শূন্য ছুঁতে পারার পরও মানুষ বিষণ্ন হয়!



ঝকঝক করছে কাঁচের দরজা। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দারুন সম্মান জানিয়ে সরে গেল। খুলে গেল দরজা পেরিয়ে সামনে যাওয়ার পথ। গটগট করে পা ফেলে ভেতরে ঢুকে গেল ‘স’। আর ওকে পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো এলোকেশি ‘ম’। দরজার ওপাশে ছিল যে, বাইরে যাওয়ার অপেক্ষায়।



দরজাটা খুলে গেল বলেই না ‘স’ ভেতরে ঢুকল আর ‘ম’ বাইরে বের হতে পারল। প্রশ্ন হচ্ছে, দরজাটা তবে সম্মান জানালো কাকে? ‘স’-কে না ‘ম’-কে?

রাখুন এসব ফিকশনাল কথাবার্তা। কোনো দরজা আপনাআপনি খুলে যাবে, এমন কথা এক সময় ফিকশনই ছিল বটে। সায়েন্স ফিকশন। বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ফিকশনের ‘অটোমেটিক ডোর’ নামক ভাবনাকে বাস্তব করে তুলতে হয়েছিল বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন লেখক এইচ জি ওয়েলস-কে। সেই ১৮৯৯ সালে তিনি যখন ‘হোয়েন দ্য স্লিপার ওয়েকস’ নামে একটি উপন্যাস লিখলেন, তখন।

এরও ৫৫ বছর পর টেক্সাসের অধিবাসী লিও হিউইট এবং ডি হর্টন অটোমেটিক ডোর আবিষ্কার করে এর পেটেন্ট আদায় করতে পারলেন। এইচ জি ওয়েলস-এর দরজার সাথে এই দরজার পার্থক্য ছিল একটা। ওয়েলস-এর দরজা অটোমেটিক ছিল বটে, তবে সেটা ভাঁজ হয়ে হয়ে মাটি থেকে উপরে উঠে যেত, পাশে সরে যেত না।

আহা, ‘হোয়েন দ্য স্লিপার ওয়েকস’ উপন্যাসের নায়ক গ্রাহামের কথা ভাবছি। দুইশ’ তিন বছর ঘুমিয়ে যখন সে জেগে উঠল, তখন তার প্রিয় শহর লন্ডন গেছে পাল্টে। ঘুম থেকে জেগেই গ্রাহাম টের পেল, এই পরিবর্তিত সময়ে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টটা অ্যাত্তো ফুলে ফেঁপে উঠেছে যে, সে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ। এরপর যত ভয়ঙ্কর ঘটনাই ঘটুক না কেন, এই যে ঘুম থেকে জেগে উঠে নিজেকে ধনী মানুষ হিসেবে দেখতে পারা, তা কিন্তু মন্দ নয়।

আর গ্রাহামের কল্যানে ‘অটোমেটিক ডোর’-এর সম্ভাবনাও যে জাগিয়ে দিয়েছিলেন লেখক ওয়েলস, সেটাই বা কম কীসে? এখন না হয় অটোমেটিক ডোর বিষয়টি পান্তাভাতের মতো, আমরা আর অবাক হই না। এক সময় কিন্তু এই ভাবনাটাই ছিল অবাক করিয়ে দেওয়ার মতো, তাই না?

আর এই যে তারহীন যন্ত্রপাতি হাতে-পকেটে নিয়ে ঘুরছি, এরকম যে হতে পারে, তা কি আমরা ভেবেছিলাম? আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ১৯৬৪ সালে এই কথা ভেবেছিলেন সায়েন্স ফিকশন লেখক আইজাক আসিমভ। ‘ভিজিট টু দ্য ওয়ার্ল্ডস ফেয়ার অব ২০১৪’ নামের একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন আসিমভ, ২০১৪ সালের পৃথিবীটা কেমন হবে তার একটি ধারণা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। তখুনি ধারণা করেছিলেন, ২০১৪ সালের পৃথিবীতে তারহীন যন্ত্রপাতি সাধারণ ঘটনা হবে।

ঐ নিবন্ধে আরো অনেক কিছুই ভেবেছিলেন, সব মিলে না গেলেও এই তারহীন যন্ত্রপাতির কল্পনা কিন্তু বাস্তবায়িত হয়ে গেছে, বলা যায় ২০০০ সাল আসার আগেই এসে যায় তারহীন বাস্তবতা। আসিমভ এভাবেই লিখেছিলেন, ‘২০১৪ সালে যন্ত্রপাতিগুলোর কোনো বৈদ্যুতিক তার থাকবে না, নিশ্চিতভাবে বলা যায় এগুলো শক্তি পাবে দীর্ঘায়ু ব্যাটারি থেকে।’

সায়েন্স ফিকশন লেখকরা আগে ভাগে ভাবনা ঝেড়ে দেবেন আর পরবর্তীতে তা বাস্তবায়িত হবে, এ বিষয়টিও আর অবাক করে না। তবে যিনি সায়েন্স ফিকশন লেখক নন, তিনি যদি দুর্দান্ত আইডিয়া দিতে পারেন, তবে অবাক না হওয়াটাই অবাক করার বিষয়।

মার্ক টোয়েন-এর কথাই ধরুন। ১৮৯৮ সালে লেখা একটি ছোট গল্প লন্ডন টাইমস অব ১৯০৪-এ মার্ক টোয়েন নতুন একটি বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ধারণা দিয়ে ফেললেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘টেলেক্ট্রোস্কোপ’। এটা আসলে সারা বিশ্বের সব মানুষের সাথে যোগাযোগের উপযোগী বিস্তৃত নেটওয়ার্কের টেলিফোন, যা কিনা ‘সবার কাছে দৃশ্যমান, এবং সবাই স্পষ্টভাবে আলোচনা করতে পারবে, যদিও বাস্তবিক দূরত্ব পৃথক করে রাখবে।’

ইন্টারনেট-এর কথাই তো বলা হচ্ছিল, নাকি? এরও কত পরে সেই ১৯৬০ সালে আমেরিকান ফেডারেল গভর্নমেন্ট কম্পিউটারের সাহায্য নিয়ে দানবাকৃতির যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলে ইন্টারনেটের সূচনা করেছিল।

হুগো গার্নসবাচার পৃথিবীর প্রথম সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিন এ্যামাজিং স্টোরিজ-এর প্রথম প্রকাশক। ১৯১১ সালে লেখা উপন্যাস রালফ ১২৪সি ৪১প্লাস-এ হুগো গার্নসবাচার রাডার-এর আইডিয়া দিয়েছিলেন। তিনি দিব্য চোখে দেখতে পেয়েছিলেন এক আশ্চর্য তরঙ্গকে। ‘সমবর্তিত এই ইথার তরঙ্গ ধাতব বস্তুর গায়ে আঘাত হেনে প্রতিফলিত হতে পারে, আলোক তরঙ্গ যেভাবে দর্পন বা দর্পনের মতো উজ্জ্বল পাতের উপর প্রতিফলিত হয়, ঠিক সেভাবে।’

ভাবনারে হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যায়। ভাবনারে হাওয়া মাতায় বটে! এই ভাবনা উড়তে উড়তে চলে যায় সত্যিকারের কল্পলোকে, সীমানা ছাড়িয়ে অসীমে, মহাকাশেও বৈকি!

কাব্য করছি না, ভাবছি। ১৮৬৫ সালে জুল ভার্ন যেমন ভেবেছিলেন। ‘ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন’ উপন্যাসে জুল ভার্ন কামান দাগিয়ে মহাকাশযানকে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, যা সত্যিই মহাকাশে পৌঁছে গিয়েছিল। ১৯২৬ সালে, জুলভার্ন কল্পনায় কামান দাগার ৬১ বছর পর রবার্ট এইচ গোডডারড মহাকাশে ছুঁড়ে দিতে পেরেছিলেন পৃথিবীর প্রথম তরল জ্বালানী শক্তিতে ভরপুর রকেটখানাকে।

এরও ৩৫ বছর পর, ১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিন হয়ে গেলেন পৃথিবীর মানুষদের মধ্য থেকে প্রথম মানুষ, যিনি মহাকাশে উড়ে গেলেন মহাকাশযানে করে, পৃথিবীর চারপাশে পাঁক খেয়েছিলেন তিনি। নীল পৃথিবীটা নিজেও কি তখন বিস্মিত হয়নি মাটি ছেড়ে মহাকাশে উড়ে আসতে পারা মানুষ দেখে? সীমাহীন কল্পনার শক্তি তো আছেই, এই মানুষের আছে কল্পনাকে বাস্তবে পরিণত করতে পারার ক্ষমতা।

অথচ শূন্য ছুঁতে পারার পরও মানুষ বিষণ্ন হয়, নিজেকে শূন্য মনে করে শূন্যে মিলিয়ে দেয় নিজেকে। মানুষের অসহায়ত্ব প্রকারান্তরে বিস্মিত করে তোলে এই মানুষকেই।



0 comments:

Post a Comment