নিরুদ্দিষ্ট যুবকের প্রতি

আমার কিছু গল্প ছিলো, বুকের পাঁজর খাঁমচে ধরে আটকে থাকা শ্বাসের মত গল্পগুলো বলার ছিলো।  সময় হবে? এক চিমটে সুর্য মাখা একটা দুটো বিকেল হবে? ??  গত আশ্বিনে আমি আমার পঁচিশতম জন্মদিন পার হয়ে এলুম। আমি জানি আমি খুব দীর্ঘ্যজীবি হব-আমার কুষ্ঠিতে এমনই লেখা আছে। পঁচিশের ঘরে বসে আমি তাই সামনের দীর্ঘ্য জীবনের দিকে চেয়ে অলস অ ধিরস্থির হয়ে বসে আছি। বিছানায় শুয়ে হাত বাড়ালেই যেমন টেবিলের উপর সিগারেট প্যাকেট, দেশালাই, জলের গ্লাস কিংবা ঘড়ি ছোঁয়া যায় মৃত্যু আমার কাছে ততটা ছোঁয়ার নয়। মাঝে মাঝে জোৎস্নারাতে আমার জানলা খুলে চুপচাপ বসে থাকি। হালকা বিশুদ্ধ চাঁদের আলো আমার কোলে পড়ে। ক্রমে ক্রমে আমার রক্তের মধ্যে ডানা নেড়ে জেগে ওঠে একটি মাছ। শরীর ও চেতনা জুড়ে তাঁর অবিরল খেলা শুরু হয়। আমার চেতনার মধ্যে জেগে উঠে একটি বোধ, আমারই ভেতর থেকে কে যেন বড় মৃদু এবং মায়ার সুরে ডাক দেয়, "সুমন, আমার সুমন।" অকারনে চোখের জল ভেসে যায়। আস্তে আস্তে জানালার চৌকাঠের উপর মাথা নামিয়ে রাখি। মায়ের হাতের মত মৃদু বাতাস মাথা থেকে পিঠ পর্যন্ত স্পর্শ করে যায়। তখন মনে পড়ে- সুমন, তোমার জীবন খুব একার হবে।

তুমি কিছু আশা করেছিলে?
এবার মিটেছে
সেই সব?
তেত্রিশ বছর শেষ হয়ে এলো!
তাহলে এবার?
উদবন্ধন ভালো নয়,
ভালো নয় রেলে মাথা অথবা
ছ'তলা থেকে লাফ;
এসো ধরি টেলিফোন,
হেসে বলো দেখা হবে 
রাস্তায় আবার।

বাদলা দিনে ছোট পৃথিবীটা যেন আদিগন্ত দেখা যায়। মনে পড়ে। বড্ড মনে পড়ে। মনে পড়ে বেঁটে লিচু গাছের বন, পাকা সড়কের উপর ইস্কুল বাড়ি। কিন্তু কি যে যন্ত্রনার ঝড় ওঠে বুকের মধ্যে। হাহাকারের এক বাতাস বয়ে যায়। কী হয়েছিল তারপর? অতীতের বৃষ্টি মাতালের মত টলে টলে পড়ে। দোল খায়। মনে পড়ে লাল ইস্টিশান...

তোমাকে অঞ্জাত দেশে দেখি প্রায়
একটি নির্জন ছাদে দাঁড়িয়ে রয়েছো,
সব কথা 
শেষ হয়ে গেছে।
আর কোনো কথা নেই-স্বপ্ন নেই;
শুধু কিছু দিন আর রাত্রি পড়ে আছে। 

চেনা রাস্তাঘাট আজ আর চেনা যাচ্ছিল না। বিবর্ন দেওয়াল, ছেঁড়া পোস্টার...আমার পায়ের তলা দিয়ে অন্ধকার রেলগাড়ির মত বয়ে চলেছে জল। কাছে আসবার এইতো সুসময়। বর্ষায় বা ঝড়ে বা কুয়াষায়। ভালোবাসায় একাকার হয়ে যায় পৃথিবী, আমাদের চেনা শহরে ফুটে ওঠে অচেনা বিদেশের ছবি। 
আজ রাতে তুমি তোমাদের খোলা জানালার পাশে এসে দাঁড়াবে কি? যদি দাঁড়াও তবে আমার মনে হয়, তুমি টের পাবে তোমাদের বাড়ির চূড়ার শ্বেতপাথরের পরীটা কুয়াশার আড়ালে তাঁর মার্বেলের ভিত ছেড়ে উড়ে গেছে মোড়ের ওই লাল রঙের বেঁটে ডাকবাক্সটার কাছে। এখন পায়ের কোনো শব্দ না করে যদি তুমি ছাদে উঠে যেতে পারো তবে দেখবে-পরীটা সত্যিই নেই।
নাকি রাতের ডাকে চিঠিপত্র চলেগেছে বলে হালকা সেই ডাক বাক্সটা বেলুনের মত উড়ে এসেছে তোমাদের ছাদে। এখন তাই পুরোনো ডাক বাক্সটা খুঁজে না পেয়ে পৃথিবীর মানুষেরা ভাবছে কোথায় গেল এতকালের আমাদের চেনা ডাকবাক্স। না কি আমাদেরই রাস্তা ভুল!

এই সেই ঘর যেখানে তোমার গন্ধ এখনও ভেসে আছে,
সবকিছুই আজ রূপকথা বলে মনে হয়,
রংমশাল, তুমি যা শখ করে জ্বালিয়েছিলে  করে দু'চারদিন
এখনও জ্বলছে-সারাজীবন জ্বলবে, শুধু
আমাকে পুড়িয়ে মারার জন্য।। 

0 comments:

Post a Comment