চিঠিপত্র

দুদণ্ড ভাবনার কোলাহলে, ঘুমের তন্দ্রায় না বলা কতই না কথা? ফিকে জোছনা হয়ে জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পরে; বাঁধন হারা অদম্য চাওয়ার মত শুধু না বলা কথায় জোছনার ছায়া প্রলেপ যেন।  ডাক দিয়ে যায় জোছনা মিছিল, দূর্বা ডগায় নগ্ন পা তোমার; ছুঁয়ে যায় না কত কাল?  কত কাল দেখি না? একুশের অম্লান ভাসানে সেই মুখ এখনও খুঁজে ফেরি তোমায় নতুন বইয়ে কস্তুরী সুবাসে।

বৃষ্টি তাহলে হলো অবশেষে ? অনেকদিন থেকে তুমি আবদার করছিলে, ‘বৃষ্টি পাঠাও’, ‘বৃষ্টি পাঠাও’ । আমিই ছাই গরীব মানুষ, বৃষ্টি পাই কোথায় ! তাও ছদ্ম-ধনী সেজে বলতাম … এই তো পাঠাচ্ছি, হাত রাখো জানলায় । তুমি বৃষ্টি তো পেতেই না, বরং আমার এই মিথ্যে-ফানুস চুপসে যেত রোজ । তুমি ভারি মজা পেতে ।

তবে বৃষ্টি আজ এলো, বিকেলবেলায় । জানলা দিয়ে দেখছিলাম, আমলকী গাছটায় বৃষ্টির আসন্ন সঙ্কেত। অল্প অল্প ফোঁটায় ধীরে ধীরে তার কয়েকটা পাতা গাঢ় সবুজ হয়ে উঠছিল । ততক্ষণে আমাদের বন্ধ জানলার কাঁচে আলপনার মত কুচো কুচো জলের রেখা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে । ইচ্ছে হলো, আমলকী গাছ শুদ্ধু, এই জানলা, ঐ কুচো কুচো জলের বিন্দু সহ গোটা দৃশ্যটা তোমার কাছে পাঠাই । ভাবতেই মনটা কেমন করে উঠল । কারণ, এ বৃষ্টি তো বিকেলবেলার । আর আমাদের দুজনেরই, বিকেলবেলার বৃষ্টিতে মনকেমন হয় । বৃষ্টির ভিতর দিয়ে ভুবনখানা দেখতে দেখতেই কেমন হঠাৎ সন্ধ্যে নামে… ঝুপ করে । যেন ওত পেতে বসে ছিল কেউ, আর চারিদিকে এই ঝাপসার সুযোগে সমস্ত কালো রঙ ঢেলে দিল আকাশে ।

তুমি হয়তো আজ বৃষ্টির আগে চুল বাঁধতে বসেছো । মা সযত্নে দুভাগ করে দিচ্ছে বিনুনি । বারান্দা লাগোয়া আমগাছটা থেকে কাঁচা পাকা মিঠে আমের গন্ধ আসছে, কথামত যেটুকু জল রেখেছিলে ছোটো ছোটো বাটিতে, দুপুরের পাখিরা সেটুকু পান করে শান্তি ছড়িয়ে গেছে । পাখি বলতে তোমার শহরে… ঐ তো… কাক আর চড়াই । তুমি তখন বোধহয় ভাবছিলে, সেই মৌটুসিটার কথা… যে আমার শোবার ঘরের জানলায় পরশু এসেছিল । তোমায় বলেছিলাম ওর হলুদ শরীরে গলার কাছে কেমন কালো রঙের পোঁচ দেওয়া ।
এসব ছাইপাঁশ যখন ভাবছো, ততক্ষণে কাছের ছাদে, বারান্দাগুলোয়… কাপড় তোলার হুড়োহুড়ি শুরু হয়েছে । তোমার বিনুনি ছেড়ে দিয়ে মা উঠেছে, বাইরের দিকে মেলা চাদরটা থেকে ক্লিপ গুলো খুলে নিচ্ছে । ঠিক তখনই, একটা দমকা হাওয়া এসে তোমার অন্যময়তা ভাঙালো । যে বৃষ্টির জন্যে এত এত অপেক্ষা… সেই অপেক্ষাগুলো প্রায় শুকিয়ে যাবার পর সে এল বলে, তুমি প্রথমটায় বুঝতে পারনি, তাই না ? একদৃষ্টে দেখছিলে, সামনের পিচরাস্তাটা ফোঁটায় ফোঁটায় নীল হচ্ছে, বাড়িগুলোর গায়ে লম্বা লম্বা দাগ … আদরচিহ্ন দিচ্ছে বৃষ্টি । তারপর ক্রমশঃ ঝাপসা… লম্বা মোবাইল টাওয়ার… অদূরের দু চারটে গাছ…ফুটপাথের পানের দোকান… সব ঝাপসা ।
তুমি একভাবে ঠায় বসে রইলে তোমার জানলায় ।

আমার এখানে, তোমার ওখানে … আমাদের জানা অজানা কত জায়গায় আজ এরম করেই বৃষ্টি হলো, এমন করেই ঝাপসা হলো । আমি পাঠাইনি, তবু তুমি বৃষ্টি পেলে । আমি পাঠাইনি, তবু তুমি একরাশ মনকেমন পেলে । এই মনকেমনেই আমরা বাঁধা হয়ে আছি, এই মনকেমনেই মন উচাটন … খুব দূরে কোথাও চলে যাবার ইচ্ছে… এই মনকেমনেই মনের ভেতর জেগে থাকা অদৃশ্য যমুনা-পুলিন আর প্রাণের মধ্যে ক্রমাগত সেই ব্যাকুল বাঁশি-ডাক ।


সন্ধ্যে হয়েছে অনেকক্ষণ হলো । বৃষ্টিও থেমেছে ।
চারিদিকে কী এক বর্ষণ-সিক্ত নীরবতা । বেশ শুনশান… সব কেমন চুপচাপ । গোটা চরাচর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে মজে আছে ।
আর আমরা দুজন ?
আমরা দুজন হারিয়ে যাচ্ছি … দূরে কোথাও… খুব খুব দূরে…




0 comments:

Post a Comment