ছোট ছোট দুঃখ কথা এবং তসলিমা নাসরিন

"নারীর বুকের ভেতর জমে আছে দুঃখের নুড়ি-পাথর। প্রতিদিন তারা বাড়ছে তো বাড়ছেই। তারা নারীর হৃদয়ে নড়ে-চড়ে উঠছে, কষ্ট-বেদনার সুর তুলছে প্রতিনিয়ত। জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা সেই দুঃখ-কথাগুলো কুড়িয়ে এনেছেন লেখিকা। সেই সঙ্গে নারীকে বলেছেন 'বুকে যদি বারুদ থাকে, জ্বলো।" 
                                                                                          -আনন্দবাজার পত্রিকা










তসলিমা নাসরিনের ছোট ছোট দুঃখ কথা বইটা পড়ার পর আমারও তাই মনে হয়েছে, হে নারী, বুকে যদি তোমার আগুন থাকে তো জ্বলো আর জ্বালিয়ে দাও চিরাচরিত সব নিয়ম কানুন যা তোমার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এতকাল যাবত।


বইটা নিয়ে এবং তার লেখিকাকে নিয়ে কিছু বলার আগে একটা মজার ঘটনা না বলে থাকতে পারছি না, তা হল বইটা কিনতে গিয়ে। চাকরীর সূত্রে আজকাল বইয়ের দোকানে বিশেষ করে বাঙলা বুক স্টলে যাওয়া হয় না। শেষ কবে বুকস্টলে পা রেখেছি তা ইতিহাস। বই-পত্র যা কিছু কেনাকাটা করি সবই অনলাইন।

বইটা প্রথম আমি Amazon.in এ ওর্ডার দিই যার পাব্লিশার্স ছিল আনন্দবাজার। আমি তখন থাকতাম কাশ্মীরে, এখনও এখানেই আছি। ঠিক কুড়ি দিনের মাথায় আমায় জানানো হল বইটা আর পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু বইটা আমার চাই, ওই হুজুগ বলে একটা ব্যাপার আছে না। মেইলের মাধ্যমে বইটার ডিলার কাম পাবলিশার্স আনন্দবাজারের প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করি। অনেক কাঠ-খড় পোড়ানোর পর নুতন বইয়ের দামে বেশ পুরোনো বইটা পেলাম। যাক ক্ষতি নেই তাতে, বইটা তো পেলাম। এই হল মজার ঘটনা এবং অনেক অনেক ধন্যবাদ তাঁকে, যিনি বইটা পেতে সাহায্য করেছেন (তাঁর নামটা বললাম না)।

তসলিমা নাসরিন-এই নামটার সাথে আমার পরিচয় ঘটে কিছু পত্র পত্রিকার মাধ্যমে, তখন সবে স্কুল ছেড়ে কলেজে পা। নিজের জীবনী লিখে তখন তিনি বেশ জনপ্রিয় এবং তার থেকেও বেশি সমালোচিত। তিনি একজন বাংলাদেশি এবং একজন ডাক্তার এবং অবশ্যই নিজের দেশে নিষিদ্ধ। তাঁর সম্বন্ধে এটুকুই আমি জানি।


ছোট ছোট দুঃখ কথা বইটা হাতে নিয়েছিলাম স্রেফ সময় কাটানোর জন্য। সত্যি বলতে কি, তিনটি ঘন্টা বেশ আনন্দেই কেটেছে আমার। রাতের ডিনার সারতাম ঠিক আটটায়, আজ সারলাম সাড়ে ন'টায়। মাথার মাঝে অজস্র চিন্তার জট। কেন যে তিনি এইসব উল্টো-পাল্টা লিখতে গেলেন, আমার পৃথিবীটা তো বেশ সুন্দর গোল ছিল, সেটাকে বন্ধুর বানানোর কি খুবই প্রয়োজন ছিল।


কেন বলতে গেলেন এক ভীরু লাজুক মেয়ের গল্প, যে মেয়ে সাত চড়েও রা কাড়ে নি। পারিবারিক কড়া শাসন এবং শোষনে ছোট্ট একটি গন্ডির মধ্যে বড় হয়ে উঠেছে, যে মেয়ের সাধ আহ্লাদ প্রতিদিনই ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে আবর্জনার স্তূপে, যে মেয়েটির ছোট্ট শরীরের দিকে লোমশ লোমশ লোভী হাত এগিয়ে এসেছে বারবার-তার কথা কি খুবই জরুরী ছিল বলার।

যে মেয়েটি কিশোরী বয়সে ছোট ছোট কিছু স্বপ্ন লালন করতে শুরু করেছে, যে মেয়েটি হঠাৎ একদিন প্রেমে পড়েছে, যৌবনের শুরুতে বিয়ের মত একটি কান্ড ঘটিয়ে আর দশটি সাধারন মেয়ের মত জীবন যাপন করতে চেয়েছে-এই গল্প শোনার জন্য মানুষ তৈরী নয়।
যে মেয়েটির সাথে প্রতারনা করেছে তাঁর স্বামী, যে মেয়েটির বিশ্বাসের দালানকোঠা ভেঙ্গে পড়েছে তাসের ঘরের মত, যে মেয়েটি শোকে, সন্তাপে বেদনায়, বিষাদে কুঁকড়ে থেকেছে, চরম লজ্জা আর লাঞ্ছনা যাকে আত্মহত্যা করার মত একটি ভয়ংকর পথে নিয়ে যেতে চেয়েছে, সেই শোকার্ত মেয়েটির গল্প বলা একদমই ঠিক হয় নি আপনার।

এইতো আমাকেই দেখুন না, কই আমি তো কিছুই বলিনি। এই সব গল্পেরা কি শুধু আপনার দেশেই ঘটে, আমার দেশে ঘটেনা? আমার দেশেও ঘটে, কখনও চোখের সামনে, কখনও অগোচরে। কই, আমি তো কিছুই বলি নি।


আমার চশমা পড়া কিশোরী মা'কে কতবার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চশমা পরিষ্কার করতে দেখেছি, সে কি কেবলই চশমা সাফের অজুহাত। চশমা পরিষ্কারের সাথে সাথে তিনি তাঁর স্বপ্ন গুলোকেও মুছে ফেলেছেন, তারপর ফিরে গেছেন পরিচিত রান্নাঘরে। কই, আমি তো কিছুই বলিনি।



তসলিমা নাসরিন’ নামটির পাশে  সাংবাদিকেরা ‘বিতর্কিত লেখিকা’ শব্দটি লিখে খুব আনন্দ পায়। তসলিমা নাসরিনের একটি বইও যে পড়ে নি, তাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তসলিমা নাসরিন’কে সে চিনে কিনা, সে হয়তো বলবে, ‘ওই যে ইসলাম বিদ্বেষী বিতর্কিত লেখিকার কথা বলছেন?’ তসলিমা নাসরিনের লেখা পড়ে আমার কখনো মনে হয় তিনি বিতর্কিত কিছু লিখেছেন। আমার কাছে তাঁর আদর্শ, চিন্তা -চেতনা একেবারেই স্পষ্ট ও সঠিক মনে হয়েছে। অবশ্য যারা নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাসী নন, যারা নারীকে কেবল মা-বোন-বধূ রূপেই দেখতে পছন্দ করেন, তাদের কাছে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো বেশ বিতর্কিতই মনে হবে।


গল্পে প্রেমিক প্রেমিকার প্রেম থাকবে, প্রেমিকাকে হিরো প্রেমিক সব বিপদ থেকে রক্ষা করছে, এধরণের কাহিনীর লেখকরাই সমাজে হাত তালি পাবেন। কিন্তু সমাজের বাস্তব চিত্র যেই লেখকের লেখায় উঠে আসবে, তিনি হবেন নিষিদ্ধ। কারণ আমাদের নিজেদের বাস্তব রূপটা যে এতটাই কলুসিত, সেটা আমরা নিজেরাই মেনে নিতে পারি না।


 ‘নিজেকে এই সমাজের চোখে নষ্ট বলতে আমি ভালোবাসি। কারণ এ-কথা সত্য যে, যদি কোনও নারী নিজের দুঃখ-দুর্দশা মোচন করতে চায়, যদি কোনও নারী কোনও ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের নোংরা নিয়মের বিপক্ষে রুখে দাঁড়ায়, তাঁকে অবদমনের সকল পদ্ধতির প্রতিবাদ করে, যদি কোনও নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সজাগ হয়, তবে তাকে নষ্ট বলে সমাজের ভদ্রলোকেরা। নারীর শুদ্ধ হবার প্রথম শর্ত নষ্ট হওয়া। নষ্ট না হলে এই সমাজের নাগপাশ থেকে কোনও নারীর মুক্তি নেই। সেই নারী সত্যিকার সুস্থ ও শুদ্ধ মানুষ, লোকে যাকে নষ্ট বলে’। ঠিকই তো, প্রতিবাদী কোন নারীকে দমিয়ে দিতে প্রথম যেই শব্দগুলো তার দিকে ছুড়ে দেয়া সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ‘নষ্ট মেয়ে’।
                               -নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য, তসলিমা নাসরিন

বইটির নামের মধ্যেই রয়েছে এক প্রচণ্ড সাহসিকতা। তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনীর ৭টি খণ্ড পড়লেই বোঝা যায়, লেখক হিসেবে তিনি কতটা সৎ। আত্মজীবনীতে নিজের ভুল ত্রুটি গুলো লিখতে কুণ্ঠাবোধ করেন নি। পরবর্তীতে সেসব ভুলগুলো সাহসের সাথে মোকাবেলা করার কথাও তিনি লিখেছেন। ‘উতল হাওয়া’ বইটিতে রুদ্রের সাথে প্রেমের ঘটনা পড়ে আমরা সবাই বলেছি, ‘আহা কী প্রেম’। রুদ্রের নষ্টামিগুলো পড়ে অনেকে বলেছে,  ছি কী অশ্লীল!’ অথচ কারও চোখে পরে নি, বাসর ঘরে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আসা মেয়েটির স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্ট। বইটি আমার কাছে মনে হয়েছে তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনীগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ একটি বই। এই বইয়ে অন্য বইগুলোর মত নারীর জীবনের কান্না-দুঃখ-কষ্টগুলোর চেয়েও বেশি ফুটে উঠেছে বাধা উপড়ে সামনে এগিয়ে চলার সাহসিকতা। 


যেসব কথা বলার নয়, সেসব কথাই তিনি জোর গলায় বলেছেন। যেই শব্দ উচ্চারণ করা মানা ছিল, সেই শব্দই তিনি বারবার উচ্চারণ করেছেন।


বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের তসলিমা বিষয়ে এমন নীরবতা আমাকে অবাক ও ক্ষুব্ধ করেছে।

0 comments:

Post a Comment