হলুদ ফুলকে প্রথমবার আমি আমার যন্ত্রণার কথা বলি। প্রথমে মনে হয়েছিল কিছুটা হলেও অনুভবে ছিলাম আমি ; আসলে পরে বুঝেছিলাম ফুলেরা যন্ত্রণা বোঝেনা । তারপর পেরিয়ে গেছে শতাব্দী, রাজা থেকে সুলতান - সুলতান থেকে রাজা; তারপর বিদেশী  শাসকদের দাবানলে বার বার হারিয়েছি দেশ, সকাল হবার আগেই  লোটাকম্বল নিয়ে ছুটে গেছি ট্রেন ধরতে; প্রথমে অবশ্য ট্রেনছিল না, হাঁটা পথে পার করেছি ভূমি । জন্মভূমি স্বাদ কতদিন পেয়েছিলাম মনে নেই; মনে নেই প্রথম দেশের নাম; মনে নেই আমার প্রথম প্রেম । মনে নেই আমার দেখা প্রথম কাক তাড়ুয়ার কথা,
মনে নেই আমার শৈশব, মনে নেই রান্নাবাটির খেলাতে কে প্রথম আমাকে তার কুটুম ভেবেছিল ।
মনে নেই কবে প্রথমবার সাঁতরে পার হয়েছিলাম  নদীর মোহনা । এখন শুধু আকাশের তারা গুণে বাড়ি ফিরি । হায় জীবন! কেন তুমি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাও!

সেই যে শতাব্দী আগে হলুদ ফুলকে বলেছিলাম আমার কিছু কিছু যন্ত্রণার  কথা; আমার কিছু গল্প, আমার কিছু চেনা কবিতা, আমার তাল গাছ, আমার রোদ্দুর , যা কিছু আমার ছিল শুধুই আমার ।

এক বসন্তের রাতে চুপি চুপি এসেছিল এক ঝাঁক পাখি, 
দিগন্তের অনেক দূর থেকে নানা রঙের সেই সব পাখি। 
কারো হলুদ পাখনার সাথে লাল ফিতের অবগাহন । 
ভীড় করে এসেছিল এক সাথে- যখন সন্ধ্যার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছিল রাস্তার চারিদিকে, যখন 
তুমি পাটভাঙা ওড়নায় হেসেছিলে পূব দিকে চেয়ে,
যখন অফিসের লোকজন  ছুটেছিল বাসের পা-দানিতে ভর দিয়ে  বাড়ির ঠিকানায় ।
বাড়ির কার্ণিশে ভীড় করেছিল পাখিদের দল, 
কেউ কেউ দেখেছিল কেউ কেউ শুনেছিল এমন ঘটনা ।
কেউ কেউ করেছিল চিৎকার, 
কেউ কেউ লিখেছিল বিকেলের প্রেম। কেউ কেউ বলেছিল "আবার আসিবো ফিরে" । 
আবার কেউ কেউ মিথ্যে করে বলেছিল প্রেম ও পরিণয় । 
কেউ তো লিখেছিল "বিধবা যুবতী, দুখানি করুণ আঁখি মানে না যুকতি" ।
দিগন্তের অনেক দূর দেশ থেকে সূর নিয়ে পাখিরা ফিরেছিল সেদিন  বাড়ির কার্ণিশে ।

সেদিন তোর কথা বলেছিলাম চায়ের কাপে। কেউ কেউ বলেছিল তারা তোকে দেখেছিলো মিছিলে্‌...কেউ বলেছিল কথা হয়েছিল একবার,  এভাবেই রটেছিল সেই রাজকন্যার কথা, যার জন্যে কোন রাজপুত্র আসেনি ঘোড়ায় চেপে, এসেছিল কিছু পাথর ভাঙার দল ...
কিন্তু হায়! সবাই মালবিকা হতে পারেনা; সবার গালের আঁচিল উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায় না আকাশে বাতাসে...তাই আজও আমার দখিনের জানালায় উত্তুরে বাতাসেরা ডাক দিয়ে যায়...

এইবার এই শীত গেলে ফিরিয়ে দিও,
মান-অভিমান আর রাগ-অনুরাগ
গত বর্ষায় যা দিয়েছি সবটুকু তোমায়।

হয়ত
আমার একটা চিঠি ছিল না পড়া,
তাও রেখেছিলে ফেলে।
খামটুকু ও হয়ত খোলার সময়
হয়ে ওঠে নি কখনো।

হয়ত
বুকশেল্ফে একাকী একটা বই ছিল, না পড়া।

ফিরে আসার সময় জানতে পারিনি
পড়েছিলে কী না;
জেনেছিলে কী গল্প লেখা ছিলো তাতে?

হয়ত
বারান্দায় পড়ে থাকা কোন টবে
আমার ছুঁয়ে দেয়া কোন চারা গাছ
অযতনে কিছুদিন বেড়েছিল আনমনে।

কী ফুল হতো জানিনা তাতো
তুমিও জানোনি, 
তার আগেই যে শুকিয়েছে তার ডালপালা।

হয়ত
একটা কবিতা জন্মেছিলো
একাকী হয়ে থাকা চার দেয়ালে
কোন একদিন তুমি পড়বে বলে।

কুয়াশায় মগ্ন রাতে – ভিজেছে রাতভর
বাতাসে উড়ে যাওয়া সেই কবিতাও
পড়া হয়নি ।

এত কিছু হয়ত হয়ে, একদিন
পাতাঝরা শীত ফিরে গেলে 
যা-ই গত বর্ষায়
পাশাপাশি হেঁটে কুড়িয়েছি
দুজনে হাতে হাত রেখে।

গত বর্ষায় যতটা ভিজেছিল
আমাদের সর্বস্ব অশ্রুজলে – তার সবটুকু হয়ে
বর্ষার পরে শরৎ পেরিয়ে কিংবা
হেমন্তের খোলা আকাশে -
সেখানেই হয়তটা কিছু রেখেছিলে।

যদি পারো ফিরিয়ে দিও তাও-
শুদ্ধ ভালো বাসার ডাকটিকেট
লাগানো খামে মৌনতার দস্তাবেজ ভেবে।

আমি বুঝে নেবো ….
একদিন এখানেই তুমি ছিলে -
কোন এক আড্ডায় ;
গানের আসরে কিংবা
মিতবাক হয়ে থাকা জোছনায় -



এক হারিয়ে যাওয়া বাশিওয়ালা



কখনও সময় আসে....
জীবন মুচকি হাসে...
ঠিক যেন প’ড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা
অনেক দিনের পর মিলে যাবে অবসর
আশা রাখি পেয়ে যাব, বাকী দু'আনা... 

নাহ, আমার কোনো তাড়া নেই, আমি কোনো স্টেশান নই, তাই এখানে কেউই থামবে না... আমি দেখি কিছু ফিরে আসা আর বারবার কিছু চলে যাওয়া...। গভীর রাতে, একটা পাখির ডাকে আমি নীরবতার আবেশে তাকে বলে দিই আমার হারিয়ে যাওয়ার খবর। জানলার পাশে একটা জোনাকি আসে। আমি একটু খানি নরম আলোতে নিজেকে দেখি। তারপর জোনাকিটাও হারিয়ে যায়!

কাল ভোরে রোদের আগে উঠবো বলে আজ  অল্প শীতে উষ্ণ কম্বলের  নিচে মাথা রাখছিনা আলস্যে।  হয়তবা ঈশ্বরের উপর  হারিয়ে ফেলা বিশ্বাসের  সাথে হারিয়ে যাওয়া 'ভয়' নামক  অনুভূতি খোঁজার জন্যে এভিল ডেথ দেখতে বসেছি বাতি নিভিয়ে।  আগামীকাল তো ছুটি............
অচেনা মেয়েটা জানি নিদারুণ অপচয়  করে চলেছে, দামী কিছু  নোনতা জলের।  মেথা অ্যাম্ফিটামিন ও  ক্যাফেইন মিশ্রণে লাল রঙের  ইয়াবা পুড়িয়ে জেগে থাকা রাত তোমাদের কেমন কাটে আমি জানি না। গতবছর শীত  শেষে হারিয়ে যাওয়া ছেলে গুলোর সাথে হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতিচারণ
করতে গিয়ে বিছানার পাশে রাখা গতরাতের কলার খোসাতে পচন ধরেছে বুঝতে পারছি আজ,
কেমন জানি পরিচিত এক বিদঘুটে গন্ধে। উচ্চ ধারার সুখাদ্য টাইপ সাহিত্যের জন্ম দিতে পারি না,সস্তা কথা গুলো বলেতেই  আমার রাতেরা শেষ হয়ে যায়…

জানালা দিয়ে যতটুকু আকাশ দেখা যায়, মেঘগুলো বিষন্নতায়  উড়ছিলো শুধু। গাছগুলো বৃষ্টিতে ভিজে নতুন। আসন্ন পাতাদের সম্ভাবনায় কিছুটা আহ্লাদী। পাখিগুলো রাস্তায় জমে থাকে জলে
সারছিলো সমবেত স্নান। রাস্তায় চলতে থাকা গাড়িগুলো বারবার চৌরাস্তার লাল এ থামছিলো।
আমার জ্বরাক্রান্ত চোখ কেবলি ছুটে বেড়াচ্ছিল পাখী থেকে চৌরাস্তায় আকাশ থেকে গাছে।
ঝুলানো পর্দার দিকে তাকিয়ে এলোমেলো ভাবনায় মনে পড়ে কতকিছু। জ্বর এলেই এমন বেহিসাবী নিমপাতা দিন। কে জানে পৃথিবীর অন্যখানে বুক ভরা বেদনা নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটে কারো কি?
সেই বেদনাকে ছুঁতে পারে কে? শুধু জানালা দিয়ে তাকালেই দেখা যায় একটা ছোট্ট মেঘের পথ বহুদুর বেয়ে গেছে। মনটাকে বিমর্ষ করে দিয়ে সেই পথ ঘুরে আসি।

একঝাঁক মানুষের মধ্যে খুব একা হয়েছিলাম আজ বিকেলেই। শেষ বিকালের সূর্যটাই তার কারন। এই রকম সূর্যাস্তের কাছে গেলে মন যে কেমন করে। একটা ছোট্ট মেয়ে বালিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিল।আমি প্রজাপতির মত সেই মেয়েটার  দিকে তাকিয়ে ছিলাম। জীবনের সুখগুলো ওর ফ্রকের ভাজে ভাজে দোল খাচ্ছিল। অস্ত যাওয়া সুর্যের আলোতে ওকে কি দারুণ যে দেখাচ্ছিল।

এক রাশ কলকাকলির মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার নিজস্বতায় সূর্যকে আমার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিলাম।কি আশ্চর্য এক অনুভব, এখানের অস্ত যাওয়াটা সূর্যটা ওখানে মায়ের চোখ এ আলো দিচ্ছে।
মাকে কিইবা আর দিতে পারি? এই এতদুর থেকে মা ,মা গো আজ আমার সূর্যটা তোমার হোক। তোমার চাঁদটা আমায় দাও মা। আর সেই তারা ভরা আকাশ। যার দিকে তাকিয়ে তোমার বলা কবিতা শুনবো...

মরচে ধরা জানলার পাল্লা খুলতেই কিছু খুচরো পাপ ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে, আর মুখের আনাচে কানাচে গুঁড়ো গুঁড়ো অনুভব দমকা হাওয়ায় হ্যাঙ্গারে রাখা জামা দোল খায় ঘর জুড়ে আপন খেয়ালে। আর বারান্দার কার্নিশে ডানা ঝাপটায় বুড়ো কাক। নি:সঙ্গ দুপুর জুড়ে তোমার না আসা চিঠি, লিখে চলি অকারণ হলদে পাতা জুড়ে আর মনের প্রান্তে ক্যানভাসে কেউ এঁকে চলে রং-তুলি।

হঠাৎ একটা চড়ুই জানলা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়তে চায়, শুকনো পাতার ঝরে পড়ায় আর কড়ি বরগার ফাঁকে আটকে থাকা ভাঙা ঘুলঘুলি, পাঁচিলের ওপাশে আটকে পড়া রোদের ছায়া বাঁক ফিরে আধ বন্ধ হওয়া চায়ের দোকান আর আচমকা হাঁক দিয়ে যায় কোনো ফেরিওয়ালা,…
কুড়িয়ে বাড়িয়ে যেটুকু পড়ে থাকে নীল-তাকে কিংবা চৌকাঠ ভেঙ্গে পেরিয়ে যাওয়া সদর দরজায় আর গলির মোড়ে আসে না সেই অচেনা বাঁশিওয়ালা…

পথের মোড়ে মোড়ে ঝুলে থাকা গল্প




সেই যে নদীটা –
যার বুকের থেকে দেখা যায়,
পথে পথে মায়া ছড়ানো।
তার সাথে দেখা হলে ফের, জেনে নিও –
তার জলের কোন ঘুর্নিতে দুঃখ লুকানো।


আবার একটা বৃষ্টির প্রত্যাশায় বুক বেঁধে আছি। তোমার আমার অনাকাঙ্খিত প্রেম ভাসিয়ে নিয়ে যাবো ময়ূরাক্ষীর জলে। আমাদের প্রেমের তো কোনো শাখা ছিল না। তারপরও তোমার সাম্রাজ্যবাদী মন শাখা খুলেছিল কৃষ্ণনগর থেকে বাগনান; পসরা সাজিয়ে বসেছিল ভালো দামে বিকোবার আশায়...
কিন্তু একটা বৃষ্টি বদলে দিল সব। তোলপাড় তুললো... ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠলো সবাই এবার; তোমার আমার পার্সেন্টেজের হিসেব ভাগ করে নেওয়া এক চিলতে খোলা আকাশ সাক্ষী থাকবে মৃত অথবা অর্ধমৃত পাপবোধ গুলোর আটলান্টিস পাড়ি দেওয়ার।

শুধু অপেক্ষায় আছি কোনো ন্যাচারাল ডিজাস্টার আবার বছর ঘুরে এক করে দেবে বিচ্ছিন্ন দুই ব-দ্বীপের গল্প, আর কিছুই ভাবছিনা তেমন। টাকা আবার সত্তর থেকে চল্লিশের ঘরে আসবে কি না, তিস্তার জল ভাগের মা পাবে কি না, আর কত সি.আর.পি.এফ জওয়ান রক্তাক্ত হবে আর ভাবিনা এসব কথা।
উবু দশ কুড়ি বলতে বলতে কেটে যাচ্ছে অষ্টাদশীর চু কিত কিত এর বিকেল। সেখানে দিন বদলের ধুসরতা এখনও ছেলেবেলাকে গ্রাস করে না। এদিকে সন্ধ্যার স্তব্ধতাকে ঘিরে কেনি জি'র স্যাক্সোফোন ভাঙ্গতে থাকে শহুরে স্কাইলানের স্তব্ধতায় মোড়া যৌবন। ঠিকানা হারিয়ে অলিপাব এ খুঁজি বন্ধুত্বের ঘ্রাণ। সেখানে প্রাপ্তির ঝুলিতে একটিও আপেল পড়ে থাকে না। আলিশান মেহেফিল শুধু দেখিয়ে দেয় শীতঘুমের রাস্তা। এবার তবে অক্ষরে শুধুই বানপ্রস্থ লেখা হোক।

নীরবতার খুব কাছে গিয়ে প্রশ্ন করি;
ভিতরে এত তোলপাড় কীসের তোমার ?
কখনও ভালবেসেছিলে কাউকে ?
অথবা  বিষাদ
হয়ে দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলো কেউ ?
তুমি যাকে আকাশ ভেবে দিগন্তরেখায়  মিশিয়েছিলে?
সেটা আসলে পাহাড় ছিলও ; দৃঢ় চিবুকে অশ্রু- বেদনহীন।
কিংবা  বলতে পার মরুর মাঝে একটি সবুজ পাতা ;
ভাবতে শেখায় মৃত্যু ছাড়া জীবন ভারী বোকা!
ভাবতে পারো মৃত্যুর সাথে জীবন শুরু করা,
ভাবতে পারো ভালবাসলেও কিন্তু
তুমি একাই…!!
আর যদি না ভাবতে পারো,
তবে নীরবতা কে প্রশ্ন করো – কীসের
নীরবতা ?

হঠাৎ একটা ছবি মনে পড়ল, আঁকতে আঁকতে কারা যেন উঠে গেছে কুহু ডাকে। আর সেই পাখিরা- নগ্ন মেঘেরা- দাঁড়িয়ে আছে একঠায় বেসামাল বিটপের ঠোঁটে। মাঝে মাঝে ভুলে যাই পৃথিবীর জ্যামিতি, মাঝে মাঝে ভুলে যাই ফিরে আসা। লবঙ্গীর বনে নড়ে ওঠে আরও একটা পোড়ানো নিলয়।

ট্রেন চলে গেলে শূণ্যতা পড়ে থাকে পিছনে পিছনে; শহরটা মরে যায় একদিন। ধূলি জমে থাকে এখানে ওখানে, কোনো ট্রেন ভিড় করে না আর ধূলি জমা স্টেশনে। শূন্যতা বিষয়ক একটি গল্পের মধ্যে কত যে প্রশ্ন...। উত্তরপর্বে এসে বোকার মতো মাথার উপর খোলা আকাশ নিয়ে হাঁটি বহুদূর- তবুও কি খুঁজে পাই তৃষা মেটাবার মত...।  বুকের মধ্যে অচিন পাখি এক করুণ স্বর, কাঁদে নিভৃতে। পূর্ণতার কাছে পরিত্যক্ত এই অস্তিত্বের খড়িমাটি!
পথের মোড়ে মোড়ে ঝুলে থাকে অনেক প্রশ্ন- অনেক উত্তর নতমুখ হেঁটে যায়- রঙিন হাসে। এইসব দেখে দেখে শূন্যতা বিষয়ক গল্পটা ক্রমশ বড় হয়- অনেক প্রশ্নের উত্তর তবুও অজ্ঞাত। শুধু চলতে চলতে হঠাৎ সরু পথ- ঘোলাটে দৃষ্টি।

আসবে যত পাতার কথাও -
কে কখন চেয়েছিলো শীতের কবিতা -  বলেছিলো - কথা দাও-
আজও সে কথামালা আছে তোলা  অবাক খাতার 'পরে - আজ আবার
হয়তো হবে খোলা।
হয়তো হবেনা - আহা - না ঝর্ণা - না বর্ষাবেলা -
পদচিহ্নময় বাংলার রূপোলি খেলা -
খেলা ফেলে চলে যাওয়ার নৌকো জীবনে ফেরেনা।
নোঙরের দাগ পড়ে রয় ঘাটে - তবু সে অচেনা।
দেখি - ঝকঝকে সব মুখ - চকচকে স্নানঘর -
অর্ধচেনা - অর্ধজানা - আশপাশের নতুন  কলস্বর।
ওই মুখ, ওই ঘরদোর আমাদেরই পাড়ায় ছিলো -
আগে তা তেমন করে নজর পড়েনি - আজ হঠাৎ পড়লো।
এইমাত্র রাস্তায় দেখা নতুন মুখকে মনে করে -
হয়তো কবিতা হবে - কিংবা গল্প।
পাতারা রাখবে ধরে।
ওই তো সূর্যাস্ত দেখে পাখিরাও ঝাঁক  বেঁধে নীড়ে ফেরে।
কাল আবারও  দেখা হবে যথারীতি সূর্যওঠা ঘিরে।

ভাল আছি- ভাল না থাকলে কি আর আড্ডায় আড্ডায় রাজা-উজির মেরে বেড়াই কিংবা তাড়িয়ে বেড়াই বনের মোষ? এই কথা শুনেই তুমি তো হোঃ হোঃ হেসেই খালাস! কাল যেমন হঠাৎ দেখা বন্ধুটিও তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে...। আশ্রমে যাবার কথা  শুনলে কি হাসতে হয় ? কেউ কি জানে কার বুকে কার আশ্রম!  উড়তে উড়তে কত যে পালক খুল গেল- কত স্বপ্ন যে দুঃস্বপ্নের অতলে তলিয়ে গেল- সে মনে রাখেনি তার একটি অর অথবা বর্ণও! সে শুধু জানে একদিন তাকে ছুঁয়ে দেখতে দূরের আকাশ। তাই সে রোদে পোড়ে- বৃষ্টিতে ভেজে...
একদিন সে সত্যি সত্যিই আকাশ ছুঁয়েছিল- নীলিমার চোখে চোখ রেখে, ঠোটে...। সেদিন তার মৃত্যু  হয়েছিল!
তোর অজস্র বসন্ত বিকেল থেকে, শুধু একটা বিকেলে আমাকে ধার দিস। ডানা ভাঙ্গা পাখির দল তোর  আর আমার হারিয়ে যাওয়ার সাক্ষী !  আমি তো হারিয়ে যাবো ঠিক ই, অজানা অহংকারে ,
মিছে দাম্ভিকতায় আর  অর্থহীন জেদে !  ডানাভাঙ্গা পাখিরা ঠিক ই মনে রাখবে !
আমি একটা বিষন্ন রাতের গল্প , যার  তারাগুলো বিষাদের  সুরে কাতর ! বাতাসে গভীর শুন্যতার ছায়া !
আমি লিখতে বসেছি অতৃপ্ত  আত্মার গল্প সঙ্গী আঁধার আর মন খারাপ করা রাত !!

বসন্তের স্নিগ্ধ বিকেলের হাওয়ায় সবুজের আলোড়ন , যান্ত্রিক অবয়বে তোর আগমনে প্রকৃতিতে উচ্ছ্বাস ছিলনা ! আমার নিস্তব্ধ  সাঝবেলায় তখনো হাওয়ার  ছাট লাগেনি !  ধীরে ধীরে মনোজগতে তোর অদৃশ্য দখলদারি ! আমার পাখিদের সুর তুই বুঝিস , আমার  বিকেলের রোদ তোর হয়ে যায় ,
আমার নদীর বাকে তোর ছোট্ট  কুটিরে জোছনা বিলাসের  সমস্ত অধিকার তোর ই কেবল !
তারপর একদিন তোর চোখে আমি অপ্সরী ছায়া দেখতে পাই !

"And There will be
companions with beautiful ,
big , And Lustrous eyes " !

আমার নদীর জল , আমার বিকেলের হাওয়া , আমার পাখিদের গান তোকে উপহার দিই রোজ !বিনিময়ে পাই তোর  আকাশের মেঘের ছায়া , তোর স্নিগ্ধ সকাল !
তারপর একদিন ঝুম  বৃষ্টি নামলো আমার জানালার টুকরো আকাশ থেকে ! দু ফোটা বৃষ্টি জল আমায়
ছুঁয়ে গেল ! তোর  আকাশে তখনো কালো মেঘ !  বিষন্ন আকাশের হুংকার ! পাখিদের ওড়াওড়ি নেই ,  আমি জানিনা তোর আকাশ  কি এখনো থমকে আছে বিষন্নতায় ??  আমার জানালার কান্না বন্ধ
হলে আমি তাকাই তোর আকাশে ! কিন্তু হায় আমি দেখতে পাইনা তোর আকাশ , তোর স্নিগ্ধ সকালের  মায়াবী রোদ ! আমার নদীর বাঁকে  কুড়েঘরে জমে থাকা অভিমান ! নদীতীরে বসা একটা নিঃসঙ্গ  চিলকে পাঠাই তোর খবর  আনতে , সে চিল আর  ফিরে আসেনা ! আরো চাপা অভিমান
বুকে বাসা বাধে ! তারপর এক  সাঝ বেলায় মৃত্যু এসে ভর  করে আমার ঘুমে ! নিরস  দেহটা পড়ে থাকে , মৃত্যূ হয় অভিমানী আত্মার।  

আমি দেখতে পাই আমার মুঠোফোনে তোর অজস্র ডাক , দেখতে পাই মুঠোফোনে তোর পাঠানো কথা মালার আগমন ! আমি যে স্পর্শ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি , আমি সে কথামালা জানতে পারিনা ,  পারিনা জানিয়ে দিতে আমার  অভিমানী আবেগ ! খুব  জানতে ইচ্ছে করে কি হয়েছিল
তোর , খুব জানিয়ে দিতে ইচ্ছে করে অভিমানী মেঘের  যে মরণ হয়েছে! একটা চিল উড়ে যায় তোর বাড়ির দিকে , আমি তাকে বলে দেই আমার আকাশ হয়ে যাবার খবর !

যে সব মেঘ রাস্তায় দাড়িয়ে বরফ  বিক্রি করে
তাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিয়ে
তোমার চুলের সঠিক বিন্যাসের ব্যাপারে
থেকেছি প্রচার বিমুখ।
সবচেয়ে অভিজাত স্পর্শগুলো হ্যাংগারে
ঝুলিয়ে বুঝলাম তোমার দাঁড়াবার ভঙ্গি
আবিষ্কারের ফলে আমার কোন উপকারই
হয়নি।

আকাশটা তখন অদ্ভুত ছাই রঙের। শীতকালেএমন মেঘলা আকাশ সচরাচর দেখা যায় না।
প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে মাঝে মধ্যেই। যে পথে এসেছিলাম সে পথেই আবার হাটতে শুরু
করলাম। এই গাছগুলি সবাই আমার পরিচিত, এই রাস্তার  পিচটাও কত পরিচিত। তবু আজ যেন কত
অচেনা লাগলো। আস্তে আস্তে ইলশেগুড়ি বৃষ্টি শুরু হল,
চারপাশে সবাই দৌড়ে ছায়াতে চলে গেল,  কেউবা ছাতা বের করলো। চারপাশটা কি নিশ্চুপ আর বিষন্ন। আমি ধীরে ধীরে হাটতে থাকলাম।  ক্যাম্পাসের পেছনের গেট দিয়ে বের
হয়ে হাটতে হাটতে কখন যে কলেজ স্ট্রিটের মোড়টাতে এসে দাঁড়িয়েছি, নিজেও খেয়াল
করিনি। আমার সামনে কফিহাউসের দিকে চলে যাওয়া রাস্তাটা। বৃষ্টি তখন বেশ
জোরেই পড়ছে।
পথ... শুধুই কি পথ ? পথের সাথে জড়িয়ে থাকে পথিকের স্মৃতি। পথ কি খেয়াল রাখে, তার বুকে হেটে যাওয়া পথিকের কথা ? তাদের অভিমান অনুভূতির কথা ? এই রাস্তায় কত মানুষ হেটে গিয়েছে, তাদের আনন্দ অভিমান কষ্টগুলিকে সাথে নিয়ে, এই রাস্তা কি তা মনে রেখেছে ? অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে আমি হাটতে থাকলাম প্রিয়তম  এই পথে। চারপাশটা এত নির্জন। বিচ্ছিন্নভাবে এক দুটো ঠেলাগাড়ি ছাড়া কিছুই  চলছে না। বৃষ্টি পড়ছে অঝোর ধারায়, ভিজে যাচ্ছি আমি, ধুয়ে যাচ্ছে আমার ভেতরটা।  থেকে থেকেই দমকা হাড় কাপানো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। এমনিতে আমি ভয়াবহ শীতকাতুরে, কিন্তু  কি আশ্চর্য ব্যাপার আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না। আমি খুঁজতে থাকলাম সেই শঙ্খচিলগুলিকে যাদেরকে আমি চিনেছিলাম কোন এক ঘোর লাগা সন্ধ্যায়। কি আশ্চর্য !  আজ তারা কোথাও নেই। একই  পথে আমি হেটে যাচ্ছি একা, সঙ্গে বিষন্ন  মেঘগুলি আর ঝরে পড়া জলের বিন্দুগুলি।
রেমিনিসেন্ট। হ্যা, ধার করা শব্দ, ধার করা অনুভূতি।পৃথিবীতে আরো অনেক ঋণের মত হয়ত এই ঋণটাও আমি শোধ  করতে পারবো না কোনদিন, হয়ত যিনি ধার
দিয়েছেন তিনি জানবেনও না, তারই
অগোচরে তার অনুভূতিকে ব্যাবহার  করেছি আমি।
এক আশ্চর্য  কারনে বৃষ্টির  স্পর্শেও রেমিনিসেন্ট শব্দটাই  আমাকে আবার আঘাত করলো। কতদিন এই  বৃষ্টির স্পর্শ পাইনি আমি। এই স্পর্শ যেন  আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে কত একাকীত্বের কথা।
হাটতে হাটতে কখন যে বাড়ির কাছে  চলে এসেছি নিজেও খেয়াল করিনি।
তখনও অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে, আর আমার মাথার  মধ্যে বেজে অঞ্জন দত্তের গানের কিছু লাইনঃ

"থাকবে না রাস্তায় গাড়ি ঘোড়া, দোকান পাট
সব বন্ধ
শুধু তোমার আমার হৃদয়ে
ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ"

অনেকদিন পর খেয়াল করলাম  আমার চোখ আবার ঝাপসা হয়ে গিয়েছে, বৃষ্টির জলেই সম্ভবত।

তোমায় বুঝতে সেদিন চায়ের কাপে ঝড় তুলেছিলাম,
একদিন পাতার ভাষা শিখতে হাওয়ার দ্বারস্থ হয়েছিলাম, গুমোট পরিবেশটা বলছিল সেদিন হাওয়াটাও হাওয়া হয়ে গেছে।
আসলে না বলা কথা বোঝার অনেক সন্ধিক্ষন আছে।শুধু ছায়াটাও বলতে পারে কাছে থাকার অনুভুতি।
প্রলাপের পেছনের আলাপটা বোঝার জন্য আজ আবার গাছের নীচে এসে দাঁড়ালাম।
এইমাত্র মৃদু হাওয়া বইতে শুরু করলো...
রাতের অন্ধকারেও নাকি লুকিয়ে থাকে কিছু গল্প।  আমি তাই চোখ মেলে অন্ধকারের  উপস্থিতি মেপে অপেক্ষায় আছি। দাও, তোমার  গল্পের কিছু প্রান, তা দিয়েই  আমি রচনা করবো অসহায়
আত্নসমপর্ণে হারিয়ে যাওয়া কোন গানের শেষ  দু'লাইন। একদিন এক ইউক্যালিপ্টাস
গাছ এর  গল্প বলেছিলাম তোমাকে।  জোছোনার সমুদ্রে ভিজে দীর্ঘ এক  রাত্রিতে  আরো কত কথাই
তো বলেছিলাম।
ঝিকিমিকি,তপোবন, মালাকাইটের  ঝাঁপি,ইস্পাত, মা,অন্ধ সুরকার এর মত প্রিয় বইরাও ছিলো আমাদের  গল্পে।  ছিলো জোনাকি।  ছিলো প্রথম ভালোবাসা। প্রথম দুঃখ ; প্রথম চুমুর গল্প। সেই তুমিটাও কোথায় যেনো হারিয়ে গেছো। যখন হাত বাড়ালেই তোমার উত্তাপে ভেজবার কথা।
যখন চোখ মেললেই তুমিময় আলো।
নাহ অনেকদিন হয়ে গেলো; গল্পবলা রাত আর আসেনা।  প্রিয় বই, প্রিয় পাখি,  প্রিয় গাছ এর গল্পবলা আর হয়না আমার। এখন আমার দীর্ঘরাত  জুড়ে দেয়ালের সাদা।  বালিশটাকে উল্টেপাল্টে  দেই বহুবার। যদি স্বপ্ন বেয়ে আসো কোনদিন।  আমি তোমাকে ছুঁয়ে দেখবো। তোমার চোখের তারায় এখনো কি এক  কাঠবিড়ালী উচ্ছল হয়?  তোমার বুকের  কাছে দাঁড়িয়ে  এখনো কি পাড়ি দেয়া যায়
অনেক শহর ?

হলুদ পাতা আর বরফ  ছুঁয়ে দিতে একবার ও কি আসবেনা তুমি? আমার ঘরের দেয়ালে ঝুলানো আয়নাতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুজনে  আবার কখনো কি ভালোবাসা হবে? হবে কি পৃথিবীর এ  যাবতকালের  সবচেয়ে দীর্ঘ এক আলিঙ্গন?

তুমি এখন আর স্বপ্ন বানাও না,
এখন আমিও আর স্বপ্ন দেখি না,
এখন আর তুমি বৃষ্টিতে ভিজো না,
সব সময়কার মত বৃষ্টি জলে শুদ্ধ
হতে আমি চাইনা অনেকদিন…
তুমি সন্ধ্যা ঘনালে লালচে আকাশে মেলাও,
আমি একটা দুটা তারা গুনে গুনে ক্লান্ত হই…
আমি বারান্দার ঝুলন্ত দোলনায় দুলতে দুলতে
এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি।
তোমার গড়া স্বপ্নগুলো আমার চোখে হাত
বুলায় না তখন,
রাতের
আঁধারে চুপি চুপি স্বপ্নগুলো ডানা মেলে না।
উড়ে উড়ে আমার আকাশে রঙ ছড়ায় না।
কাকডাকা সকালে তুমি ব্যস্ত  পায়ে হেঁটে হেঁটে যাও
একটু খানি আকাশ দেখার তোমার হয়না অবসর,
আমি সেই আকাশের ছোট্ট প্রজাপতি হই না।
তবুও তুমি জানো, আমি জানি-আমাদের
স্বপ্নগুলো এক…
আমার বুক পকেটে এক অচল স্বপ্ন ঘুমায়,
তোমার শাড়ির আচলে বাঁধা থাকে সেই একি ঘুমন্ত  স্বপ্ন…


সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতো যখন নেমে আসে সন্ধে, আমি সেই ভেজানো জ়ানালার ফাঁক দিয়ে দেখি কি নিবিড়ভাবে তুই ভূগোলের পাহাড় নদী পার হয়ে এসে পড়েছিস রুপসার ঘোলা জলে ...
তারপর এক সময় নূরজাহান হয়ে  নিজেই মিশে যাচ্ছিস পাঠ্যবইয়ের ইতিহাসে ...কখনও আবার রসায়নের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হয়ে যাচ্ছিস  টেস্টটিউবের লঘু সালফিউরিক আ্যাসিড; আর দূরে তখন আমি কোনও এক ল্যাবে সাতশো বছর ধরে পড়ে থাকা কপার কেঁপে কেঁপে উঠছি তোর স্পর্শের অপেক্ষায় ..
মরচে ধরা জানলার  পাল্লা খুলতেই  কিছু খুচরো পাপ  ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে, আর মুখের আনাচে কানাচে গুঁড়ো গুঁড়ো অনুভব দমকা হাওয়ার;  হ্যাঙ্গারে রাখা জামা দোল খায় ঘর জুড়ে আপন  খেয়ালে।  আর বারান্দার  কার্নিশে ডানা ঝাপটায়  বুড়ো ডাক। নি:সঙ্গ দুপুর জুড়ে তোমার
না আসা চিঠি, লিখে চলি অকারণ হলদে পাতা জুড়ে আর মনের প্রান্তে ক্যানভাসে কেউ এঁকে চলে রং-তুলি। হঠাৎ একটা চড়ুই জানলা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়তে চায়, শুকনো পাতার ঝরে পড়ায় আর কড়ি বরগার ফাঁকে আটকে থাকা ভাঙা ঘুলঘুলি, পাঁচিলের ওপাশে আটকে পড়া রোদের ছায়া বাঁক ফিরে আধা বন্ধ হওয়া চায়ের দোকান  আর আচমকা হাঁক দিয়ে যায়  কোনো ফেরিওয়ালা,…

কুড়িয়ে বাড়িয়ে যেটুকু পড়ে থাকে নীল-তাকে কিংবা চৌকাঠ ভেঙ্গে পেরিয়ে যাওয়া সদর দরজায় আর গলির মোড়ে আসে না সেই অচেনা বাঁশিওয়ালা… কিছু খুচরো পাপ গড়িয়ে পড়ে হাতের নাগাল না পেয়েও!

একদিন পালিয়ে যাবো। শহরের কড়া রোদ থেকে,
অবিরত শোরগোল, বন্ধ ঘরের গুমট গন্ধ থেকে,

পালিয়ে যাবো বালুময় বাতাস থেকে, শ্যাওলা পড়া ইটের দেয়াল, সে দেয়ালে নিয়ত
আছড়ে পড়া প্রতিধ্বনি থেকে।
সে প্রতিধ্বনিতে মানুষের হাহাকার মিশে থাকে।
আফসোস এর নিঃশ্বাসে ভারি হয়ে থাকে এ বাতাস। তোর আমার
হতাশার গল্প শুনতে শুনতে একদিন এ দেয়াল
ধসে পড়ে আমাদের উপর।

পালিয়ে যাবো দুঃস্বপ্ন দেখানো অন্ধকার থেকে,
সন্ধ্যাতারা লুকিয়ে রাখা কালো মেঘ,
অসীম আকাশের গায়ে কাটা দাগের মতো
লেপ্টে থাকা বিদ্যুতের তার থেকে, খোলা রাস্তায়
মানুষের ভীড় থেকে, ধুলো জমা ধুসর- সবুজ পাতা থেকে।
বিরান পথে নেমে যাবো, যে পথে পেছন থেকে
রিকশার ভেপু তাড়া করে বেড়াবে না, পাতায় ময়লা জমে নাযেখানে নিরন্তর বাতাসে- সে পথের
সাথে বন্ধুতা করে নেব।

একদিন হঠাৎ করেই দেখবি তোর বন্ধুতা, ওর ভালোবাসা ছিড়ে টুকরো করে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবো। কত গল্প বাকি থাকতেই আসর ভেঙ্গে উঠে চলে আসবো।
হয়তো পথ চলতে চলতে ধরে থাকা হাতের বাধন আলগা করে নেব, শত স্পর্শ কামনার সুখ
পায়ে ঠেলে বিজনগামী হব।

কেউ কাঁদবে , কেউ ভাববে, কেউ বা
বড়ো করে নিশ্বাস ফেলবে ...হয়তো অস্বস্তির, হয়তো স্বস্তির।।।কিন্তু তবু
তোর গান শোনার জন্য কান পেতে থাকবো না, অন্যের বাঁশীর শব্দে বিমোহীত হব না,
পালিয়ে যাবো অনেক অনেক দূরে। এই শহর, শহরের
শ্যাওলা পড়া দেয়ালের মোহ  কাটিয়ে অন্য কোথাও, নিজেকে খুজে নেবো। একটু
জায়গা খুজে নেব খোলা মাঠে বা পাহাড়ের চুড়োয় কিংবা ভীষণ একা কোন রাস্তার ধারে-
যেখানে কড়া রোদ নেই তাই তেষ্টায় বুক ফাটার গল্প নেই, মানুষের ভীড় নেই-
আছে এলোমেলো পায়ে হেটে বেড়ানোর স্বাধীনতা।
আছে স্তব্ধতা- শুনতে পাবো ভেতরের ডাক, বুঝবো বেঁচে আছি।
স্বচ্ছ আকাশের হাজারো তারার মেলা দেখবো, গলায় আটকে  বসা গান
গুলো ডানা মেলবে
বাতাসে- অবচেতনে। নির্বাক ঘাস্ কে গল্প শোনাবো
রাত-ভর; আমার গল্প। সব বলে নিঃস্ব হয়ে যাবো।
নিঃস্ব হতেই একদিন নিরুদ্দেশ
হয়ে যাবো।