দাঁত বের করে হাসে শহরের জেব্রা ক্রসিং



দাঁত বের করে হাসে শহরের জেব্রা ক্রসিংও। মাথার ভেতরে লাইনটা লিখে ফেলে একটু থমকে গেলাম। অদৃশ্যে কারও হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। অবিকল মানুষের মতো। বাসের ভেতরে মানুষের গায়ে মানুষ গেঁথে আছে। এতক্ষণ মনে হচ্ছিল, পেস্ট্রির ওপর ঘন ক্রিম। চারপাশে দৃষ্টি চালনা করি সেই অদৃশ্য হাসির উৎস সন্ধান করতে। নাহ, সবারই তো মুখ খুব গম্ভীর। দাঁতে দাঁত চেপে, রাগের কঠিন চোয়াল নিয়ে নিঃস্পন্দ হয়ে আছে মানুষের ভিড়। বরফের মতো জমে আছে যানবাহন। তাহলে হাসল কে?

- অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক'টায়?

আবার চমকাই। এবার বেপরোয়া উত্তর আমার- বিকেল ৪টায়, কেন?

- পৌঁছাতে পারবেন সময়মতো? এখনই তো সাড়ে ৩টা বাজে। অর্ধেকের বেশি রাস্তা বাকি।

রাগ হয়ে যায়। অদ্ভুত ব্যাপার তো! কথা বলছে কে? আর আমিই বা কার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি!

- আপনি কে? 

- আমি? ধরে নিন এই শহরটাই আমি। মানুষের চাপে, ব্যবহারে ক্ষতবিক্ষত। 

- শহর কখনও কথা বলে নাকি!

আবার হাসির শব্দ শোনা যায়। ব্যাঙ্গের হাসি এবার। 

- বলে, যখন দমবন্ধ হয়ে আসে, শহরও কথা বলে। আচ্ছা, আপনি কি জানেন, কাল সকালে বাজার করতে গেলে চালের দাম ঠিক কত হবে? এই ট্যারিফিক জ্যামের মধ্যে বসে চালের দাম বলা যায় না! এ রকম পরিস্থিতিই তো অলস মাথাকে খাটিয়ে নেওয়ার জন্য উৎকৃষ্ট। 

- দেখুন ভাই, খামোখা মেজাজটা খারাপ করবেন না। এমনিতেই অনেক ঝামেলায় আছি। আজকের মিটিংটায় সময়মতো যেতে না পারলে মহাঝামেলা হয়ে যাবে। 

আমার ক্ষিপ্ত বক্তব্যের জবাবে শোনা যায় খিকখিক করে হাসি। আচ্ছা, লোকটা কে, আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছে তখন থেকে। আমি রেগে উঠে পেছনে ঘুরে তাকাই। আর ঠিক তখনই বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে থাকা এক ভদ্রলোকের মাথার সঙ্গে ঠোকাঠুকি হয় আমার নাসিকার। শীতল এবং বিরক্তিমাখা দৃষ্টি ঘুরে যায় আমার মুখের ওপর। ওহ, অদ্ভুত ধরনের বাজে গন্ধ লোকটার মাথায়। তেল মাখে চুলে? 

নিরাসক্ত গলায় তেলের গন্ধওয়ালা লোকটার প্রশ্ন।

- এত নড়েন ক্যান? নইড়েন না। এত লড়াচড়া করনের কী আছে!

- নড়বেন না, নড়বেন না। রাস্তায় নেমে কাজে যাওয়ার পথে নড়বেন না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন। রাস্তায় নড়বে শুধু উল্টোদিক থেকে আসা মোটরবাইক আর ভিআইপিদের গাড়ি। আপনি তো সামান্য নাগরিক। আপনি নড়েন কেন?

আবার সেই অদৃশ্য কণ্ঠ কথা বলে নিচু স্বরে। বিরক্তি চরমে ওঠে। 

- আপনি কে বলেন তো? তখন থেকে ফালতু কথা বলে যাচ্ছেন! 

- আমি ফালতু বলছি না। আচ্ছা আপনি তো নিয়মিত ট্যাক্স দেন, রাস্তায় নেমে বাসের জন্য লাইনে দাঁড়ান, উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে যেতে চান না, রাস্তায় যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলেন না। তাহলে আপনি কেন সময়মতো কোথাও যেতে পারেন না যানজটের জন্য?

- সে প্রশ্ন তো আমারও। আপনি জানতে চাইছেন কেন?

- জানতে চাইছি আপনার কেমন লাগে? আজকের মিটিংটায় আপনি মাথা ফাটালেও সময়মতো পৌঁছাতে পারবেন না। যে লোকটা আপনার জন্য এক ঘণ্টা ধরে অফিসে বসে আছে, সে বিরক্ত হয়ে আপনাকে ফোনে মিটিং ক্যান্সেলের কথা বলে বাড়ির পথ ধরবে। তখন কেমন লাগবে?

- কেমন লাগবে মানে! মিটিংটা না হলে বিপদে পড়ে যাব। 

আমার উত্তর শুনে অদৃশ্যে আবারও কেউ হাসে। 

- আচ্ছা, এই যে শহরে এত বাস আর গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, আপনার কাছে কেউ অনুমতি নিয়েছে? 

- আমার অনুমতি!!

এবার অবাক হওয়ার পালা আমার।

- হ্যাঁ, আপনার অনুমতি। আপনি একজন সম্মানিত নাগরিক, আপনার সঙ্গেও তো কথা বলা দরকার। দেশের আইনকানুন মেনে চলা একজন মানুষ আপনি...।

- ভাই, আপনি মনে হয় ফান করছেন আমার সঙ্গে। 

- কী আশ্চর্য, ফান করব কেন! আমি তো জানতে চাইছি। আচ্ছা, সেদিন যে আপনার বসবাসের এলাকায় প্রায় চারশ' গাছ কেটে ফেলা হলো, আপনার এলাকার কল্যাণ সমিতির কর্তারা আপনার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি? সিটি করপোরেশন থেকে কেউ এসে জানায়নি?

এবার আবার আমার মেজাজের পারদ ওপরে উঠতে থাকে। ক্ষিপ্ত হয়ে বলি-

- সিরিয়ায় যখন রুশ-বাশার বিমানবাহিনী বোমা ফেলে শত শত শিশু আর মানুষ হত্যা করল, তারা কি নিহতদের অনুমতি নিয়েছিল?

- বাহ, আপনি তো দেখি দার্শনিকদের মতো কথা বলছেন! মানে বাণী দিচ্ছেন। 

বাইরে গাড়ির বহর সামান্য নড়তে শুরু করেছে। আমি কোনোমতে ঘাড় নিচু করে দেখার চেষ্টা করি। 

- আপনি সিরিয়া নিয়ে কিছু একটা বলতে চাইছিলেন। 

- বলতে চাইছিলাম গোটা পৃথিবীর বড় বড় সুপার পাওয়ার আর জাতিসংঘ বসে বসে নিথর হয়ে এই হত্যাকাণ্ড দেখল; কিন্তু কেউ তো কিছু বলল না!

- আপনার এলাকায় যখন এতগুলো গাছ কেটে ফেলা হলো, তখনও কি কেউ কিছু বলেছিল? কেউ ট্যা-টু করেনি। 

- গাছ আর মানুষ এক হলো?

আবার হাসি শুনতে পাই। বাসটা একটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর।

- গাছেরও প্রাণ আছে। এ শহরে গাছ লাগানো হয়েছিল আপনার মতো মানুষের শরীরে অক্সিজেনের ভারসাম্য তৈরি করার জন্য। সেগুলো কেটে ফেলাও তো অন্যায়। কী মনে হয় আপনার?

হাসিচাপা গলাটা এবার বেশ কঠিন শোনায়। 

- সে রকম অন্যায় গুনতে গেলে তো মহাকাব্য লেখা হয়ে যাবে। অন্যায়ের মহাকাব্য।

- লিখবেন? আপনি তো আবার লেখালেখি করেন। তখন মনে মনে একটা লাইন লিখলেন, এই শহরের জেব্রা ক্রসিং দাঁত বের করে হাসে আপনাকে দেখে। কেন হাসে?

- আমি হাসির পাত্র বলে। 

থমথমে গলায় উত্তর দিই। 

- ঠিক বলেছেন। হাসির পাত্র। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় হওয়ার পরও অধ্যাপক জাফর ইকবালকে খুনের চেষ্টা করা হলো। আপনি এই শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে এ রকম আরও মুক্তমনা মানুষদের খুনিদের বিচার দাবি করলেন। কিন্তু কোনো কিনারা হলো?

মাথা নাড়ি আমি। 

- না, হলো না। 

- তাহলে সিরিয়া অথবা রোহিঙ্গা সমস্যারও সমাধান হবে, এ রকম ভাবছেন কেন? আসলে সবাই সবকিছু জানে। সবকিছু বোঝেও। আর সব জেনেবুঝে আমরা নাটকের দৃশ্যায়ন দেখতে থাকি। 

- নাটক!

আমার গলায় বিস্ময়। 

- নাটক না? পুরোটাই তো কমেডি সিরিয়াল মনে হয় আমার কাছে। গোটা পৃথিবীজুড়ে একটা নাটকের অভিনয় চলছে। ক্লাউনের বেশে সত্য মঞ্চে প্রবেশ করছে। তার পর আবার বিদায় নিচ্ছে। প্রহসন নাটক, দেখতে খারাপ লাগে না। 

আমি অনেক কষ্টে ঘড়ি দেখি হাত তুলে। একমাত্র সত্য সময়। সে বলছে, আমার মিটিংয়ের কাল অতিক্রান্ত। অসহায় বোধ করি। ফোনটা এখনও আসেনি। 

- আপনি ভেবে দেখেন, বাজারদর এত চেষ্টা করেও কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। কর ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টা আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। চোরাই গ্যাসের লাইন নেওয়াটাও আমাদের রপ্ত। সবাই সবকিছু জানে। কিন্তু কোনো কিছুই ঘটছে না। এ রকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত আমি দিয়ে যেতে পারি। 

- আপনি কে, এখনও বললেন না আমাকে?

আমার গলায় খানিকটা অসহায়ত্ব খেলা করে। 

- আমি কে, তা জেনে কী হবে? আমিও আপনার মতো প্রতিদিন নানা বৈসাদৃশ্যের শিকার হচ্ছি, দেখছি নির্বিকার দৃষ্টিতে। প্রতিটি অন্যায় আমার সামনে বুড়ো আঙুল দুলিয়ে বলে যাচ্ছে- কিচ্ছু করতে পারবে না তুমি, কোনো ক্ষমতা নেই তোমার। 

- তাহলে?

- তাহলে আর কী? বাস থেকে নেমে পড়ূন। মানুষের ভিড়ে মিশে যান। সবাই আপনার মতোই এই ব্যাঙ্গ নাটক সহ্য করছে, আপনিও করুন। 

- যদি না করি?

এবার আবারও হাসির শব্দ কানে ভেসে আসে শুধু। আমার প্রশ্নের উত্তর দেয় না সেই অদৃশ্য কণ্ঠ। আমি এদিক-ওদিক তাকাই চোরা দৃষ্টি মেলে। কই, কেউ তো নেই আমার আশপাশে। কার সঙ্গে কথা বলছিলাম এতক্ষণ?




Location: Maharashtra 440023, India

0 comments:

Post a Comment