বাতাবি লেবুর গন্ধে

তারপর আরো, কত চন্দ্রাহত রাত ফিরে গেছে, দিকশূন্য নাবিকের মত ভেসে গেছি তরঙ্গাভিযানে, অবিন্যাস্ত জলধারায় অনেক অক্ষমতার ভারী বোঝা কাঁধে বয়ে, অনেক অসমাপ্ত বালিয়ারি পায়ে দলে এসে দাঁড়িয়েছি, তোমারই এঁকে দেয়া সীমান্ত রেখায় অনাবৃত বসন্তের প্রান্তে।কল্পনায় ছুঁয়ে যায়,হাতছানি দিয়ে যায়,
আমাকে শূন্যতায় ভাসায়, তবুও ভুলে যাওয়া,
বারে বারে ফিরে পাওয়া, পেয়েও আবার হারিয়ে যাওয়া;
একটা স্বপ্নের মাঝামাঝি, আমি যে তারে খুঁজি,
কল্পনায় শুধু চোখ বুজি।


আজ অনেকদিন পর লিখতে বসলাম, কি নিয়ে লিখি ভাবতে ভাবতে তোর কথাই মনে পড়ল, অথচ আমি চেয়েছিলাম আমার শৈশবের নদীর কথা, আমার ময়ুরাক্ষী নদীর কথা। এক একটা দিন কাটে নিঃসঙ্গ হাওয়া হয়ে জনশূন্য পথে একলা একেলা। সিগারেট ছাই হয়, বিষাদ উড়ে উড়ে বিবাগী মেঘের মত দুরদেশে ভেসে যায়। আমার বাড়ির চিলেকোঠায় বসে থাকে এক নিঃসঙ্গ চিল, আমি তাকে বলে দিই আমার হাওয়া হয়ে যাওয়ার খবর। বুকের উপর জড় হয় কঠিন সব অসুখ, এক পালতোলা নৌকোয় তাদের পাঠিয়ে দিই নির্বাসনে, অব্যক্ত কথাগুলো হাতড়ে ফেরে ফেরার ঠিকানা।

আজ সারাদিন  ঘরে আটকা পড়ে আছি। আটকা পড়ে আছি - বলছি এইজন্যে যে খুব 
একটা দরকার না থাকলে এই বৃষ্টিতে বোকারাই বাড়ি থেকে বেরোয়। এখনো ঝরে যাচ্ছে অবিরাম। রাত একটু বেশি হলে দৌড়ে আসি আধাঘন্টা ময়লা নদীটার পাশ দিয়ে। গুগল ম্যাপে খুঁজে দেখি সেই নদী ধরে চার-পাঁচ ঘন্টা দৌড়ে গেলে নদীর সাথে সাগরে মেলার জায়গাটায় পৌঁছুনো যাবে। 
দৌড়ে এসে শাওয়ার নিয়ে শুয়ে পড়ি। রোজকার রুটিন। 
ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। অনেকটা সময় পেরিয়ে এলাম এইভাবে ছাদের দিকে তাকিয়ে।ছেলেবেলায় খাটের নিচে ঢুকে শুয়ে গল্পের বই পড়তাম, তিন গোয়েন্দা, সুনীল 
অথবা সমরেশ। ছাদটা অনেক কাছাকাছি ছিলো। 
এখন যে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে সেটা বড্ড দূরে। 
অনেকদিন কোন ভালো লেখাও লিখতে পারি না। কয়েকটা লেখা পড়ে আছে গুগলডকে, বের হবে না কোনদিনই মনে হয়। সৃষ্টিশীল চিন্তা করার অংশটুকু সম্পূর্ণ অচল হবার পথে। রাত বারোটায় বাড়ি ফিরি। কেটে যায় দিনকেটে যায় পথ। নিজে থেমে গেলেও দিনগুলো যাবে। যেন ছুটে যায় ট্রেনহুইসেল দিয়ে। আমি থেমে থাকলেও ট্রেনের কিছু যায় আসে না। ট্রেনের সাথে তাল রেখে আমাকেও দৌড়ুতে হয়। 
রোজ এক গান শুনি, লতা মঙ্গেশকর অথবা নুসরাত ফতেহ আলী খান, রোজ ভাবি - আইপডের 
গানগুলো বদলাতে হবে, করা আর হয়ে ওঠে না। রোজ একপথে একই জায়গায়  পায়ের ছাপ রেখে যাই। রোজ এক জায়গায় একই পথচলতি মানুষের সাথে দেখা হয়ে যায়হেসে ফেলি। 
উড়ে যায় পুরো সপ্তাহটা এইভাবে। আর এইরকম বৃষ্টিবন্দী দিনে সারা সপ্তাহ গলায় চেপে রাখা ক্কান্নাটুকু বেরিয়ে আসতে চায় । ঈশ্বরের সাথে এমন কোন বন্ধুতা নেই যে
তাকে ডাকবো প্রাণভরে। তবু মাঝে মাঝে তার সাথেও বন্ধুতা করতে ইচ্ছে করে । 
ভাবি, বলি

"
এতকাল নদীকূলে 
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে 
সকলি দিলাম তুলে 
থরে বিথরে--- 
এখন আমারে লহো করুণা ক'রে ॥

প্রতি সন্ধ্যায় একবার করে আবিষ্কার করি। আমি এখনও কারো কাছেই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারলাম না। 


নিয়ম বলে, এই আবিষ্কার আমারে কষ্ট দেবে,আমার মন খারাপ হবে, গান শুনতে শুনতে বালিশ ভিজবে। কি অদ্ভুত, কিচ্ছুই হয় না, আমি স্ট্যাটাস লিখতে বসি। 



তবে এখনও কোন এক কারণে ঘুমাতে পারি নাটবে নয়নতারা নাই,রাস্তার ল্যাম্পোস্ট গুলো আগের মতই রয়ে গেছে। জড় পদার্থের এই সুবিধা, তাঁদের বদলাতে হয় না। বদলে যাওয়া এক বিচ্ছিরী প্রক্রিয়া ।গাছটা মারা গেছে অনেক দিন হল।নতুন একটা নয়নতারা কিনব কিনব করে আর কিনা হল 
না। আমি তো চলেই যাবনয়নতারা'রা একলা একলা করবে কি সারারাত আকাশের নিচে



কত লাল,নীল কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকি। কালো মেঘ দেখে আর্তনাদ লুকাতে চাই মেঘের ভাজে। তেমন কোন লাভ হয় না,মেঘ নিষ্ঠুরের মতই বৃষ্টি হয়ে মাটিতে লুটাতে থাকে। 



পৌনঃপুনিকতার তালিকায় অনেকদিন আগে নাম লিখিয়ে ফেলা জীবনের এই ছোট্ট ঠিকানায় তাও আকাশ ছিলোছিলো জানলা খুলে দিলে ওপারে দাড়িয়ে থাকা কয়েকটা অচিন বৃক্ষ। 
আমার এই বসার জায়গাটুকুর পেছনে তাকালে দেখতাম কখনো আকাশ নীল, কখনো কালো। 
কখনো আকাশের মন ভালোকখনো কটমটে রাগ করা মা মেঘেরা বাচ্চা মেঘেদের নিয়ে উড়ে যেতো ওই অচিন বৃক্ষের ওপর দিয়ে। পাখি। টিয়া। ঝাঁকে ঝাঁকে, সন্ধ্যায় ওদের ডানা ঝাপটানি ওই অচিন বৃক্ষের পাতায়- ডালে। 
সব হারিয়ে যাবে, খুব তাড়াতাড়ি হলে কালঅথবা সামনের সপ্তায়। বাড়ছে কনক্রিটের কাঠামো, হয়ে গেছে একতলা। আমার বিদ্যালয় বানাচ্ছে নতুন ভবনযেনো ফুঁড়ে উঠছে অশ্লীলভাবে। একেবারে আমার জানলা ঘেঁষে। পুরনো কিছু ভবন ভেঙে ফেলা হবে, তার প্রস্তুতি হিসেবে এখানে গড়ে উঠছে নতুন। 
আমাদের আকাশকে বিসর্জন দেবার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান দেবে চকচকে নতুন ল্যাবশ্রেনীকক্ষ এমনকি একতলায় কনভেনিয়েন্স স্টোর। বেচবে প্যাকেট লাঞ্চ থেকে শুরু করে স্লিপিং পিল। 
আমি জানলা দিয়ে তাকালে আর আকাশ আমায় ডাকবে না। মায়াভরা বৃষ্টিমাখা আকাশ অথবা দুধ-সাদা মেঘ মাখানো আকাশ। দেখবো সেখানে কনক্রিটের কালো অথবা ধূসর দেয়াল। অথবাএয়ারকুলারের বেড়ে যাওয়া বাইরে থাকা অংশ। 
স্ট্রেসময় জীবনের বন্ধু এই ছোট্ট আকাশটুকু, তোমার সাথে বিদায়ের এই বেলায় নাগরিক মানুষ হবার দায় ও দুঃখে আমি বিব্রত। অসহায়।

আমি জানিনা, আমার জানা নেই  কতটুকু সময় পার হলেঅপেক্ষা খুব ভারী মনে হয়। দুচোখের পাতায় নেমে আসে ভোরের শিশির। ভালোলাগা,ভালোবাসা শব্দগুলোর কাছাকাছি যতগুলো আপন শব্দাবলী তোমাকে দেবার কথা ছিলো সবগুলো জমিয়ে রাখি। কে জানে যদি আর না আসো, যদি জীবনের একটু দেখা হওয়া আলো হয়ে জুড়ে থাকে মনের আকাশ। যদি তুমি আমার আকাশ সীমায় মেঘ হয়ে আসো, খুব বৃষ্টি হয়ে ঝরো একদিন। আমি না হয় সেই বৃষ্টিতে ভিজে হবো স্নিগ্ধ সকাল। বৈশাখের দিন গুলোতে যখন শুনশান দুপুরগুলো দীর্ঘ হতে থাকে কেবলি ধূসর হতে থাকি। তোমার বাড়ীর ছাদ থেকে আমার আঙিনা । এক্কা দোক্কা খেলা। বাতাবী লেবুর গাছটার ছায়ায়। দুপুরের আকাশ দেখার ফাঁকে কখনো? চোখ কি আমাতে ছিলোকে জানে বাতাবী লেবুর গন্ধ মেখে কখনো কি আমি ও তোমার দিকেএই বৈশাখে তোমাকে যদি কাছে পাই। খুব কাছে পাই একদিন মনে ভাবি। এখনো সেই গন্ধময়্তা জুড়ে থাকে। শুধু অস্পষ্ট তোমার চোখ দেখা হলো না কোনদিন। এভাবে পিছন ফিরে থাকো যদি আকাশের দীর্ঘ মেঘের পথ হয়ে।কখনো পাওয়া হবেনা সেই তারাকে যার খুব কাছে বসবাস ছিলো একদিন। বৈশাখ এলে এইকথাটা ভাবনার ঘুঘু হয়ে ডাকতে থাকে সকাল দুপুর রাত।।

0 comments:

Post a Comment