জোনাকি


ছোট্ট ঘরটার দেয়ালে বড় করে লেখাঃ জোনাকি!!

বাড়ির সেই ছোট্ট ঘরটার দরজা বন্ধ থাকে।
সেই ঘরে এখন কেবল জোনাকিরাই থাকে।
সারারাত ঘরের দেয়ালে ঝুলতে থাকা মেয়েটার
ছবির ওপর,
কখনো ধূলো জমা ডায়েরীর ওপর লেপ্টে থাকা
নামটার ওপর একটু আলো ফেলেই নিভে যায়।
মেয়েটার নাম নীলা, না ভূল হলো, মেয়েটার নাম
ছিলো নীলা। সকাল বেলা হলেই মেয়েটা ঘুম
থেকে উঠে গানের রেওয়াজ করতো....

মাঝের বাগানের ঠিক এ পাশের জানালা থেকে
নীলার ঘরটা দেখা যেতো। মেয়েটা বাগানে
আসতো। বিচিত্র গাছে ভরা বাগান। ছোট্ট
বনসাইয়েরা বড় হওয়ার সুযোগ পেতো।
আর ঝোপঝাড়ের মত গাছের কাছে একটা
সাইনবোর্ড।
জোনাকির খামার।
মেয়েটা সারাশরীর ঢেকে রাখতো। শুধু ফ্যাকাসে
মুখটা গাছের পাতার মাঝ গলিয়ে এসে পড়তো
মুখে।
মেয়েটা কিছুক্ষন রোদের দিকে থাকতেই কি
ভেবে ঘরে ফিরে যেত।
সন্ধ্যা হলেই আমার জানালার ওপাশে বসতো
জোনাকীর মেলা।
মেয়েটা লাইট অফ করে সরু শলতের মোম জ্বালাতো
বাগানে। মেয়েটার ঘরে শত শত জোনাক পোকা
জ্বলতো আর নিভত।
আমিও খুব অবাক হয়ে তাকাতাম।
এত সুন্দর দৃশ্যের মধ্যে কি এক ভয়ংকর বিষণ্ণতা।
দ্যা লাস্ট সাপারের মত একটা স্থিরচিত্রের মত
মেয়েটার চোখে পানি চিক চিক করতো।
মেয়েটা হাসতো না।
নড়তো না।
একসময় ঘরের জানালা বন্ধ হতো...
বাগানের জোনাকিরাও হারিয়ে যেতো।

খুব বর্ষায় মেয়েটা বাইরে মোম জ্বালাতো না।
অন্য দশটা মেয়ের মত জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে
দিতো না কিংবা ভিজতো।
খুব জোছনায় মেয়েটার ঘরে কেবল জোনাকিরাই
থাকতো..

আমি খোঁজ নিয়ে যা জেনেছিলাম তার সারাংশ
এইঃ
মেয়েটি পাগলী, জোনাক পাগলি, শুধু তিনবেলা
খাওয়া ছাড়া মেয়েটা ঘরের বাইরে যায় না।
বাড়ির সবার তার ঘরে যাওয়া নিষেধ। আর
মেয়েটার কি এক অসুখ আছে। কি অসুখ কেউ জানে
না।

আমিও মনোযোগ বাড়িয়ে মেয়েটাকে দেখতাম।
ধীরে ধীরে মেয়েটা আর বাইরে আসা কমিয়ে
দিলো।
তবু জোনাকির আলোতে মেয়েটার দেখা মিলতো।
একদিন পড়ার টেবিলে একটা কাগজের দলা দেখে
ফেলে দিচ্ছিলাম পরে দেখলাম এটা আমার না।
খুলতেই একটা মরা জোনাকি আমার টেবিলে
পড়লো।
আমি বিভ্রান্তের মত অভাব হয়ে লেখা পড়লাম।
কোন সম্ভাভাষণ ছাড়াই লেখাঃ
"আমি পাগল নই। আর আমাকে হা করে দেখলে
নিজেকে চিড়িয়াখানার বস্তু মনে হয়। আমার
জীবনে বৈশাখেরা শেষ।
তাই আমাকে দেখে লাভ নেই।
আমি চুপ করে বসে থাকি আর আপনি অন্ধকারে
বসে থাকেন।
তবু আমি বলতে পারি যে আপনি নীল শার্ট
পড়েছিলেন।
আপনি ব্যাপাটা নিজের অজান্তে ঘটাচ্ছেন তা
না, আপনার অবচেতন মনে কিছু একটা কাজ করে।
হিয়তো সহানুভূতি, যা হোক যদি আমি আর দশটা
দুরন্ত মেয়ের মত হতাম আপনাকে বলতে পারতাম
চলুন একদিন জোনাকি দেখি।
আমার গল্প এই জোনাকির মতই নিভছে।
তবু,
ডাক্তারবাবুর মত একটা মিথ্যে আশ্বাস দেই যদি
আমি দুটো বছর বাঁচি একদিন আপনার সাথে
জোনাক দেখবো।
ভালো থাকবেন।
আর আমাকে লুকিয়ে দেখার দরকার নেই।
দেখতে চাইলে দেখবেন।
কিন্তু
আমি আরো কিছু দিন মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে
থাকতে চাই।"
চিঠিটা পড়ে সবকিছু কেমন সহজ হয়ে গেলো।
তাকিয়ে দেখলাম বাইরে।
মেয়েটা সাদা শাড়ী পড়েছে।
আমার চোখে চোখ রেখে সামান্য ঠোঁট বিস্তৃত
করে মেয়েটা হাসলো।
আমার ভেতরটা ওলট পালট হয়ে গেলো।
ভেতরের কি জানি একটা মোচড় দিয়ে বললোঃ এই
মেয়েটাকে আমি ভালোবাসি।


আমাদের ভালোবাসার কোন গল্প ছিলো না। দু
সপ্তাহ বেঁচেছিলো মেয়েটা, আমি চিঠিটা
হারিয়ে ফেলেছি কিংবা হয়তো সবটাই কল্পনা।
মেয়েটার কবরে কয়েকমুঠো মাটির সাথে কয়েক
ফোঁটা চোখের জল মিশে গিয়েছিলো।
হঠ্যাৎ করেই আমার চেনা ঘরটা অচেনা হয়ে গেল।
জোনাকিরা নেই।
আমি কি ভেবে হাটতে হাটতে মেয়েটার কবরের
সামনে দাঁড়াতাম। রাতে এলোমেলো জোনাকিরা
উড়তো।
আমার এমন হচ্ছে কেন এটা আমি ধরতে পারছিলাম
না।
মেয়েটা আমার কেউ না।
তবু
কারো আপন কেউ না হয়েও যে সবকিছু হয়ে যাওয়া
যায় তা আমার জানা হয়েছিলো।
এক জোনাক পোকা যেন আলো জ্বেলে অন্য
জোনাক পোকা কে ডাকে।
অন্য জোনাক পোকা এসে যখন সেখানেই আলো
জ্বেলে জানায় দেয় তার উপস্থিতি, প্রথম জোনাক
পোকা একটু দূরে আলো জ্বালিয়ে জানান দেয়
কাছেই আছি।
দুজন কখনো কারো কাছে যেতে পারে না।
তেমনি নীলার হাতটা ধরতে ইচ্ছে করে।
নীলার কড়ে আঙুল ধরে একদিন ইচ্ছে করে জোনাক
পোকা দেখতে যাওয়ার।
বাগানের মাঝে নীলা প্রায়ই হাটে।
আমার গাওয়া সেই শেষ গানটা গান,
"এ তুমি কেমন তুমি......"


আমি চোখ বন্ধ করে নীলার গান শুনি।
আর জোনাকীরা এসে ভীড় করে আমার ঘরে।
আমি দিন গুনি দু বছরের।
নীলা বলেছিলো, সে আসবে।
আসবে তো?
আমি বিশ্বাস করি নীলা আসবে, নীলাকে আসতে
হবে.....

0 comments:

Post a Comment