এক জন্মের থেকে আরেক জন্মের দিকে


এখানে নিখোঁজ হয়ে যায় একদিন জীবনের সবকিছু। বাতাসের আস্তিনে আগুনের ফুলকিরা যেমন নিখোঁজ একদিন নিজে, দেখোনা, আকাশের অবতলে আলোর রেখা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হেরে যাচ্ছে নিয়নের কাছে। এখানে নিখোঁজ হয়ে যায় জীবনের সবকিছু একদিন সব।  তবুও কখনো হারানো বিজ্ঞপ্তির মলিন ফলক দেখি পৃথিবীর কোনায় কোনায় সার বেঁধে অনায়াসে নিয়তি যুঝে। এখানে কেউ কেউ ভালোবাসে নিখোঁজ হতে, এখানে কেউ কেউ ভালোবাসে জীবনের ভ্রম, অথবা ভুলগুলো ধরে রাখে সুখের মতো, তারপর টের পায় আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে কখন হারিয়ে গেছে সবকিছুই। এখানে নিখোঁজ হতেই হবে এটাই প্রথা। এখানে নিখোঁজ হয়ে যায় জীবনের সবকিছু সব, না রাখা কথারা।

ভেবেছিলাম, একদিন কথা হবে। কথা হবে সেইসব সময়ের সাথে, যাদের অপেক্ষা করে গলি-ঘুঁজি পার হয়ে, ইস্তেহারসমূহ চেখে শেষমেষ ঘরে ফিরে আসা।

অথচ এই যে রাজ্যজোড়া পরিণতি, এও কিছু আলাদা হয়ে দাঁড়ায়নি আমার পৃথিবী থেকে আজও। স্বল্প ঘুমের থেকে গভীর ঘুমের দিকে কিভাবে কেমন করে চলে যাচ্ছি যেন আমি দিনদিন, স্বপ্নের আশায়। স্বপ্ন, যেসব আমার অবচেতনের স্লেটে লিখে দেয় ইচ্ছেমত গান, ইচ্ছেমত প্রেম ও আদর। তোমাকে উদ্দেশ্যহীন ভালোবাসতেবাসতে শেষে রিং-টোনে ঘুম ভেঙে যায়। সিয়েস্টা ইন গ্রানাডা। পোশাকি শহরের সেই সিয়েস্টায় গভীর অসুখ বাজে, ভেসে আসে ঘুমের ভেতরে আর আমাকে টেনে নিয়ে আসে বাইরে কোথাও।

বাড়ির বাইরে তখন ফেরিওয়ালা, সবজিবিক্রেতা, কারও ঘরে সন্তান এসেছে বলে একদল হিজড়ে এসেছে। ভুল করে আমার গ্রিলে টোকা দেয় দূর্গা, আমি মুখ বার করতেই অদ্ভুত স্বরে বলে ওঠে… “কই গো, সোনারচাঁদ? বুকে করে আনো গো দিদি, প্রাণভরে আশীব্বাদ করি। কোলজুড়ে আলো হয়ে উঠুক…” ওদিকে জয়ন্তী তার ঘরটর মোছা সেরে বেরোচ্ছে আরেক বাড়ি যাবে। “অন্যবাড়ি দেখোগে যাও! এখানে কোনো কুচো নি!”  দূর্গা হেসে বলে ” সে যা হোক গো দিদি, তোমারও কোল আলো হবে একদিন… আবার আসব দলবেঁধে” ।

সকালের কফির ধোঁয়া আমার ভীষণ প্রিয় ঋতু। যে ঋতুকে আমি ছেড়ে যেতে দিই না কখনও কোথাও। কিন্তু সেই ঋতুতে কোনো অন্য গন্ধ থাকেনা কখনও। খবরকাগজ থেকে লাফ দিয়ে কোলে পিঠে উঠে পড়ে কিছু কালো কালো মোটা অক্ষর, শব্দমালা, ভয় ও ভণিতা… মনে হয় সব যেন আশ্চর্য মাদারির খেলা। এই কোল আলো করে কারও ঘরে আসা, এ’ব্যাপারটা আমার কাছে চিরদিনই খুব উজ্জ্বল একটা মায়ার প্রতিচ্ছবি, যে মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে  মানুষের সারা জীবন কেটে যেতে পারে। অথচ মৃত্যু এক অমোঘ সত্যি, যে সত্যিকে আমি সবথেকে কাছ থেকে দেখেছি কয়েকমাস আগে। হারিয়েছি সেই মানুষটাকে যে আমার প্রাণশক্তির উৎস ছিল – আমার বাবাকে। আর তারপর থেকে মৃত্যুকে সহ্য করা আমার কাছে যতটা কঠিন, ততটাই সহজ হয়ে গেছে।

কিছুদিন আগে একটি প্রাণবন্ত ছেলে মারা গেল, তারও আগে একটি মেয়ে ধর্ষিতা হওয়ার পরে পাশবিক যন্ত্রণার শিকার হয়ে জীবনযুদ্ধ থেকে আদিগন্ত ছুটি নিয়ে চলে গেলো। কেউ বললেন “ঘোর কলিযুগ” , কেউ বললেন ” অত্যন্ত অন্যায়”, কেউ কেউ জোটবেঁধে প্রতিবাদ করলেন, কর্তৃপক্ষ বললেন ” আটকানোর ক্ষমতা ছিল না”, কেউ খুব একলা ঘরে কাঁদলো, কেউ শ্মশানযাত্রী হলো… ধূমধাম করে তাদের দাহ করা হলো সর্বসমক্ষে, আর কেউ ভুলে গেলো দিন আনা দিন খাওয়ায়। মেয়েটির গায়ে কোনো রাজনৈতিক রঙ ছিল না, ছিল শুধু নারীত্বের রঙ, ছেলেটিকে ঢেকে দেওয়া হল একটি নির্দিষ্ট রঙের পতাকা দিয়ে। দলীয় সহকর্মীরা মিছিল করলেন, প্রতিবাদ করলেন, কিন্তু অন্য দলীয় প্রতিবাদে সামিল হলেন না। মনে হল যেন অনেকদিন বাদে একটা বিশেষ অ্যাজেন্ডা পাওয়া গেছে, যা নিয়ে খানিকটা দূর মাইলেজ নেওয়া যেতে পারে, বিরোধিতা করা যেতে পারে। মৃত্যুটা বড় নয়, সেই দলীয় সদস্যের মৃত্যুটা বড় এইখানে। অর্থাৎ প্রকারান্তরে তারাও বললেন “এটা সাজানো ঘটনা” , অর্থাৎ মৃত্যুটি কেবলমাত্র তাদের দলীয় সদস্যের জন্যেই সাজানো। এক্ষেত্রে অনেক প্রশ্ন উঠে আসে, আইন অমান্য শান্তিপূর্ণ ছিল কিনা, হলে এই ঘটনাটা ঘটত কিনা, না হলেও এই ঘটনাটা ঘটা উচিত ছিল কিনা, দলমত নির্বিশেষে যদি আইন অমান্য করা হত এবং কোনো নির্দল ছাত্র মারা যেত তাহলেও উক্ত দলের লোকজন একই ভাবে রিঅ্যাক্ট করতেন কিনা। আমি নিশ্চিত তখন প্রতিবাদ করার আগে প্রতিটি দলের সদস্যেরা ছেলেটির বাপ-ঠাকুর্দার কেউ কোনোদিন কোনো দলীয় সভা-সমিতির পাশে দাঁড়িয়ে চাও খেয়েছিলেন কিনা সেইটাও খতিয়ে দেখতেন, এবং চিহ্নিত করা হত। একটি প্রাণবন্ত মেয়ে বা একটি প্রাণবন্ত ছেলে তার ঘর শূন্য করে চলে গেলো, স্বপ্নগুলো একলা ফেলে চলে গেলো, মা-বাবা, ভাই-বোন, প্রেমিক-প্রেমিকার হৃদয়ে হাহাকার রেখে চলে গেলো, সেটা কেন প্রতিবাদের কারণ হিসাবে তুলনামূলকভাবে গৌণ হয়ে পড়ে ? তারা যে সবার আগে কারো সন্তান, একজন সমর্থ মানুষ, এ-দেশের নাগরিক এবং সম্ভাবনাময় জীবন পেতে পারতো এবং সেটা ব্যাহত হল, অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থে এটাকে সামাজিক ক্ষতিই বলা উচিত এবং শুধুমাত্র দলীয় সদস্যের মৃত্যু বললে প্রতিবাদের কারণকে আরো সঙ্কীর্ণ গন্ডীর মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলা হয় সেটাও ভেবে দেখা উচিত নয় কি? অথবা আর একটি ঘটনা মনে পড়ছে, যেখানে শাসক দলের শীর্ষনেত্রী যখন একটি চ্যানেলে আলোচনা সভায় এসে একটি মেয়ের একটি প্রশ্নের উত্তরে মুহূর্তে বলে ওঠেন ” দিস ইস আ মাওইস্ট কোয়েশ্চেন” অর্থাৎ আবার সেই চিহ্নিতকরণের প্রশ্ন চলে আসছে। হয়ত মেয়েটির একটা  রাজনৈতিক ভাবধারা রয়েছে, কিন্তু তা হলেও সে আগে এ’দেশের নাগরিক, একজন সাধারণ মানুষ যিনি গণতন্ত্রে এখনও বিশ্বাস রেখেছেন এবং তার প্রশ্ন তোলার এবং উত্তর দাবী করার অধিকারও রয়েছে!

আসলে, পৃথিবীতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্মলগ্নে যে প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে এগিয়েছিলেন নেতৃবৃন্দ তার মূলে ছিল প্রতিটি সাধারণ মানুষের সুস্থ ও সুন্দরভাবে  বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য লড়াই করা, এবং তার জন্য একটি বিশেষ দর্শনের ধারায় বিশ্বাসী মানুষের একসাথে দলবেঁধে চলা। কিন্তু এখন , মানুষের অধিকারের চেয়েও সেই দলের অধিকার ও সেই দর্শনের ধারার অনুসারীদেরই কেবল মানুষ বলে গণ্য করার মত একটা সূক্ষ্ম ও ভয়ংকর চেতনা বিরাটাকার ধারণ করছে। অর্থাৎ কোনটা নেসেসারি আর কোনটা সাফিসিয়েন্ট কন্ডিশন হওয়া উচিৎ একটি বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে, তা যথার্থই গুলিয়ে গিয়েছে। এবং প্রত্যেকেই অসম্ভবরকম জাজমেন্টাল, কে কোন দলের সমর্থক তা বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে। অর্থাৎ কেউ আনবায়াসড থাকতে চাইলে বা কোনো দলের বিশেষ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী ব্যতিরেকে ব্যাপারটাকে ভাবতে চাইলেও তার পক্ষে থাকা সম্ভব নয় কারণ, তার প্রতিবাদের বিষয়টি কোন দলীয় অ্যাজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত তা দেখে মুহূর্তেই তাকে লাল বা সবুজ যেকোনোরকমের ওরাংওটাং বলে ধরে নেবেন যে যার মতন, অতএব তার প্রতিবাদের পেছনে হাজারো গ্যূঢ় কারণও জটলায় জটলায় নির্ধারিত হয়ে যাবে, বিভিন্ন চায়ের কাপে তুফান তুলতে তুলতে। বিভিন্ন্রকমের ফলও ভোগ করতে হতে পারে… মিষ্টি বা তেতো। এইসব নানান সার্কাসের মধ্যে পড়ে সাধারণ মানুষটি শেষ পর্যন্ত ভেবে দেখবেন তিনি দলীয় হবেন, না প্রতিবাদ করতে ভুলে যাবেন। বলাই বাহুল্য অন্তত ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে সেই সাধারণ মানুষটি আর প্রতিবাদ করার আগেই ভুলে যাবেন। অর্থাৎ “রাতে ঘুমোবার আগে, ভালোবাসবার আগে” … তাকে তাড়া করে বেড়াবে একটিই প্রশ্ন “কোন দল?… তুমি কোন দল? ”

ভেবেছিলাম, একদিন কথা হবে। কথা হবে সেইসব সময়ের সাথে, যাদের অপেক্ষা করে গলি-ঘুঁজি পার হয়ে, ইস্তেহারসমূহ চেখে শেষমেষ ঘরে ফিরে আসা। অপেক্ষার আপাতত কোনো পাড় আমি খুঁজে পাচ্ছিনা…


0 comments:

Post a Comment