আমাদের মা আজো টলমল করে

মধুর আমার মায়ের হাসি
চাঁদের মুখে ঝরে
মাকে মনে পড়ে আমার
মাকে মনে পড়ে।



বেলা শেষে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে গোধূলি লগ্নে মায়ের উষ্ণতার পরশে দূর হয়ে যায় সব ক্লান্তি। বাষ্পীভূত চায়ের পেয়ালা... খোশ গল্প... রান্না ঘরের টুং টাং ঝংকারে চেনা সুর। মায়ের অনুভূতি সমস্ত ঘরে... মায়ের ঘ্রাণ সমস্ত শরীরে... মায়ের চিন্তা সমস্ত মন জুরে। জগদ্বিখ্যাত মনীষী আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, আমি যা কিছু পেয়েছি, যা কিছু হয়েছি, অথবা যা হতে আশা করি, তার জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী’।
কয়েক দিন আগে বাসার একটা বিষয় নিয়ে মায়ের সাথে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছে। এর পর থেকে মায়ের মুখ ভার। বড় হ্ওয়ার অনেক হ্যাপা। দুর দিয়ে ঘুর ঘুর করি... কিছু বলি না... মা'ও বলে না। আমার ভেতর উথাল পাথাল। কি করা যায়... কি করা যায়। কিভাবে মায়ের রাগ ভাঙানো যায়। কষ্টে সারাটা রাত ঘুম আসেনি। কেনো এমন করলাম মায়ের সাথে? আরেকটু ভাল ভাবে বলা যেত কথাগুলো। এটা আমাদের অনেকেরই হয় ...

ছোট থেকেই একটা কথা শুনে আসছি... শিশুদের জন্য জাপান... তারুণ্য এবং যৌবনে পশ্চিমা দেশ আর বার্ধক্যে ভারত উপমহাদেশ। বয়ষ্কদের যত্ন ... তাদের সেবা শুশ্রুষায় ভারত উপমহাদেশের প্রশংসা সবসময় ছিল তবে এটা কতদিন থাকবে তা নিয়ে সন্দিহান। নইলে কি নচিকেতা গান বাধেঁ?
ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার
মস্ত ফ্লাটে যায়না দেখা এপার ওপার
নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামী দামী
সবচে কমদামী ছিলাম একমাত্র আমি

ছেলের আমার, আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম।।

http://www.youtube.com/watch?v=cEdWxhA6FS8&feature=related

চলে যাওয়া মা দিবসে 'সেভ দ্যা চিলড্রেন' একটা সংবাদ প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায় সারা বিশ্বের মায়েদের মধ্যে ভারতের অবস্থান সবচাইতে নিচের দিকে। রিপোর্টটা খুবই পীড়াদায়ক। খুব কষ্ট পাই মায়েদের নিয়ে কোন নেগেটিভ লেখাতে। ৭৭টি দেশের মধ্যে আমাদের  ভারতের জায়গা ৭৩ নম্বরে। মায়েদের এই দুরবস্থার মূল কারণ দারিদ্রপীড়িত গ্রামগুলোতে চিকিৎসা সেবার ঘাটতি। মায়েদের প্রসব কালীন মৃত্যুর হার এক লক্ষে ২৫৪ জন।

‘সেভ দ্যা চিলড্রেন' বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ১৬৬ টি দেশকে নিয়ে তালিকা তৈরী করেছে। সেখানে স্বল্পোন্নত ৪০টি দেশের মায়েদের মধ্যে ভারতের  অবস্থান ১৪২ । এটাকে নিয়ে সন্তোষ প্রকাশের কিছু নেই। আমাদের মায়েরা কি পরিমাণ দুর্দশাগ্রস্থ তা আমরা অবগত। প্রসুতী মায়ের যত্ন শহড়ে কিছুটা হয় বৈকি গ্রামাঞ্চলের চিত্র হতাশা ব্যাঞ্জক।

ফেসবুকিংয়ে একটি সংবাদের শেয়ার করা লিংক ধরে পড়লাম সবটুকুই... মাকে সরাসরি দেখে বা স্পর্শ করে শিশু যে মানসিক স্বস্তি পায় টেলিফোনে কেবল মায়ের কন্ঠ শুনেই তারা সেই একই স্বস্তি পেতে পারে। নতুন এক গবেষণায় এ কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা। গবেষণার ফল এটাই প্রমাণ করছে যে, সম্পর্কের বন্ধনের ক্ষেত্রে স্পর্শের মতো কণ্ঠস্বরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।  আর তাই আমরা... মাকে ছেড়ে দুরে থাকা সন্তানেরা সারা সপ্তাহ অমানুষিক পরিশ্রম শেষে মাকে একটা ফোন করি... যা আমাদের সপ্তাহের ক্লান্তি এক নিমেষেই হাওয়া করে দেয়।

সদ্য ভ্রুণ থেকে ভুমিষ্ঠ হ্ওয়া শিশুটির প্রথম যে শব্দটি উচ্চারণ করে তা হলো মা। পৃথিবীতে এর চেয়ে মধুর কোন শব্দ হতে পারে না। জন্ম প্রক্রিয়ার শুরু থেকে পৃথিবীর আলোর মুখ দেখা পর্যন্ত... প্রতিটি স্তরে স্তরেই মা। প্রচণ্ড অসুস্থ অবস্থায়ও মা তার সন্তানের হাসি মুখ দেখতে চায়। ত্যাগী মহিমাময় এই মায়েদের জন্য আর কিছু করতে না পারি অন্তত তাদের মুখে যেন কখনোই দু:খের ছায়া পরতে না দেই।
সংসারের প্রতিদিনের ব্যস্ততায় কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামে আমার মায়ের মুখে জীর্ণতার ছোঁয়া লাগে ... চাঁদের হাসিটা মলিন হয় ... কিন্তু ফুরসত নেই মায়ের ভালবাসার। অন্তহীন এই ভালবাসা। এই ঋণ আমি কেউ কখনোই শোধ করতে পারবো না।
সব শেষে হুমায়ুন আজাদের একটি কবিতা তুলে দেই

আমাদের মা – হুমায়ুন আজাদ
আমাদের মাকে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি।
আমাদের মা গরিব প্রজার মত দাঁড়াতো বাবার সামনে,
কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ ক’রে উঠতে পারতোনা।
আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে
মাকে আপনি বলার কথা আমাদের কোনোদিন মনেই হয়নি।
আমাদের মা আমাদের থেকে বড় ছিলো, কিন্তু ছিলো আমাদের সমান।
আমাদের মা ছিলো আমাদের শ্রেনীর, আমাদের বর্ণের, আমাদের গোত্রের।
বাবা ছিলেন অনেকটা আল্লার মতো, তার জ্যোতি দেখলে আমরা সেজদা দিতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা সিংহের মতো, তার গর্জনে আমরা কাঁপতে থাকতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা আড়িয়াল বিলের প্রচন্ড চিলের মতো, তার ছায়া দেখলেই
মুরগির বাচ্চার মতো আমরা মায়ের ডানার নিচে লুকিয়ে পড়তাম।
ছায়া সরে গেলে আবার বের হয়ে আকাশ দেখতাম।
আমাদের মা ছিলো অশ্রুবিন্দু-দিনরাত টলমল করতো
আমাদের মা ছিলো বনফুলের পাপড়ি;-সারাদিন ঝরে ঝরে পড়তো,
আমাদের মা ছিলো ধানখেত-সোনা হয়ে দিকে দিকে বিছিয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিলো দুধভাত-তিন বেলা আমাদের পাতে ঘন হয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিলো ছোট্ট পুকুর-আমরা তাতে দিনরাত সাঁতার কাটতাম।
আমাদের মার কোনো ব্যক্তিগত জীবন ছিলো কিনা আমরা জানি না।
আমাদের মাকে আমি কখনো বাবার বাহুতে দেখি নি।
আমি জানি না মাকে জড়িয়ে ধরে বাবা কখনো চুমু খেয়েছেন কি না
চুমু খেলে মার ঠোঁট ওরকম শুকনো থাকতো না।
আমরা ছোট ছিলাম, কিন্তু বছর বছর আমরা বড় হতে থাকি,
আমাদের মা বড় ছিলো, কিন্তু বছর বছর মা ছোটো হতে থাকে।
ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ার সময়ও আমি ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতাম।
সপ্তম শ্রেনীতে ওঠার পর ভয় পেয়ে মা একদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে।
আমাদের মা দিন দিন ছোটো হতে থাকে
আমাদের মা দিন দিন ভয় পেতে থাকে।
আমাদের মা আর বনফুলের পাপড়ি নয়, সারাদিন ঝরে ঝরে পড়েনা
আমাদের মা আর ধানখেত নয়, সোনা হয়ে বিছিয়ে থাকে না
আমাদের মা আর দুধভাত নয়, আমরা আর দুধভাত পছন্দ করিনা,
আমাদের মা আর ছোট্ট পুকুর নয়, পুকুরে সাঁতার কাটতে আমরা কবে ভুলে গেছি।
কিন্তু আমাদের মা আজো অশ্রুবিন্দু, গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত
আমাদের মা আজো টলমল করে।

0 comments:

Post a Comment