সে এক রূপকথার গল্প

আমিও তো একদিন এরকমই কোনও এক বাড়ির ভিতরে বারবার ঢুকতে চেয়েছি, শুধু সময় পেরিয়ে গেছে বলেই তুলসীমঞ্চে প্রণাম পড়েনি, নতুন বউয়ের শাঁখে ফুটে ওঠে অন্য কোনও ঈশ্বরের নাম...সে এক রূপকথার গল্প, টাইম মেশিনে বসে আবার যদি কৈশোরকালে ফিরে যেতে পারতাম তাহলে আমি নিজের অতীত জীবনের বেশ কিছু ভুল-ভ্রান্তি শুধরে নিতাম। শচীন-সৌরভের খেলা আর সুমন-নচিকেতার গান শুনতে শুনতে বেশ বড় হচ্ছিলাম কিন্তু গোল বাঁধালো ওই মেট্রো চ্যানেল। তখন সবে শুরু হয়েছে, আর আমি “সুপারহিট মুকাবিলা” তে দেখছি মাধুরীর খোলা পিঠ, ভুবনমোহিনী হাসির হাতছানিতে তিনি আমাকে বলছেন, “হাম আপকে হ্যায় কৌন?” কেমন একটা ঘোর লেগে গেছিলো, সর্বক্ষণ রণে-বনে-জলে-জঙ্গলে শুধুই মাধুরী, মাধুরী আর মাধুরী। হুসেন সাহেবের তবু ফিদা হওয়া মানায়, কিন্তু আমার তখন ভালো করে অঙ্ক করার বয়স, মাধুরী জ্বরে কুপোকাত না হয়ে যদি আরো মন দিয়ে পড়াশোনাটা করতাম….

সেই সময়টাই ছিলো আমাদের বয়:সন্ধিকালে প্রেমে পড়ার সময়। বাতাসে তখন ছড়িয়ে থাকতো চোখাচোখি মুগ্ধতা। হৃদয়ে অবাধ্য ছেলে-মেয়েদের মনে হঠাৎ করে কালবৈশাখী আসত আর তখনই নচিকেতা গান ধরতেন, “হাজার কবিতা, বেকার সবই তা, তার কথা কেউ বলে না….” । আমরা নীলাঞ্জনাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াতাম পাড়ায় পাড়ায়, স্কুলে স্কুলে, অলিতে গলিতে, সাইকেলে রিক্সায়, টিউশনে, বইয়ের পাতায়, কবিতার খাতায়, সরস্বতী পূজোয় অঞ্জলী দেবার সময়। তখন আমাদের কাছে সেলফোন ছিলো না, ফেসবুক-টুইটার ছিলো না, হোয়াটস্‌ আপ ছিলো না কিন্তু চোখে চোখে কথা বলার সময় ছিলো, বইয়ের মধ্যে কবিতা গুঁজে দেবার ইচ্ছে ছিলো, লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করার সাহস ছিলো, দু টাকার ফুচকা খাওয়ার বিলাসিতা ছিলো।

এপ্রিল মাসে জটায়ুকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন সত্যজিৎ। আমার শৈশব ও কৈশোর যে মানুষটিকে ঘিরে ছিলো, গরমের ছুটির দুপুরবেলাগুলোতে মা ঘুমিয়ে পড়ার পরে যেই চরিত্র রা চুপি চুপি আমার সাথে গল্প করতে আসতো, যাদেরকে সাথে নিয়ে আমি ধীরে সুস্থে বড় হচ্ছিলাম, তাদের স্রষ্টা ঐ দীর্ঘদেহী মানুষটি, যিনি প্রায় প্রতিদিন আমার সাথে বিজনে কথা বলতেন, তিনি আমাকে কিচ্ছুটি প্রায় না জানিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আপনজন হারানোর সেই ব্যথা এখনো আমি বয়ে বেড়াচ্ছি, এখনো প্রতিটা দিন এই বিদেশ-বিঁভুয়ে আমি ওনাকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।

সত্যজিৎের শোক কাটতে না কাটতেই ঐ বছরেরই ডিসেম্বর মাসে সারা দেশজুড়ে ঘটে গেলো এক ভয়াবহ দূর্ঘটনা। কিশোর ছেলেটি তখন কিছুতেই বুঝতে পারে নি যে ‘জয় শ্রীরাম’ বলে চিৎকার করা কিছু গেরুয়াধারী মানুষ কেন ওরকম উন্মত্তভাবে একটা মসজিদ ভাঙতে শুরু করলো। টিভির পর্দায় দেখা সেই দৃশ্য ছেলেটির সরল মনের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিলো। আর তারপরে সারাদেশ জুড়ে যা যা ঘটেছিলো সেইসব কিছু ছেলেটিকে ভাবিয়ে তুলেছিলো আর সেই ভাবনা ছেলেটি এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। সত্যজিৎের মৃত্যু আর বাবরি মসজিদ ধ্বংস সেই কিশোরকে শিখিয়ে দিয়েছিলো যে জীবন সবসময় ফুরফুরে কাটবে না, আস্তে আস্তে যত সে বড় হবে, যত বুঝতে শিখবে, যত এই পৃথিবীটাকে জানতে থাকবে, নতুন নতুন ঘটনা ঘটতে দেখবে ততই এই চিন্তা-ভাবনার সময়টা আর মনে আঘাত লাগার পরিমানটা চক্রবৃদ্ধিসুদের হাড়ে বাড়তে থাকবে। তাই কৈশোর শেষ হতে থাকার সময়কালে অবধারিতভাবে প্রথম প্রেমে ব্যর্থ হবার আকস্মিকতাটা সে খুব তাড়াতাড়ি সামলে নিতে পেরেছিলো।

নব্বইয়ের দশক আমাকে যেমন অনেক কিছু দিয়েছিলো, শিখিয়েছিলো, ঠিক তেমনই আমার থেকে আস্তে আস্তে অনেক কিছু ছিনিয়ে নিয়েছিলো। আমার কৈশোর হারিয়ে গিয়েছে এই দশকে, আমার সরলতা আটকা পড়েছে এই দশকে, আমার বিস্ময়বোধ লুকিয়ে আছে এই দশকে। এখন এই ২০১৫ সালে, আমার নিজের বাড়ি, নিজের পাড়া, নিজের শহর, নিজের রাজ্য, নিজের দেশের থেকে অনেক অনেক দূরে বসে আমি স্বপ্ন দেখি যে একদিন আমি সেই টাইম মেশিনটা ঠিক খুঁজে পাবো আর তাতে করে পাড়ি জমাব সেই দিনগুলিতে। না, তখন যা যা ভুল করেছিলাম, এবার সেগুলো আর কিচ্ছু শুধরোবো না, সেগুলো ঠিক যেমন যেমনটি ছিলো সব তেমন তেমনটিই থাকবে, শুধু আমি আর সেই সময় থেকে ফিরে আসবো না। আগের মতই, প্রতিদিন বিকেলবেলা পাড়ার মাঠে ক্রিকেট খেলে, নর্দমা থেকে বলতোলা হাতে, এবারেও বাড়ি ফিরে চিৎকার করে বলবো, “মা, খুব খিদে পেয়েছে, তাড়াতাড়ি কিছু খেতে দাও না….।

0 comments:

Post a Comment