কখনও কাছে কখনও দুরে-নিজের সাথে দেখা-১

কিছুদিন ধরেই মনটা পালাই পালাই করছে। মনে হচ্ছে, আমি একটা ভুল জায়গায় আছি, আমার অন্য কোথাও থাকার কথা ছিল।
এক-একদিন বন্ধু-বান্ধব কেউ থাকে না। যারই বাড়িতে যাই সে নেই, প্রত্যেকেরই সেদিন অন্য কোন কাজ থাকে। আমার অভিমান হয়, কেউ একবারও ভাবলো না, আমি কি করে সন্ধ্যেবেলা একা থাকব? সেই অভিমান থেকে মনখারাপ, উদ্দেশ্যহীন হয়ে ঘুরতে থাকি, আর বার বার নিজেকে বলি, আমায় কেউ মনে রাখেনি। তারপর একসময় পুরো ব্যাপারটাই যে একটা হাস্যকর ছেলেমানুষী তা বুঝতে পেরে বাড়িতে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি।

স্যার আশুতোষ মুখার্জীর বাড়ির সামনে থেকে দুটি মেয়ে মন্থর ভাবে রাস্তা পার হয়। শীতকালীন মসৃন মাধুর্য্য লেগে আছে তাদের মুখে, সেই রুপের ঝাপটা এসে আমার গায়ে লাগে। আমি মনে মনে বলি, ওরা আমার কেউ নয়। ওরা আমাকে কোনোদিন চিনবে না।

একটা গাড়ি বারান্দার নিচে একটা ভিখিরি পরিবার কদিন ধরে বাসা বেঁধেছে। অন্যদিন লক্ষ করিনা, হঠাৎ একদিন দেখলাম, ভিখিরি মা ইটের তোলা উনুনে মাটির হাঁড়িতে খিচুরী চাপিয়েছে। অনেকখানি হলুদ মেশানো গাঢ় হলদে রঙের খিচুরীতে অনেকখানি নানা রঙের ডাল। বাচ্চাগুলো উনুনের সামনে গোল হয়ে বসা-আনন্দে চকচক করছে তাদের চোখ। আমার কষ্ট হয়, আমার মনে হয়, আমি কেন ওদের আত্মীয় হতে পারলুম না? কেন আমি ওদের পাশে বসে এইরকম খিচুরী ভোগ পেতে পারি না?

জানালা দিয়ে জলন্ত সিগারেটের টুকরো ছুঁড়ে ফেলা আমার একটা বদ অভ্যেস। যখনই মন খারাপ থাকে, তখনই মনের উপর আর কোনো অধিকার থাকেনা। সেরকম অনেকদিন বাদে, অন্য কি একটা কথা ভাবতে ভাবতে সিগারেটের শেষ অংশ ছুঁড়ে দিয়েছি জানলা দিয়ে, একটা লাল টুকটুকে লেপের উপর পড়েছে আমার সিগারেটের টুকরোটা, এবং ধোয়াচ্ছে। তুলোর আগুন সাংঘাতিক, কখনও দাউ দাউ করে জ্বলেনা, ভেতরে ভেতরে ছারখার।
প্রথমেই ভাবলাম, আমি এই মুহুর্তেই বাড়ি থেকে কেটে পড়লে কে আর বুঝবে এই দুষ্কর্মটি আমার? অন্য যার ঘাড়ে দোষ পড়ে পড়ুক। পরমুহুর্তেই মনে হল, এখনো চেষ্টা করলে লেপটাকে বাঁচানো যায়। ও বাড়ির মেয়ে দোতালার জানালার কাছে রোদে বসে পার্ট টু পরীক্ষার পড়া পড়ছিল, আমি তাঁকে বললাম, এই শোনো শোনো!
সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো। কোনো দিন তার সঙ্গে ডেকে কথা বলিনি। আমি বললাম, শিগগির একবার ছাদে এসো তো, শিগগির, এক্ষুনি।
আমার ব্যাগ্রতাকে মেয়েটি অগ্রাহ্য করতে পারল না, বই মুড়ে রেখে মেয়েটি ওপরে উঠে এলো। এরমধ্যেই সিগরেটের টুকরোটা টুপ করে খসে পড়ে গেল নিচে, লেপটার কিছুই ক্ষতি হয়নি, শুধু একটা ছোট্ট কালো দাগ পড়েছে, হয়টো কারুরই নজরে আসবে না। পুরো ব্যাপারটা চেপে গেলেই তো হয়।
কিন্তু ততক্ষনে মেয়েটি ছাদে উঠে এসেছে। ভুরু কুঁচকে িজ্ঞাসা করলো, কী?
আমার আর একটা দোষ এই, আমি ঠিক দরকারের সময় মিথ্যে বলতে পারি না। আমি তো-তো করে বললাম, এই না, মানে হঠাৎ মনে হল...। মেয়েটি এমনভাবে আমার দিকে তকালো, যেন আমি মানুষ নয়, অন্য কোন অদ্ভুত প্রানী। পরীক্ষার পড়া থেকে তুলে একটি মেয়েকে ছাদে ডেকে এনে যে কোনো কথা বলতে পারে না, সে কি মানুষ হতে পারে? জানালার কাছ থেকে সরে এসে আমি নিজের কান মুলে বললাম, স্টুপিড, জীবনে আর যদি কক্ষনো সিগরেত খেয়ে...।

কিছুদিন ধরেই এইসব ভুল ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে পরপর, নানা লোক টুকটাক অপমান করে যাচ্ছে বিনা কারনে। একএকটা সময় আসে যখন দিনের পর দিন চলে গন্ডগোলের দিকে।

গার্হস্থ্য আশ্রম থেকে  চির বিদায় নেবার সাহস আমার নেই, তবু মাঝে মাঝে ছুটি তো নিতেই পারি। ঠিক করলাম, আজই বেরিয়ে পড়বো। কোথায় যাব জানিনা, তবু কোথাও যেতে হবে।


     style="display:block"
     data-ad-client="ca-pub-2221917604703020"
     data-ad-slot="5898435076"
     data-ad-format="auto">



0 comments:

Post a Comment