কোজাগরী

সে যাওয়ার চলে গেছে।  কিন্তু কোথায় এই মেঘলা আকাশে দাগ রেখে গেছে।  তোকে বলেছে কেউ তোর চোখটা বড় গভীর, ওখানে একটা চাহিদা রাখা আছে।চিরকাল সরস্বতীই প্রিয় আমার, পছন্দ তনুজা, পছন্দ সুচিত্রা মিত্র। তবু কোজাগরী চাঁদ যখন সুখে ভেসে থাকে আমাদের পুরনো দীঘিটার বুকের উপর তখন তাকে হারিয়ে যাওয়া মেয়েটির মতো লাগে, সেও তো এমনই করে বুকের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতো ছাদে। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে প্রতারিত হওয়ার জন্য যখন প্রস্তুত করি সততাকে তখন মাথার মধ্যে কে জানে কেউ বলে- ‘কি দরকার? ঘরে বসে থাকো, কবিতা লেখো। বলে, মানব সভ্যতার ইতিহাস আসলে প্রতারণার ইতিহাস’।

ছোটবেলায় অঙ্কের প্রতি জোর দেওয়া হয় কেন তা ঠিক কখনই বুঝতে পারিনি, বড় হয়ে তো কোনও অঙ্কই মেলে না, মেলে না সম্পর্কের সমীকরণগুলো। প্রতিদিন সকালে উঠে বাড়ির কাজের মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত কিছু কথোপকথন হয়, নিঃশব্দে। এতদিনে জেনে গিয়েছি, বর তার প্রায় প্রতি রাতেই মদ্যপ হয়ে বাড়ি ফেরে। বিছানায় রাজি না হলে, নরম মুখে অনেক দাগ নিয়ে সকাল সকাল আসে কাজে। রাজি হতে হয়। অভ্যাসে, অনেক অভ্যাসে।
একদিন বলেছিল সে-‘তোমার ছবিগুলো খুব সুন্দর’, আরেকদিন- ‘বিয়ে করবে কবে? ‘মাঝে মাঝে যে আমারও ঘর করতে যে ইচ্ছে করে না এমন নয়। একটি শীতের বিকেলের আলো যখন ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ে সোনা-ঝুরি গাছেদের বুকে তখন ঘরে ফিরতে ভাল লাগে।

 ইচ্ছে করে ট্রাফিকের ওই কালো মানুষটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, সংসারকেও কি আপনি একই দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন? পৃথিবী, গ্রহ, নক্ষত্র। আপনি কি যাদু জানেন? আপনি কি ভগবান? তবে সামনের পুরনো বাড়ির যে ষাটোর্ধ মহিলার স্নান আমি হঠাৎ দেখে ফিরিয়ে নিলাম চোখ, তাকে পরজন্মে আমার প্রিয়তমা করে নিয়ে আসুন। বলুন এই স্বল্প খিদের শরীর যেন কেবল একটাই শব্দ পায়-বিশ্বাস। যাকে খুঁজেছি আমি, তার সমান্তরাল চলেছি, ফলে মিলন হয়নি। মিলন আমাদের ক্যানসার পাওয়া আচার-কাকুর বয়ামের আচারের মতোই? যখন একজন মানুষ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করেন নিজেকে অপরের কাছে, তখন তারা কি দুটো শরীর থাকেন, কখনই? তখন তাদের সম্পর্কের নাম কি হয়?

পরশু স্বপ্নে এক সোনালি চুলের অপরিচিতা বালিকা হঠাৎ এসে আমার ভেঙে ফেলা বসতবাড়ির মৃত জানলা দিয়ে ফেলে দিল ধুনুচি। তাতে ধুনো ছিল না, শুধুই কাঠকয়লা। তারপর দুজনেই নিঃশব্দ ছিলাম। একটা চিলেকোঠার ঘরে বসে থাকি, যার কেবল জানলা আছে, কোনও দরজা নেই। একটি জানলা আছে, যেখান থেকে প্রিয় মানুষদের দেখা যায়, শোনা যায় মনের কথা।
পুরনো মলাট-ছেঁড়া বই, ভাঙা ক্যাসেট, রেডিও,ধুলো-ভর্তি তোষক, এলোমেলো বিছানায় কিছু রুগ্ন কোলবালিশ নিয়ে বসে থাকি। স্বপ্ন দেখি শীতকাল এলে ওই মাঠের কোনাটায়, যেখানে খেলা হয় সেখানে আসবে কোন নতুন শিশু, তার গন্ধ পাব, তার নরম পায়ের প্রতিটি চলা লিখে ফেলব খাতায়, লিখে ফেলব, জরায়ু নয়, হৃদয়কে ভালবাসা বলে। লিখে ফেলব আমার লেপের পোশাকের ভেতর এমন এক আলতামিরা আছে, কেউ খুঁজতে আসেনি, কেউ আসেনি, প্রাচীন।

কবিদের সাথে ঘর করা যায়না কক্ষনো। শিল্পীদের সঙ্গে আরও নয়। তবু কোন এক লক্ষ্মীপুজোর দুপুরে যখন আদিম শেয়ালেরা খুঁজে ফেরে বিপন্নতার সুখ, মৃত্যু-বোধ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আমার আমি সেই বাদামি চামড়ার মেয়েটির দেখা পেতে চাই যে চার পাঁচটা স্টেশন ট্রেনের জানলার কাছে বসে হঠাৎ নেমে পড়ে এক নীরব স্টেশনে।যার ঝোলায় থাকে কোন অচেনা কবির দু-ফর্মার একটা কাঁচা কবিতার বই।আমি তার প্রেমিক হতে চেয়েছিলাম।

0 comments:

Post a Comment