আকাশের ছাদে বসে থাকা পাখির পালকের নাম কবিতা

 মেয়ে তোমার ঘোর কাটেনি, এলোমেলো চুল নিয়ে কাঁপছে তোমার ছায়াশরীর, শিহরনে। তুমি এসেছিলে, শুক্লপক্ষের চাঁদ ছিল কার্ণিশের উপর, তারপর যখন তোমার নিঃশ্বাস গাঢ় হতে লাগলো, আমি দেখলাম সব নক্ষত্রগুলো সাদা কাক হয়ে উড়ে যাচ্ছে একে একে। আর তোমার  নাভীতে জমা দুঃখগুলো তখন সুখ নিয়ে মিশে যায় সুদুর অন্তঃরীক্ষে। এদিকে আমার শয্যাপাশে এখনও ভোর হয় নি। কিন্তু মেয়ে, তোমার চোখে জমে আছে একরাশ নিঃশব্দ ধূসর ঘোর।
আমি তারাদের রোদন, ঠিক যেন অবিরাম নষ্ঠ হতে থাকা রাতগুলোর কুন্ডলী। একটি অখন্ড আকাশ আমার শৈশব লিখে রেখেছিল তার বায়বীয় আগুনের বুকে। এখনও আমি চলতে ফিরতে দেখি আমার শৈশব জন্ম নিচ্ছে আলোর কোটরে; বেড়ে উঠেছে বৃষ্টির আবরনে। আগুনে পুড়ে আয়নাতে ভেসে উঠেছে একজন ঘুমিয়ে পড়া যাদুকর, এই অবয়ব আমি কখনও ভুলিনি।

তোমার ভেতর শুকনো নদীর পাড় ঘেঁসে বেড়ে উঠেছে সবুজ ক্ষত, ট্রাক এসে বোঝাই করে নিয়ে যায় উপচে পড়া নিল, ঘামে ভেজা গামছার তলে মুখ মোছা ঘ্রাণের শক্তিই তোমাকে জাগিয়ে রাখে। ভোরের সরল আলো এখনও চোখের তারায়। বিশুদ্ধ বাতাস চুলের মেঘ থেকে ঝরিয়ে নেয় বৃষ্টি। মৃত্তিকার অবয়বে ফুটিয়ে তোলে আলতা ছাপ, যে রঙের মাঝে তোমার হাত বাড়ানো পাপড়ি থেকে ঝরে পড়ে খেয়াঘাট।
মেয়ে, তুমি বৃষ্টি হয়ে ঝরো, খোলা আকাশ আর এলোমেলো হাওয়া, অদ্ভুত কিছু ভালোলাগা আর কিছু টুকরো মেঘ নিয়ে এসো। আমার আকাশ আজ ভিন্নভাবে শ্বাস ফেলতে চাইছে। রোজ দু'টোর সময় আমি একটা দুচাকার দুপুরকে হারিয়ে ফেলতে দেখি তার মনখারাপের হাতল। আমি চমকে উঠি, ছুটে গিয়ে জাপটে ধরি তার নির্জনতার হাতল। আমার সেলফোন দুপুরে ঠিক সাইকেলের বেলের মতই বেজে ওঠে।  ঝকঝকে আকাশ থেকে অলক্ষ্যে ঝরে পড়তে থাকে অন্ধকারের অদৃশ্য কনাগুলো রোদের ফাঁক দিয়ে। রোজ দু'টোর সময় এক সন্ধ্যে আমার বিছানায় ঘুমোতে আসে। আমার কবিতাগুলো ছন্দহীন হয়ে পড়ে তারপর।

তারপর আমি ফিরে যাই তোর আকাশে, আমি দেখি আমার হারিয়ে যাওয়া ঘুড়ি সুতো কেটে উড়ে বেড়ায়। আমি ফেরাতে পারিনা, আমার মন খারাপ করে। ফাঁকা ঘরে জানালার ওপারে দূর নীলাকাশ থেকে ফিসফিসিয়ে ভেসে আসে প্রিয়তম হাওয়া। কান্নায় আমার গলা ভিজে যায়, আমি ফুঁপিয়ে উঠি। আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক নির্জন তালগাছ। তালগাছটার শিখরে দুলছে মৌসুমী সমুদ্রের হাওয়া। আমি দেখি এক পিঙ্গল অশ্বারোহী, দিগন্তের ওপারে ওই দেখো থেমে আছে সময়, ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে তেপান্তরের মাঠ, মাঝখানে থমকে আছে আমাদের প্রিয়তম মুহুর্তেরা। যবনিকা সরে যায়, দেখি দূর অন্ধকার স্রোতের ওপারে এক আমোঘ সত্য। ফিরে যাই দিগন্তের কিনারে, দেখি শিশির ভেজা মাঠে শুয়ে আছে কিছু সুখী মাথা।
অন্ধকার নেমে এলে আমি বেঁচে থাকি এক অন্য পৃথিবীতে, চিরকাল আকাশ বলেছি যাকে, চোখ তুলে দেখে নিই, আজ সে হয়ে আছে মহাকাশ।

এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সচেতন কবিতারা, বন্ধ আছে অন্ধ অভিষেক; কিশোর এসে প্রতিদিন হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে। তবুতো জ্যোৎস্নারাতে ঘরে ফিরতে হয় বুকে চেপে রেখে কিছু বেওয়ারিশ ভয়। এই অলীক পৃথিবীতে আমিও একজন অতিথি, আমিও একজন পথিক মাত্র। সকলের মাঝে আমি চিরদিন থাকবনা। ধূমল কুয়াশা কেটে গেছে। স্বর্ণময় শিশির কনাও নীরস। নদীর ঢেউয়ের সাথে দুপুর গড়িয়ে গেল নিঃশব্দে বহুদুর। শ্রাবনের ঝরো ঝরো বর্ষন বয়ে গেল, তবু মনে মরুভূমি।
পিছনে পড়ে ছিল কাতর নদী, কারো কংকালে লেখা থাকে মৃত নদীর নাম। যে যায় সে ফেরে না, তবু কোন কোন রাতে তৃষিত নদীরা ঘুম চোখে জল চায়। ভুল করে আমিও নদীর মত তৃষিত হই, হাত রাখি অর্পিত চাঁদে। ফোঁটা ফোঁটা জ্যোৎস্নারা কাঁদে নিরুপায়, তবুও কেউ মিষ্টি করে বলে না আকাশের ছাদে বসে থাকা পাখির পালকের নাম কবিতা।

তুমি তৈরী থেকো, এবার আমি এসে যাবো। যে কোন দিন, যে কোন জুঁই ঝরবার আগে। বুঝলে নীলা, পথে যদি সন্ধ্যা লাগে পাঁজর খুলে আগুন দেব অন্ধকারে। শান ধরানো তীক্ষ্ণ ফলার লাঙ্গল টেনে সবুজ মাটি চষে বীজ ছড়াবো আবার। সত্যি রক্তে এবার তোমার নীল মেশাবো। ইদেন বনের নিষিদ্ধ ফল ছিঁড়ে খাবো। র‍্যাবের চাকায় পিষ্ট হয়ে যে কোন খুন ঝরার আগেই মাটির কাছে, তোমার কাছে যে কোন দিন এসে যাবো।



     style="display:block"
     data-ad-client="ca-pub-2221917604703020"
     data-ad-slot="3843650204"
     data-ad-format="auto">

0 comments:

Post a Comment