চিঠি

ভূতটাকে আমি দেখেছিলাম পুরোনো পোস্ট অফিসের
সামনে। সেই থেকে ভূতের গল্পটা সবাইকে বলে আসছি, কেউ বিশ্বাস করছে, কেউ কেউ করছে না।
নদীর একটা দিক ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে শহরের উত্তর দিকটা অনেকখানি গিলে ফেলল। পুরোনো পোস্ট অফিসের বাড়িটা থেকে যখন আর মাত্র বিশ গজ দূরে জল, তখনই সরকার তরফ অফিসটাকে শহরের মাঝখানে তুলে আনে। পুরোনো বাড়িটা নদীগর্ভে যাওয়ার জন্য মৃত্যুদ্বন্ডাদেশ পেয়ে একা পোড়ো বাড়ির মত দাঁড়িয়ে রইলো। তার বিশ গজ দূরে নদীর পাড় আরও খানিকটা ভাঙ্গল। ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে সেই জল এসে একদিন বাড়ির ভীত ছুঁয়ে ফেললো। তলা থেকে ধুয়ে নিয়ে গেল মাটি। কিন্তু সে সময় বর্ষার পর জলে মন্দা লেগে যাওয়ায় সেবছরের মত পুরোনো বাড়িটা বেঁচে যায়। কেবল নদীর দিকটায় একটু কাত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ওই ভাবেই রয়ে গেল বাড়িটা, কেউ এসে দখল নেয়নি। কেবল তার জানালা দরজা গুলো গরীব-গুর্বোরা খুলে নিয়ে গেল, কিছু আলগা ইট নিয়ে গেল লোকজন। কিন্তু পিসার হেলানো স্তম্ভের মত সেই হেলা বাড়িতে কেবল নদীর বাতাস বইতো দীর্ঘ্যশ্বাসের মত, আর ছিল বাদুড়, ইঁদুর, চামচিকে, সাপখোপ আর উদ্ভিদ। গাছের জান বড় সাংঘাতিক, তারা ভিত ফাটিয়ে গজায়। তা এরা সবই ছিল, আর কেউ নয়।

তখন আমি ছোট। বছর সাত আটেক বয়স হবে। সে বয়সটার ধর্মই এই যে, পৃথিবীর সবকিছুই হাঁ করে দেখা। সব কথা হাঁ করে শুনি। কিছু বোকাসোকাও ছিলাম। বড়রা কেউ সঙ্গে না থাকলে যেখানে সেখানে যাওয়া ছিল বারন। যাওয়ার সাহসও ছিলনা। 

তখন দাদু বিকেলবেলায় প্রতিদিন একহাতে আমার হাত অন্য হাতে লাঠি নিয়ে বেড়াতে বেরোত। সবদিন একদিকে বেড়ানো হত না। তবে প্রতিদিনই আমরা নদীর পাড়ে যেতাম। নদী শহরের ভেতর ঢুকে এসেছে। কাজেই বেশি দূর যেতে হয় না। একটু হাঁটলেই নদী।শীতকাল তখন, বিশাল বিস্তির্ন চর ফেলে নদী আবারও খানিকটা উত্তরে সরে এসেছে। সে চরের মাটি চন্দনের মত নরম। তার উর্বরতা খুব। 
আমি আর দাদু সেই নদীর পাড়ে দাঁড়াতাম, দাদু লাঠিটা তুলে দুরের দিকে দেখাতেন। বলতেন-ওই যে কাকতাড়ুয়া, কেলো হাঁড়ি দেখছো ওইখানে ছিল একটা বহু পুরোনো ডুমুর গাছ। ওর তলায় পঞ্চাশ ষাট বছর আগেও রাম পন্ডিতের পাঠশালা ছিল। আর ওই যে ডালের খেত খড়ের ঘর, ও ছিল ডাকাতে কালীবাড়ি। এখন দেখে বোঝাই যায় না। 

শহরের অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সেই অংশ টুকুতে ছিল বসত বাড়ী, ইস্কুল, মন্দীর রাস্তা। সেটুকুই সব নয়, তার সাথে অনেকের বাল্য-কৈশোরের নানা স্মৃতিচিহ্নও। কত পুরোনো গাছ, পাথর, ঘাট আঘাটা। 
দাদু নদীর ধারে এলেই আমাকে উপলক্ষ্য করে সেই সব পুরোনো স্মৃতির চিহ্নগুলোর স্থান নির্দেশ করার চেষ্টা করতেন। তারপর চুপকরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। নতুন ঘাট তৈরী হয়েছে, সেখানে নৌকা বাঁধা। দাদু কখনও সেই ঘাটের ধারে গিয়ে ঝিম হয়ে বসে থাকতেন। তাঁর একদিকে আমি, অন্য দিকে লাঠি।

বাঁ ধারে, অনেকটা দূরে পুরোনো পোস্ট অফিসের রহস্যময় হেলে পড়া বাড়ি দেখা যেত। জানালা দরজার প্রকান্ড হাঁ-গুলো শোকার্ত চোখের মত চেয়ে আছে সজীব পৃথিবীর দিকে। সামনের বর্ষায় যদি বাঁধ ভাঙ্গে তো তার পৃথিবীর মেয়াদ শেষ হবে। মুমুর্ষ বাড়িটা এই সত্যটা বুঝতে পেরেছিল। সে তাই অজানা মানুষের কাছে তার মৃত্যুসংবাদ পাঠাতো ওইসব অন্ধকার চোখের ভাষায়। 

বিকেল ফুরিয়ে গেলে আমরা নিঃশব্দে উঠে আসতাম। 

একদিন দাদু ওই ভাবে ধ্যানস্থ। নদীর উপর শীতের শেষবেলায় একটা অদ্ভুত আবছা আলো পড়েছে। ফসলের ক্ষেত নিস্তব্ধ নিঃসাড়। একটা কুয়াশার গোলা নদীজল থেকে উঠে আসছে। ঘাটে জনহীন নৌকা বাঁধা। জলে স্রোত নেই, শব্দ নেই। 
সেই বয়সের যা স্বভাব। আমি উঠে কিছুদুর একা হাঁটলাম। জলের একটা পচাটে গন্ধ শীতের বাতাসকে ভারী করে তুলছিল। এওকটা লাল বল গড়িয়ে গড়িয়ে পায়ে পায়ে নিয়ে আমি আস্তে আস্তে ছুটছি। কখনও দাঁড়াচ্ছি। দাদুর দিকে ফিরে দেখি তিনি তখনও একইরকম বসে আছেন। সাদা লাঠিটা দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে।

কোথাও একটা ঈশারা ছিল। একটা ইঙ্গিতময় ষড়যন্ত্র। নদীর ভাঙ্গা পাড় বেয়ে নেমে গিয়ে জল ছুঁয়ে শীতভাব টের পাই। বলটায় নোংরা লেগেছিল।সেটা জলে ধুয়ে উঠে আসছি, ঠিক সে সময় মুখ তুলে দেখি ঠিক মাথার উপরে হেলানো বাড়িটা ঝুলছে। ভিতের থেকে মাটি ক্ষয়ে গিয়ে একটা ঝুল বারান্দার মত ঝুঁকে আমাকে দেখছে। 

এত কাছ থেকে ওভাবে বাড়িটাকে দেখিনি কখনও। দাদুকে তখনও দেখা যাচ্ছিলো, বিকেলের হালকা অন্ধকার তখনও ঢেকে ফেলেনি তাঁকে। সাদা লাঠিটা তখনও ঝলকাচ্ছে। মুখ তুলে বাড়িটা আবার দেখি। বাড়িটার মাথার ওপরে ফ্যাকাসে চাঁদ। 

ভুতটাকে তখনই দেখতে পেলাম।
কথাটা কিছুটা ভুল হল। ভুতটাকে আসলে আমি দেখেছি কি? বোধহয় না। দেখা নয়, ভুতটাকে আমি তখনই টের পেলাম। 
নদীর দিক থেকে কখনও কখনও হাওয়া দেয়। দমকা হাওয়া। একবার শ্বাস ফেলে চুপ করে যায়। চাঁদের আলোটাকে তক্ষুনি ঢেকে দিল কুয়াশা এসে। ঘোমটা খুলে বাড়িটা তখন চারধার চেয়ে দেখে নিল একটু। 
পায়ে পায়ে আমি খাড়া পাড় বেয়ে উঠতে লাগলাম। কোনও কারন ছিলনা, কেবলই মনে হল একটু বাড়ীটা দেখে আসি তো।
কিন্তু দেখার কিছুই ছিল না। চারধারে ভাট আর শ্যাওড়ার জঙ্গল। বিছুটি পাতা ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে আছে। দুএকটা বড় নিম গাছ, এসব পার হয়ে অন্ধকার দরজার কাছে গেলে দেখা যায়, ভিতরে গভীর অন্ধকার, ধুলোর ধূসরতা, চামচিকে ডেকে উঠে। একটা বাদুর ডানা ভাসিয়ে শূন্যে ঝুলে পড়ে আচম্বিতে। দাঁড়িয়ে থাকি। অন্ধকার সয়ে আসে চোখে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ দেখতে পাই, বড় ঘরটার মেঝেতে একটা চিঠি পড়ে আছে। একটা চিঠি, আর কিছু নয়।

কার চিঠি? কে ফেলে গেছে?
একসঙ্গে অনেকগুলি শব্দ ভেসে উঠে মনের ভেতর। নিমগাছে ফিসফিসিয়ে হাওয়ারা কথা কয়। তক্ষক ডেকে ওঠে নিজস্ব ভাষায়। বাড়িটার ভেতরে অদৃশ্য জলের শব্দ। 
দাঁড়িয়ে থাকি। চিঠিটা পড়ে আছে ধুলোয়। সাদা চৌকো।
সন্ধ্যে হয়ে এল। আলো জল থেকে তুলে নেয় তাঁর শরীর। নদীর পরপারে ঘোরলাগা অন্ধকার। বেলা যায়।

কথা হয়, সে কেমন কথা কে জানে। কিন্তু তবু জানি, চারধারে কথা হয়। গাছে, জলের, বাতাসের, কীট-পতঙ্গের। প্রানপনে তারা বার্তা বিনিময় করে। সেরকমই একটা কথা চারধারে তৈরী হতে থাকে। 

হঠাৎ উত্তর পাই - তোমার, নাও।
প্রকান্ড ঘরের অন্ধকার মেঝেয় চিঠিখানা পড়ে আছে। তুলে নাও। ও চিঠি তোমার জন্যই পড়ে আছে। 
আমার চারধার অপেক্ষা করছে, দেখছে। চিঠিটা আমি তুলে নিই কিনা।
আমি নিলাম না।
দাদু দূর থেকে ডেকেছিল - কোথায় গেলি ভাই?
আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম, মাথা নেড়ে বললাম - না, নেবো না।
উত্তর পেলাম - যেখানেই থাকো, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকো, একদিন না একদিন এই চিঠি ঠিক তোমার ঠিকানা খুঁজে যাবে। চিঠি পাবে, চিঠি পাবে।
ভুতটাকে আমি দেখেছিলাম সেই প্রথম ও শেষবার। পুরোনো পোস্ট অফিসের বাড়িতে। ঠিক দেখা বলে না। অনুভব করা। 

ভয় করে না, তবে চোখে জল আসে কখনও কখনও। বয়স হল। কবে সেই শহর ছেড়ে চলে এসেছি। কতদুরে। কিন্তু ঠিক জানি, চিঠি পাব, চিঠি পাব।।

0 comments:

Post a Comment