এক মরনজয়ী জীবন প্রেমিকের কাহিনী- The Last Lecture

র‍্যান্ডি পশের কথা আমি আগে কোথাও পড়িইনি।
পরে জেনেছি তাঁকে নিয়ে কেবল আমেরিকা নয়, দুনিয়া জুড়ে বিস্তর হইচই হয়েছে,কিন্তু সেসব তখন জানতাম না।
ছুটির দিনে উদ্দেশ্যহীন ভাবে এ-বই সে-বই উল্টাতে উল্টাতে ছোট্ট বইটা চোখে পড়েছিলো।
গত কয়েক বছরে কলকাতার আর কিছু না হোক, একটা উন্নতি হয়েছে।
দু'চারটে বইয়ের দোকান হয়েছে।
যেখানে নিজের ইচ্ছে মত ঘুরে ঘুরে দেখা যায়, যতক্ষন খুশি পড়ে নেওয়া যায়। কলেজস্ট্রিটে এই সুবিধে নেই, ওপাড়ায় বইয়ের দোকানে গিয়ে দাঁড়ালেই সটান প্রশ্ন ছুটে আসে "কি বই চাই?

আরে, কি বই চাই্‌ সে কথা আগে থেকে জানলে আর বই খোঁজার সুখ কোথায়?

তো, বছরখানেক আগে, হঠাৎই চোখে পড়েছিল বইটা, 'লাস্ট লেকচার', লেখক র‍্যান্ডি পশ, কার্ণেগি মেলান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
অভ্যাসবশত পাতা উলটে ভূমিকায় এলাম, এবং মনে হল, পা দুটো মাটিতে আটকে গেছে।

ভূমিকার প্রথম কয়েকটা লাইনঃ
"I have an engineering problem.
While for the most part I'm in terrific physical shape, I have ten tumors in my liver and
I have only few months left to live.
I am a father of three young children, and married to the women of my dreams."

এই পর্যন্ত পড়ে কিছুক্ষন আর এগোতেই পারলাম না, মাথার মধ্যে কে যেন খুব জোরে জোরে বলছিল, I am a father of three young children, I am a father of three young children

র‍্যান্ডি নিশ্চয়ই জানতেন, তাঁর কথাগুলো পড়ে পাঠকের ওইরকম একটা ধাক্কা লাগবে, তাই এরপরেই তিনি লিখলেন;
"While I could easily feel sorry for myself, that wouldn't do them, or me any good."

   কথাটা বলা সহজ, কিন্তু র‍্যযান্ডি পশ জীবনের শেষ কয়েক মাস এই কথাটাকে যাপন করে দেখিয়েছেন।
খুব বেশিদিন সময় পাননি তিনি, ২০০৬ গ্রীষ্মে পেটে ব্যাথা, প্রথমে জন্ডিস ধরা পড়ল। তারপর আরও কিছু পরীক্ষা, জানা গেল ক্যান্সার।
র‍্যান্ডি জেনে গেলেন প্যাংক্রিয়াটিক ক্যান্সারে অর্ধেক রোগী অসুখ ধরা পড়ার ছ'মাসের মধ্যে মারা যান।

১৫অগাস্ট, ২০০৭, ডাক্তারের কাছে গেছেন রিপোর্ট নিতে, সাথে জে-তাঁর স্ত্রী এবং স্বপ্নের নারী। ডাক্তারের সহকারি কম্পিউটার টার্মিনালে টেস্ট রিপোর্ট দেখে তার সঙ্গে কথা বলে উঠে গেলেন, র‍্যান্ডি উঠে গিয়ে টার্মিনালে বসলেন এবং চটপট পরীক্ষার রেজাল্ট পড়ে ফেললেন।
পড়ে জে'কে বললেন, "Its over. My goose is cooked."
ডাক্তার এলেন , রিপোর্ট দেখলেন। র‍্যান্ডি তাকে প্রশ্ন করলেন,'আমার মৃত্যুর কতদিন বাকি আছে?'
ডাক্তার বললেন, 'সম্ভবত, তিন থেকে ছয় মাস, আপনি ভালো থাকবেন।"

' দ্য লাস্ট লেকচার' যখন হাতে পেয়েছিলাম, ততদিনে ছ'মাস পেরিয়ে গেছে।

মৃত্যু নিশ্চিত এবং আসন্ন জানার পর বেশিরভাগ মানুষই ভেঙ্গে পড়ে, আবার কেউ কেউ হয়তো স্বরচিত বিভ্রমের মধ্যে বাস করে নিয়তিকে ভুলে থাকতে চায়, নিজেকে বোঝায়।
র‍্যান্ডি পশ এক মুহুর্তের জন্যও এমন কোনো আত্মপ্রবঞ্চনা করেননি, অসুখের খবর জানার পর ওসুখ স্বম্বন্ধে, তার পরিনতি সম্বন্ধে তন্ন তন্ন করে জেনেছেন। মৃত্যু যে কতটা আসন্ন, সে বিষয়ে তার কিছুমাত্র সংশয় ছিলনা।এই বোধ নিয়েই বাকি দিনগুলি কী করে জীবনটাকে
যথাসম্ভব ভালোভাবে, অর্থপূর্ন ভাবে বাঁচা যায়, বাড়ির মানুষ গুলোকে নিয়ে কাটানো যায়। তার চেষ্টা করেছেন।
আর তার মাঝেই বিশ্ববিদ্যালয়ে লাস্ট লেকচার দিয়েছেন।

১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭।
কার্ণেগি মিলান এর কানায় কানায় ভর্তি হল- লাস্ট লেকচার দিলেন র‍্যান্ডি পশ। শিরোনাম, "Really achieving your childhood dreams"
এই বইটি মুলত সেই বক্তিতারই গ্রন্থরূপ।
নিজের জীবনের কথাই বলেছিলেন র‍্যান্ডি তার বক্তৃতায়, কিন্তু ঠিক জীবন কাহিনি হিসেবে নয়, আবার আমি কি করে আমার ছোটবেলার স্বপ্ন পূরন করলাম টাইপের উপদেশমালাও নয়।

ছোট ছোট ঘটনা, ছোট ছোট কিছু মন্তব্য, ছোট ছোট আঁচড়ে কয়েকজন কাছের মানুষের ছবি, এ সব নিয়েই ' দ্য লাস্ট লেকচার।'

এই লেখার সামারি করতে গেলে বইটাকে নষ্ট করে দেওয়া হবে,দু'একজন মানুষ আর দু'একটা ঘটনার কথা বলি বরং।

শেশ গল্পটা র‍্যান্ডি পশ শুনেছিলেন, তাকে শুনিয়েছিল তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মি রোবি কসাক।
র‍্যান্ডির ক্যান্সার ধরা পড়ার খবর ততদিনে সবাই শুনেছে।

রোবি লিখেছেন, তিনি সেদিন সন্ধ্যেবেলায় কাজসেরে বাড়ি ফিরছেন, সন্ধ্যেটা দারুন।
বাতাসে প্রথম বসন্ত, তার গাড়ির সামনে একটি কনভার্টিবল। তার ছাদটি খোলা, সব জানালার কাঁচ নামানো। চালকের একটা হাত দরজার বাইরে অলসভাবে রাখা, আঙ্গুলগুলো আপনমনে গাড়ির টোকা দিয়ে চলেছে, বোঝা যাচ্ছে গাড়িতে গান বাজছে। গানের তালে তালে তার মাথাটাও অল্প অল্প দুলছে, গানের তালে তালে, হাওয়ায় উড়ছে তার চুল।
একটা আশ্চর্য আনন্দ আছে দৃশ্যটায়।
রোবি লেন পালটে একটু কাছে নিয়ে গেলেন তার গাড়িটাকে, এবার পাশ থেকে চালকের মুখ দেখা যাচ্ছে, সেই মুখে একটা হাল্কা হাসি, একটা মানুষ যখন নিজের মনের মধ্যে ডুব দিয়ে খুশি থাকে, তখন তার মুখে এই হাসি ভেসে উঠে। রোবি নিজ মনেই বললেন, ' আজকের দিনটাকে, এই মুহুর্তটাকে মনপ্রান দিয়ে উপভোগ করা বলতে কি বোঝায়, এই মানুষটি তারই প্রতিক'।

একসময় কনভার্টিবলটি মোড় ঘুরল এবং রোবি দেখতে পেলেন, সেটির স্টিয়ারিং এ র‍্যান্ডি পশ। তিনি নিজের মনে বলে উঠলেন : ওহ মাই গড!

গোটা বইটা এবং তার নানা অংশ আলাদা করে পড়লেও ওই একটা কথা বলতে ইচ্ছে করে :ওহ মাই গড।

তার শৈশবের স্বপ্ন কি, সেগুলি সফল করার জন্য তিনি কি করেছিলেন, সে সব কাহিনিও পড়তে বেশ লাগে।
'দ্য লাস্ট লেকচার' আমার কাছে এক অন্য জীবন বোধ, মৃত্যুবোধ থেকে যাকে আলাদা করা যায় না।।

0 comments:

Post a Comment