তোমার জানালায়

তোমার একটা জানালা দরকার 
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, 
পিচ্ছিল কুয়াশা, 
ল্যাম্পের খালি রাস্তা 
ধুলোদের তাকিয়ে থাকা অপেক্ষায় 
কে এখন আমাকে মাড়িয়ে চলে যাবে। 

ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে চলে যাওয়া খালি ভ্যান গাড়ীটা, 
আমার কবিতা লেখার কাগজ দিয়ে 
তোমার জন্য বানানো প্লেনটি, 
ওই জানালাতেই টুক করে ঢুকে পড়তে পারতো। 

তোমার জানালা দিয়ে 
ভেসে আসতে পারতো স্বাধীনতায় 
বয়ে যাওয়া অজস্রে বুলেট। 

সব তোমার বাড়ির ছাদ ফুঁড়ে 
বেড়িয়ে যেত, খুঁজে নিত এক একটি নক্ষত্রের 
বুক। 

এমনিতে আমাদের শহরের পায়ে হেটে চলা 
হাজার হাজার আন্দোলনী বুক 
ফুটো করে দিয়ে আমাদের দাবিয়ে ছোট করে 
রাখলো পৃথিবীতে। 

ঐ তো শুনতে পাচ্ছো? এখনও কারা যেন বলছে 
“এটা এটা, এটা একটা বিপ্লব, মেরে ফেল, 
মেরে ফেল এটাকে।” 

তোমার জানালা দিয়ে ভুর ভুর করে 
আসা ধোঁয়ায়, এই সন্ধ্যায়, বা রাতে 
তোমার ঘর ভরে যেত। বিরক্ত হয়ে 
জানালা দিয়ে উঁকি দিলেই তুমি অবাক 
হয়ে যেতে। সামনে খেলার মাঠ ভর্তি ছেলেগুলো 
গাঁজা টানছে। কত আর হবে বয়স! 
খুব বেশি হলে মাধ্যমিক পাস করে 
উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছে। 

কি অনেক অবাক হলে তো! 

তোমার জানালায় বেড়াতে গেলে 
দেখতে পেতে তোমার হারিয়ে যাওয়া 
ভালবাসা ঐ সেন্ট মার্টিনস দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। 

তুমি নিষেধ করো, ওদের নিষেধ করো তুমি। 
ওদের যেতে বারণ করো, সামনে সুনামি ঢেউ 
এগিয়ে আসছে। ওরা দুইজনই হারিয়ে যাবে, 
তলিয়ে যাবে, ভেসে যাবে। 

থাক, বোল না। কিছু বোল না। 

ঐ সুনামী আজ ওদের দু’জনের 
মাঝেই বিরাজমান। 
ওরা এমনিতেই ভেসে যাবে। 

তোমার জানালায় চাইলেই তুমি 
ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিতে পারতে 
পৃথিবীর সূর্যের আলো আর যত কালো। 

তুমি একটা গোমড়া মুখো নদীকে 
স্রোত আর ঢেউ-এ উত্তাল করে তুলতে 
পারতে। তোমার জানালায় কোথাও কোন 
দূরত্ব ছিল না, সব ছিল কাছের, 
সব বহুদূর ছিল কাছে, 
তোমাকে জিভ কামড়ে দাড়িয়ে থাকতে হতনা। 

ঐ জানালা দিয়েই দেখতে পেতে 
আমাদের মানুষগুলো সব কেমন যেন 
পোষা পাখি। 

ওরা চোখের পলক ফেলে যেভাবে ফেলতে 
বলা হয়। তাই খায়, তাই শোনে, তাই পায়, 
তাই মেটায়। আমরা কেউই একটা পতাকা 
পাওয়ার পর সুখি হয়ে যেতে পারিনি। 

আগে যেটা ছিল আমাদের দেশপ্রেম 
পরে সেটা ব্যবসায়। 
তুমি তো মাথা নত করলে না কখনও 
জানালা দিয়ে নীচে তাকালে 
মাথা নত করলে দেখতে পেতে 
মাটি আছে সেখানে। মানুষ আছে 
সেখানে, কিছু ছিঁড়ে যাওয়া জীবনও 
সেখানে ঘুরঘুর করছে। খুঁজছে। 

ওদের কিন্তু জীবন থেকে কিছু 
পাওয়া হলনা। দিয়ে গেল, 
ছেড়ে গেল অনন্ত পথ মানুষের 
তরে। হয়ত তোমার তরে। কিছু মানুষ 
জন্মায় অন্যের জন্য বুক পেতে দিতে। 

একদিন ঠিকই দেখতে পেতে 
আমি পৃথিবীর বুকে চিহ্ন আঁকার 
চেষ্টা করছি, মগ্ন হচ্ছি দাগ রেখে যাওয়ায়। 

পায়ের ছাপে যেন কিছুটা কষ্টও 
ধোঁয়া হচ্ছে না, সব চেপে বসে আছে বুকে। 

ওরা থাকবে। বাস করবে এখানে। 

জানালায় একদিন ঠিকই দেখতে পেতে, 
আমি ঘরে ফেরার পথে হাটতে চাচ্ছি। 

হঠাৎ সেই জানালা দিয়ে 
শুভ্র জোছনা তোমার বিছানায় গড়িয়ে এলে 
তাতে, ছায়া ছায়া আলোতে, তুমি দেখতে পেতে 
বিছানায় তুমি নেই। 
তোমার শরীরটা পৃথিবী থেকে অনেক আগেই 
হারিয়ে গেছে। 

তুমি ভাস্কর্য হতে চাওনি, আমিও না। 
কিন্তু তুমি সুখি হতে চেয়েছিলে 
আর আমি বাঁচতে। 

এমন করেই জানালার প্রসঙ্গে তুমি 
আমি, জড়িয়ে আছি একে অপরকে। 
অনন্তকাল ধরে। আমাদের মাঝখানে 
সেই দেয়ালটা, আজও দাড়িয়ে আছে 
বুক বাড়িয়ে। 

জানালা কাটা হোক, 
জানালা কাটা হোক ঐ বুকটায়। 
যেই জানালায় আগ্নেয়গিরি হবে 
আর লাভা গড়িয়ে পড়তে থাকবে 
আমার সমস্ত শরীরে। এবং আমি, 
আমি জড়িয়ে ধরবো তোমায় আরও 
কয়েকশ অনন্তকালের জন্যে। 

মাঝখানে 
শুধু জানালার দেয়ালটি।

0 comments:

Post a Comment