এক ছন্নছাড়া বিকেলের গল্প



আমিতো জানতাম, আমাকে জানিয়েছিলো বুকখোলা ধারালো এক গ্রাম, পথ পেয়ে গেছে যদি বিষন্ন দুটি পা, তারা হেঁটেছিলো ছলছল ভীরু নদীটির পার ঘেষে, নদীটা গ্রামের হাতে ভার দিয়েছিলো তার, আর যতসব মাছেরা, মাঝে মাঝে তারা জল মরে গেলে, কড়ির অতিথি।
সর্ষে ক্ষেতের ভেতর যেদিন, যেসব অসময় আমি আমাকে নিয়ে হাঁটছিলাম, আমাকে জানিয়েছিলো সেই গ্রাম… তুমি পাতা কাঁপানো দুঃখী একটি পাখি!
কোনও এক মৌ ঝরা সময়ে একদিন বুনোফুলের গন্ধ লেগেছিল আমাদের চৈত্রের আকাশে ।এখন দিন বদলে গেছে, হয়তো আর ফিরে যাওয়া হবে না সেই নাম ভুলে যাওয়া বনে। তবুও সেখানে আগ্রাসী হাতগুলো পৌছতে পারে না, সেখানে অন্তত বেচেঁ রইল গন্ধটা এক মৌ ঝরা বাতাসের গায়ে ।

সাজানো কুড়েঘরের সেই বধুয়া বারান্দায় এক চিলতে টেউ নিরন্তর বয়ে চলে আঁচল ঢাকা মুখখানির হাটুজল স্মৃতি নিয়ে । তবুও, সন্ধ্যা হলে যে আমি অবিরাম হাঁটতে থাকি তা হলো আমার ঘরে ফেরার চেষ্টা।। অথচ অনেকবার চেয়েছি পাখির শিসের বাঁকবাঁকে জীবনটাকে মিশিয়ে দিই। আমার যাদুর ঝাঁপি, আমার জমানো পুঁজিপাটা, তাতে আর কিছু নেই, আছে শুধু মায়াবীমুকুর; আমার সে আর্শিটা চিরতরে তোমাকে দিলাম। তবুও আমরা পাশাপাশি থেকে যাই। কোন এক বিকেলে হয়তো মেঘপিয়নকে সাক্ষী রেখে মহাকালের যাত্রায় আমিও বিলিন হয়ে যাবো। তখনও তুমি বুঝে নিয়ো - কেউ একজন ছিলো তোমার একলা মনে একলা হয়ে।

মাঝে মাঝে এমন ও হয় নিজের শ্বাসের শব্দকে অচেনা লাগে, নিজেকে মনে হয় সামান্য শাঁখ! যে সাঁঝের আগে আর বৌদির হাতে উঠবেনা, বাজবেনা... হঠাৎ বিভ্রম হয়। বন্ধ ঘর জানালার ওপারটাকে মনে হয় দশ বছর আগের দিন! পায়ে চলা পথ ধরে একটা ঘুঘুর জীবন যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। রাজহংসী বয়সী সেই নারীর মত কেনো আমি আর তার দেখা পাইনা!
কেমন থাকে রোজ ধান কাটা মাঠ। বিভ্রমে শুয়ে যায় শীতের বিকেল। আরেকটু ঘুমুবো আমি, আরেকটি হাতে থাক লুডুর গুটি। ঘুম ভাংলেই যেন পাই তার পুরনো চিঠিটা। লিখছি লিখছি করে যে আজ পর করে দিল- এখানে খাঁজকাটা জাফরী। বিভ্রম হয়। যেন নীল পর্দার ওপাশে তুমি এবং তোমার
ইচ্ছেরা।

মেঘলা দিনের সকালে অকারনে মনখারাপ, কারন খোঁজার চেষ্টা করোনা, পাবেনা। মনে আছে সেই প্রথম ডায়েরী, বা হারিয়ে যাওয়া সেই রাস্তা, বা ফেলে আসা সেই মুহুর্ত? শুধু মনে কর একবার।
দেখতে পাচ্ছ? অকারনের মনখারাপ  ফানুস হয়ে উড়ে যাচ্ছে ভীনদেশে।
মূল গল্পটা আসলে সাদামাটা ছিল না কখনই।
জটিল যতো রহস্য নিয়ে এখনও বয়েই চলছে। সুখী-সুখী স্ট্যাটাসের, আঁকাবাঁকা সেলফিতে কত কিছু লুকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে,লোক দেখানো হাসি হাসছে। তাই বলে এমন না, তারা সুখে আছে। এখনও রোজ সকালে রাশ রাশ বিষণ্ণতা বুকে নিয়ে ঘুম ভাঙে। তারা দল বেঁধে সব ভালো থাকার নামে, "ভালো থাকার" অভিনয় করে।

আজকাল প্রায়ই আমার কোন কারণ ছাড়া বিষণ্ন লাগে। ছন্নছাড়া মেঘের মত বিষণ্ণ লাগে, একলা চিলের মত বিষণ্ণ লাগে, নিশ্চুপ পাহাড়ের মত বিষণ্ন লাগে। বৃষ্টিধোয়া বিকেলে ঠিক তোমারই মত আমারও বিষণ্ন আর একা লাগে। তোমারও কি কখনো এমন হয়? যখন তুমি ক্লাসে অন্য সবার মত একজন হয়ে উঠতে পার না? যখন স্কুলজীবনের মত ভাল ফলাফল করে রেজাল্ট কার্ডটা বাবা-মায়ের  হাতে তুলে দিতে পার না আর তাদের চোখে চিকচিক করে জ্বলতে থাকা আনন্দের জলটুকু দেখতে পাও না? ভালোবাসার মানুষটি কি তোমাকেও কষ্ট দিয়ে চলে যায়? প্রিয় বন্ধুরা কি ভুল করে তোমায় ফেলে আড্ডায় মেতে ওঠে? কাছের মানুষগুলো কি তোমার পেছনে অনবরত তোমায় নিয়েই ব্যঙ্গ করে? পরিবারের একান্ত মানুষগুলো কি তোমায় বুঝতে পারে না কিংবা বুঝলেও ভুল বোঝে? তোমার সহোদরও কি তোমারই সামনে ভুল পথে হেঁটে যায়?

আজকাল প্রায়ই আমার কোন কারণ ছাড়া বিষণ্ন লাগে। তোমার মত ঐ বিমর্ষ একাকী কষ্টের কারণগুলোকে যে আমি কারণ বলেই মনে করি না! তাই আজকাল আমার কোন কারণ ছাড়াই বড্ড একা আর বিষণ্ন লাগে। মনে হয় এই পৃথিবীর বৃত্ত জুড়ে কেবল আমি একা বসবাস করছি। আমি- এমন একজন যে শূন্য, রিক্ত। হয়ত আমাকে সবাই দেখতে পায় তবু জানি আমি শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই নই।

“বড় একা আমি
নিজের ছায়ার মত
শূন্যতার মত
দীর্ঘশ্বাসের মত
নিঃসঙ্গ বৃক্ষের মত
নির্জন নদীর মত
বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত
মৌন পাহাড়ের মত
আজীবন সাজাপ্রাপ্ত দন্ডপ্রাপ্ত আসামির মত
বড় একা আমি, বড় একা “



আমি জানি, তোমার আর আমার মাঝে কোন পার্থক্য নেই। কারণ কম-বেশি আমরা সবাই নিজের থেকে বিছিন্ন, নিঃস্ব হয়ে বেঁচে থাকি। নিজেকে নিয়ত ভাঙ্গি-গড়ি; সমস্ত কষ্ট, না পাওয়ার আড়ালে নিজেকে প্রবোধ দেই। নিজের কাছে নিজেকে শতেকবার বিক্রি করি আবার সস্তায় বিক্রি হয়ে যাওয়া পুরনো সেই আমিকে কিনে নেই নতুন করে।

আমি জানি, তুমি বারবার চিন্তা কর নতুন কোন কষ্টে আর নিজেকে জড়াবে না, কারো অবহেলায় দুঃখ পাবে না, নিজের হীনমণ্যতায় আর একাকী কাঁদবে না। তবু তুমি কষ্ট পাও, দুঃখ পাও, একাকী কাঁদ কেননা তুমি চেষ্টা করেও তোমার চোখের সামনে নতুন কোন ছবি আঁকতে পার না। কারণ সবাই তোমায় বলে যে তোমাকে অন্যদের মত জনপ্রিয় হতে হবে, সুন্দর হতে হবে, তোমাকে দামী কসমেটিকস ব্যবহার করতে হবে, এমনকি প্রয়োজনে সার্জারিও করাতে হবে। তোমাকে সবাই বলে যে তোমায় স্লিম হতে হবে, আকর্শনীয় পোশাক পরে ফেসবুকে চমৎকার সব প্রোফাইল পিকচার দিতে হবে। তারপর ধুন্ধুমার সব স্ট্যাটাস দিয়ে অজস্র মানুষের লাইক পেতে হবে। তোমার পরিবারেও ঠিক তাই ঘটে। সবাই বলে যে তোমাকে ঐ আত্মীয়ের মত সর্বগুনে গুনান্বিত আর চটপটে হতে হবে। সর্বোপরি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমাকে মানুষের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠতে হবে।



কিন্তু জানো, তোমার চারপাশে এঁকে দেয়া এই ছবিটাই ভুল, কেবল মায়াজাল মাত্র। এই ছবির বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে তুমি প্রতিদিন আরও ক্লান্ত হয়ে পড়বে, হেরে যেতে থাকবে, ছবির মত হতে না পারার অসহায়ত্ব তোমাকে কুরে কুরে খাবে।

আজকাল প্রায়ই আমার কোন কারণ ছাড়া বিষণ্ন লাগে। বিষণ্ন হবার মত কোন কারণ আজ আর আমি খুঁজে পাই না, যেমন করে তুমি কিংবা তোমরা পাও। কারণ আমি অন্য কারো কথাকে, সিস্টেমের এঁকে দেয়া প্রোগ্রাম করা পুরো ছবিটাকে আজ আর পাত্তা দেই না। হয়ত তোমার মনে হতে পারে যে এই অভ্যাস তৈরি করার জন্য প্রচণ্ড মানসিক শক্তির প্রয়োজন। কিন্তু আদতে তা নয়, তোমাকে শুধু বুঝে নিতে হবে দুর্ভাগ্যবশত বেশিরভাগ মানুষের ভেতর সতেচনতাবোধের অভাব থাকে। তোমার শুধু মনে রাখতে হবে যে তোমার জীবনে আরো অনেক ছোট ছোট বাঁক রয়েছে পরের অধ্যায়গুলোতে যাবার জন্য। নিন্দুকদের দেখা তুমি সবসময় পাবে, তোমার জীবনের সবগুলো অধ্যায়ে, যে কোন বয়সে।



সবার মত হতে পারাটা বড্ড সোজা আর ঠুনকো। তুমি হবে তোমার নিজের মত, আর কারো মত নয়। আর সে কারণে তোমাকে আরও বেশি শিখতে হবে, আরও বেশি জানতে হবে, আর এই শেখা আর জানার জন্য কেবলমাত্র প্রচুর বই পড়তে হবে। নিজের চিন্তাশক্তিকে উজ্জীবিত করতে, নিজের ভেতরে নতুন চেতনাবোধের চাষ করতে, পুরো বিশ্বাসের প্রক্রিয়াকে পালটে দিতে, নিজের দুর্বল বোধের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আর সেই লড়াইয়ের শক্তিকে মনের ভেতর সঞ্চয় করে রাখতে দরকার দক্ষতা, যা কেবল শেখা আর পড়ার মাধ্যমেই সম্ভব।



যখন সবকিছু তোমার বিপরীতে যাবে তখন এই সবকিছুর বিপরীতে কখনো উদাসীন হবে না। কারণ এই উদাসীনতা, আক্ষেপ, যন্ত্রণা এগুলো বেশ সহজ বরং এই সবকিছুর বিপরীতে উঠে দাঁড়ানোটাই কঠিন, যার জন্য দরকার সাহস ও উদ্যম। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হল তোমার মাঝে এই দুটোর ভেতর অন্তত একটা গুনাবলীর অস্তিত্বও ঠিক সেই বিষণ্ন মুহূর্তে থাকবে না। সবচেয়ে বড় কথা, এই একা উঠে দাঁড়ানোতে তোমাকে কেউ কোনদিন ধন্যবাদ জানাবে না। তাই যখন তুমি একা লড়াই করতে করতে ভেঙ্গে পড়বে, ক্লান্ত হবে তখন কোন এক শরতের বিকেলে কোন এক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ছায়ায় আমাকে খুঁজে পাবে। আমি তোমার জন্য সেখানে অপেক্ষা করে থাকব কারণ আমি জানি, তুমি এমন একটা কাজ করেছ যেটা সবাই পারে না, আমরা কেউ পারি না, আমরা কেউ পারি নি।

আজকাল প্রায়ই আমার কোন কারণ ছাড়া বিষণ্ন লাগে। বিষণ্ন হবার মত কোন কারণ আজ আর আমি খুঁজে পাই না। বিমর্ষ, অন্ধকারাচ্ছন্ন, নিশ্চুপ শরতের মৌনমুখর মেঘগুলোর হয়ে তাই আজ আমি একাকীত্বের লড়াইয়ে জয়ী হওয়া এই তোমাকে বলছি,

‘তোমায় ধন্যবাদ, কেবলমাত্র তুমিই তা করে দেখিয়েছ, যা আমি-আমরা কেউ কোনদিন শিকল ছিঁড়ে করে উঠতে পারি নি!’



0 comments:

Post a Comment