যেখানে নামের ফলকে লেখা আছে '' কোথাও না"

কথা ছিলো…  ভেবেছিলাম  কবিতার কাছে আর ফিরবো না ভেবেছিলাম অনেক কিছুই…  অথচ দিনে দিনে প্রতি ভোরে নিজের কবিতার কাছে নিজেই 'প্রতারক' হয়ে যাই……  আমি আমার হারানো শহরকে খুঁজে পাইনা, সেই কবে আমার শহর থেকে দেখা এক রহস্যময় মহাপর্বত মেঘের মতো ডেকেছিল, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তা কোথায় কোন সুদুরে চলে গেছে। কতবার মনে হয় ফিরে আসি... এ শহর তো নয়, আমার সেই শৈশবের চোখে একটা শহরের ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিল কল্পনায়। কিছুতেই সে ছবি মিলিয়ে যায় না। সে এক অদ্ভুত সুন্দর ম্লান- আলোর উপত্যকা, চারধারে নীল পাহাড় হাসিমুখে চেয়ে আছে, শহরের মাঝখান দিয়ে নদী। নদির উপর ঝুলন্ত পোল। আকাশে রামধনু-রঙা নানা বর্নের মেঘ ভেসে যায়। পথে পথে স্থল পদ্ম ফুটে থাকে। রাস্তা আকির্ণ করে থাকে ঝরা ফুলে। মানুষ সেখনে জেগেও স্বর্গের ভেতর বাস করে।

আমার শহরে ফুল ফোটে; পাখিরা গান গায়; মেঘ ভেসে যায়। তবুও কিছুতেই ছবিটা মেলাতে পারিনা। আমি ফিরে যাই। আমার আরও কিছু দেখে যাওয়ার বাকি আছে। যেমন কাটিহারের সেই মাদার গাছটা- যেখান থেকে সেই আশ্চর্য্য কোকিল ডেকেছিল। কিংবা বাসস্টপের পশ্চিমের সেই মাঠটা, যেখানে ডুবে গিয়েছিল পেট্রলের ট্যাঙ্ক। কিংবা সেই স্কুল বাড়ি, যেখানে হোস্টেলের কাঁচা ঘরে প্রথম থাকতে গিয়ে মায়ের জন্য মন কেমন করায় হাপুস নয়নে আমি কেঁদেছিলাম।
আমি বিদায় নিতে যাই।
আমার চোখ জলে ভেসে যায়। আমি দেখতে পাই অচিন্ত্যবাবু স্কুলের পাথরের মুর্তি ছেড়ে পথে নেমে এসেছেন। মাঝরাতে সবাই যখন গভীর ঘুমে ব্যাস্ত, আমি দেখি ধীরে ধীরে রাস্তা গুলো এঁকে এঁকে নদী হয়ে যায়। অচিন্ত্যবাবু আনমনে ঘুরে বেড়ান।
আমার মনে পড়ে যায় রঞ্জিনির কথা। অচিন্ত্যবাবু সেদিনই শিখিয়েছিলেন ভরের নিত্যতা সুত্র। আর রঞ্জীনি বলেছিল মৃত্যুর পর ওর দেহটা আপেল গাছ হয়ে যাবে। আমার আপেল খেতে একদম ভাল লাগেনা-আমি বলেছিলাম। ও তাতে রেগে গিয়ে বলেছিল সেই কারনেই ও আপেল গাছ হতে চায়।
অচিন্ত্যবাবু পুনরায় ফিরেযান পাথরের মুর্তিতে। আমি ফিরে যাই তালদিঘিটির কাছে, তালদিঘীর জলে আমি নিজেকে দেখি।
কিছুতেই বুঝতে পারিনা। হঠাৎ চার দিকে এক ভুতুড়ে কুয়াশা উঠে এলো কোথা থেকে? একধারে গভীর খাদ, অন্য ধারে উঁচু পাহাড়, কিছুই দেখা যায় না। আলো মরে গেলো।কেবল এক শূন্যের রেললাইনের উপর দিয়ে ছোট্ট খেলনা গাড়ি দুলে দুলে কোথায় চলছে।

গাড়িটা তার ধুকপুক চলার শব্দ দিয়ে বলে কোথাও না, কোথাও না।
আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। হঠাৎ অনুভব করি, হলুদ প্রজাপতিটা এতক্ষন পর হঠাৎ উড়াল দিল।
গাড়ি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কোন শূন্যপথে? কোন অচেনার কাছে? কে সেই চিরযুবতী অপেক্ষা করছে সেইখানে যেখানে নামের ফলকে লেখা আছে '' কোথাও না।"

0 comments:

Post a Comment