ছাতিম ফুলের গন্ধ

এসো, হেমলক বিষের চা খেতে খেতে; বিষন্নতার গল্প করি।  মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে; পুরনো স্মৃতির ভাঁজ খুলে; ব্যাবচ্ছেদ করি।

কোনো কোনো রাতে যখন আমাদের ঘুম আসে না, বিছানায় কেবলই এপাশ-ওপাশ করি, মনের মুকুরে তখন একটি প্রান্তরের স্মৃতি জাগিয়ে তুলি। অনিদ্রা দূরীকরণে স্মৃতি কখনো কখনো কার্যকর ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমাদের তো আরো কত কত স্মৃতি আছে। শৈশবের, কৈশোরের, তারুণ্যের, বন্ধুবান্ধবের, সাবেক প্রেমিকার, বাসর রাতের, স্কুল পালানোর, পৌষের হিম রাতে খেজুরের রস চুরির, গ্রাম্য কিশোরীর প্রেমে পড়ার। এত এত স্মৃতি থাকতে আমরা কেন শুধু সেই প্রান্তরের স্মৃতিটা জাগিয়ে তুলি? কারণ সেই প্রান্তরে পড়ে আছে আমাদের এমন এক স্মৃতি, যার মধ্য দিয়ে আমরা জীবনের সৌন্দর্য বুঝতে শিখেছি। ওই প্রান্তরে আমরা দেখেছি পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্য – নারীর টোলপড়া গালের হাসি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমরা সেই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম, ওই টোলের মধ্যেই বুঝি জীবনের গুপ্ত রহস্য লুকিয়ে। সেই রহস্যের টানে রোজ বিকেলে আমরা ছুটে যেতাম সেখানে, সেই বিশাল প্রান্তরে। উত্তরে ও পুবে ত্রিপুরা সীমান্ত, পশ্চিমে বাংলাদেশ, মাঝখানে বিশাল প্রান্তর। কোথাও হাতির পিঠের মতো, কোথাও ঝিনুকের খোলের মতো, কোথাও সমান্তরাল ধু-ধু বালুচরের মতো দক্ষিণে চলে গেছে। কোথায় শেষ হয়েছে কে জানে। আমরা ভাবতাম, ওই প্রান্তরের বুঝি সীমা নেই। পৃথিবীর শেষ সীমানায়, আকাশ যেখানে মাটির সঙ্গে মিশেছে, সেখানেই বুঝি তার শেষ।
প্রান্তরের ঠিক উত্তরে, যেখানে দুই দেশের সীমানা মিশেছে, সরকারি কাগজপত্রে যাকে বলা হয় নো ম্যান্স ল্যান্ড, আমরা প্রথম দেখেছিলাম সেই টোলপড়া গালের অপূর্ব হাসি। প্রতিবছর সেখানে চৈত্রসংক্রাস্তির মেলা হতো। চড়কগাছ ঘোরানো হতো। বিনোদন বলতে তেমন কিছু তো ছিল না আমাদের জীবনে। গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, টেলিভিশন ছিল না, বছরের দুই ঈদ ছাড়া আনন্দ করার মতো কোনো উৎসবও ছিল না। পারিবারিক কঠোর শাসনের নিগড়ে আবদ্ধ নিরানন্দময় এক ঊষর জীবন। তাই সারাবছর আমরা যে-কটি দিনের অপেক্ষায় থাকতাম চৈত্রসংক্রাস্তির দিন ছিল তার মধ্যে একটি।
দিনটি যখন একেবারে নাগালের মধ্যে চলে আসত, যখন মনে হতো হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারব, সুধীর দাসের বাড়িতে যখন ছাতু চিড়া দই মুড়ি খই তিল ও নাড়ুর ধুম পড়ে যেত, আমাদের উত্তেজনার আর সীমা থাকত না। ঘুমাতে পারতাম না সারারাত। রাতকে মনে হতো শত শত মাইল দীর্ঘ কোনো পথ, আমরা দুরন্ত পথিক, অবিশ্রাম হাঁটছি তো হাঁটছিই, অথচ গন্তব্যে পৌঁছতে পারছি না। ঘুমের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালে জেগে পুবের আকাশে দেখতাম হাস্যোজ্জ্বল সূর্য। সারাবছর সূর্যকে কখনো হাসতে দেখতাম না। হাসত শুধু বছরে একবার – চৈত্রসংক্রাস্তির দিন। প্রাণ খুলে। সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা চলে যেতাম সাড়াসীমার প্রান্তরে, সকাল থেকে যেখানে শুরু হতো চড়কমেলার আয়োজন।
সেই মেলাতেই তাকে আমরা প্রথম দেখি। বিকেল তখন সন্ধ্যার কোলে। লাল সালোয়ার-কামিজ পরে, হাওয়াই ওড়নায় বুক ঢেকে, কপালে লাল টিপ পরে, খোঁপায় একটা রাধাচূড়া গুঁজে সে মেলায় এসেছিল। আমরা তো তখন পনেরো-ষোলো বছরের বালক, প্রেমের বোধ তখনো আমাদের মধ্যে পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, নারীর সুডৌল বুককে তখনো আমরা মাতৃস্তন মনে করতাম, নারীর ঊরুসন্ধি তখনো আমাদের কাছে রহস্যের আধার, নারী মানেই আমাদের কাছে মা, বোন, খালা, ফুপু, চাচি। নারীকে স্ত্রী ভাবার মতো দুঃসাহস তখনো আমাদের হয়ে ওঠেনি।
চৈত্রের দামাল বাতাসে ওড়না উড়িয়ে সে আমাদের সামনে এলো। আমরা ভাবলাম, আকাশ থেকে বুঝি পরী নামল! আমরা তার পিঠের ডানাদুটি খুঁজতে থাকি। ঠোঁটের ডগায় চলে আসা কথাটি তাকে আমি না বলে পারলাম না, আপনার ডানা দুটি কোথায় রেখেছেন? ভ্রম্ন বাঁকিয়ে সে আমার দিকে তাকাল। চোখ জ্বালা করে উঠল আমার। ঝলসে যাবে জেনেও আমি তাকিয়ে রইলাম। হাতের পিঠে মুখ ঢেকে সে হাসতে লাগল। সে কী হাসি! যেন পূর্ণিমার জোয়ার নদীর বাঁধ ভেঙে ভাসিয়ে দিচ্ছে ঊষর জমিন। আমরা তার অধর দেখতে পাই না, দাঁত দেখতে পাই না, শুধু দেখতে পাই গালের অনিন্দ্য দুটি টোল। যেন এক গভীর গহবর, যেখানে লুকানো সাত রাজার ধন মণিমাণিক্য। পতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছা হয় আমাদের। মরে যেতে ইচ্ছা হয়। আমাদের বুকে একটা দীর্ঘশ্বাস ঘুরপাক খায়। দীর্ঘশ্বাসটার ভাষারূপ দিলে এই দাঁড়ায় – হায়, জীবনে বুঝি কোনোদিন আমরা এরকম একটা টোলপড়া গাল ছুঁয়ে দেখতে পারব না। অতৃপ্ত বাসনা নিয়েই বুঝি আমাদের মরে যেতে হবে।
চড়কগাছটা ঘুরতে শুরু করলে আমাদের ঘোর কাটল। আমাদের চোখ চলে গেল সন্ন্যাসীর দিকে, দড়ি দিয়ে যার শরীর চড়কগাছের সঙ্গে বাঁধা। উলুধ্বনি উঠল শত শত কণ্ঠে। আমরাও হর্ষধ্বনি দিতে শুরু করি। চড়কের বৃত্তটা কয়েক পাক ঘোরার পর এক সন্ন্যাসী গজা, নকুলদানা আর চানাচুর ছিটাতে লাগল। হই-হুল্লোড় করতে করতে আমরা কুড়াই। ডানাহীন পরীর কথা আর খেয়ালে থাকে না। কুড়াতে কুড়াতে যখন সন্ধ্যা নামল, সবাই যখন বাড়ি ফিরতে শুরু করল, সহসা আমাদের মনে পড়ে গেল ডানাহীন পরীর কথা। আমাদের দৃষ্টি ঘুরতে লাগল মেলার মাঠে। কোথাও তাকে দেখতে পাই না। কোথায় গেল? আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বুঝি আকাশে উড়াল দিলো! প্রান্তরের বাতাসে দীর্ঘশ্বাসগুলো ছড়াতে ছড়াতে আমরা বাড়ির পথ ধরি।
পরদিন বিস্ময়ের সঙ্গে আমরা আমাদের পরিবর্তন লক্ষ করি। বিকেলে তো আমাদের কোনো কাজ থাকত না। তখন তো আর পুতুলখেলার বয়স ছিল না। ফুটবল, গোল্লাছুট, হা-ডু-ডুও তো রোজ রোজ খেলতাম না। কিন্তু বিকেলটা তো কাটাতে হবে। নদীর তীরে, রেললাইনের পথ ধরে কিংবা গ্রামের মেঠোপথে হেঁটে হেঁটে আমরা বিকেল কাটাতাম। সেদিন নদীর তীর ডাকল না আমাদের, রেললাইন ডাকল না, গ্রামের মেঠোপথ ডাকল না; আমরা শুনতে পেলাম সাড়াসীমা প্রান্তরের ডাক। আমাদের মনের মুকুরে ভেসে উঠল উত্তর সীমান্তের ছাতিমবৃক্ষ, লাল সালোয়ার-কামিজ, হাওয়াই ওড়না, লাল টিপ, খোঁপায় গোঁজা রাধাচূড়া, টোলপড়া গাল। কেবলই মনে হতে লাগল ডানাহীন পরী ছাতিমতলায় আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। আমরা ছুটে গেলাম নো ম্যান্স ল্যান্ডে, সারা বিকেল জমিনের আলে বসে ছাতিমতলার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। সে এলো না। সন্ধ্যা নামল। প্রান্তরের পাখিরা উড়াল দিলো নীড়ের দিকে। দীর্ঘশ্বাসগুলো বাতাসে ছড়াতে ছড়াতে আমরা বাড়ি ফিরে গেলাম।
নো ম্যান্স ল্যান্ডে তার অপেক্ষায় বসে থেকে কত উৎকণ্ঠিত বিকেল পার করে দিয়েছি তার কোনো শুমার ছিল না। জানতাম কোনোদিন আর তার দেখা পাব না, তবু আমরা প্রতীক্ষায় থাকি। সীমান্তের ওপারেই মহকুমা শহর। ভাবি, নিশ্চয়ই তার বাড়ি সীমান্তের কাছেই। মাঝেমধ্যে ইচ্ছা করত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপারে চলে যাই, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাকে খুঁজি। একটিবার তার টোলপড়া গাল দেখে চোখ জুড়াই। কিন্তু দুই দেশের ব্যাপার, সীমান্তে বিএসএফ পাহারায়, আমাদের ইচ্ছারা তাই নো ম্যান্স ল্যান্ডে মাথা কুটে মরে। তবু একদিন টহলপার্টির ডিউটি বদলের সময় আমরা সীমান্ত পাড়ি দিই। সারা বিকেল সীমান্তের বাড়ি বাড়ি উঁকি মারি। তার দেখা পেলাম না কোথাও। আমাদের ধারণাটা দৃঢ় হলো – সে আসলে মানুষ ছিল না, চড়কমেলায় যেসব পরী আকাশ থেকে নামে সে ছিল তাদেরই একজন।
রোজ বিকেলে সাড়াসীমার প্রান্তরে বসে থাকাটা আমাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল। ততদিনে ডানাহীন পরীর জন্য আমাদের দীর্ঘশ্বাসগুলো হ্রস্ব হয়ে এসেছিল। আমরা আর তার দর্শন কামনা করতাম না। তবু যেতাম। কেননা বিকেল যাপনের জন্য ওই প্রান্তরের চেয়ে ভালো কোনো স্থান ছিল না, এত বাতাস গ্রামের আর কোথাও ছিল না, সূর্যাস্তের এমন অপরূপ দৃশ্য আর কোথাও দেখা যেত না।
হঠাৎ একদিন, তখন হেমন্তের অপরূপ বিকেল, সীমান্তের ছাতিমগাছটায় ফুলের সমারোহ, একদল তরুণীকে ছাতিমতলার দিকে আসতে দেখে আমাদের বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। উত্তেজনায় আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম। ছাতিমতলায় দাঁড়িয়ে তারা আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকল। বহুদিন ধরে মনের মুকুরে ভাসতে থাকা দৃশ্যের বাস্তব রূপায়ণ দেখে আমরা দ্বিধায় পড়ে যাই। পরস্পরের মুখের দিকে তাকাই। নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে ডানাহীন পরীও আছে! নইলে আমাদের ডাকবে কেন? কিন্তু আমরা কাছে যাওয়ার সাহস পাই না। ভিনদেশের অজানা-অচেনা মেয়ে, যদি কোনো অঘটন ঘটায়! হাতের ইশারায় উলটো আমরা তাদের ডাকি। প্রত্যাশা করিনি তারা আসবে; কিন্তু এলো। নো ম্যান্স ল্যান্ডের দুই আলে আমরা মুখোমুখি বসলাম। আমাদের মাথার ওপর ভাসছে সাদা মেঘের ভেলা, চারদিকে হেমন্তের বাতাসে দোল খাচ্ছে কাশফুল। আমাদের চোখ খুঁজে বেড়ায় টোলপড়া গালের পরীকে। এতদিনে তার চেহারা ভুলে গেছি, নামটিও জানা নেই, শুধু মনে আছে তার টোলপড়া গালের অপূর্ব হাসি।
যে-মেয়েটির খোঁপায় ছাতিম ফুল গোঁজা, আমি তাকে বললাম, চড়কমেলায় আমরা ঠিক আপনার মতো এক পরীকে দেখেছিলাম। মেয়েটির ভ্রম্ন দুটি ধনুকের মতো বেঁকে গেল। মুখটা হাঁ হয়ে গেল। হাতের পিঠে মুখ ঢেকে সে হেসে উঠল। আমরা চমকে উঠলাম। সেই টোলপড়া গাল! সেই সাত রাজার ধনের গহবর! আমি বলেই ফেললাম, আপনি! কতদিন পর! আপনাকে আমরা কত খুঁজেছি!
চোখের মণি দুটো ঘুরিয়ে সে বলল, আমাকে খুঁজেছেন? বলেই হাসতে লাগল। আমরা তার টোলপড়া গালের দিকে তাকিয়ে থাকি। পলক ফেলতে ভুলে যাই। আমরা প্রথমবারের মতো টের পাই সে পরী নয়, মানুষ। কিন্তু ভেবে পাই না মানুষ কী করে এমন সুন্দর হয়। আমাদের বিস্ময় কাটে না। আমাদের চোখে খেলা করতে থাকে এক অধরা স্বপ্ন – আহা, এই ডানাহীন পরীকে যদি সারাজীবনের জন্য কাছে পেতাম! জোছনার রাতে সাড়াসীমার প্রান্তরে যদি তার হাত ধরে হাঁটতে পারতাম!
হয়তো সে আমাদের চেহারা দেখে মনের কথা টের পেয়েছিল। নইলে রোজ রোজ কেন আসত নো ম্যান্স ল্যান্ডে? মুখোমুখি আলে বসে আমরা গল্প করতাম। বাংলাদেশ নিয়ে খুব আগ্রহ ছিল তার। বাংলাদেশ তার পিতৃভূমি। দক্ষিণ অলকানগর গ্রাম। সীমান্ত থেকে বারো মাইল দক্ষিণে। চৌষট্টির দাঙ্গার সময় সপরিবারে ত্রিপুরা পাড়ি দেয় তার দাদাঠাকুর। বাংলাদেশ নিয়ে সে কত যে প্রশ্ন করত আমাদের! বাংলাদেশে কি ধান হয়? আমগাছে আম ধরে? লিচুগাছে লিচু? বাংলাদেশেও কি পাখি ডাকে? নিশিরাতে বাঁশি বাজে? বাংলাদেশের মানুষ কি রবিঠাকুরের গান গায়? জীবনানন্দের কবিতা পড়ে? তার প্রশ্ন শুনে আমরা হাসতাম। বাবার কাছ থেকে শোনা বাংলাদেশ বিষয়ে তার গল্প থামত না। রোজই কোনো না কোনো গল্প শোনাত। শুনতে শুনতে আমাদের খুব বলতে ইচ্ছা করত, আপনি চলে আসুন, আপনাকে বুকের ভেতরে ঠাঁই দেব। কিন্তু বলতে পারতাম না। কারণ নারী মানে তখনো আমাদের কাছে মা, বোন, খালা, ফুপু, চাচি। তবু একদিন সাহস করে হাসতে হাসতে আমি বলে ফেললাম, জানেন, আপনার গালের টোলটা দেখলে পৃথিবীতে কয়েক হাজার বছর বাঁচতে ইচ্ছা করে। শুনে সে হাসতে লাগল। হাতের পিঠে মুখ ঢেকে। আমরা তার টোলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। যেন কেউ আমাদের বাণ-টোনা করেছে। কোনোদিন আর ওই টোল থেকে চোখ ফেরাতে পারব না।
একদিন। বন্ধুদের কেউ প্রান্তরে এলো না। আমি একা। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। বৃষ্টি হবে তুমুল। নো ম্যান্স ল্যান্ডে বসে আছি তার অপেক্ষায়। বসে থাকতে থাকতে পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে, অথচ সে আসে না। সূর্য যখন অস্তাচলে, বাতাসের তোড়ে মেঘেরা যখন ছুটছে দিগ্বিদিক, ছাতিমতলায় একটা হাওয়াই ওড়না দেখতে পাই। উড়ছে পতপত। শীতল বাতাসে আমার গা-টা শিউরে উঠল। ছাতিমতলায় ছুটে যেতে ইচ্ছা করল। কিন্তু দিনের আলো তখনো নেভেনি। অন্ধকারের অপেক্ষায় আমি বসে থাকি।
যখন অন্ধকার নামল, চারদিক যখন জনশূন্য হয়ে পড়ল, আমরা দুজন মুখোমুখি দাঁড়ালাম। তার খোঁপায় একটা ছাতিম ফুল। মধুপের মতো আমি খোঁপায় নাক ডুবিয়ে দিই। গাছে হেলান দিয়ে সে দাঁড়িয়ে। তার গালের টোলে আঙুল ঠেকাই। সে মুখ সরিয়ে নেয়। আমি বলি, তোমার টোলের দিকে তাকিয়ে থেকে আমি একজীবন কাটিয়ে দিতে পারব। সে হাসতে লাগল। অন্ধকারে তার টোলটা আমি দেখতে পাই না। খুব মন খারাপ হয় আমার। মনে মনে প্রার্থনা করি, হে মাবুদ, এক ফোঁটা আলো দাও।
আকাশ ডেকে উঠল অকস্মাৎ। বিজলি চমকাতে লাগল ঘনঘন। বৃষ্টি নামতে আর বুঝি দেরি নেই। অস্থির হয়ে উঠল সে। আর দাঁড়াতে চাইল না। তার হাতদুটো মুঠোয় নিয়ে বললাম, কাল আবার আসব। তুমি আসবে তো? সে শুধু বলল, এখন যাব।
সে চলে গেল। আকাশ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে জমিনে পড়তে লাগল। টানা দশদিন চলল তুমুল বৃষ্টি। সাড়াসীমার প্রান্তর ভেসে গেল পাহাড়ি বন্যায়। পানি নামতে লেগে গেল আরো সাতদিন। শুকাতে আরো দশদিন। আমি আবার নো ম্যান্স ল্যান্ডে গিয়ে দাঁড়াই। তার প্রতীক্ষায় থাকি। সে এলো না। রোজ রোজ গিয়ে বসে থাকি। সে আসে না। দিনের পর দিন কেটে গেল, মাসের পর মাস, অথচ সে এলো না। একদিন তার চেহারাটাও স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেল। হারাল না শুধু তার টোলপড়া গালের হাসি এবং তার খোঁপায় গোঁজা ছাতিম ফুলের গন্ধ।

0 comments:

Post a Comment