বর্ষায় পুরাতন এই হৃদয় আমার


এমনও দিনে তারে বলা যায়। কারে বলা যায়! যে কথা বুকে ধরে রেখেছিল শরতের আমিনা ও গফুর সেই কথা কাকে বলা যায়? 

ভেজা পাতার ছাউনির নিচে' যে কথা জমিয়ে রাখে আসমানীরা, সেই কথা শোনার দোষের কই? রাজার পোশাক পরে প্রবল প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসে প্যান্ডেলের দূরতম কোনায় যাত্রার মালিকের কাছে ভিখিরির মতন হাত পেতে অর্থ নিয়ে সংসারের চাল-ডাল-তেল-নুনের হিসাব মেলায় যে অক্ষম, তার কথা কার কানে পৌছবে? অথবা এই যে আমি, গল্পকথক, রাজা ও রানী, রাক্ষস ও ফুলকুমারী, জোকার ও জোলাদের গল্পের ফাঁদ পেতে বসে থাকার চেষ্টা করি আপনাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে, আমারই বা বুকের মধ্যে কোন ব্যথা করে চিনচিন, সেই কথা বলবার মতন দিন কি আমার আসে? 

প্রশ্ন সকল উত্তরহীন। তবু, মনের মধ্যে গুঞ্জরিত হয়, 'এমন দিনে তারে বলা যায়, এমনি ঘনঘোর বরিষায়।' 

বর্ষার ধর্মই বুঝি এই! আকাশে মেঘ জমে-জমে আর নিজেতে নিজে স্থির হয়ে থাকতে না পেরে যেমন ঝরে পড়ে কাতর জলকণা, তেমনি বর্ষায়_ নিদারুণ আষাঢ়ে যখন মেঘের পরে মেঘ ঘনিয়ে আসে, তখন মনের মাঝের কথারা-ও যেন হয়ে ওঠে পতনোন্মুখ। অপেক্ষার কাল আর বুঝি সইতে না পেরে 'হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল' হয়ে ওঠে ঘরে ঘরে একা দিন গুনতে থাকা তন্বী বধূর দল, হৃদয়ের কথা জানাতে আকুল হয়ে ওঠে কালিদাসকুল।

সেই আকুলতা থেকেই বুঝি মানুষ গেয়ে ওঠে, 'বন্ধু আইসো রে ... কোলেতে বসতে দিবো, মুখে দিবো পান।'

আমি যখন খুব ছোটো, একেবারে শিশু, সেই সময়ে আমার দিদু যার গায়ের রঙ ছিল পাকা আমের মতন হলুদাভ, যার গলার স্বর ছিল ঝরনার মতন রিনরিনে কিন্তু সুর ছিল বিলাপের মতন করুণ_ প্রায় নিত্যই গাইতেন একটা গীত যেটির কথাগুলো ছিল এ রকম : 'নামো কুলি আষাঢ়ে, নামো কুলি জমিনে, খাইয়া যাও গো কুলি সরলি বাটার পান।'

আষাঢ়ের সঙ্গে কুলি, কুলির সঙ্গে জমিন ও বাটার পানের কী সম্পর্ক তা আমি জানিনি। শুধু বুঝতাম এই সুরে এমন এক বিলাপ আছে, যা আমাকে বেঁধে ফেলেছে। 

আমি যখন স্কুলে পড়ি ততদিনে দিদুর নিভে গেছে চোখের আলো। শীতলাদেবীর অভিশাপে তার পটোলচেরা গহিন নয়ন দুটো আর নেই। সারা মুখে বসন্তের দাগ। গলার স্বরটাও বুঝি আর ছিল না তেমন।

কিন্তু আজও আমার প্রাণে বাজে সেই কুলির স্বর, সেই কুলির সুর, কুলির জন্য সেই ব্যাকুলতা। 

বড় হয়ে বহুবার আমার মা'কে  অনুরোধ করে শুনেছি এই কুলির গীত। এমনকি আজও মাঝে মাঝে আমার মাকে অনুনয়-বিনয় করে বলি, 'মা , কুলির গীতটা একটু শোনাও না।' আমার মা বলেন, 'ধুর ! কী যে বলিস! আমার কি আর সুর আছে!' 

আমি তাকে জবরদস্তি করি। বলি, 'আহা! তোমারে কি আমি সুর দিয়ে  গাইতে বলছি না-কি! তুমি একটু গাও না।'

মা  তখন ইতস্তত করতে-করতে গীতে টান দেয় : 'নামো কুলি আষাঢ়ে, নামো কুলি জমিনে, খাইয়া যাও গো কুলি সরলি বাটার পান।'

রোগে-শোকে জরাজীর্ণ হয়ে যাওয়া আমার মা গীত গাইতে-গাইতে যেন কোথায়, কোন দূরের দেশে চলে যান। কোথায় যান? আমার মাঝে-মাঝে জানতে সাধ হয়। আমার বাবার সাথে বিয়ে হবার আগে আমার মায়ের কি ছিল কোনো কুলি? যে হারিয়ে গেছে? অথবা হয়তো ছিল না কোনো কুলি। তবু, অজানা ব্যথা ও না চেনা আকুলতা নিয়েই আমার মা কি তার অদেখা কুলিকে ডাকতে-ডাকতে চলে যান অচিনপুর? জানি না, সেই প্রশ্নের উত্তর। 

কিন্তু বৃষ্টির দিনগুলো সুন্দর। সুন্দর আষাঢ়ের মধুবর্ষণ। আমার ছেলেবেলায় ঝুমবৃষ্টি যখন নামতো টিনের চালে, তখন ঝমঝম ঝমঝম ঝমঝম শব্দে প্রাণের মধ্যে কী যে দোলা, কী যে আনন্দ, কিসের যে আহ্বান আসত সে হিসেব মেলেনি কোনো দিন। কিন্তু সেই ঝমঝম সুরমূর্ছনা ছেলে ভোলানো এক মন্ত্র হয়ে কোথায় কোন দূরের দেশে, আজও চকিতে আমাকে যেনো টেনে নিয়ে যায়।

তবে আজকাল আমি ভীষণ বৃষ্টিবিদ্বেষী। বৃষ্টির পর পথ যখন কাদা-কাদা হয়ে যায়, রিকশা যখন পাই না, জ্যাম যখন অসহনীয়, তখন বৃষ্টিকে আমার শত্রু মনে হয়। কিন্তু বৃষ্টির প্রতি একটা অদ্ভুত টান আমার ছিল, সেই কথা মিথ্যে নয়। বরং বলা যায়, নিষেধের খুব বেশি কড়াকড়ি ছিল বলেই হয়তো টানটাও ছিল তীব্র।

বৃষ্টি এলেই কোনো একটা উছিলা করে স্কুল ফাঁকি দেবার সে কি আনন্দ। যেদিন বুঝতে পেতাম যে আজ আর ফাঁকি দেবার কোনো উপায় নেই, সেদিন হয়তো স্কুলড্রেস পরা অবস্থায় ইচ্ছে করেই একটু কসরত করে একটা 'পিছলা' খেয়ে আমি পড়ে যেতাম উঠোনে। আর আমার কাপড়-চোপড় নষ্ট হয়ে যেত কাদায়। আমার দাদু তখন বলত, 'আহারে! আহারে! ছেলেটা পড়ে গেলোরে! কি রে 'ব্যাথা লেগেছে?'

আমি বলতাম, 'না দাদু, ব্যাথা পাইনাই।' আর মনে মনে বলতাম, 'হে ভগবান! আজকে যেন আর ইশকুলে যেতে না হয়।'

স্কুলে না যাওয়া, দিনমান বৃষ্টিতে ভিজা, ভিজে ভিজে পাড়ার প্রত্যেকটা বাড়ি একবার করে চক্কর খাওয়া, বাড়ি বাড়ি ঘুরে আমার বয়সী অন্যদের বৃষ্টিতে ভেজার জন্য উস্কানি দেওয়া, দল পাকিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমাদের বাড়ির পিছন দিকে কন্ট্রাক্টর বাড়ির 'পুকুরে' স্নান করতে যাবার স্বাধীনতা ছিল কী যে লোভনীয়! 

কোনো কোনো বৃষ্টির দিনে চলে যেতাম আরও দূরে  দীঘিতে। আহারে!  দীঘি! আমার জন্য চিরকালই নিষিদ্ধ গন্তব্য। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে কত যে সেই পুকুরে গেছি, ধরা পড়ে মার খেয়েছি! তবু  পুকুর নিষিদ্ধ আকর্ষণ। 

পুকুর তো তা-ও ছিল ক্ষমাযোগ্য অপরাধ। কিন্তু কোনো কোনো দিন, পাড়ার ছেলেদের সাথে দলবেঁধে নেমে যেতাম মরা নরসুন্দায়!

আষাঢ়ে বা শাওনে মরা নরসুন্দাকেও মনে হতো যেন এক কিশোরী। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে নরসুন্দাকে কেমন অবাস্তব-অবাস্তব দেখাত। মুষলধারে বৃষ্টি যখন ঝরতো, বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মাটিতে পড়ে আবার যখন জলের কণা ওপর দিকে লাফ দিয়ে উঠতো এবং ঝুম বৃষ্টিতে যখন বেশিদূর দেখা যেত না, সেই সব সময়ে মনে হতো, নদী তো নয়, এ যেন মায়াজালে মোড়ানো এক রূপকথা। যেন এই নদীর ওপারেই আছে রাজার কুমার। পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চড়ে এই বৃষ্টিতেই বুঝি সে এলো!

আজও মনে হয়, হয়তো যদি সেই দেশ থেকে কোনোদিন কোনো রাজার কুমার পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চড়ে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে মায়াজালে আছন্ন হয়ে এসে নামতো নরসুন্দার পাড়ে, সে দেখতো রাজু নামের এক কিশোর, পায়ে যার জুতো নেই, গায়ের রঙ যার ময়লা, বৃষ্টিতে কেমন উড়ছে!



একবার এক বৃষ্টির দিনে, আমার মা সেদিন বাড়িতে ছিলেন না, আমি ভিজতে ভিজতে উঠে গেলাম আমাদের ঘরের চালে। ঘরের চালে উঠে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দটা অন্যরকম। সেই আনন্দ আরও একটু বাড়িয়ে নিতে আমি উঠে গেলাম দোচালা ঘরের 'টুই'-এর উপর। সেখানে উঠে টুই-এর মাথায় বসে পিছলা খেয়ে-খেয়ে আমি এসে পড়ছি ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বারান্দার চালে। এমন করে খেলতে খেলতে আরেকবার এমন জোরে পিছলা খেলাম যে, ঘরের চাল থেকে এসে বারান্দার চাল ছাড়িয়ে আমি পড়লাম উঠানে! চার হাত-পা চারদিকে ছড়িয়ে আমি যখন চিৎপটাং, আমার দাদু উদ্বেগ নিয়ে তখন বলে, 'হায়! হায়! হায়! ব্যাথা পাস নি রে!'

সেই দাদু আজ নেই। নেই সেই নরসুন্দা। খেলার সাথীরা নেই। নেই সেই পাড়া। নেই সেই আমিও আর।

তবু আহা! বৃষ্টির দিন! তবু ফিরে ফিরে আসে দারুণ আষাঢ়। তবু 'বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর', বৃষ্টি পড়ে সারা দুপুর, বৃষ্টি পড়ে মনের মধ্যে অবিরাম। আর কত না কথা মনে আসে। মনের কথা হয়তো মনেই রয়ে যায়। অথবা মনের কথা দোসর না পেয়ে যায় বনবাসে একা! 

কিন্তু এই জামানায় মানুষের তো আর বনবাস নেই। মানুষের মনবাস আছে শুধু। তাই মনে মনে আমি এক বর্ষায় উঠে যাই যুবক রবীন্দ্রনাথের বজরায়। 


এই রবীন্দ্রনাথকে দেখে আমার বোধহয় একটু ভালোই লাগে। চারদিকে যখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, যখন পালানোরও আর পথ নেই কোনো, যখন বৃষ্টির মায়াজালে আমাদের বজরাটা আর বাস্তবের কোনো নদীতে নেই, যখন সেটি ঠাঁই নিয়েছে রূপকথার বইয়ে আঁকা ছবিতে, তখন সেই ছবির ভেতর সপ্রাণ হয়ে ওঠে কীভাবে আমি তাকাতাম যুবকের চোখে! এরচেয়ে বরং এই ঢের ভালো। আমি এই সব ভাবি, আর সন্তুকে সম্বোধন করি, 'গুরুজি।' 

বৃষ্টির দিনে স্কুল ফাঁকি দিয়ে আমার ছোট্ট রুমের ছোট্ট চৌকিটাতে কাঁথা মুড়ি দিয়ে দিনমান শুয়ে শুয়ে এই রকম আরও কত না অযাচিত কথা মনে ভেবেছি। ভেবেছি, 'এমন দিনে তারে বলা যায়?' কারে বলা যায়! বরষা যতই ঘন ঘোর হোক, যতই আঁধার হয়ে আসুক চারিধার, বৃষ্টির স্বর্গীয় চাদরে যতই তৈরি হোক মায়াজাল, তাই বলে কি সবকথা উচ্চারিত হতে পারে মুখে? প্রেম হোক, ব্যথা হোক, অথবা হোক তা কোনো এক কুলিকে ডাকার আকুলতা তা কি মানুষ বলতে পারে মুখে? ধরতে পারে ভাষায়? 

0 comments:

Post a Comment