এখন আর কিশোর-কিশোরী নেই, তারা টিন-এজার

কৈশোর কখনওই অপাপবিদ্ধ ছিল না। যে দিন দশম শ্রেণিতে ছেলেটি চটি বই নিয়ে গেল, ক্লাস শুরু হওয়ার আগে ভিড় উপচে পড়েছে সেই ধেবড়ে যাওয়া কালো ছবির উপর। গোকুলের দোকানে কাউকে কাউকে টিফিন পিরিয়ডে বিড়ি কিনতে দেখা যায়নি এমনও নয়। ইতিহাস পিরিয়ডে এক জন খাতায় পাতার পর পাতা ভরে লিখেছিল কোচিং ক্লাসের এক সুন্দরী কিশোরীর নাম। ফার্স্ট বেঞ্চে সে যে যখন তখন মাস্টারমশায়ের হাতে ধরা পড়ে যেতে পারে, সেই খেয়ালটুকুও ছিল না। হয়েছিলও তাই। শুধু মাস্টারমশায়ই বুঝতে পারেননি সেই নামাবলী কীর্তন এবং তার লেখককে নিয়ে করণীয় কী।




অতএব সে দিন অল্পের উপর দিয়েই ফাঁড়া কাটে। যদিও ক্লাস কেটে বন্দনায় অনিল কাপুর-শ্রীদেবী দেখতে গেলে ধরা পড়ে যাওয়ার চান্স ছিল অঢেল। যারা ধরে ফেলতেন, তারা তখনকার মতো মৌনব্রত অবলম্বন করে ঘরে ফিরে “ওদের বাড়ির ছেলেটা গোল্লায় গেল” বলে মুচকি হাসার লোক ছিলেন না। রীতিমতো তিরস্কার বাঁধা ছিল কপালে। এবং সেই শুভানুধ্যায়ী তিরস্কার করেছেন কেন, এই প্রশ্নের জবাব চেয়ে ছেলেটির বাবা-মা-পরিবারবর্গ বাড়িতে হানা দিত না।

 আমরা সকলেই জানতাম, আমাদের কেউ-কেউ হয়তো মেধার দিক থেকে এক্টু বেশি সরেস, কেউ বা মেধাবী হলেও ফাঁকিবাজ, আবার কারও পড়ার বই দেখলেই মনে হয় এভারেস্ট পর্বতের তলে বিনা অক্সিজেনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ফারাকটি মেনে নেওয়াই ছিল দস্তুর। প্রতি পরীক্ষায় একশো শতাংশের কাছে নম্বর না পেলে, তার জীবনযৌবন সব যে হয়ে গেল কালো, এমনটি ভেবে নেওয়ার কোনও কারণই ছিল না। চাকরিবাকরির বাজার তখন বেশ খারাপই, তবুও কোথাও একটা আশ্বাস ছিল, কিছু না কিছু হয়ে যাবে। সবাই মিলেজুলে ঝগড়া-হাসিতে ভালোবাসা-বাসিতে মধ্যবিত্তের দিন গুজরান, যেখানে সুখ হয়তো বিন্দুসম, কিন্তু স্বস্তি অগাধ।




আমরা কিশোর ছিলাম, টিন-এজার হতে পারিনি। কৈশোর যে কোন মুহূর্তে এসে টিন-এজ হয়ে গেল, জানতেও পারিনি। কাগজে যখন দেখি, ক্লাস এইটে উঠলেই বাধ্যতামূলক মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার নিদান দিচ্ছেন জ্ঞানী মানুষজন, তখন নিজেকেই কেমন অসম্পূর্ণ লাগে। মনে হয়, কোথাও হয়তো কোনও ভুল থেকে গেল। কোথাও হয়তো মস্ত কোনও ভুল হয়ে যাচ্ছে। সমস্যা হল, সেই ভুলটা কী, জানি না। রিপ ভ্যান উইঙ্কল-এর মতো কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি।

0 comments:

Post a Comment