বিকালের রোদে ভোরের গন্ধ

বিকেল ফুরায়, কেউ তো এসো সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালো... আমিও তো কাঁদতে জানি বাসতে জানি ভালো!

ভালবাসার শীর্ষ বিন্দু জয় করার সাধ ছিল, তাই তো তোমাকে জড়িয়ে ধরা, তোমার ভালবাসা ছিল বটবৃক্ষ, আমারটা ছিল লতা। হেমন্তের এই নির্জন সাঁঝবেলায় কী যে হয়! খুব আনমনা লাগে। অতীতের কোনো এক শৈশব-কৈশোরের সাঁঝবেলার স্বপ্ন এসে আমায় আচ্ছন্ন করে। সেসব স্বপ্ন যার কিছুই জীবনে সত্যি হয়ে আসেনি। জীবনের অনেক অনেক দিনের পরিভ্রমণ শেষে সেই স্বপ্নের মাঝে কেমন বিষণ্ণতা ভর করেছে! হেমন্তের জোছনাভেজা রাত অচেনা জগতের সেই হাতছানি হয়ে কী এক মরীচিকার খেলা হয়ে দীর্ঘশ্বাসকে নিরাসক্ত করে তোলে।
নদীর অন্য প্রান্তে চাঁদের আলোয় মায়ার কুহেলিকা। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ অশ্রুতে ভরে উঠে। 

চাঁদটা এখনও রহস্যময়, যেন কানে কানে সে কিছু বলতে চায়। কিন্তু শেষরাতের জোছনায় লুকানো কুহেলিকার চেয়েও এক রহস্যময় দৃশ্য দেখি।  আহা, মৌরি, তুমি এলে এমন সময়, যখন আমার মনে হলো, এই পৃথিবীর সব জঞ্জাল পায়ে ঠেলে আমি একটা সুরের পাখি হয়ে যেতে চাই। যে ভালোবাসাকে নেওয়ার জন্য এই সমাজ প্রস্তুত নয়, তাকে মহার্ঘ্য ভাবার অপরাধে, আমার মৌরি; আমি তোমার কাছ থেকেও পালাতে চাই।
অনন্ত জীবনকে আস্বাদের জন্য নদীর পাড়ের ঝোপঝাড়টা মোক্ষম একটা জায়গা। চাঁদের আলোয় কত ছায়া সেখানে ঘোরাফেরা করে! আমার সাংকেতিক স্নায়ুতন্ত্র আমাকে বলে; ছায়াগুলো অনন্ত পরমায়ুপ্রাপ্ত।

বেহায়া বাতাস আমার পিছু ছাড়ে না। পাপ স্পর্শ করে না চোখের পাতা। এমন পৃথিবীতে ঘুম আসে না- মৃত্যু আসে না। দুঃখের দেয়াল ধাক্কা মারে-; পৃথিবীর বুকে ঘুট-ঘুটে অন্ধকার  নিয়ে অনিচ্ছায় শুয়ে থাকি কত কত বছর; জলপ্রণয়ী পাখিসাঁতারও ভালো লাগে না; লাঙলের ঘষা খাওয়া রেখাহীন হাত দেখে দেখে  মানুষ-জন্ম ভুলে  যাই।

এই জনপদে তুই ছাড়া আর কোনো নদী নেই ও কুমারী নদী দোয়েলা আমার, তুই কি জানিস, তোর চোখে ঘুমায় বৃষ্টিমাসী সকাল, ইমনরাগে সন্ধ্যা জাগে কণ্ঠে তোর। আর আমি দুলে উঠি অন্ধ জোছনায়। জান তো এই সমতলে জন্মে না দ্রাক্ষার ফুল কিংবা ন্যাংটা আঙুর। দীর্ঘ রাত্তির নেমে এলে তুই গেঁথে থাকিস পতঙ্গ শিকারী ফুলের লালায়। যখন রাত্তির নেমে আসে জংলাপাখির ঝরা পালকের লোমকূপে, রুক্ষ বনের খেয়ালী একটা বৃক্ষ হেঁটে যায় দূর চন্দ্রালোকে, মৃত নগরের ছবি বেনামী চিঠির খামে ভেসে আসে অদৃশ্য রাত্রির উড়ন্ত পাখায়। বাংলার অন্তঃপুরে ধুতরার চাষ। অন্ধ গলিতে তার ছেঁড়া দোতরার বর্ণহীন সুর এখানে ধূলায় গড়ায় সাধারণ মানুষের শব। অচল আধুলির দামে আমাদের অন্তঃপুরে বৈধব্য-সন্ধ্যা নামে, গুমোট হাওয়া, চিমনির ধোঁয়া-ভরা রাত নীরব পাঁচালি লেখে ইটের ভাটায়।

যখন রাত্তির নেমে আসে আমাদের নীলাচল পাহাড়ে, তারাবাতি কথা বলে ইলোরা জোছনায়, তুই দোয়েলা বরফ আগুনে পুড়ে মরো সাধনার ফেরে, জোড়াহীন দোয়েলা আমার, সাধনা জানো না বলে তলিয়ে যাচ্ছো ঘুমনদী-জলে। যকৃত ছিইড়া খায় নতুন ঈগল, পুড়তে চাই, পোড়ে না- তৃষ্ণা মেটে না যার আরব সাগরের সমস্ত জলে, সেই আমি সন্ধায় গোধূলিরে পাখির ডানায় বেঁধে তারাদের স্নান শেষে- দিয়াছি উড়াল... 

0 comments:

Post a Comment