একটি গল্পের শুরু কিংবা শেষ



কখানা নদী খুঁজছি অনেকদিন ধরে। নিঃশব্দে, একান্তে, বড় একান্তে ঝরে যাওয়া সে নদী। তারপর সমস্ত শহর অবশেষে  একদিন জেনে যায় মোহানা হারিয়ে ফেলেছে সে নদী। অতঃপর কিছু দীর্ঘ্যশ্বাস জমে যায় বুকের বামদিকে। তারপরেও সন্ধ্যে নামে তোমার আর আমার এই শহরে। রাতের বিষন্ন বাতাস সমস্ত শহর হেঁটে একদিন জেনে যায় ফুল হাতে ফিরে গেছে কেউ কাউকে কিছু না বলেই তোমার ছায়াপথ থেকে দূরে। গোধুলীবেলার ট্রেন শোঁ শোঁ করে বয়ে যায় গন্ত্যবে। লন্ঠন জ্বেলে যে যার মত পৌঁছে যাচ্ছে নিজস্ব আলোর কাছে। কিন্তু যে পথিক পথ চেনেনা, কেবল তারই আর ফেরা হয় না।

মাথার মধ্যে যে নদী আমি তার কথা লিখে রাখতে চাই
আমি তোমার রেশমের মত চুলের কথা লিখতে চাই
তোমার গালের আভা, ঝিলিক আজও আমায় সুখে রাখে
কি ভুল আর নষ্ট ছেলেবেলা কাটিয়েছি
মরুভুমিতে আজ আছড়ে পড়েছি আমি...
আমার কবিতায় কোনো বারান্দা নেই...।

এখন অঘ্রানের ঘ্রান এখানে; এই লোভে বারবার ফিরে আসি। আমাদের নিরালা উঠোনে আজও বিকেল নামে। পাখিরা তোমার নামের খরকুটো নিয়ে ফিরে যায় ঘরে। বিডন স্ট্রিটের মোড়ে সন্ধ্যেবেলা তোমায় মনে পড়ে। তোমার ম্লান কিশোরী মুখ... আমাদের কাঠের বাক্সে থাকা হারমোনোনিয়াম আমাদের ভুলে যাচ্ছে...ইদানিং পথে অনেক কিছু কূড়িয়ে পাই, যেমন সেদিন হিটলারের একটা ডায়েরি পেলাম, আচানক বিষয়- সে ডায়েরিতে মানুষের কথা লেখা আছে সাথে প্রেম ভালবাসার কথাও।

জানিস বকুল, একটা বৃষ্টির খুব দরকার। আর বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে, রোদ্দুরে ঝড়ে ভয়ংকর বীভৎস নৈশব্দে কাঠের গুঁড়ির মত পড়ে রইলাম আমরা স্তব্ধতা আর নৈশব্দের মধ্যবর্তি অংশে। তোমার চুড়ির শব্দ, কি নিঃশব্দে,বুকে তুলে দিল ঢেউ।

থাকুক না কিছুটা কালো রং আলোর জোছনায়
কিছুটা মেঘ,
কিছুটা মরচে ধরার আকরিক যন্ত্রনা।
চুপচাপ বসে থাকা আর কিছুটা গভীর জলে
শ্যাওলা ছায়া।
থাকুক না ; অন্যমনস্ক পাতার আড়ালে বাদামী রং... 

থরে থরে নেমে আসুক ফোঁটা ফোঁটা সব -
তবুও থাকুক নোনা জল
পৃথিবীর দ্রাঘিমায় -

একটি মৃতপ্রায় নদীর মোহনায় জেগে উঠা চরে
থাকুক না ; কিছুটা বালুতট।
থাকুক না কিছুটা কালো রং আলোর জোছনায়....

যে শূন্যতার কথা বলে মানুষ, তা কি শুধু শূন্যই আসলে? এক একটা রাতের স্বপ্নে গল্প থাকে। কোন রাতে নদী। কোন রাতে পাহাড়। এক রাতে নক্ষত্রের বৃষ্টি দেখেছিলাম। অনেকদিন হয়ে গেল বৃষ্টি আর আসে না। সেই কবে কেউ লিখেছিল লাল কালিতে। সময় ফুরিয়ে যায়, ফুরিয়ে যায় বইয়ের ফাঁকে রাখা ন্যাপথালিনের গন্ধ। আমার মনে পড়ে যায় বিশু পাগলার কথা, যে চাঁদ ধরতে গিয়ে দু'তলা থেকে ঝাপ মেরেছিলে। আমি জানিনা মাটিতে পড়ার আগে পর্যন্ত্য সত্যিই কি সে চাঁদকে ছুঁতে পেরেছিলো। বড্ড ময়লা জমে গেছে এই মনে। 
আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত বিশ্বাসঘাতকেরা একদিন ফুল হয়ে জন্ম নিক। বুকের ভেতর যে ছোট্ট একটা ফুল লুকিয়ে থাকে, সেই ফুল  তুলে নেওয়ার যন্ত্রনা ওরা সেদিনই বুঝতে পারবে। 


উড়ন্ত পাখি লাফ দিয়ে ধরার শখ কয়জনের থাকে? এই প্রশ্নটা আমার মনে যখন প্রথম এসেছিল, তখন আমি দেখছিলাম – একটা মেয়ে শিশু লাফ দিয়ে পায়রা ধরার চেষ্টা করছে। পায়রাটি একবার কার্নিশে বসে তো তিনবার মেয়েটির মাথার কাছাকাছি উড়াউড়ি করে। তাই পায়রাটি যে দুষ্ট ছিল সেটা আমি আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। আর বুঝতে পেরেছিলাম মেয়েটির চোখ কেন বারবার ছোট হয়ে এসেছিল। এমনও হতে পারে, অনেকদিন ধরে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠার ছেঁড়ার পর আমি একটা কবিতা লেখা শেষে বলতে পারি - এই বেশ ! আর নয়, পৃথিবীর মৌনতার আজ হোক শেষ। 

আচ্ছা, তোমাদের পৃথিবীটা কেমন হবে একটু বলতে পারো আমাকে? মাঝে মাঝে বড্ড
জানতে ইচ্ছে হয় যে! বলো দেখি, কেমন হবে তোমাদের ছেলেবেলা? যেদিন বৃষ্টি পড়বে,
বাইরে খেলতে যেতে না পারলে কি নিজেরাই নিত্যনতুন খেলা বানাতে বসে যাবে ঘরের
কোণায়? আমাদের মতন সুর করে বলে উঠবে নাকি, “একটা নতুন কিছু করি…”? আর অন্য দিনগুলিতে, ছুটোছুটি করে খেলতে গিয়ে হঠাৎ আছাড় খেয়ে হাঁটু আর হাতের ছাল উঠে গেলে ঠোঁট ফুলিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠবে? নাকি এই ফাঁকে কেউ ছুঁয়ে দিলেই গোটা খেলাটা বরবাদ হয়ে যাবে, এই ভয়ে ব্যথা ভুলে কোনমতে কান্না গিলে উঠেই আবার পড়ি কি মরি করে ছুটবে? আমরা যেমন করতাম?
আবার ধরো, কোন এক ছুটির দিনে ঘুম ভাঙার পর থেকেই তোমাদের কারো হয়তো মন কেমন করা শুরু হল, হবে তো এমন? সকাল গড়িয়ে দুপুর আসবে, তারপর বিকেল; মাঝরাত অবধি একদম অকারণেই কান্নাটা শুধু শুধু দলা পাকিয়ে উঠতে থাকবে কি গলার মধ্যে? কিছুই ভাল লাগবে না কিন্তু কেন যে লাগবে না সেটাও জানবে না, আমাদের যেমন
হয়।

কোন একদিন বাসায় তোমাদের কাউকে একা রেখে সবাই কাজে বেরিয়ে গেলে, বিপুল উত্তেজনায় সেও কি নিষিদ্ধ সব কাজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবে? আচারের
লুকোনো বয়ামটা, মোড়ের দোকানের লবণ ছিটানো তেঁতুলের ঢেলা কিংবা সাদা আর
গোলাপি ডোরার দারুণ মিষ্টি লজেন্সগুলো, অথবা ফেরিওয়ালার  রকমারি কটকটি কিংবা ছোট্ট গোল মিষ্টি তুলোর বলগুলো সব – থাকবে তো সে সময়ে? আমাদের সময়কার মতন?
আর স্কুলের পড়াতেও কি একদমই মন বসবে না তোমাদের, শুধুই মনে হবে কখন টিফিনের ঘণ্টাটা বাজবে? কারণ তখন দৌড়ে গিয়ে ভিড় ঠেলে গেটের ফাঁক
দিয়ে আমসত্ত্ব কিংবা বার্মিজ আচার কিংবা ফুচকা-চটপটি কে কার আগে নিতে পারে সেই প্রতিযোগিতা চলবে? আবার পড়তে ভাল লাগে না বলে তোমাদের
জন্যও কি অমন কোন ছড়াগান থাকবে, ঐ যে, “হঠাৎ যদি পৃথিবীটা এমনি হত,
মাস্টারেরা পড়ালেখা ভুলে যেতো… হতো যদি ঘূর্ণিঝড়, উড়ে যেত স্কুলঘর…”?
আমাদের যেমনটা ছিল?
আরেকটু যখন বড় হবে, তখন কেমন হবে তোমাদের সেই পৃথিবীটা? আমাদের মতই
থাকবে না নিশ্চয়ই? সে সময় কেমন গান গাইবে তোমরা বলো তো শুনি! কেমন গান
শুনবে? মন খারাপ হলে “সকাল আসে না, আয়না হাসে না…” বলে গাইবে কেউ তোমাদের
জন্য? আর মন ভাল থাকলে তখন? তোমাদের কেউ কি কখনো বলে উঠবে যে সে “আজকালকার গানে” সুর খুঁজে পায় না, নাকি সুরের নতুন কোন সংজ্ঞা থাকবে তখন? সুর শব্দটাই কি থাকবে আদৌ?
কোনদিন বৃষ্টির পর আকাশে রামধনু দেখে কি তোমরাও আনন্দে অধীর হবে,
আমরা যেমন হতাম? অথবা কখনো ধরো একসাথে দুটো রামধনু দেখা দিল, সেদিন কী হবে? বাঁধ ভেঙে যাবে না আনন্দের? তারপর হয়তো আরেকদিন খটখটে রোদের মাঝেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো, তোমরা কি সেদিন সেই ছড়াটাই কাটবে? আমরা যেটা কাটতাম? একদিন হঠাৎ একটু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে আর কোন কাজ না পেয়ে যখন কী করা যায় ভাববে তোমাদের কেউ, তার কি তখন হঠাৎ মনে পড়বে যে কতদিন পরিষ্কার আকাশে ঘুড়ি উড়তে দেখে নি সে? অথবা মেঘেদের পাল্লা দিয়ে রঙ আর আকার
পালটানো নিয়ে গবেষণা করা হয় না কতদিন? আবার সে রাতেই তারাজ্বলা আকাশের
দিকে তাকিয়ে মনে হবে কি, কতদিন আকাশ দেখি না? নাকি আকাশ কাকে বলে তা-ই জানবে না তোমরা? আমাদের অদেখা তোমাদের সেই পৃথিবীর সবকিছুই কি বদলে যাবে সেদিন, পালটে যাবে নাকি অনুভূতিগুলো? সেই পরিবর্তনের কথা তোমরা জানবে হয়তো বা কোনভাবে, বই পড়ে অথবা তা না থাকলেও তেমনি কিছু পড়ে কিংবা শুনে; কিন্তু বুঝতে পারবে না, বুঝবে কেবল তারাই আমাদের মাঝ থেকে যারা তখনো টিকে থাকবে? কিন্তু সত্যি সত্যি সবই কি বদলে যাবে, নাকি এমনটা হওয়া সম্ভব, বলো তো? আমরা তো চাই তোমাদের চোখও অকারণেই ভিজে উঠুক কখনো, আর মনটা শুধু শুধুই খারাপ
হয়ে থাকুক। তোমাদের কারো অভিমান হোক অন্য কারো ওপর আর তখন তা ভাঙাতে ব্যস্ত হয়ে উঠুক সেই অন্যজন।

পথে হেঁটে যেতে যেতে দখিনা বাতাস ছুঁয়ে যাক তোমাদেরও, আর তখন কেউ বা কারা সে বাতাস নিয়ে গান-কবিতায় ভরে তুলুক তোমাদের জীবনটাকে। তারাজ্বলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়ুক তোমাদের বিবর্তিত মন। সারাজীবন একলার ভেবে আগলে রাখা মনটায় ভাগ বসাতে আসুক তোমাদেরই কেউ। চলতে- ফিরতে-গাইতে পুরনো পৃথিবীর শব্দ-বর্ণ-গন্ধ চিহ্ন এঁকে দিক তোমাদের শরীরে আর মনে। আদি থেকে অন্তের যত সব পৃথিবীর স-অ-ব  বাসিন্দাদের সাথে তোমরাও একই সুতোয়
গাঁথা হয়ে থাকো অনন্তর…থাকবে তো?



0 comments:

Post a Comment