এইটা তোমার কবিতা



একটা বিষন্ন বিকেল শেষে নেমে আসা বৃষ্টির চেয়ে মর্মান্তিক কিছু নেই। মৃত্যুমুখী শহরে বিকেল নামে নামতে হয় বলে, সন্ধ্যা নামে রাত হবে বলে; কিন্তু বৃষ্টি কেনো আসে?
ইট আর কাঠের রুক্ষতায় বৃষ্টির খুব একটা জায়গা আছে বলে মনে হয় না। তবুও বৃষ্টি নামে। মর্মান্তিক
এই বৃষ্টিতে নস্টালজিয়ার ভিড় জমে, ভিড় বাড়ে নিঃসঙ্গতার।
তোমার শহরে যাওয়া হয় না আর। তারপরও আবহাওয়ার খবরটা পেয়ে যাই। গুগলে সার্চ দিলেই হয়। বুঝতে পারি তুমি কেমন থাকো। তুমি মানে আমার সীমাহীন স্মৃতিকাতরতা।

একদিন কুড়োতে যাব ফেলে আসা দিন গুলোকে। এ শহরে বিকেল নামে বিষাদের মত। আর কতো শুনবো ক্লান্তির ভায়োলিন? এ শহরে আমি হেরে যাওয়ার দলে...
ঘর পালানো পাখিদের কাছে রাত আর ভোর একই রকম প্রহসনের। এখানে নিজেই নিজের না। এখানে শহর ধোয়া হয়ে কুন্ডুলি পাকায়; আমার চোখ ঝুলে থাকে শহরের কুন্ডুলি লেজে।
আমি জানি, তুমি এই শহরে থাকো, এবং আমার মতোই উদ্ভ্রান্ত উদাস হয়ে। তুমি আমার মতোই
কুল পাবে না, কিনারাও তোমাকে ধরা দিবে না। জমে  থাকা বাকি দিনগুলো শেষ হয়ে গেলে, তুমি আমি মুখোমুখি হবো আবার; তখন আমি শুকনো কাঠ আর তুমি নষ্ট যৌবনের ধ্বংসাবশেষ।

 তারপর আবার রাত হলে তুমি আমি বিছানায় বসে থাকবো নিশ্চুপ, ঘুম এসে অপেক্ষা করবে
দূরের বাতিঘরে। এক ফোঁটা জলও থাকবে না চোখে, তবু তুমি আমি নিরন্তর চোখে বয়ে চলবো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাসাগর।

পৃথিবীটা গোল বলেই আমি আশা করি; প্রত্যাশার চাদর গায়ে জড়িয়ে হাত মেলে বসে থাকি। স্বপ্ন আঁকি নিতান্তই নিরীহ একটা বিকেলের। ঘর পালানো পাখিদের বেঁচে থাকাই সুখ, আলাদা করে সুখ-সন্ধানে যাওয়ার কিছু নেই; ঘর বলে আলাদা কিছু খোঁজার তাড়া নেই, বেঁচে থাকাই সুখ। সুখ মানে
কিছুই না; শুধু কিছু অপলক দৃষ্টি, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা…এখন আমি ঘর পালানো
পাখি, আমার ডানায় জং ধরা অতীত।

দুই চোখে রাজ্যের ঘুম নিয়ে জেগে থেকেছি সারারাত। তারপর- শীতের সকালে একটি রাতজাগা
পাখির জন্য আমার শীতলতম সংলাপ। বিষন্নতার নোনতা রোদ, বুঝে নেবে সকালের সার্বভৌমত্ব। আমি কেবল সঙ্কুচিত হবো, শীতে। শীতার্ত সংলাপে। আমার চুলে, নাকে-মুখে সতীর্থের ছেড়া পালক। বেঁচে থাকার অনন্তকর প্রচেষ্টায়, তাচ্ছিল্যে হাসে- শীতগ্রস্ত ঠোঁট। হাত ছোঁয়া দূরত্বে থাকে বিলাসের পৃথিবী- আমার ভাবনার মৃত্যুরা। ক্রমশ শুকাতে থাকা হাত- পায়ে পোকা ধরে গেছে। চোখ ভরা
ঘুম নিয়ে রোদের সাথে ঝগড়া জমে না। আমি পাখি হয়ে হয়ে যাই, ওড়াল দেই কোনো এক রাতের দেশে…

পান্থপথ এখানে সন্ধ্যার গায়ে সারাটাদিন ভাঁজ করে লুকোনো থাকে। সন্ধ্যাতে তাই সারাদিনের অনুভূতি। এখানে সন্ধ্যার গায়ে তীব্র সুঘ্রাণ। আর পিছলে পড়ার দাগ ও অচেনা পায়ের অস্পষ্ট ছাপ।
বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো এখানে আকাশ নেমে আসে। পিঠে করে আনে যাপিত মেঘ। ঘোলাটে হলেও সন্ধ্যা এখানে ঔজ্জ্বল্য ছড়ায়; কারো মন হৃদয় বা কারো শরীরে। নিতম্বে। বুকে। কারো বাদামী কালো বা
লালচে চোখে। এখান সন্ধ্যাই নাগরিক। সন্ধ্যাই সব। এখানে শহর ঝলমল করে নিরীহ আলোর ভিতরে ঢুকে। এখানে শহর নিজের থাকেনা; টুকরো টুকরো হয়ে ঢুকে পড়ে রাধিকাদের ভ্যানিটিতে। এখানে সন্ধ্যা মুগ্ধ দর্শক, বিমুগ্ধ শ্রোতা…তখনকার মতো এখনো গোটা শহর ফাঁকা। তুমি কোথাও নেই;
নেই তোমার চলে যাওয়ার দৃশ্যও…ঘাসফুলেরা ভালোই থাকে। কতো রঙিন ফড়িং তাদের নিয়মিত
খদ্দের। আমি সামলে নিয়েছি ফড়িং হওয়ার লোভ; অন্ধকারেরা বিলুপ্তপ্রায়। শহুরে রঙিন আলোয় হাওয়া হয়ে গেছে তারা। তবু ধ্বংসাবশেষ কিছু রয়ে গেছে তোমার ফর্সা শরীরের তিলক হয়ে। কিছু ধ্বংসাবশেষ রয়ে গেছে তোমার পায়ের ছায়ায়, ইটের খোয়ায় জড়িয়ে।
কতো কিছু হারালাম জীবনে; প্রেম- ভালোবাসা-স্বপ্ন। কিন্তু তোমাকে আমার হারানো হলোনা। হলুদের বাগান, ফড়িং হওয়ার ইচ্ছা, অন্ধকার আর তোমার তিলকেরা হারাতে দিলোনা তোমাকে….

তোমার স্কুলঘর দেখার ইচ্ছে জাগে আমার। কোথায় কেটেছে তোমার শৈশব, আমার জানতে ইচ্ছে করে। তুমি খালি পায়ে হেঁটেছো যে উঠোনে, আমারও খুব ইচ্ছে- সে উঠোনের মাটি ছুঁবো। হয়তো
তোমার পায়ের ছাপ লেগে আছে এখনো! ভরা বর্ষায় তোমার সাথে আমার নৌকোয়
চড়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা ছিলো। তোমাদের পুকুরে সাঁতার কাটার স্বপ্ন ছিলো। কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ফুরিয়ে গেছে…আমি তবু দিনমান হাঁটি। আর ফুরিয়ে ফেলি দিনগুলোকে। দিনে দিনে তো দিন এমনিই ফুরায়…

আমার বিষন্নতাও আরো গভীরতর বিষন্নতায় ডুব দিলো। শেষ বসন্তে এসে সবুজ পাতাদের আমার বড় হিংসে হয়। আমি কেনো পারছিনা পাতাদের মতো নতুন রকম সজিব হতে? আমি কেনো পারিনা
ফেলে আসা বিকেলগুলোকে ভুলে যেতে? নোনা রোদ হারিয়ে গেছে; দিনে দিনে ফুরিয়ে যাচ্ছে দিনগুলো। বুকের খুব গভীরে গজিয়ে উঠা দু:খরাও বড় হয়ে উঠছে। শরীরে ফাটছে কার যেনো অশরীরী অস্তিত্ব। কোনো মায়ার বাধনেই তাকে বাধা যায়না।
বড় ইচ্ছে করে জানতে- সে কোথায়, কেমন থাকে। কার নতুন হাতে জমে উঠে তার নতুন ভালোবাসা?
সন্ধ্যার অন্ধকারে আমাকে বাড়ি ফিরতে হয়। পায়ে জড়িয়ে যায় পা। আমার শুধু
তাকেই মনে পড়ে... 




3 comments:

  1. এক জীবনের ভালোবাসা আসলেই যথেষ্ট নয়! শুভকামনা আপনার জন্য !

    ReplyDelete
  2. অতি চমৎকার লিখেছেন, দারুন!

    সবসময় আপনার লেখা পড়েছি লিখতে থাকুন।

    ReplyDelete
  3. করুনাধারা23 May 2018 at 09:10

    চমৎকার উপস্থাপনা । পড়ে ভালো লাগলো ।

    শুভ কামনা ।

    ReplyDelete