একদিন রাস্তায় (ভ্রমন গল্প)

আফশোস কোরো না গালিব একটা লম্বা জীবন চাও আল্লা মিয়ার কাছে ঘুরে ফিরে দেখা হয়ে যাবেই প্রিয় মুখ, বুলবুল আর বসন্তের সাথে...

 গেঁয়ো যোগী ভিক্ষে পায় না। এই কথাটা প্রায়ই মানুষ ব্যবহার করে। অবশ্য যে কারণে ব্যবহার করে সেটা আমার সাথে হয়নি এবার। আমি অবশ্য ২৭ মিনিট আগে গিয়েই বসে ছিলাম বাস স্টেশনে। আমার ক্ষেত্রে সবসময় কানের উপর দিয়েই গুলি যায়। কিন্তু ২৭ টা মিনিট আগে চলে এলাম, ভাবাই মুশকিল। না, কখনো কোন কিছু ছুটে যাবার ঘটনা কখনো ঘটেনি।  সকাল সাড়ে দশটায় আমার বাস। উদ্দেশ্য একটাই, কিছুটা সময় হাপ ছেড়ে বাচাঁ, একটু নিজেকে আলাদা করার প্রয়াস। অবশ্য, এই পৃথিবীতে কোন সামাজিক প্রাণী নিজেকে কখনো আলাদা করে একটো সময় উপভোগ করতে পেরেছে কিনা আমার জানা নেই। জানা থাকলে হয়তো ভালোই হতো। কষ্ট করে এই সাড়ে আট ঘন্টার জার্নি করে এতো দূরে না গিয়ে তাকে একটা ফোন দিয়ে বলতাম, দাদা একটা  উপায় করে দেন!!!

বাস ছাড়তে আরো ২৫ মিনিট বাকী। বাসের ছায়াও অবশ্য এখনো দেখা যায়নি। আমি যেখানে বসে আছি তার পাশের চেয়ারটায় বসে আছেন এক বৃদ্ধ দশপতি। মানে দম্পতি।  দশপতি কথাটা শিখেছি হুমায়ূন স্যারের কাছে। বড়ই সুন্দর একটা শব্দ। যাই হোক, দুজনেই দেখলাম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন একটা বাসের দিকে। বাসের গায়ে লিখা – ৯ পাউন্ডে আমস্টার্ডাম।  আমার দিকে তাকিয়ে  হাসতে হাসতে বললো, আহা যদি  আগে জানতাম ৯ পাউন্ডে ওখানে যাওয়া যায় তাহলে কি আর এবারডীন যেতাম হানিমুন করতে।  আমি কিছুটা অবাকই হলাম। প্রশ্ন করলাম, আপনারা  হানিমুন করতে যাচ্ছেন  এখন?  উত্তরে বললো- কেন ৫০ বছর বয়সে কি কেউ হানিমুনে যেতে পারেনা বুঝি?  আমি ঐ দিকে আর কথা না বারিয়ে বললাম, অবশ্যই যায়, আর দেখো ২০১৬ তে যদি আবার হানিমুনে যাও তাহলে এই বাসের গায়ে লিখাটা থেকে টিকেট করো তাহলে ৯ পাউন্ডে পেয়ে যাবে।  দুজনেই হাসতে লাগলো আমার কথা শুনে।  বাসে উঠার সময় বৃদ্ধ যুগলকে শুভ হানিমুন বলে বিদায় দিয়ে বাসে উঠে পড়লাম। না, ওরা আর আমার একি বাসে যাত্রা হয়নি।  কিছু অনুভুতি অল্প থাকাই ভালো।  আর একসাথে যাত্রা হলে অবশ্য আমার যে একা থাকার প্রহর কল্পনা করে রেখেছি সেটা অবশ্য হতোনা।

বাসের জন্য যখন অপেক্ষা করছিলাম তখন একটা অংক কষেছিলাম। আনুমানিক কতোজন হতে পারে এই বাসে। এই খেলাটা আমার খেলতে ভালোই লাগে। কারণ একটাই, খেলোয়াড় আমি নিজেই। জয় পরাজয় বিবেচনা আমার হাতে, অবশ্য জয় আমার সেটা আগেই নিশ্চিত। হারার গ্লানিটা থাকেনা বলেই হয়তো এমন। এটাও একটা কারণ হতে পারে। ভেবে দেখিনি কখনো। গুণে দেখলাম ১৫/১৬ জন হবে খুব বেশী হলে। টার্গেট দিলাম নিজেকে ২০ এর উপরে গেলেই তোমার হার নিশ্চিত মিস্টার ময়না। বাসস্টপে আসার সময় কিছু খাবার আর দুটো লুকোজেড কিনে নিয়ে এসেছিলাম। লুকোজেডের এক বিরাট কাহিনী আছে। সে না হয় অন্য আরেক সময় বলা যাবে।  যাত্রী গুনতে গুনতেই মনে হয় পিপাসা পেয়ে গেল।  উপুর হয়ে ব্যাগ থেকে লুকোজেডটা নিতে যাব যখন  ঠিক তখনি বজ্রপাতের মতো একটা আওয়াজ হলো। অবশ্য এটা আমার কানে হতে পারে। উপরওয়ালা আমাকে দুটো জিনিস খুব ভালো দিয়েছেন। চোখ এবং কান। সুপারপাওয়ারে ভর্তি। অনেক চেষ্টা করেও চোখের বারোটা বাজিয়ে একটা চশমা পারমানেন্ট করতে পারিনি। আর কানের কথা বাদই দিলাম। সুক্ষাতিসুক্ষ আওয়াজও মাঝে মাঝে অনেক পরিষ্কার শুনি। হাহাহহা, মানসিক রোগও হতে পারে, কে জানে হবে হয়তো। দুনিয়া বড়ই আজব জায়গা। কোন কিছুই অসম্ভব না।  যাই হোক, দমকা আওয়াজে আমার হাত থেকে লুকোজেডের বোতলটা পরে গেল ফ্লোরে। না, কোন দুর্ঘটনা না। এসিস্ট্যান্ট এসে বললেন, গ্লাসগোর যাত্রী যারা আছেন তারা এসে এক লাইনে দাড়ান আর এম১১ গাড়িটির দিকে অগ্রসর হোন। তড়িঘড়ি করে সব নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। তড়িঘড়ি করার একটা কারণ হলো, আগে লাইনে দাড়ালে, আগে গিয়ে বাসে পছন্দমত জায়গায় বসতে পারবো তাই। আমার এই বাচ্চাদের মতো স্বভাবটা এখনো ছাড়তে পারিনি। চেক করে উঠে গেলাম বাসে। বাম পাশে দ্বিতীয় সারিতে দুটো সিট দখল করেই বসলাম। মাথায় চিন্তা একটা, ক্লান্ত হয়ে গেলে হাত পা ছেঁড়ে দিয়ে একটো আরাম করা যাবে।  বাসটায় কম করে হলেও ৪৫ জন যাত্রী ধরার কথা। সাইজ কিন্তু খারাপ না। তাও আবার ডাবল ডেকার। বাস ছাড়ার আগ মুহুর্তে একজন কিছুটা পকপক করলো মানে ইন্সট্রাকশন দিলো কোথায় ব্রেক দিবে এইসব আর কি। আমার মাথায় কি আর তখন ঐসব ঢুকে। আমি তখন কাঁপছি ভয়ে। এই প্রথম হেরে যাবার ভয় হচ্ছে মনে। বাস ছেড়ে দিয়েছে ৫ মিনিট হলো। সবাই যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে আমি তখন উঠে গিয়ে এসিস্ট্যান্টকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই আমরা কয়জন যাচ্ছি এই বাসে, পুরো বাস তো দেখি খালি। মনে একটা খুশির ঝিলিক, বাস খালি মানেই আমার জয় নিশ্চিত। লোকটা আমার দিকে এমন ভাবে তাকালো যেন তাকে প্রশ্ন করে আমি বিরাট এক অন্যায় করে ফেলেছি। মুখটা বাকা করেই বললো ২২। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আমার হাত পা কাঁপছে। আমি হেরে গেছি। কানের কাছ দিয়ে গুলি নয় বরং গুলি লেগেই গেল এবার। তবে জয়ের নয় পরাজয়ের। আজকের দিনের প্রথম খেলাতেই আমার পরাজয়। জানিনা বাকীটা সময় বাসে কিভাবে কাটবে। তবে এটা বুঝতে পারছি এখন- পরাজয়ের গ্লানিটা না থাকলে হয়তো মানুষ জয়ের স্বাদ কি জিনিস বুঝতে পারতো না। মুখটা ঘুরিয়ে নিজের সিটের দিকে এগুতে লাগলাম আর হাসতে হাসতে বলতে লাগলাম– পরাজয়ে ডরেনা বীর।

বাসে ঘুমানোর বাজে অভ্যাস আমার নেই। কারো মতে এটা আবার রাজকীয় অভ্যাস। আমার নেই বলেই এটা এখন বাজে অভ্যাস। যেহেতু ঘুম আসবে না তাই সাথে করে তিনটে বই নিয়েছিলাম পড়ার জন্য। বাস চলছে আর আমি বই পড়ছি। একটা কেমন যেন পন্ডিত পন্ডিত ভাব আমার ভিতরে। হঠাত খেয়াল করলাম আমার প্যান্টের পকেটে সুরসুরি লাগছে।পাশের সিটেতো কেউ নেই তাহলে সুরসুরি কে দেবে? পকেটে হাত দিয়ে মোবাইলটা আন্সার করলাম। যার বাসায় যাচ্ছি তিনি ফোন দিয়েছেন আমাকে। জিজ্ঞেস করলেন কতোদূর আসা হলো? এইতো ভাই, বার্মিঙ্গহাম পার করলাম। ঠিক আছে আসো তাহলে আস্তে ধীরে। ফোন রাখার আগেই তিনি বললেন তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করলে কিছু মনে করবা নাকি? আমি বললাম  না, বলেন ভাই। তিনি বললেন, তোমাকে এতো করে বল্লেও আসো না আর এখন হঠাত করেই চারদিনের নোটিশে আসছো, ঘটনা কি? সব ঠিক আছে তো?  আমি একটা শুকনো হাসি দিয়ে বললাম, এসে নেই, তারপর বলি?  আর বলে দিলেই তো বৃত্ত পুর্ণ হয়ে গেল- থাকুক না একটো অর্ধবৃত্ত আরো ৬টা ঘন্টা…

বাসে হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে ঘুমানোর মজাই আলাদা। সেই জন্যই দুসিট দখল করে বসা। সবে মাত্র বাসটা এ১৩ দিয়ে মটরওয়েতে উঠার জন্য তড়িঘড়ি করছে। না, ঘুমানোর সময় হয়নি এখনো। সবচেয়ে বড় কথা হলো ঘুম অবশ্য তেমন করে আসেনি এখনো। না আসার হেতুটা বুঝতে পারছিনা। নরমাল সময়ে সারা রাত কাজ শেষ করে বাসা এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সাত সমুদ্দুর তের নদী পারি দিতে ২ সেকেন্ড সময় লাগেনা আর এখন কি হয়েছে ভগবানই জানেন। সারা রাত চাকুরী শেষ করে এখন যাচ্ছি ৮ ঘন্টার বাস ভ্রমন করে গ্লাসগো। আর কি আজব ব্যাপার আমার চোখে ক্লান্তির ছায়াটুকু নেই। শুনেছি মানুষ যখন চাপের মুখে থাকে তখন তার স্নায়ুগুলো তাড়িত হয় খুব বেশী। তাই  শারীরিক ক্লান্তিটা খানিকটা সময়ের জন্য বোধ করেনা। কিন্তু যখনই চাপ কমতে থাকে তখনই ক্লান্তি জিনিসটা ভর করতে থাকে ভুতের মত। আমার বেলায় হয়তো তাই হয়েছে এখন। ঘুম আসবে হয়তো একটূ পর সদলবলে। আমার অবশ্য তাতে কোন আপত্তি নেই আমি তো বসেই আছি তাদের আপ্যায়নে।

পেটের মাঝে কেমন যেন গুর গুর করে আওয়াজ হলো দুবার।  এটা হলো আমার ক্ষিদার অশনি সংকেত। অশনি সংকেত নামটা বললেই ঠাস করেই ববিতা ম্যাডামের চেহারা ভেসে আসার কথা কিন্তু কি আজব আমার মনের আয়নায় এখন ববিতা ম্যাডাম ঠাই পাচ্ছেন না। অনেক ঠেলে ঠুলে ম্যাডামকে জায়গা করতে পারছি না। আসলে দোষটা ম্যাডামের না- দোষ আমার ডানপাশে বসা ঐ বিশাল সাইজের দৈত্যটার। মানুষ নাকি দৈত্য কে জানে। এতো বড় একটা মানুষ চোখের সামনে থাকলে কল্পনায় ববিতা ম্যাডামের জায়গা কি করে হবে?? ঐ দৈত্যটা সম্পর্কে পরে বলবো। দেখতে দৈত্যের মত হলেও মানুষটা খারাপ ছিলনা। ব্যাগ থেকে কাস্টার্ড বিস্কিটের পোটলাটা বের করলাম আর সাথে তো লোকোজেড আছেই।  লোকোজেড কেনার সময় ছোট্ট একটা ঘটনা হয়েছিলো। সেলফ থেকে যখন লোকোজেড নিচ্ছিলাম তখন কেন যেন মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি চেপেছিলো। ভাবলাম আমাকেও এমন বিপাকে অনেক বার পড়তে হয়েছে। দেখিনা কেমন লাগে অন্যেরা এমন বিপাকে পড়লে। একটা বোতল নিয়ে ইচ্ছেমত ঝাকিয়ে আবার সামনেই রেখে দিলাম। বেশী দেরী হলনা। আমি শপিং শেষ করাই আগেই অভাগা এক লোকের সারা প্যান্টের উপর লোকোজেড বিসর্জন। না, ভালো লাগেনি তখন। নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হয়েছিলো। কেন জানি তখন মনে হয়েছিলো আমি মানুষ হিসেবে এতোটা খারাপ না। হাহাহাহহাহা। আমার মনে হয় ভালো মানুষ হবার প্রথম শর্ত হচ্ছে — নিজের সসত্ত্বার ভালো দিকগুলো আবিষ্কার করা।

প্রতি সপ্তাহে আমরা আবিষ্কার করি একজন নতুন মানুষকে। আজ আমাদের সাথে আছেন আমাদের জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক  প্রয়াত মাটিরময়না।  আমার সামনে বসা ভদ্রলোক আমাকে প্রয়াত কেন বলছেন ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমার দৃষ্টিভঙ্গি দেখে ভদ্রলোক বুঝে গেলেন আমার জিজ্ঞাসা।

– আপনি এখন আর দুনিয়াতে নেই। আপনি গত হয়েছেন ১১ বছর হলো। জি না এটা পরপার না। এটা মধ্যপার। দুনিয়া পার করার পর পরপারে যাবার আগে এই অংশটা হচ্ছে মধ্যপার। এখানে আমরা মানুষের তিনটে করে অপুর্ণ স্বপ্ন পুরণ করে থাকি। আপনি এখন আছেন খোলাশ্মশান টিভি চ্যানেলে । আপনার সাক্ষাতকার নেয়া হবে এখন। এটা আপনার তিনটে স্বপ্নের একটি। ফোনটা তখন বেজে উঠলো। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বলে দিল আপনার হাতে সময় আছে ৬ মিনিট ৪৩ সেকেন্ড। ফোন ঊঠাতেই- ওপার থেকে  কর্কশ একজন মেয়ের আওয়াজ শোনা গেল- কি রে হারামী, দুইটা বাচ্চা পয়দা করে দিয়ে শুধু বালের কবিতা, গল্প আর টিভি রেডিও নিয়া পড়ে থাকলে তোরে ভাত দিবে কে?? আমি ভয়ে ফোনটা রেখে দিলাম। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বলে দিল – জি, ওখানেই আপনার বাকী দুটো স্বপ্ন। আপনার স্ত্রী- মানসী, আপনার প্রথম স্বপ্ন আর আপনার একটা ফুটফুটে সুন্দর ছেলে আর একটা পরীর মত মেয়ে- আপনার দ্বিতীয় সপ্ন। আর এখন আপনার তৃতীয় স্বপ্ন পুরণ হবে। চলুন শুরু করা যাক।

প্রশ্নঃ কেমন আছেন জিজ্ঞেস করবো না কারণ এখানে কেউ খারাপ থাকেনা,তাই সরাসরি আসল প্রশ্নে, আপনি কি খেতে ভালোবাসেন?

উত্তরঃ জি আমি সর্বভুক। ক্ষিদে পেলে সব কিছু খাই। তবে জাবর কাটা জন্তু না আমি। আসলে হয়েছে কি, আমি যদি বলি এটা পছন্দ করি তাহলে হয়তো অন্য খাবাররা রাগ হতে পারে আবার রেগে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে অনশন করতে পারে তখন না খেয়ে থাকা লাগতে পারে তাই কিছুটা সেইফ সাইডে থাকা আর কি।

প্রশ্নঃ আচ্ছা আপনাকে যদি এখন একটি কবিতা লিখতে দেয়া হয় কিংবা একটি জোক বলতে বলা হয় তাহলে কি করবেন?

উত্তরঃ  জি জোক বলবো। কারণ কবিতা লিখার জন্য মুহুর্ত প্রয়োজন আর সাথে আবেগ। আর প্রয়াতদের আবেগ থাকেনা।

প্রশ্নঃ হুম, ভালোই উত্তর করেছেন আপনি। তো কি জোক বলবেন মাটিরময়না?

উত্তরঃ  বাচ্চারা কি দেখছে এই অনুষ্ঠান?

– না দেখছে না।  আচ্ছা তাহলে বলা যায়- তো হলো কি- মৃত্যুর পর সবাই লাইন ধরে আছে। সবাই পাপী। সবাইকে এক এক করে নিক্ষেপ করা হচ্ছে আগুনে। হঠাত করেই অনেক দূরে দেখা গেল একটা সবুজ মাঠ আর একটা বিশাল বট গাছ। তার নিচেই বসে আছেন বিল গেটস একটা টেবিল নিয়ে। তাতে তার সেই চিরাচরিত কম্পিউটার আর তার সামনে বসে আছেন খুব সুন্দর একটা মেয়ে। তো হলো কি, একজন পাপী বলে উঠলো, একি অবিচার আমরা দুনিয়াতেও কিছু পাই নাই এখানে আইসাও জাহান্নাম আর ঐ বেটায় দুনিয়াতেও সব পাইলো আর এখানে আইসাও সব পাইলো- একি বিচার তার।  তখন জাহান্নামের পাহাড়াদার বলে উঠলেন- আরে কি বলিস বোকার হদ্দ- এই কম্পিউটারে কোন কন্ট্রোল, অলটার, ডিলিট বাটন নেই আর ঐ যে মেয়েটা, তার শরীরে কোন প্রকার ফুটু নেই। হাহাহাহহাহাহা

প্রশ্নঃ আপনি তো খুব অসভ্য একটা লোক।

প্রশ্নঃ যতদুর মনে পরে জীবদ্দশায় ভদ্র ছিলাম বলেই হয়তো কোন স্বপ্নই পুরণ হয়নি তাই  এখন একটো মজা করলাম। আর আপনি আমাকে ভুল কমপ্লিমেন্ট দিলেন এখন। আমি অসভ্য না, আমি প্রাপ্ত বয়স্ক। আমার স্ত্রী আর দুটো সন্তান আছে।

প্রশ্নঃ তো আপনার সময়কার কোন লেখকের লিখা আপনার পড়তে ভাল  লাগতো?

উত্তরঃ এটার উত্তর না করাই ভাল কি বলেন? একজনের নাম বলে আরেকজনকে কষ্ট দেয়া আমার স্বভাববিরুদ্ধ।

প্রশ্নঃ আপনার শার্টের বোতামগুলো এমন কেন?

উত্তরঃ জি আমি শার্টে টিম বোতাম পড়ি। তাই এগুলো দেখতে এমন।  সংসারে ঝগড়া হলে বোতাম ছেড়ার রিস্ক নেই। টানলে খুলে যাবে কিন্তু ছিঁড়বে না। বোতাম ছিড়ে গেলে লাগানো অনেক বিরক্তিকর একটা কাজ।

প্রশ্নঃ এবার একটা ভিন্ন প্রশ্ন করি। দুটো জিনিসের নাম বলেন যা আপনি ঘৃণা করেন।

উত্তরঃ চাঁদ আর জোছনা। কেন করি তাও বলে দেই না হয় আবার প্রশ্ন করবেন কেন ঘৃণা করি। জীবদ্দশায় দুটো জিনিসকেই প্রচন্ড রকম ভালোবেসেছি কিন্তু তার বদৌলতে পেয়েছিলাম অখন্ড অবসর।

প্রশ্নঃ আপনার কাছে ভালোবাসার সংজ্ঞা কি তা জানতে চাইবো না তবে বলুন তো কাকে ভালোবাসা যায়?

উত্তরঃ আমরা এখন আছি মধ্যপারে তাইনা?  মধ্যপারের মানুষেরা তো ঘৃণা করতে জানেনা। এখানে শুধুই ভালোবাসা। ঘৃণা জিনিসটা ভালোবাসার জন্য অনেক জরুরী একটা ঔষধ।ভালোবাসা যায় যার উপর লিমিট ছাড়াই অধিকার খাটানো যায় তাকে। আর, এক মুহুর্তে যাকে ঘৃণা করা যায় তাকে আবার এক মুহুর্তে ভালোও বাসা যায়।  ঘৃণা আর ভালোবাসা হলো মুদ্রার এপিট ওপিট।

প্রশ্নঃ টের পাচ্ছি আপনার শ্বাস ভারি হয়ে আসছে। তাহলে কি এখন একটা কবিতা শুনাবেন আমাদের?

উত্তরঃ

যে শহরে আমি থাকবো না

সে শহরে বেঁচে থাকবে তুমি খাচায় আটকে রাখা টিয়া পাখিটার মত।

সব সময় তোমার মনে ঘিরে থাকবে বিড়ালের একটা হিংস্র থাবা।

তুমি ভয়ে কাতরাবে, পালাতে চাইবে, কিন্তু পারবে না।

যে শহরে আমি থাকবো না

সেখানে তোমার প্রতিদিন শেষ হবে একটি করে আত্মহত্যা দিয়ে।

তোমার সাজের টেবিলের সামনে টিপ খুলে রাখতেই

তোমার কপাল চিরে বের হবে কালো রক্ত।

তুমি কপাল চেপে ধরবে, বীভৎস চিতকারে তুমি জ্ঞান হারাবে।

তারপর ক্লান্ত শরীরে যখন তুমি উঠে দাঁড়াবে

তখন চারপাশে দেখবে শুধুই সাদা কাপড়।

যে শহরে আমি থাকবো না

সেখানে তোমায় ভালোবাসার কেউ থাকবে না।

কামুক আর উৎসুক চোখ খুবলে খাবে তোমার শরীর।

অদৃশ্য হাতে ছাড়াতে গিয়েও তুমি ব্যর্থ হবে।

তুমি আমার নাম ধরে চিৎকার করবে,

তোমার চিৎকারে ভেঙ্গে যাবে সাজের টেবিলের আয়না।

টুকরো আয়নার  প্রতিবিম্বে তুমি টের পাবে

যে শহরে আমি নেই

সেখানে তোমাকে ভালোবাসার কেউ নেই।

……………

……………

……………

যে শহরে আমি নেই

সেখানে শব্দের সঙ্গমে হবেনা কোন কবিতা।

এটাকেই কবিতা হিসেবে ধরে নিন।

প্রশ্নঃ স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এবার একটা অন্যরকম প্রশ্ন। আপনাকে যদি এখন বলা হয় আপনার যত ইচ্ছে টাকা চাইবেন ততই পাবেন তাহলে কি করবেন?

উত্তরঃ আমার হৃদরোগ নেই এবং ছিলোওনা তখন কিন্তু এখন হয়ে যাবে নিশ্চিত। এতো বেশী দরকার নেই। ফিউদস নামে একটা জায়গা আছে, অনেক সুন্দর, সেখানে একটা সন্ধ্যা আমার স্ত্রী মানসীকে নিয়ে বসে থাকতে চাই। হাজার পাচেক এ হয়ে যাবে।  আপনিই কিন্তু বলেছেন, এখন  মানসী আমার স্ত্রী।

প্রশ্নঃ ধরুণ আপনাকে যদি আরেকবার জন্ম নেবার সুযোগ করে দেয়া হয় তাহলে কি করবেন?

উত্তরঃ  আপনি বলেছেন মানসীকে আমি পাইনি দুনিয়াতে। তাই আরেকবার সুযোগ পেলে মানসী হয়ে জন্মাতে চাই। শুধু  দেখতে চাই তার মনে আমার জন্য আসলে কোন ভালোবাসা ছিলো কিনা আর দেখতে চাই তার কষ্টগুলো অনুভব দিয়ে। আর মেয়েদের এমন কিছু কথা থাকে যে, কোন ছেলে মানুষকে দেখলেই মুখ বন্ধ করে রাখে। সেগুলো কি তাও জানা হয়ে গেল। আরেকটা কারণ আছে- আপনাকে বলা যাবেনা।

প্রশ্নঃ আপনি পারেনও বটে। আমাকে বললে হয়তো আমি বলতাম পুরুষ হয়েই জন্মাবো।  যাই হোক শেষ একটা প্রশ্ন — আপনাকে যদি এখন বাংলাদেশের প্রধান্মন্ত্রী করা হয় তাহলে কি করবেন?

বাসের ব্রেকের ধাক্কায় ঘুমটা ভেঙ্গে গেল আমার।  কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়ালই নেই। লোকোজেডের বোটলটা পরে গিয়ে ভিজে গেছে আমার প্যান্ট।  অপরাধবোধটা এখন আর নেই। শাস্তি আমার হয়ে গেছে।  বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই অপুর্ব সেই প্রকৃতি।  মনে মনে হাসিই পেল। এসব কি দেখলাম আমি — কিছুটা পুর্ণতা আর কিছুটা অপুর্ণতার অনুভব নিয়ে গুণগুণ করতে লাগলাম –

ঘাসফুলের মালা পড়ামু তোমার অঙ্গে

দেখুম তোমারে আমি সাদা পরীর ঢঙ্গে

কথা দাও সখী আমার যাইবা না ছাড়িয়া।

ও সখী গো,

পুর্ণিমার চান্দ তোমায় রুপ দিব

কোকিলের গান তোমায় সুর দিব

তোমার সেই গান শুনুম পরান ভইরা

কথা দাও সখী আমার যাইবা না ছাড়িয়া।




0 comments:

Post a Comment