সেখানে অন্ধকার ধোঁয়ায় ভেজা

মাঝে মাঝে সখ্যতা বড় বাজে জিনিস । সখ্যতার বৃত্তে বন্দি হয়ে অস্তিত্ব লোপের পথে চলে যায় । কখনও নিশ্চল অন্ধকারের অভেদ্য বৃত্তে বন্দি হয়ে কিছু অবশ ইন্দ্রিয়কে সঙ্গী করে , ফুসফুস এ কৃত্রিম দীর্ঘনিঃশ্বাস বয়ে যায় । দুটো আঙ্গুলের ফাঁক থেকে ভয়ানক ছদ্মবেশী মৃত্যু ধোঁয়া হয়ে বেরিয়ে আসে । কখনো কুণ্ডলী পাকিয়ে থমথম শব্দে আমার দিকে তাকিয়ে হাসে । সে হাসি বড়ই অসহনীয় । তবু আরও সখ্যতা জন্মায় , এগিয়ে যায় সম্পর্ক । 

কে ? আমার সঙ্গী কে ? মুঠোভরা ধোঁয়ায় ভেজা মৃত্যু আমাকে বারবার বলে জীবন বড় বাজে জিনিস , বড় কষ্টের জিনিস । মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে বলি , তাই তো ! কিন্তু কি জানি একটা বাধা দেয় । বড় দৃঢ় সে বাধা।  ভেদ করার দুঃসাহস হয়ে ওঠে না । আমার অদৃশ্য ক্যানভাসে এইভাবে আমার দৃশ্যপট অংকন করা যায় । ঘড়িতে কয়টা বাজে ? রাত ১ টা ? ২ টা ? কি জানি ! বাজুক ! চারিদিকে সুনসান নীরবতা । নিয়মিত বিরতিতে তক্ষক ডেকে উঠছে । ওদের এইতো কাজ ! বড় কর্মমুখর ওরা । 

একবারও থামছে না । জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে দেখা যায় , এত্ত বড় একটা চাঁদ ! যেন চুপচাপ নির্জনে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । ভাবলেশহীন চোখমুখ । চেয়ে থাকলে বুক কাপে , চোখ ফিরিয়ে নিতে হয় । তা না হলে মনে হয় আমার ভেতর থেকে কিছু একটা শুষে নিচ্ছে জিনিসটা ! চাঁদটা একা হলেও হত ! ব্যাটা তার পাশে তার সঙ্গীদের নিয়ে আসে । তারা আবার স্থির হয়ে থাকে না । মিটিমিটি করে জ্বলে । মুহূর্তেই হৃদকম্পন বাড়িয়ে দেয় । তখন পাগলের মতো চোখ বন্ধ করে ফেলি । তবুও তারা অক্ষিকোটরের অভ্যন্তরের অন্ধকারে জায়গা করে নেয় । মিটিমিটি করে অস্থির জ্বালাতন করে । তখন চোখের কষ্ট মেটানো জরুরি হয়ে পড়ে । ফুসফুসকে কষ্ট দেওয়ার প্রক্রিয়া পর্যন্ত শুরু হয়ে যায় । তবে তখন তা কতই না আরামের । আর মাঝে মাঝে বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকার আমার দিকে তাকিয়ে মায়াময় হাসি হাসে । মোহে ফেলতে চেষ্টা করে আমাকে । 

আসলে আমার একান্ত কক্ষের অন্ধকার হতে বাইরের অন্ধকার আলাদা । আমার কক্ষের অন্ধকারগুলো আমার মতো হয়ে গেছে । তাদের সাথে আমার দীর্ঘদিনের বাস । তারা আমাকে মোহে ফেলার চেষ্টা করে না । বাইরের অন্ধকার এই কিছুদিন বড্ড বেশি জ্বালাতন করছে । অসময়ে ডাক দেয় । আমি কেবল আমার বন্ধু অন্ধকারগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি , উপেক্ষা করতে চেষ্টা করি সকল মোহ । সেই বদমাশ অন্ধকারগুলো ক্ষান্ত হয় না । মুচকি মুচকি হেসে বারবার ফিরে আসে । সেই হাসিতে আমার ভীষণ ভয় হয় । 

আমার সুন্দর ফুলতোলা চাদরের বিছানাটা অযত্নে অবহেলায় একটুকরো কাগজের ন্যায় পড়ে থাকে ! সৌন্দর্যের কি অপূর্ব অবহেলা । চারপাশে টুকরো টুকরো শক্ত কাগজ পড়ে থাকে , মুঠোবন্দি ভেজা মৃত্যুরা সেগুলো থেকে আত্মপ্রকাশ করেছিল । কিছু কাগজ নিষ্ঠুর হাতে ছিঁড়ে কুচিকুচি করা হয়েছে । আমার পড়নে নীলরঙা রঙচঙে টি-শার্ট । অন্ধকারের আলোয় বেচারা ক্ষুদ্র নীল রঙের আর্তনাদ শোনা যায় । একসময় মিলিয়ে যায় , তখন নিজেকে অন্ধকারে সামিল করে নেয় । এই পরিনতি বড় দুঃখজনক । 

নীল শার্টের পকেট পুরে কিছু স্বস্তি নিয়ে থাকি । অস্বস্তিরা তা কেবল নিমিষেই গ্রাস করে নেয় । তাদের বিরুদ্ধে এক দুইটা হুংকার দেওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না । গুটিগুটি পায়ে আমার ছায়া আমাকে মাতিয়ে তোলে । আমাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় । বুকের ভেতর জমা থাকা বাক্যগুলি একেকটা পাথর পিণ্ডে পরিণত হয় । ভারী হয়ে আসে বুকটা । ঝেড়ে কাশি একেকবার । কিছু দিশেহারা শব্দ কেবল কাঁপিয়ে দিয়ে যায় আমায় । অস্থির চোখে তাকাই ইতিউতি , একমুঠো কালো আলো আর কিছু বেকার নৈঃশব্দ্য ছাড়া কিছুই খুঁজে পাই না । 

মাথার ভেতরে শিরাগুলো বড্ড বেয়ারা । উত্থাল-পাতাল ঢেউ তোলে একেক সময় । আমি এক ঝাঁপটায় বকে দেই শয়তানগুলোকে তবু আত্মসম্মান ভুলে বারবার ফিরে আসে । একবার এক পথহারা জোনাকি আমার কাছে এসে পড়েছিল । আমার শিরাগুলো হুট করে থেমে গিয়েছিল । সব যেন নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল । আমার চোখগুলো নাড়াচাড়া ভুলে গিয়েছিল । কেবল অদ্ভুত ভয়ার্ত কম্পন তুলেছিল জোনাকিটা । এক সময় তার ভয়ের মাঝেই সে হারিয়ে গেল । সব আবার ফিরে এলো । একসময় অন্ধকারের থমথমে হাসি বন্ধ হয় । কুৎসিত খিলখিল হাসি নিয়ে আলোরা আসে । আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে । এখন ঘুমানোর সময় । তবে আমার মুঠোভর্তি ধোঁয়ায় ভেজা মৃত্যু আমার সঙ্গ ছাড়ে না । বার বার বলে , “এসো , আমার কাছে এসো ।”

0 comments:

Post a Comment