ঝরা পাতা

১.
সর্বস্ব খুইয়ে গাছ থেকে খসে পড়ল একটি সবুজ পাতা। ঝরা পাতার হাহাকারে কাঁপন ধরলনা কোথাও। এখানে সেখানে বাতাসের ঝাপটায় ছিটকে যেতে যেতে বিবর্ণ আর মলিন হল অবয়ব। একটা দুর্বার সাথে কিছুক্ষণ লেপ্টে থেকে জিরিয়ে নিচ্ছিল বোধহয়। আরেকটা দমকা হাওয়া ছিটকে নিয়ে গেল দৃষ্টিসীমার বাইরে কোথাও।

শতবর্ষী গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে অমীয় দেখছিল প্রকৃতির নিষ্ঠুর হেঁয়ালী। সেও কি এমনি এক ছিন্ন পাতা ? প্রশ্নটি মনে আসতেই চোখের কোনে অনুভব করল ঝর্ণার কলকল ধ্বনি। বুকের ভেতর চেনা সেই ব্যাথাটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। অথচ চোখ বুজলেই ফিরে যেতে পারে স্বপ্নরাঙা সোনালী শৈশবে।

২.
মাঠের আলপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে। বাতাস আর রোদের মাখামাখিতে সবুজ ফসলের ক্ষেত পার হচ্ছে স্বাপ্নিক ভাবালুতায়। দিগন্ত বিস্তারী সুবজের সমারোহ পেরিয়ে ছায়াঘেরা স্কুলঘরে ওদের স্বপ্নের চাষ। সেখানে সুর করে নামতা শেখার তালে তালে বিভোর হয় মায়াপুরীর রঙিন স্বপ্নে।

লোখাপড়া শিখে গাড়ীঘোড়ায় চড়ার স্বপ্নই শুধু নয়; সূর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে হাড়-ভাঙ্গা পরিশ্রমের বদলে একটু আরাম আর আয়েশের স্বর্ণালী আগামী যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে!

৩.
হঠাৎ করেই হারিয়ে গেল মধ্যদুপুরের গনগনে উত্তাপ আর শিশুকন্ঠের নানান কলধ্বনি। চারদিক ছেয়ে গেল অশরীরি সাপের বিষাক্ত ছোবলে। নেমে এল আঁধারের রাত সঙ্গে নিয়ে সহজাত বিপন্নবোধ।

উঠোনে অনেক মানুষের হাঁকডাকে ঘুম ভাঙে অমীয়’র। ঘরের দরজা খোলা। মা আগেই বের হয়েছেন। হঠাৎ মায়ের কান্না এল কানে। ‘মা কাঁদছে কেন?’ একটু এগুতেই বাবার নিথর দেহ অবাক করল সদ্য ক্লাশ টু-এ ওঠা বালককে। ‘বাবা কেন এভাবে শুয়ে আছে?’ মাকে স্পর্শ করতেই অমীয়কে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। ডুকরে উঠলেন তীব্র বুকফাটা আর্তনাদে। সেই শোকে রাতের আকাশ থেকে ঝরেছিল কি কোন নক্ষত্র ? বাতাসে কি হয়েছিল শিশুপুত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন কানাকানি ? অমীয় জানেনি, জানেনা আজো!

অমীয়, ছোট্ট মনের ছোট্ট বালক, তখনো বুঝেনি শুয়ে থাকা মানুষটি আর কখনো ডাকবেনা তাকে। কখনো আর বাবার কোলে ওঠার বায়না ধরতে পারবেনা। নদীর ভাঙ্গা কূল ধরে একসাথে হেঁটে যাবার দিন ফিরে আসবেনা আর কখনো। গায়ে অনেক ময়লা জমলেও কেউ আর জোর করে গোসল করিয়ে দিবেনা তাকে।

৪.
অমীয় আজ একা। ওর শিক্ষাজীবন গেছে, প্রেম গেছে, স্বপ্ন গেছে। ছিন্ন পাতার মত বাতাসের ঝাপটায় উড়ে বেড়ায় এখানে ওখানে। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিঃসীম অন্ধকারে চোখের পাতা ভিজায়; আর ভাবে, ‘হায়! জীবন এত দীর্ঘ কেন ? কেন অবেলায় নিভে গেলনা সাধের প্রদীপ!’

0 comments:

Post a Comment