বিষ্টু দা

বিষ্টু দা বিষ্টু দাকে খুব মনে পড়ে আজকাল। ঢোলা পাজামা, খদ্দরের পাঞ্জাবী , পায়ে টায়ারের চ্চপ্পল, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। পঁয়ষট্টি সাল , সবে কলেজে ঢুকেছি সেই সময় । হলধরের চায়ের দোকানে আসতেন বিষ্টু দা ।আমাদের বোঝাতেন বুর্জোয়া, পেটি- বুর্জোয়া, সাম্রাজ্যবাদ এর বিপদ, কেন সমাজবাদ দরকার আমাদের। কর্পোরেশন এ চাকরী করতেন। আমরা চারজন ওঁর খুব কাছের ছেলে ছিলাম। বাড়িতেও গেছি । স্ত্রী, এক ছেলে, এই নিয়ে ছিলো ওঁর এক ঘরের বাসাবাড়ি। চা , লেড়ো বিস্কুট আর বিড়ি ছাড়া আর কিছু ওঁকে খেতে দেখিনি কোনদিন।স্ত্রীকে বলতেন- দেখে রাখ, , একদিন এরাই দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আনবে। কিন্তু কিছু দিন পর আরো তাড়াতাড়ি বিপ্লব আনতে বিষ্টু দা নাম লেখালেন নতুন দলে ঊনসত্তরে, না , আমাদের একবারের জন্যেও বলেন নি সেই দলে যোগ দিতে। ওই ঊনসত্তরেই আমরা চারজন পাশ করলাম , কলেজ এর সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হোল, এবার গন্তব্য ইউনিভারসিটি। কিন্তু পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল সেই উত্তাল সময়ে। কিছুই করিনা। বাহাত্তরে একদিন খবর পেলাম বিস্টু দা খুন হয়েছেন । কিভাবে যেন চারজনই খবর পেলাম। যাব কিনা ভাবছিলাম। আশিস বললো- চল, দেখি ই না গিয়ে ।বিষ্টু দার স্ত্রী ঘরে ঢুকতে দিলেন না কাউকেই, অনেকেই এসেছিলেন, বের করে দিলেন প্রায়। সাধের লাল-পতাকায় ঢাকতেও দিলেন না বিষ্টু দার লাশ। বাইরে রাখা মড়ার খাটে বিষ্টু দাকে যখন তোলা হলো, তখন বিষ্টু দার গায়ে নামাবলী। "হরিধ্বনি" দিতে দিতে পাড়ার মোড় পেরিয়ে গেল শ্মশানযাত্রীরা। কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলাম । দেখলাম বিষ্টু দার স্ত্রী ঘর থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছেন অনেক কিছু। তার মধ্যে মাও আর লেনিনের দুটি ছবি।একটা রেডবুক শুধু চোখে পড়েছিল আমাদের। খই আর খুচরো পয়সার সঙ্গে রাজপথে পড়ে আছে । এরও কিছুদিন পর ওই পাড়া দিয়ে যাবার সময় দেখলাম কারা যেন বেশ কিছু দেওয়ালে কাঠ-কয়লা দিয়ে লিখেছে " কমরেড বিষ্টু মুখারজী অমর রহে', " কমরেড বিষ্টু মুখারজী লাল সেলাম। বিষ্টু দা , আমিও বুড়ো হয়ে গেলাম। সত্যি বলছি, খুব মনে পড়ে তোমাকে আজকাল।

0 comments:

Post a Comment