আমাদের এক্কাদোক্কা জীবন


শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে উঠে জানলার কাছে বসে বসে মানুষের মুখের নানা রেখা দেখে,বোঝার চেষ্টা করি তাদের জীবনের গভীরতা,সরলতা অথবা অনেক অনেক জটিল তারের মধ্যে জমে থাকা একটা টুনি আলোর মতো সুখ।অনেকগুলো মুখ হটাত আচমকা চলে যাওয়ার পর নিজেদের ফেলে যাওয়াটুকু নিয়ে একটা গল্প তৈরি করে আমার মনের বারান্দায়।সেখানে দু মুহূর্ত বসি।যত চলে আসি বাড়ির দিকে ট্রেনের পাশের দিকে বয়ে চলা রাস্তায় কিছু এমন মানুষ দেখি,যাদের খুব সুখী মনে হয়।শুধু সেই মুহূর্তেই।কোনও প্রিয় ছোট বইয়ের দোকানের পরিচিত মুখ নেমে যায় নির্দিষ্ট স্টেশনে।আমি তাকে দেখি তবে নিজেকে হয়ত দেখাতে চাই না।এরকম নিজের অনেক না দেখাতে চাওয়া জমে থাকে সারাদিন।আজ,আজই ঢাকুরিয়া লেকে দেখলাম কত প্রেম,কত প্রেম।চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে সে সব প্রেমে,মনটা বলছে চারিদিকে সত্যি কি ভয়ানক প্রেম-হীনতা।উদযাপনটা আরো বেশি করে কঙ্কালটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে যায়।তাদের কারো কারো ফোনে বেজে ওঠে যে কোনও নিস্তব্ধতা-বিনাশী গান।নির্দিষ্ট স্টেশনের আগের স্টেশনে নামি।অন্য কোনও পথ ধরি বাড়ি ফেরার।একটু নিরিবিলির পথ,একটু আড়াল।ভাবি আদতে কার কাছে ফিরে আসি,সত্যি বারবার?নিজের কাছে?মায়ের কাছে?নাকি নিজের আড়ালের কাছে?কি জানি আজকাল নিজেকে সুন্দর করে আড়াল করতে পারি হয়ত।তারপর সে সমস্ত আড়াল থেকে অনেক শব্দ জন্ম নেয়,আমার পাশে হাঁটে,হাত ধরে…
ফিরতে ফিরতে দেখি পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র ঠাকুর পুজো হয়।বুঝি আমার এখনো একটা আড়াল আছে…ভাগ্যিস…


কাল রাতে জীবনানন্দ এসেছিলেন, মুখোমুখি বসেছিলেন অন্ধকারে। বলেছিলাম,খুব শক্ত করেই যে শিখেছি এমন নয়, তবু মনে হয় মায়ের ঐ কথা যে, কেউ ঘরে না থাকলে পাখা বন্ধ করে দে, এই কথাটুকুই শিখিয়ে দিয়েছে অনেক কিছু।সকাল বেলা উঠে মাঝে মাঝে পুরনো ইশকুলের সামনে চলে যাই। দুপুরে ছাদের কোনও একটা ছোট্ট কোনায় বসে ভাবি ঐ যে দূরের ছাদটা,বহুদিন কথা হয় না।কেমন আছো, এই রোদ্দুরে।ছাদের তো মাথার উপর আর ছাদ নেই।আজকাল খুব ইচ্ছে করে কোথাও একটা চুপ করে বসে থাকি,আকাশের দিকে তাকিয়ে।কতদিন ঘাড় উঁচু করে আর আকাশটাকেই দেখি না। মনে হয় আজ রাতে যদি আর বাড়ি না ফিরি।এই আমার দু পয়সার জীবন, টেলিফোনে পয়সা নেই ফোন করার তবু একটা খাতার দোকান দেখলে নতুন একটা খাতা কিনে ফেলি।মা বলে,আবার একটা নতুন খাতা? আমি ভাবি,এইটুকুই তো বিলাস।বিলাস,বিলাস,বিলাস।আমারও বিলাস আছে বইকি।বিলাস কি সবসময় অর্থগত হতে হবে?মানসিক?তামসিক?তারপর একটা কেউটের মতো রাত্রি আসে।আমি অনেক পুরনো মুখ খুঁজি আজকাল, অথবা একটি নতুন মুখে প্রাচীন সুখ।বাসায় ফেরে আমার মধ্যে জেগে থাকা ‘মা’।মৃত্যুর কথা ভাবি,জীবনের কথা ভাবি,তারপর ভাবি এসব শ্যাওলা মাখা শরীর নিয়ে কতদিন পাল্লা দেবো? ভাবি কতদিন সিঁড়ির ঘরে লুকিয়ে রাখবো ভালোবাসার বোধগুলোকে,বলবো বৃষ্টি,চল একবার সস্তা পালিয়ে যাই।জামাকাপড় বিশেষ লাগবে না খালি কতগুলো বই যদি সঙ্গে নিতিস…। ভালবেসে কি পাবো?অভিযোগ?শরীর?আমি তো সেসব চাই নি কোনদিনও।একটা ছাদ-মানুষ,তারা,বোধ,চোখের জলে ভিজিয়ে দেওয়া ক্ষত,বোবা আদর।কাল রাতে জীবনানন্দ এসেছিলেন,বলছিলাম-আমি একটা কাগুজে বাঘ সেজে হেঁটে চলেছি শব্দের উপর দিয়ে মহাকালের পথে, বলছিলাম-আমার ঘুমের মধ্যে মরে যেতে ভয় লাগে,একা।

0 comments:

Post a Comment