নিয়ম ভাঙ্গার নিয়ম

শেষ বিকেলে শীতের চাদর গায়ে বসে আছে বিষণ্ণ সূর্য  তাকে একটা ঝিলের গল্প শোনাব বলতেই  আকাশে খুশির আভা ;  আমার গল্পে একটা দুঃখী বালিহাঁসও আছে,  বালিহাঁসের গল্প শুনে সূর্যের ম্লান চোখ থেকে  অন্ধকার ঝরে পড়লো ।  প্রেম" আর "ভালোবাসার" মধ্যে একটা সুক্ষ পার্থক্য আছে।যেমন কোনো কাঠের রাস্তা যতক্ষণ "সাঁকো",সে ততক্ষণ একটা ছবি।সেটা যেই না "ব্রিজ" হল,অমনি কেমন যেন প্রয়োজন হয়ে গেল...

আমি তাই প্রেমের গল্প লিখতে পারিনা।কদিন আগে একবার চেষ্টা করেছিলাম।একটা ছেলে এলো,একটা মেয়ে এলো,কলেজ এলো,কলেজের সাথে নিয়ম মেনে ক্যান্টিন,তার সাথে নিয়ম মেনে গিটার,সিগারেট,হাত ধরা,এলো চুল,নীল আকাশ...গল্প শেষ হওয়ার পরে দেখলাম পুরো পৃষ্ঠাটা একগাদা নিয়ম হয়ে গেছে।বিরক্তি তে সবকিছু ছিঁড়ে ফেললাম।তারপর মনে হল,এটাও তো একটা অভ্যেস!

আমি মাঝে মাঝেই গল্প লেখার সময় এক একটা বিরাট স্ট্যানজা ধরে ঘচাং করে কেটে দেই।তারপর জায়গাটাকে একটা বর্ডার দিয়ে ঘিরে আলাদা করে ফেলি।আজ ভাবলাম নিয়ম ভাঙবো,তাই খাঁচার দরজাটা খুলে দিলাম।সাথে সাথে একঝাঁক শব্দ একসঙ্গে ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল।তারপর তাদের সে কি হুটোপুটি!একটা "কেন" ধাক্কা দিল "তোমাকে"র গায়ে।সে ছিটকে এসে ধাক্কা দিল "আদর" কে-এরা আমার বাতিল অনুভুতি।এদের কোনো নিয়ম নেই কারন এরা বাতিল;বা হয়তো নিয়ম নেই বলেই বাতিল!

সে আজ থেকে দু-তিন বছর আগের কথা।একদিন এমন কয়েকটা বাতিল শব্দ,একমুঠো বৃষ্টি,তিনটে গাছের ছায়া আর একটা পোড়া দেশলাই দিয়ে আমি ঝালমুড়ি বানিয়েছিলাম।সঙ্গীতা ঝালমুড়ি খেতে খুব ভালোবাসত বলে।
সঙ্গীতা-আমার কলেজের প্রেমিকা।

এই লাইনটা লেখার পর আমি আরো এক দোকান ঝালমুড়ি লিখতে পারি।কিন্তু ভাঙ্গা প্রেম নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করলে লোকে হয় "ফ্রাসট্রেটেড" বলবে,নয় "আঁতেল" বলবে।তাই থেমে গেলাম।ট্যাগ জিনিসটায় আমার বরাবরের ভয়!সঙ্গীতা যতদিন আমার কেউ ছিলনা,ততদিন আমার সব ছিল,যেই "প্রেমিকা" ট্যাগ লাগালাম,ক'দিন বাদেই মেয়েটা কেমন যেন ফুরিয়ে গেল...

আমিও কি ফুরাইনি বলো!কি লিখছি এসব ছাইপাশ?পোড়া দেশলাই কাঠি কেউ কোনোদিন বাক্সে ভরে রাখে বলে জানা নেই।পোড়া গল্প তবে রাখবে কেন?আর রাখেও যদি,তারা তো আমার বাক্সবন্দি অনুভুতি!গল্প হল কৈ?

সব সালা নিয়ম...সব!আমার বাথরুমে গান শুনতে শুনতে মাথা দোলানো নিয়ম,ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি রেখে বারবার নিজেকে আয়নায় দেখা নিয়ম,প্রেম করা নিয়ম,প্রেম ভাঙা নিয়ম।এসব তো তোমরাও করেছ,করনি,বলো?তুমি-আমি তবে স্পেশাল হলাম কোথায়?

আমি হলপ করে বলতে পারি জীবনের প্রথম সিগারেট খেয়ে তুমি খুব কেশেছিলে,নীল চুড়িদারের অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্যে হেয়ারস্টাইল পাল্টেছিলে,সাইকেল চালিয়ে স্কুল থেকে ফেরার সময় নিজেকে সুপারম্যান ভেবেছিলে,প্রথমদিন বড় হওয়ার পর কুলকুল করে ঘেমেছিলে-দেখো আমি সব জানি।কারন তুমি নিয়মে থাকতে বাধ্য।হাত-পা বাঁধা,আমার মত।


বেনিয়মে চলত আমাদের পুরোনো বাড়ির ছাদের অ্যান্টেনা।আর সেই কাকটা যে তার মাথায় বসবে।কাকটা জানত না ওর দু-ফুট উপর দিয়ে খতরনাক ইলেকট্রিক তার চলে গেছে।আর অ্যান্টেনাও জানত না যে,সে আর দু ফুট লম্বা হলে তার প্রেমিক মারা যেত।


আর একজন ছিল।বৌ।আমার পাড়ার এক ঠাকুমা।আমি ডাকতাম "বৌ" আর বৌ আমায় ডাকত "সোয়ামি"।বছর তিনেক আগে বৌয়ের একটা অ্যাকসিডেন্ট হল।বৌয়ের কথা বলার ক্ষমতা চলে গেল,সর্বাঙ্গ প্যারালাইজড হয়ে গেল।আমার বৌ নিয়মের বাইরে চলে গেল।

ক'দিন আগে বৌকে দেখতে গেছি।তখন বিকেলবেলা।বৌ খাটে শোয়া,মাথার বালিশের পাশে একগাদা সাদা ট্যাবলেট,তার পরে একটা জানলা,বৌয়ের পায়ের কাছে আমি।বোকার মত জিজ্ঞেস করলাম,

"কেমন আছো বৌ?আমি তোমার সোয়ামি গো!"

ঘোলাটে চোখ দিয়ে বৌ বেশ কিছুক্ষন ধরে আমায় চিনল।তারপর কিছুক্ষন ঠোঁট কাঁপালো।হয়তো কিছু বলার জন্য।আর তারপর...হাসতে শুরু করল।পাগলের মত হাসি!চোখ দিয়ে জল ঝরছে,হাসির চোটে গোটা খাট থরথর করে কাঁপছে,বৌয়ের হাসি আর থামেনা।

সেদিন আমি অনুভব করেছিলাম,নিয়মের বাইরে বেরোতে হলে পরিহাস করতে জানতে হয়।হাসো...শুধু হাসো।প্রেম জাহান্নমে যাক,গল্পের শেষ জাহান্নমে যাক,সাঁকো জাহান্নমে যাক...

আমরা,অপদার্থরা শুধু ওই অনুভবটুকুই করতে পারি।নিয়মের মধ্যে থেকে অনিয়ম মাপা খুব সহজ!আসল কষ্ট জানে আমার বৌ,যার কান্না পেলেও হাসতে হয়...আর জানে সেই অ্যান্টেনা,যার দু ফুট উপরে এখন একটা মরা কাক ঝুলে আছে।

0 comments:

Post a Comment