আধপোড়া আপেলের খোসা



এমন চন্দ্রগন্ধী রাতে আমার ঘুম আসে না। রক্তের ভেতর তীব্র ঝড়; মরুর বালিয়াড়ি। আমি ভুলে যাই, ভুলে যেতে থাকি কবিতার পাঠ; তাবৎ অক্ষর। ভুলে যাই গোপন স্নান।
মনে নেই, মনে নেই...

কবে কোথায় কৃষ্ণচাঁদ জেগেছিল রক্তজবার মতো! কোথাও কি পাখির ঠোঁটে লিখেছিলাম দ্বিধার বাতুনি; আমার মরণ। আর বুঝি না আমি দিন ও রাত্রির তফাৎ। আধো ঘুম আধো জাগরণে থাকি। কেউ কি বলেছিল আমায় দ্বিখণ্ডিত লালের জোয়ারে নদীরা প্রমত্তা হবে! কিংবা তোমায় পাঠ করে শোনাবো কস্তুরী পুরাণ! এমন বিস্মৃতিপ্রবণ কী করে হলাম আমি! অচেনা দাঁড়িয়ে থাকি ভুলের নগরে। সারি সারি লণ্ঠন হাতে সৈন্যদল সম্মুখে আমার। তাদের কাঁধের উদ্যত বর্শায় দেখি পুড়ে যাচ্ছে কবিদের নাম; আদম সূরত। আর কৃষ্ণ কাফনে ঢেকে যাচ্ছে তার মুখ। অথচ ওই মুখ স্মরণ করে ঘুমাতে যাওয়ার আগে গায়ত্রীমন্ত্র জপ করেছিলাম আমি।
অবিশ্বস্ত আগুনের পাশে বসে তুলে নেই তার হাত।
ফেটে যাওয়া জ্যোৎস্নার ভেতর হরিণীরা হেঁটে যায়। তাহাদের স্তব্ধ খুরে খুরে ধুলোর পরাগ উড়ে। নিকষ বনের দিকে তাহাদের যাত্রা- আমি তাদের পদশব্দে ক্রমশ অন্ধ হয়ে যেতে থাকি...
আমার কোনো কর্ম নেই...
এই ঘর, এই রাত, এই অন্দর-বাহির সবকিছু ছাপিয়ে কেবল তার কণ্ঠস্বর আমার মাঝে বাজতে থাকে। অথচ আমি জানি একজন্মে তার হাত ধরে কোনো দিন হাঁটা হবে না আমার, এই মহাপৃথিবীর মহাপথ ধরে কোনোদিন হাঁটব না আমরা।
বসে আছি, ঠাঁয়, পুরাতন বৃক্ষের গায়ে হেলান দিয়ে। চোখের ভেতর জলের কলস ভেঙে যেতে থাকে।
পৃথিবীর কোথাও কি ভোর হলো! এই ছায়া ছায়া পথে কোনোদিন হাঁটিনি তো। একই নক্ষত্রের ছায়ায় থেকেও মানুষেরা এতো অচেনা কেন?
আরশি মহলায় পিতামহ নিদ্রা যান, মাতামহ নিদ্রা যান। কেবল লাবণ্যনগর জেগে থাকে।
একদিন তবে আমিও নিদ্রা যাবো সুখের তরাসে।
কেউ চিনবে না তোমায়
হে ধুলি, হে অনস্তিত্বের শিশির!
শরীরের ওপর গজিয়ে ওঠা ঘাস; ডুমুরের ঘ্রাণ বিস্মৃত অচেনা অচেনা...
রজনী দীর্ঘ হলো।
রাগ বাগেশ্রী দীর্ঘ হয়। মাঝরাতের স্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়ে এর স্বর-বিস্তারে। প্রতীক্ষমানা কোনো নারীর গোপন আর্তি। শিউলিতলায় ঝরে পড়া বিন্দুর মতো বাগেশ্রীর আলাপ মন্থর।
হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে...
এতো অস্থিরতা কেন আমার! হা ঈশ্বর আমি কি তবে জীবন্ত মমি হয়ে যাচ্ছি!


০২.

আকাশে অনেক উজ্জ্বল আলো দেখা যায়। পরিযায়ী পাখিরা বিহারে বের হয়েছে। চাঁদের আলোয় সবকিছু অপ্রাকৃত মনে হয়। হায় এই আমার নগরী! আমার প্রিয় নগরী! এই নগরীর ইথারেই তো তার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। অথচ হে নগরী আমার! তোমার কাঁচের বদ্ধ প্রাসাদ ভেদ করে ঠিকই আমার কর্ণমূলে পৌঁছে যায় প্রেত হুলোর, দেখতে পাই মার্বেল মেঝেতে গড়িয়ে পড়া গমরঙা তরল। তুমি তৈরি হয়েছ ক্রেডিট, ইকোসাইড, অবদমন আর দাম্পত্য পঙ্কিলতা দিয়ে। কে বহন করবে এর দায়, এই মানবিক সম্পর্কচ্যুতির!
আবারও অস্থিরতা ঘিরে ধরে আমায়।
আমি তো কিছুই মনে করতে পারছি না!
শয্যায় ফিরে আমি পুনর্বার।
আগুনরঙা ধুলির ভেতর দু’জন শুয়ে থাকি। পরস্পর পরস্পরের গায়ে ধুলোর প্রলেপ মেখে দেই। কারো বাড়ি থেকে এইমাত্র একটি মৃতদেহ বেরিয়ে গেল শবখানার দিকে। জামদানি শাড়ি কেটে পিতার গায়ে জামা বানিয়ে দেই। আমার মাথার ভেতর দৃশ্যগুলো জেগে থাকে। 
ফসলকাটা শেষে বাড়ি ফিরে গেছে কৃষকসকল।
মহাসমুদ্রে নৈমত্তিক কার্যদিবস শেষে আমিও বেড়াতে যাই চাঁদের উঠোনে। কুড়িয়ে নেই পড়ে থাকা শষ্য ও কাঁটা। নাড়ার আগুনে পোড়াই বৈকালিক মন; অস্থি ও শালুক। মৃতসখীরা কলস ভরে নিয়ে আসে সাগরের জল। এমন উড়াল দিনে আমিও কি তবে কলঙ্ক ভালোবাসি! বুড়িছোঁয়া হয়ে পড়ে থাকি কালের ধুলায়...


০৩.

জীবনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার সাহস নেই আমার। তাই ঘুমের ভেতর লিখে রাখি মৃত্যুর চিরকুট। পেছনে অন্ধকার আর সম্মুখে আলোর ইশারা। ম্রিয়মাণ আলোয় দেখি পূর্বপুরুষের ভিটায় নিরন্তর ঘুঘুর ডাক।
আমার সঙ্গে হাঁটে পরম্পরা; বেড়ালটিও...
বন্ধু যারা তারা কি আসবেন মৌতা দাফনের কালে? তারা তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনার ঝড় তোলেন আকাশে বাতাসে। পাতার পর পাতা ভরিয়ে তোলেন অক্ষরে অক্ষরে। অথচ আমি বাকরুদ্ধ। অক্ষরগুলো ফসিল যায়।
বন্ধুরা আমাকে ফেলে এগিয়ে যান। 
বেড়ালটিও...
আমি আহত হই না, কারো অগ্রযাত্রাই আমাকে আহত করে না। আমি হাঁটছি সন্তর্পণে...খসখসে দেয়ালের ধার ঘেঁষে ঘেঁষে। সরু টানেলে মাথা ঠুকে যাচ্ছে...হাঁপ ধরে। হা করে নিঃশ্বাস নেই। মাকড়শার জাল সরিয়ে সরিয়ে আমাকে হাঁটতে হয়।
আমি হাঁটছি
একা
নিঃসঙ্গ… কেবল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র দাঁড়িয়ে থাকে।


০৪.

কাল সারারাত একটা জ্যোৎস্না প্লাবিত ভাঙা মন্দিরের পাশে বসেছিলাম। শ্যাওলার গন্ধ গায়ের রোমকুপ ভেদ করে ঢুকে যেতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরের গাত্রে যে সকল সর্পকুল বাসা বেঁধেছিল কিছুটা সরে গিয়ে তারা আমায় জায়গা করে দেয়। ডুবে যাই...শ্যাওলার আস্তরণে ডুবে যেতে থাকি। আকাশে বিস্তীর্ণ নক্ষত্রের বন। আমি মৃতবন্ধুদের খুঁজি। তারা কোথায়? যাদের সঙ্গে পৃথিবীর উদ্যানে উড়াল দেব বলে ভেবেছিলাম কখনো।
কোথাও কোনো সৌরভ নেই। কেবলই মৃত ইঁদুরের গন্ধ আমায় তাড়া করে। বিহ্বল বিস্ময়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি, বসে থাকি...
বসে আছি কাঁচের বাগানে। মহা-অতিথির আগমন প্রত্যাশায়। একটা মৃত কাঠবিড়ালী কেশর ফুলিয়ে আমায় ডাকে। নীল নাবিকেরা ঝুড়ি ভরে নিয়ে যায় মৎস্য ও কুমারীদের লাল-নীল রেশমি ওড়না।
মঞ্চের পেছন ফিরে আমি বসে থাকি। অন্ধকার থেকে সূক্ষ্ণ এক আলোকরশ্মি আমার চুল ছুঁয়ে যায়। কেউ কি আসবে আজ?
উৎকর্ণ হই। শুনতে চাই সেই কণ্ঠস্বর- সমুদ্রের মতো গম্ভীর; জলদ। সৈকতে আছড়ে পড়া শিশিরের মতো তা আমার স্নায়ুরন্ধ্রে ঢুকে যায়। বৃক্ষের শাখায় দ্যোদুল্যমান ছোট ছোট ঘণ্টা আমাকে মনে করিয়ে দেয় মন্দিরের ঘ্রাণ। সে এক জুঁইফুলের মতো ভোরের মন্দির। বৃষ্টিস্নাত...
সে আর আসবে না, কেউ একজন বলে যায়। যদিও অষ্টম রাতে চাঁদ খুলে দিয়েছিল তার মোহন দরোজা; দেহের জরদ। ঝর্ণার হাত অর্কেস্ট্রা বাজায়। আর আমার টেবিলের চাদর সাদা সাদা খইয়ের মতো গড়িয়ে পড়ে। সেকি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসেছিল? কী জানি?

সমস্ত বাগান পড়ে থাকে রিক্ত, শূন্য।


০৫.

অদ্ভুত এক সময় অতিক্রম করছি আমি। সে কি জানে না তার উষাস গিলে ফেলার পর থেকে এ জীবন আর আমার নয়।
রাজপুত্র বদলে দিলেন আমার দিন রাত। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আমাকে ডেকে তোলেন। তিনি পাঠ করেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাই।
রাজপুত্র প্রকাশমান...
আমি ম্রিয়মাণ।
তার সঙ্গে উৎসবে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত নই আমি। দাদী আম্মা তুমি কোথায়! আমি এক ‘পুয়র সিন্ডারেলা’। আমি তো রাজপুত্রের সঙ্গে মহাপৃথিবীর উৎসবে যোগ দিতে চাই। আমি তার উপযুক্ত হয়ে উঠতে চাই। 
দারিদা, হাইডেগার, সস্যুর সনটাগ...জীবনানন্দ...রবীন্দ্রনাথ...অ্যারিস্টটল... দেকার্ত...সেফারিস...শুধুমাত্র রাজপুত্রের ভাষা বুঝব বলে পাঠ করতে থাকি। আমার মস্তিষ্ক তার কথা অর্ধেক বুঝে, অর্ধেক বুঝে না। আমি কেবল তার কণ্ঠস্বর শুনি। সে কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে ব্যপ্ত হয়ে যায় আমার প্রতিটি রোমকুপে।

০৬.

‘বলো কোন কোন অক্ষর তুমি রচনা করেছ? নিমের ডালে লিখেছো কোন সে কবিতা?’
জ্যোৎস্নার নিরাই নিরাই রোদে গাছেদের ছায়া আরো ঘন হয়ে আসে। আর ছায়ার ভেতর অজস্র কচি কচি হাত। তাহাদের মুখে মাতৃদুগ্ধের ঘ্রাণ! আত্মবিস্মৃত আমি বসে থাকি, দাঁড়িয়ে থাকি।

কী করো কন্যা
পাঠ করি
কী পাঠ করো
পৃথিবীর আদি গ্রন্থ; তোমার কবিতা
কবিতা! আমি কি লিখি
তবে কে লেখে?
জানি না গো কন্যা, জানেন আমার ঈশ্বর
আমার ঈশ্বর যে তুমি। এই নক্ষত্র দিবা রাত্রির মতো সত্য। সত্য পৃথিবী চন্দ্র সূর্যের মতো। প্রিয় গুণীন আমার! এই দ্যাখো খুলে দিচ্ছি আমার হাড়; হৃৎপিণ্ড খুলে দিচ্ছি। তুমি দেখাও তোমার ব্রহ্ম্রবিদ্যা। আমাকে ভস্ম করো। সেই ভস্ম থেকে পুনর্বার জন্মগ্রহণ করি আমি। আমার কোনো পিতা নেই, আমার কোনো মাতা নেই, তুমি আমাকে জন্ম দাও।
এই বলে জ্যোৎস্নাবতী খুঁজে খুঁজে একটা পাতি হাড় বের করে। হায় হায় এই যে আমারও একটা পাতি হাড় ছিলো। সেই পাতি হাড়ে পাখি বসে। পাখিরা গান করে। পাখিরা ডাকে দাদী আম্মা গো।
-মানব কোথায় তুমি
-কোথায় আমি জানি না তো? কোথাও কি ছিলাম কখনো? হয়তো ছিলাম হয়তো ছিলাম না। কিংবা ছিলাম বোধহয় মেঘের ওপারে। ওই যে রামগিরি পাহাড় দেখা যায়। ওইখানে শূন্যস্থানে ঝুলে আছে এক সুদৃশ্য জানালা। দেখা যায়! সেই পাহাড়ের সানুদেশে বয়ে যায় স্বচ্ছতোয়া- লাবণ্যবতী। অহো লাবণ্য! লবণকুণ্ড। এতো এতো রোদ চারিদিকে! তোমার ত্বক ভেদ করে ঢুকে পড়েছে সেই রোদ। লবণকুণ্ড! তুমি গলে যাচ্ছো। আমার সিনার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে পৃথিবীর বায়ুকুণ্ড। আমি সিনা ভরে বাতাস নেই, আমি সিনা ভরে লাবণ্য প্রভা নেই। আমি লাল সিরাজে চুমুক দেই, আমি লাল সিরাজ পান করি। আমি লাবণ্য প্রভা পান করি।
-এতো তেষ্টা কেন তোমার মানব! মাঝে মাঝে আমারও খুব খেতে ইচ্ছে করে। আমি জ্যোৎস্না খেতে চাই, কিন্তু কে যেন আমার কোচর ভরে কাঁকর তুলে দেয়। আমি কাঁকর খেতে থাকি। ছাই খেতে থাকি। খেতে খেতে আমার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল খেতে ইচ্ছে হয়। আল্লাহর আরশ খেতে ইচ্ছে হয়।
-তুমি আমাকে খাও। চলো আমরা পরস্পর পরস্পরের খাদ্য হই।


০৭.

ধমনীতে মহাকালের কান্না শোনা যায়...
ঈশ্বর বলেন, স্তুতি করো, আমি স্তুতি করি তাহার; আমার আপন ঈশ্বরের। প্রতিরাতে হাড়ের অগ্নিতে উৎসবের আয়োজন করি। হায় ঈশ্বর! তার এই নীরবতা আমি কী করে সহ্য করবো। আমি কি তবে মৃত্যুর দিকে হাত বাড়িয়ে দেব। কিন্তু তিনি তো কেবলই আমার পথ রোধ করে দাঁড়ান। আমি তো আমার মরণ কবেই লিখে দিয়েছি তারে, নিমের আখরে। নিজেকে হত্যা করতে পারি না আমি। কেননা আমাকে হত্যা করা মানে তাকে হত্যা করা। আমি তো তাকে হত্যা করতে পারি না।
...খুলে গেছে বিস্মৃতির জানালা। নীল-নক্ষত্রেরা বলে গেছে আমারও ডানা ছিল। নাকি আমিই সেই নীল ডানা যা কেবলই দীর্ঘ হতে থাকে। নৈর্ব্যক্তিক আলো-অন্ধকারে পড়েছিলাম ফুটন্ত কয়লার পাশে অনিন্দ্য মগজ। কাটা জিহ্বা নিয়ে পালিয়েছে অলীক নারীরা। পৃথিবীর মাঠে মাঠে অলৌকিক ভোজসভা। সর্বভূক পতঙ্গেরা আসে। মানুষেরা নিয়ে আসে বিগত নখর; মাংসাশি দাঁত। 
হায় হরপ্পা মানব
তোমার পথের সামনে পড়েছিলাম
পারস্য উড়নি সরিয়ে চিনে নিতে পারো নি তো!


০৮.

অন্তহীন পথ পাড়ি দিয়ে কোথায় চলেছি আমি! এই পথে কেউ কি হেঁটেছিলেন কখনো?
হোঁচট খাই।
তবে কি তারে আমি ভালোবাসি। হায় কোনো মানবকে ভালোবাসা কি আমার পক্ষে সম্ভব। আমি যে লগ্নবিচ্যুত নক্ষত্র কন্যা। আমার জন্মের মুহূর্তে দেবীমাতাগণ ভাগ্য গণণা করে বলেছিলেন এই মেয়ে অভিশপ্ত। এই মেয়ে কবিতা লিখবে।
হায়! না নারী! না নক্ষত্র!
তাহলে তাকে আমি কী করে বলবো ভালোবাসার কথা!
কী করে তাকে বলবো, আমার হৃৎপিণ্ডে মুখ রাখো মানব, আমার রক্ত পান করো। পাঠ করো আমাকে আনখশিখ। পান করো আকণ্ঠ। তোমার জীবনে একমাত্র হয়ে উঠতে চাই আমি।’ এই ঘর, এই বাহির, এই রাত, এই দিন আমি কেবল তার কণ্ঠস্বর তালাশ করি। 
‘কী তালাশ করো তমি জহুরার বনে? এই দ্যাখো আমার বুকের মাঝে পরান পরিন্দা তোমার।’
হায়! ভালোবাসা শব্দটি তো দীর্ণ কেন? আমি কি তাকে বলবো, হাড় খুলে দিচ্ছি তোমায়!
ভেসে গেছে পৃথিবীর সমস্ত ভুলের নদী।
অন্ধকারে জেগে থাকে চাঁদের আকর।
কী হতে চেয়েছিলাম আমি! কবি হতে! নারী হতে!
সদ্য ধোয়া চাদরের মতো ভোর এখন কালিয়ান গ্রামে। বাতাসে বিগত রাতের জলের গন্ধ লেগে আছে। নদীর ঘাটলায় বসে থাকতে আমার ভালো লাগে। স্রোতের টানে দু’একটি কচুরীপানা ভেসে যেতে দেখে বুঝতে পারলাম জল বাড়ছে বংশাইয়ের। নীল নীল ফুলের পাপড়িতে হলুদ ফোঁটা দেখে আমারও নীলাম্বরী হতে ইচ্ছে হয়। আমার ভালো লাগতে থাকে। কতোদিন অমন ভোর দেখি না আমি।! কতোদিন ঘুমে বিবমিষায় জীবন অতিক্রম করেছি আমি ঠিক হিসেব মেলাতে পারি না। বুকের ভেতরে মহাসমুদ্রের জলরাশির মতো কথামালা জমে আছে,কুণ্ডলী পাকাচ্ছে।


০৯.

কতোকাল ঘুমিয়ে ছিলাম আমি! কতো সহস্র চন্দ্রবর্ষ!। আমি কি ঘুমিয়ে ছিলাম নাকি জেগেই ছিলাম জরথ্রুস্ত্রের মতো!
নিঃসঙ্গ
একাকী
নির্জন বনপ্রান্ত ধরে আমি হাঁটছি। নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্মের মধ্যে যেন নিজেকেই নতুন করে খুঁজে পেলাম। নির্জনতার আনন্দ পান করলাম দু’হাত ভরে। মধ্যাহ্নের সূর্যের আলো শত টুকরো হয়ে বৃক্ষের শাখায় ঝুলে আছে। একটি পুরাতন বৃক্ষের গাযে হেলান দিয়ে বসলাম। বৃক্ষটির রসালো ফল দেখে আমার ক্ষুধার উদ্রেক হলে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। নির্জন তৃণের কুসুমে ও গোপনতায় আমি ঘুমিয়ে যাই। কিন্তু আমার মস্তিষ্ক ঘুমায় না।
শান্তি!
এই মুহূর্তে শান্তি কামনা করা ছাড়া আর কিছু চাইবার রইল না আমার। সে ধীরে নোঙর করছে আমার আত্মার ভেতর। শান্তি!
সে আমায় ছুরিকাঘাত করে।
শান্তি!
ছুরির তীক্ষ্ণ প্রান্ত আমার হৃদয় স্পর্শ করে।
শান্তি!
আমি ভেঙে যাচ্ছি চূর্ণিত পাথরের মতো।
ওম শান্তি!


১০.

অবশেষে মহাকালে নিজেকে সমর্পিত করে আমি উঠে দাঁড়ালাম। বিধ্বস্ত পৃথিবীর বুকে বিছিয়ে দিয়ে সমস্ত ভুল ও বিবমিষা। হে আমার পৃথিবী, আমি জেনে গেছি এখানে আমার আগমন কেবল অনন্ত ক্লেশ ভোগ করবার জন্য। হৈ হৈ আলোর বন্যায় উৎসবের আড়ম্বরে ভেসে যাওয়া আমার কর্ম নয়। আমি কেবল তারে তালাশ করি। কোথায় পাবো তারে? পর্বতশীর্ষে! নাকি সমুদ্রের তলদেশে! পাতার ধার ঘেঁষে গড়িয়ে পড়া যে শিশির সেইখানে কি তবে তিনি বাস করেন? বহু ব্যর্থ পর্যটন আর অনুসন্ধান মাড়িয়ে মাড়িয়ে আমি পথ চলি।


১১.

আদিম অগ্নিকুণ্ড সারারাত ধিকি ধিকি ধিকি জ্বলে
আমাদের নৃত্য-উৎসবে যাওয়ার কথা ছিল। বদ্ধ জানালার ওইপাশে সারি সারি প্রসাধিত মুখ। বিম্বিত কাচের ফলকে মৃত আত্মীয়দের এপিটাফ। কোথাও যাওয়া হয় না আমার। আমি অনঢ় অচল হয়ে বসে থাকি। কোথাও কি গান বেজেছিল! তার অলৌকিক উষ্ণতা আমায় আগলে রাখে-বেঁধে রাখে গৃহ পরিয়াল সাপের মতো।
হে আমার মুগ্ধতা, তুমি বৈভব দেখাও। এখন রজনীর নিষিদ্ধ প্রহর। সমস্ত ঢাকনা খুলে গেছে সৌরভের। সেইসব উজ্জ্বল বন; সুবর্ণ কলস আজ বড়ো অপ্রাকৃত মনে হয়। বিগত দিনের পাপ ও ক্ষত ধুয়ে ফেলেছি লবণ-জলে। জলজ আগুনে পুড়ে যাচ্ছে পাতার শরীর। ঈষৎ স্মৃতি উদ্রেককারী নারীরা মুছে যাচ্ছে ধীরে। যে নারী তোমার সামনে গোলাপ মশাল হাতে দাঁড়িয়েছিল ভিখারীর মতো সে আজ অপসৃয়মান অন্ধকারে। তুমি কি ভুলে গেছ নিটোল রাত্রি কথন, অব্যক্ত আগুন!
মৃত্যু কেন এতো ভালো লাগছে আমার! বিকেলের শতরঞ্জিতে আসন পেতেছে ছায়ার শরীর। তোমার দরোজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি শীতার্ত মানবী। আমি তখন আত্মহননের সবকটি উপায় খোঁজ করছিলাম। যুৎসই মনে হচ্ছে না কিছুই।
নাইলনের রশি!
স্লিপিং পিল!
নাকি দরোজা-জানালা বন্ধ করে গ্যাস ছেড়ে দিয়ে আগুন জ্বেলে দেব? তার চেয়ে বরং ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে ফেলি কব্জি থেকে ধমণীটি।
কী হয়েছে আমার! সে কি আমায় কোনো অচীন বৃক্ষের পাতা বেটে খাইয়েছে! কোন বৃক্ষের পাতা এটি! আমার শরীর আর শরীর থাকে না। এ কেমন শরীর! পুড়ে গেলেও ব্যথা লাগে না। কেটে ফেলা আঙুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত মেঝেতে জমে যাচ্ছে। আমি সেই সুনিপুণ শিল্পের দিকে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি।
মানব, আমার মরণ হয় না কেন? আমি জানি যতক্ষণ তুমি আমার হৃৎপিণ্ডে মুখ না রাখবে ততক্ষণ আমার মৃত্যু হবে না।
মানব, তুমি দৃশ্যমান হও। তোমার অনুকৃতি খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত ভৈরবী। রক্তের ভেতর দানার মতো বেড়ে ওঠে বর্ণিল দুঃখ। 
তুমি কি জানো, কতো কতো কাল আমি পৃথিবী ভ্রমণ করেছি নিতান্ত আগুন্তকের মতো। আজ মনে হলো গৃহে ফিরে এসেছি। তুমিই নিয়ে এসেছ আমার হাত ধরে। মনে পড়ে, যতোবার পিতার সম্মুখে দাঁড়িয়েছি উদগত কান্না আমার কণ্ঠরোধ করেছে বারবার।


১২.

দৃশ্যত কোথাও কোনো অন্ধকার নেই। কেবল রাতের নৌ-যানে সওয়ার হয়েছে মধ্যবিত্ত বাহানা সকল। আমাদের ঘরের পাশে মনসার বিল। আমি জানান দিতে চাই আমি আছি। অথচ আমার অস্তিত্বে মাংসের দাগ লাগবার পূর্বেই আমার হাত আটকে যায় মাতৃজরায়নের ভেতর। ছিলাম তো চূর্ণ জল; নিরাকার। তৎপরে তা পরিণত হলো বংশাই নদে। দুরন্ত অথচ ছিলাম ষড়ঋতুর মতো বধির। আমি জানি চন্দ্র কিংবা সূর্যের বানান! আমার মাংসের আড়মোড়া ভেঙে যেতে থাকে দ্রুত। পতিত নক্ষত্র কিংবা বৃষ্টির কম্পঙ্কের গান গেয়েছিলাম আমি। যা ছিল একান্তই আমার পিতার জানা...আমি কেবল জানতাম শীতের আগমনী বার্তা; তীক্ষ্ণ ফলার মতো বিঁধে যাওয়া শীতের কণা। সহোদরার ওড়নার মতো বাতাস আমাকে দোলাতো। 
হায় নরকের শিশির!
প্রান্তিক বায়ুতে আমার শিরাগুলো লাফাতে থাকে। তবু একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে পেয়ে গেলাম দিন ও রাতের ধারণা। 
মানুষের সীমান্তরেখা মুছে যাচ্ছে দ্রুত...
আশ্চর্য ভোর আজ! এইখানেই কি কুড়িয়েছিলাম শেফালির পালক!

ফিরে আসি নিমগ্ন নির্জনতায়
কর্তিত মুণ্ডের ওপর পা ফেলে
আমার কোনো নাম নেই 
তবে কী নামে ডাকলে আমায়!
আজ সারাদিন একলা
আজ সারা দিন অদ্ভুত মাতাল
তটস্থ রোদের চোখে লিখে রাখি গোপন কবিতা।
বর্ণাধার ভেঙে ভেঙে জড়ো করেছি অন্ধকার
পদচ্ছাপ মিলিয়ে যাচ্ছে বন্দরে বন্দরে...
তবে কাকে অনুসরণ করেছি এতোদিন!
পাথরের পরী জেগে ওঠে
‘দ্য মেটিং অব টু লস্ট সোলস’
মাইগ্রেশনের দিন চলে আসছে
তারা জানে নদীর ওইপারে যেতে হলে কুমীরের ভয় আছে
তবু যেতে হবে
কেননা তৃণ নিঃশেষ
যেতে হবে দ্রুত...

আমি তার নাম ধরে ডাকি। আই অ্যাম স্টিল সারাউন্ডেড বাই দ্য শ্যাডো অব দ্য বার্ড...
অনন্তের আচ্ছাদন হতে বেরিয়ে এসেছে অভিজাত পক্ষীকুল যতো
দাঁড়িয়েছি মশাল হাতে সারি সারি
জেনে রেখো প্রিয় আদম সুরত
আমিই সেই আদিকন্যা অন্ধকারের 
এইখানে আসমান এইখানে বিভ্রম গলে যায়...
গলে যেতে থাকে
অহো মানব! 
অনন্ত প্রেম আমার!
তোমার আলোকিত ডানার স্পর্শে অমর হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কতো যে বিভ্রম তা জেনে গেছি। তুমি আমায় বলেছিলে সেই সাঁওতাল নারীর কথা। পুরুষ তাকে স্পর্শ করেছিল বলে সে নাকি তার দেবত্ব হারিয়েছিল। আগে যে মাছেরা তার সঙ্গে কথা বলত তারা আর তার কাছে আসে না। আমিও নাকি দেবত্ব হারিয়েছি। হায় ঈশ্বর! তুমি কি সেই মানব আমার! আমার ঘৃণা জাগে। আমার ক্ষোভ জন্মে। তোমার তথাকথিত দেবত্ব থেকে আমাকে বিচ্যুত করার কথায় আমার মনে তোমার জন্য করুণার উদ্রেক হয়। 
শোনো মানব! 
আমি দেবী নই। আমি নারী। আমি মানবী। যে নারী কেবল ভালো বাসতে জানে। 
আবার আমাকে পথ হাঁটতে হবে...অন্তহীন সেই পথ। আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমারও অনেক কাজ আছে। আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমাকেও শ্লোক রচনা করতে হবে। আমি ভুলে গিয়েছিলাম শিল্পের পথ। ভুলে গিয়েছিলাম কোনো পথই মসৃণ নয় আমার জন্য। 
আমি বেঁচে থাকি...
অন্তর্গত উষ্ণতা নিয়ে আমি বেঁচে থাকি…



0 comments:

Post a Comment