হায় জীবন, তুমি কেন বারবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাও?

সীমানারও একটা সীমানা থকে। তাই জীবনে বারবার সীমানা পেরিয়েও দেখা যায় আমরা নির্দিষ্ট একটা সীমানায় আটকে পড়ে আছি। হায় জীবন, তুমি কেন বারবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাও?




সত্যিই জীবন,তুমি কেন বারাবার তাকিয়ে আছো দেওয়াল ঘড়িটার দিকে...এই তো একটু আগেই একরাশ ঠান্ডা হাওয়া ছুঁয়ে গেলো আমায়; নাহ, সেটা কোনো শীতের কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ছিলোনা, সেই হাওয়ার বর্ননা দেওয়ার মত শব্দমালা আমাদের কীবোর্ডে পাওয়া যায়না বোধহয়, হয়তো এই ক্ষনস্থায়ী জীবনে সেই হাওয়া একবারই আমাদের ছুঁয়ে যায়, তার পর কোনো খোজ পাওয়া যায়না তার; হারিয়ে যায় তার ঠিকানা। ভুল পথে বারবার ফিরে যাই, ফিরে গিয়ে ফের হারাই।

কাল অনেক রাত অবধি বসে ছিলাম চুপ করে। এখানে আজকাল মাঝেই মাঝেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি এসে চারিদিক মেঘলা করে ধুয়ে নিচ্ছে। কাল রাতে তাই আর চাঁদের ফেনায় ভাসেনি আমার ঘর। চুপচাপ বসে ছিলাম, যদি সে ভুল করে ধোঁয়াটে জানলাটা খুলে একবার আসে। বসে বসে আঙুলে কর গুনি, রেখা চিনি, ছোঁয়ায় ছোঁয়া চিনি, আর বাকি যা কিছু আনাগোনা করে মনে মনে।

বড়রা বলেন সময়ের প্রতীক্ষা করতে হয়, সময়ের আগে কিচ্ছুটি হবার যো নেই। আমি কিন্তু তাদেরকে বলিনি, এমনি করে করে আমি কবে জানি নিজেকে পেতে দিয়েছি সময়ের সে চাদরের নিচে। এ যেন ঠিক পেতে দেওয়া নয়, তলিয়ে যাওয়া সময়ের নদীটাতে। অপেক্ষা অপেক্ষা আর শুধুই অপেক্ষা। কিসের? বললে হয়ত তোকেই বলা যেত, কিন্তু আজ থাক। অন্য কোন এক আদুরে আলোতে মন পেতে দেব খন।

সব যদি বলা যেত, সব কিছু উজাড় করে হয়ত তোকেই বলে দিতাম। সেইখানটাতে কবেই যে গন্ডি পরে গেছে, জানিস কি তুই? কিছুই তো জানিস না। খালি খালি আমাকে ভুল বুঝে অভিমান করিস। যদি বুঝতিস সবটুকুন, কত যে সহজ হত। তোকেও কাল আলতো আদরে ভাসিয়ে দিয়েছি সময়ের সে নদীটার ঢেউয়ের রঙ ঘেঁষে। ভেবেছি সকাল হতেই আলগোছে ফিরে পাব সূর্য্যের রঙ। অথচ আজ সকাল থেকেই দেখি আকাশের রঙে ছেপেছে মুখ-মন-চোখ। কেন হল এমনটা?

আজকাল আর ঘুম আসেনা, স্বপ্ন গুলোও আসেনা আর তাই। সেই সব নদী-পাহাড়ের স্বপ্নদের বড্ড মনে পড়ে, আর সে তোর-আমার স্বপ্নের দেবদারু গাছটাকে। এতদিনে বোধহয় সে গাছটা আরো ছুঁয়েছে আকাশ, হাওয়া এসে একটানা সুর গাঁথছে তার পাতায় পাতায়। আর দেখ, আমি কিছুতেই যেতে পারছিনে সে গাছের নীচে, তোর কাছে।

একটা একটা করে শব্দের পুনরাবৃত্তি হয়ে চলে, আমার হাঁপ ধরে। অবুঝ হয়ে বারবার রেগে ফেলি, কখনও বা ক্ষোভে কেঁদে ফেলি। কখন নিজের সঙ্গে নিজেই যুদ্ধ করতে করতে থেমে যাই। তারপর কোন কোন দিন আনমনে কথা হয় তোর সাথে। আর আরো একবার ভুল ভাবি সব কিছু, যা কিছু হবার নয় সেইটাই ভেবে বসি।




সময়ের সঙ্গে রোজ রোজ নয়, প্রতিটা ক্ষনে আমার এ কেমন তর্ক-দ্বন্দ্ব। ক্লান্ত আমি, বড় বেশি ক্লান্তি এসে আঁকড়ে ধরেছে, আজকাল ক্লান্তি আমায় ঘিরে থাকে সমস্তটা ক্ষন। সময়ের পর সময় কেটে যায়, ভাবি আমি, আর কতটা সময় পার হলে তবে আসবে সে সময়, যে সময়ের কথা সক্কলে বলে। একে একে সকলে উঠে যায় নৌকোয়। আমি থাকি এইদিকেই বসে। প্রতিটা বার আসে, আর মাঝি দেখায় অন্য কাউকে, আমার থেকে তার যাওয়া জরুরি ওপারে। আর তুই ভাবিস আমি আসতে চাইনা তোর মনে।

সব কিছু ঘোলাটে হয়ে আসে, নদীটায় বণ্যা আসে যখন। তখন সে ঘোলা রঙে ডুবে যেতে মন টানে। সত্যি যদি ডুবে যাই, তুই হয়ত জানবিও না। তোর চোখ, শুধু তোর স্বর মনে ভেবে পিছু হাঁটি। এই যেমন এখন দাঁড়িয়ে আছি জলে, বুকের নীচে ঢেউ, ছলাৎ ছলাৎ। শব্দটা বড় মিঠে, ঘুম পাড়ানি গানের মতন। কতকাল যে ঘুমোই নি জানিস? আজ সত্যি সত্যি লোভ লাগছে ঘুমের।

এ কেমন অভিশাপ বলতে পারিস? ঠিক কোন দোষের শাস্তিটুকুন এমন করে নদী হয়ে গেঁথে গেল? বোধ-বুদ্ধি-বিবেচনা-শিক্ষা-পরিচয়-পাপ-পুণ্য, আজ সব সব কিছু মিথ্যে লাগে, ফেলে আসা পথটাকে গুঁড়িয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। সব কিছু ভুল, সব, সব, সব। ওই সব বই-পুঁথি-শাস্ত্র-নীতি সময় কাটানোর উপায় মাত্র কিছু বিলাসী মনের। একবার ওই ওরা এসে দাঁড়াক আমি হয়ে তবে বুঝি নীতি কথার বিলাস-ব্যসন। ক্লান্ত, ক্লান্ত, ক্লান্ত লাগে বড় বেশি।

চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমশ, ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে যায়। পোড়া গন্ধ পাই যখন তখন। কি পোড়ে বলতে পারিস তুই? পৃথিবী কক্ষপথে ঘোরে, আবর্তে জড়িয়ে যায় সূর্য্য , আরো আরো গ্রহ উপগ্রহ। কত সহস্র জন্ম জন্ম ধরে একই ভাবে ঘুরে চলি আমি, এক এই চেনা অপেক্ষা, আজ এই এত জন্ম পরে ক্লান্তি এসে হাতে হাত রাখে।

আবারো একটা রাত এসে কড়া নাড়ে, ক্লান্ত পায়ে উঠে দরজা খুলে দি আমি। আজ বরং ঘুম আসুক ঘরে, ঘুম আসুক নিটোল চাঁদের মতন।




অপেক্ষার ভোর কমলারসা, তোমার ঠোঁটের স্বাদে।

অপেক্ষা সকালে সবুজ, তোমার চোখের ছায়ায়।

কবি, তুমি অপেক্ষা করনি কখনও, না? এক-দুই-তিন-সাত-পনেরো-কুড়ি দিন-মাস-বছর? নাহ কবি। এতো শুধু তোমার সময় পেন্ডুলাম। অপেক্ষা তোমার এখনও বাকি।

অপেক্ষার দুপুর গেরুয়াছোপা, তোমার রুক্ষ চুলের জটে।

অপেক্ষার ধূপ রঙ ধোঁয়ার তোমার নিঃশ্বাসে ডুব চান।

জীবনের পর জীবন জন্ম নেবে, জন্মের পর জন্ম মৃত্যু হবে, পৃথিবীর আবর্তে লাগবে জলছাপ, তবেইতো অপেক্ষা।

অপেক্ষার রাত মাতাল, টলে যাবে সব নিষেধ।

অপেক্ষার নেশা নীলরঙ বিষে চুঁয়ে যাবে বুক।

এক বুক হাহাকার মরুভূমি হবে, একরাশ অভিমান পাহাড় গড়বে, দুই চোখ জমা জলে মাটি আট সাগর পাবে, তবে বুঝি অপেক্ষা, কবি।

মাঝে মাঝে সব কিছু দুলে যায়, নড়ে যায়, ভেসে যায়। মিশে যায় এক শরীর মানুষ অনন্ত অপেক্ষার বুকে। দিকভ্রষ্ট হলে নাকি কবি, বসন্ত-চোখের অনাবিল ইশারায়?

আজ আমি ঘর ছাড়বো কবি। সিদ্ধার্থ দাঁড়িয়ে চৌকাঠে। বাঁ পায়ের ঘর-বাঁধা টান, খুলে গেছে তার সন্ন্যাস আবিরে।

0 comments:

Post a Comment