দিগন্তের সাথে আজও দেখা হল না প্রিয়

 ভিজতে ভিজতে যদি<br />একদিন বৃষ্টি হতে পারি..<br /><br />আমায় নিভৃতে নিও কথামেঘ<br /><br />কতই বা আশ্রিত হয়ে বাঁচা যায়..?<br /><br />হ্যারিকেনের মায়াবী আলোয় শুরু হয়েছিল শৈশব। বাড়িতে রেডিও এলো যখন আমার চোদ্দ বছর বয়স। গ্যাসের উনুন, সে এক ইতিহাস। এক জীবনের মধ্যে আমার কয়েকবার জন্মান্তর ঘটে গেলো। টেলিভিষন, মাইক্রোওয়েভ, কম্পিউটারের ঘেরটোপের মধ্যে বসেও কেন যেন ভ্রমবেশে চমকে উঠি, জীবনের কন্ডাক্টর কেউ কি কেবলই চেঁচিয়ে বলছে , পিছনের দিকে বড্ড এগিয়ে গেছেন স্যার।”

আমি আমার চিলেকোঠার জানালা বন্ধ করে রেখেছি সেই কবে থেকেই; কারন কান্নার শব্দ আমার পছন্দ নয়, তবু ধূসর দেওয়ালের আড়াল থেকে কান্না ছাড়া আর কোনো কিছুরই শব্দ শোনা যায়না। আমি দেখতে পাই মাঝরাতে বাড়ির পাশের পিচঢালা রাস্তাগুলো একে একে নদী হয়ে যাচ্ছে; সেই নদীর ঢেউ গুলো আছড়ে পড়ে আমার শৈশবের চিলেকোঠায়; আমি নেমে পড়ি নদীতে; দেখতে পাই আমাদের স্কুলের হেডমাস্টার অচিন্ত্যবাবু পাথরের মূর্তি থেকে নেমে এসে হেঁটে বেড়াচ্ছেন স্কুলের মাঠে।
আমি ছেড়ে যাবো একদিন – আমার চেয়ার থেকে নিঃশব্দে উঠে, একদিন
আমি অদ্ভুত নির্বাসনে চলে যাবো; গ্রীষ্মের দুপুরে
কুকুরগুলো ঝিমোতে ঝিমোতে অতীতের কথা ভাবে; আমি জানি না
জানি না আমি, অর্থহীন বারান্দা
শুধু শুধুই জেগে উঠে আমার বুকের ভেতর; হায়, জীবন
আর কিছুই মনে পড়ে না আমার; আমার আর কিছুই মনে পড়ে না...”


আমার মনখারাপ করে অকারনে। ঘুমেরা উড়ে যায় পরিযায়ী পাখি হয়ে দূর পাড়া থেকে আরো দূর বেপাড়ায়; দেখি, একফালি ধানের অজুহাতে খুনসুটি করছে চড়ুই, অচেনা চোখের কোনে জল; আমি খুঁজে বেড়াই আমার না পাওয়া চিঠি। রানারের ঝুমঝুম ঘন্টা বাজা তো সেই কবেই থেমে গেছে; আমি আমার উত্তরের জানালা খুলে দিই, এক দমকা হাওয়া ফিসফিসিয়ে বলে এখনো সময় হয় নি, আমি অপেক্ষা করি, আমাকে পেতেই হবে সেই চিঠি। ভালোবাসা ভরাট করে তোমার শহরে সন্ধ্যে আসে, পৃথিবীর হৃদয় রোমন্থন করে আকাঙ্খার পরিবার পাড়ি দেয় তোমার শহরে; আলোয় লুটোপুটি খায় গোপন স্বপ্নেরা; পৃথিবী ছিদ্র করে বৃষ্টি নামে তোমার শহরে; আমি ভিজলে শুধু আমিই ভিজি, কিন্তু তুমি ভিজলে পুরো শহর ভিজে যায়।
কেরোসিনের গন্ধে, আবার মনে পড়লো তোমাদের অন্ধকার উঠোন,
কোথায় ট্রেন চলে যাচ্ছে দূরে, আর এই সন্ধ্যেবেলা
আমি একা একা বসে আছি; চেয়ে দেখছি
আমার জানালা, আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে দু’দিকে,
তোমাদের কাপড়কাচা শেষ হয়েছে এখন?
অনেক বছরের পর, আরও অনেক বছর কীরকম পার হয়ে গেলো,
মনে পড়ছে আজ তোমাদের সাদা বিড়াল ছানাটার কথা, মনে পড়ছে
তোমাদের হাসি, চোখের জল আর তোমাদের।”


দিগন্তে আজও কেউ ঢেউ বুনে যাচ্ছে বিষাদে, প্রবালের পাশে সেই নির্জনতা, নির্বাসনে মেঘ; উপকুলে ক্লান্ত সে নাবিক খুঁজে যায় ফেরার ঠিকানা, পথ ভুল করে ফিরে যায় সুন্দর, কোথা যায় জানা যায় না কিছুতেই। ভারি অচেনা লাগে, মনে হয় পরাজিত, মনে হয় ফতুর! মনে হয় হরতনে নিবেদিত গোলাম, সমুদ্র অচেনা লাগে...একটা ঢেউ কুল পেতে তার কতদিন লাগে?
হে ভুতের বাড়ি, তুমি কার জন্যে দাঁড়িয়ে রয়েছো?
কেউ আর আসবে না, কোনোদিন, আসবে না কেঊ।
হে নদী, একলা নদী, একা একা কোথায় চলেছো?
আমি আরো একা, তুমি সঙ্গে নেবে পুজোর ছুটিতে?
হে প্রিয় শহর, তুমি কেন চিঠি লিখোনা প্রত্যহ?
একা একা একা একা কেঁপে উঠি মানুষের দেশে...”


এই সব চিরচেনা দৃশ্যবলি কিছুই দেখবনা আর, ঝুলবারান্দার টবে ফুলের কোলাহল, পাশেরর বাড়ির ছাদ আর সেই ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরী, আটপৌরে জীবনের সমস্ত বিষন্নতা ঠোঁটে করে উড়ে যায় বিষন্ন চিল; ওর কাছে জমা রাখি আমার জমা খরচ আর পাপ পূন্যের হিসেব; বুঝতে পারি খরচের খাতাটা বড্ড বেশি ভারি, জমা খরচের হিসেব মেলেনা কিছুতেই, কিন্তু এ হিসেব তো মেলবার কথা! ক্রস চেক করি জমার খাতা, দেখতে পাই পাতার এক কোনে লেগে আছে কয়েক ফোঁটা চোখের জল; জমা খরচ সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়...
ধিরে ধিরে নদীগুলো আবার পিচঢালা রাস্তা হয়ে যায়, অচিন্ত্যবাবু চশমা হাতে ফিরে যান মাঠ ছেড়ে পাথরের মূর্তিতে; আমার মনে পড়ে যায় রঞ্জিনীর কথা। অচিন্ত্যবাবু সেদিনই শিখিয়েছিলেন ভরের নিত্যতা সূত্র, আমি রঞ্জিনীকে বলেছিলাম আমার আপেল খেতে একদমই ভালোলাগেনা; রঞ্জিনী রেগে গিয়ে বলেছিল সে কারনেই ও আপেল গাছ হবে।
সত্যি কি কেউ কষ্ট পায় কারুর জন্য? এই চাপা কান্নার পৃথিবীতে
আমি তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাই।
ভালো করেছো, তুমি নখ আর মুখোশ থেকে সরে গেছো।
তোমার দুচোখের জল হয়তো এখন নিমন্ত্রন করছে মুক্তোকে;
তুমি বেঁচে আছো না মরে গেছো? আদৌ যদি
বেঁচে থাকো, বন্ধু আমার, তুমি কোনোদিন আর ফিরে এসোনা বাড়িতে।”


আমার জানা নেই রঞ্জিনী আপেল গাছ হতে পেরেছে কি না; ট্রাফিক সিগন্যালের লাল আলো আমায় দেখে হাত নাড়ে, আমার বিদায়ী হাত নাড়া দেখে ওরা চোখ বড় বড় করে তাকায়, বুঝতে পারি আমাকে সাথে নেওয়ার কোনো ইচ্ছে ওদের নেই; টেবিল ল্যাম্পের সরলরেখায় আমি আঁকতে বসি ময়ুরাক্ষী নদীর গতিপথ, নদি যে আমায় কোনোদিন ফেরায়নি।।
শেষ হল সময়, এবং আমার জীবন।
তেমন কিছু আফশোষ নেই আর।
যদিও দু’চারটে সামান্য কাজ বাকি ছিলো-
যেমন ও পাড়ার সন্ত্রস্ত ছেলেটিকে
একটু ভরসা দিয়ে আসা – ‘ ভয় কিসের?’
যেমন চিঠি লেখা নতুন বন্ধুকে
‘ভুতের বাড়িতে , বেড়াতে আসুন একিদিন
।”

0 comments:

Post a Comment