খুঁজছি আমি খুঁজছি তোমার ঠিকানা



মাদের বাগানের কিশোর ঘাসেদের মন ভালো করে দিত যখন যুবতী চন্দ্রমল্লিকা, তখন অর্ধনির্মিত দোতলার ছাদ থেকে কলতলা দেখতে দেখতে ভাবতাম একদিন ঠিক শীতের রোদ হয়ে যাব, খেলে বেড়াব শিল্পী গাছেদের ডালের সাথে।
‘যাদের’ প্রথম ভালবেসেছিলাম তারা অনেক নাম রেখে গেছে জীবনে, অনেক মানুষের অনেক গল্প। এই গল্পগুলো যখন জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে পড়ত একে অপরের সাথে তখন আমার সারারাত ঘুম আসতো না। চিঠিরা আত্মহত্যা করেছে ততদিনে, যৌনতা অনেক রাত করে বাড়ি ফিরে বিষণ্ণ হয়ে শুয়ে পড়ে পাশে, মরে যায় একের পর এক সহজ মানুষ, যাওয়ার আগে চুপি চুপি কেড়ে নিয়ে যায় আমার কোন প্রিয় রঙের শিশি, কোন প্রিয় শব্দের আদর।
মাথার কাছে নিয়ে ঘুমনোর মতো মানুষের মুখ হারিয়ে যায়, জীবন নামক প্রেমিকার কাছে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে একএকদিন খুব মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরে শুয়ে পড়ি পৃথিবীর খাটের তলায়। আকাশগঙ্গা দেখা করতে আসে, দেখা করতে আসেন আনুবিস।
আমার মাথার মধ্যে তখন ক্রমাগত বেজে চলে মাইলস ডেভিস, লুইস আর্মস্ট্রং, বিলি হলিডে, ন্যাট কোল কিং। চোখ থেকে শব্দ ঝড়ে পড়ে, খুব ভয় করে, হাতড়ে পাই না বামদিকের বাবাকে, ডানদিকের মা কে।

আমারও কি আশা ছিল না সমস্ত বিকেল বন্ধুরা মিলে যখন ভাঙা দুর্গটায় মিলে ফড়িং ধরতে যাব তখন ভেঙে পড়বে না কোনও মিগ যুদ্ধবিমান, আমারও কি আশা ছিল না রোহিঙ্গা শিশুটির পেটের মধ্যে হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাবে না কোনও রাষ্ট্রনায়ক, আমারও কি কেবল ঘৃণা করার কথা ছিল? আর ভালবাসা? কেবল বিচ্ছিন্নতা? আর বিশ্বাস? আমারও কি অন্ধের মতো সকলকে বিশ্বাস করার অধিকার ছিল না?

জীবনকে আজকাল খুব ভয় হয়, স্বপ্নটাও আচমকা ধর্ষক হয়ে যায় বা ধর্ষিত।খুব ভয় হয় জীবন থেকে বেশি যদি কিছু চেয়ে ফেলি। যদি অধিকারের বেশি কিছু চেয়ে ফেলি আচমকা?

কারো থেকেই আমার হয়ত আর কিছু চাওয়ার নেই। পেছন থেকে যাদের ছুরি মারা হয় তারা সকলেই বেঁচে থাকে শুধু তাদের আর কিছু চাওয়া হয়ে ওঠে না কারোর থেকে কখনো বিশ্বাস, শুধু শব্দটুকু নয়।প্রতিদিন বিশ্বাস তার পুরনো দালানবাড়ির মতো গন্ধ নিয়ে ঠোঁটের উপর মোলায়েম আঙুল ধরে বলে- ‘লেখো’।

একটা বয়সের পর মানুষের সবথেকে বড় বন্ধু হয়ে ওঠে স্মৃতি এবং বিস্মৃতি।স্মৃতির পথ ধরেই আসে বিস্মৃতি।আবার বিস্মৃত দিনের কথা হাতড়াতে হাতড়াতে আসে স্মৃতির পাহাড়।তবে বর্তমান জীবনে দিনগুলো এতো দ্রুত বদলে যায় যে স্মৃতি এবং বিস্মৃতি একেবারে ভারসাম্য রাখতে পারে না।এই আমি যখন আমার জীবনের চার পাঁচ বছর আগেকার কথা ভাবি তখন দেখি কি ভয়ানক বদলে গেছে জীবনটা।শুধু আমার জীবন নয়।এতো দ্রুত একটা সময়ের মধ্যে আমরা চলছি যে বদলে যাচ্ছে আশেপাশের সবকিছু।আশেপাশের সবকিছু বদলে গেলে নিজেকেও নিজের থেকে একটু অচেনা লাগে বইকি।হটাত করে খুব দামী একটা জীবনের মাঝে দাঁড়িয়ে আমিও চার্লি চ্যাপলিনের ‘গোল্ড রাশ’ সিনেমার মতো রাস্তা থেকে ফেলে দেওয়া একটা সিগারেট তুলে নি।

ভুলে যাই হটাত জীবনটা দামী হয়ে গেছে।জীবন তখন আমার হাত থেকে সেটা ফেলে দিয়ে মোটা চুরুট বাগিয়ে দেয় আমার মুখের সামনে।নিজে দামী হয়ে গেলে আশেপাশের সমস্ত কমদামী স্মৃতিগুলো খুব দূরের লাগে।তখন হয়ত বিস্মৃতিই ভালো।নইলে রাত্রিবেলার ঘুম পালিয়ে যায় অন্যদেশে।
মনের মধ্যে অনেক পাইচারি এসে জমা বাঁধে।মানুষ ক্রমাগত হয়ে যায় আয়না-মানুষ। কোনও মানুষ যখন নিজের সীমা ছাড়িয়ে বেশি দামী হয়ে যায়,বেশি বড় হয়ে যায় তখন স্মৃতিরা তার পিউরিফিকেশন ঘটায়।তাকে নামিয়ে নিয়ে আসে নিজের উচ্চতায়।যদি কেউ না নামতে চায় তখন তার আরও কাছের বন্ধু হয়ে ওঠে বিস্মৃতি।
জীবনে বোধহয় আমি সবথেকে বেশি ভয় পেয়েছি এই নিজের মাপের তুলনায় বেশি বড় বা বেশি ছোট হওয়াতেই।তাতে করে মানুষ,মানুষের থেকে অনেক দূরে সরে যায়।আদতে সারাজীবন তো মানুষের কাছেই থাকতে চেয়েছি। পেতে চেয়েছি মানুষের হৃদয়ের সহজতা।তাই কখনই প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের ভাবনায় বিশ্বাস রাখতে পারি নি।কারণ তাতে কবিরাই নেই।কবিরাই তো স্মৃতি এবং বিস্মৃতি নিয়ে খেলা করার সবথেকে বড় শিল্পী।

মৃত্যুর কথা ভাবি,জীবনের কথা ভাবি,তারপর ভাবি এসব শ্যাওলা মাখা শরীর নিয়ে কতদিন পাল্লা দেবো? ভাবি কতদিন সিঁড়ির ঘরে লুকিয়ে রাখবো ভালোবাসার বোধগুলোকে,বলবো বৃষ্টি,চল একবার সস্তা পালিয়ে যাই।জামাকাপড় বিশেষ লাগবে না খালি কতগুলো বই যদি সঙ্গে নিতিস…। ভালবেসে কি পাবো?অভিযোগ?শরীর?আমি তো সেসব চাই নি কোনদিনও।একটা ছাদ-মানুষ,তারা,বোধ,চোখের জলে ভিজিয়ে দেওয়া ক্ষত,বোবা আদর।কাল রাতে জীবনানন্দ এসেছিলেন,বলছিলাম-আমি একটা কাগুজে বাঘ সেজে হেঁটে চলেছি শব্দের উপর দিয়ে মহাকালের পথে, বলছিলাম-আমার ঘুমের মধ্যে মরে যেতে ভয় লাগে,একা।



2 comments:

  1. বুকের মধ্যে হু হু নোনা হাওয়ার ঝড় তুলে দিলে ...

    ReplyDelete
    Replies
    1. ভালোথাকার শুভ কামনা।

      Delete