আমি ধুলো হব এই পৃথিবীর


লে যেতে চাই- অথচ কোথাও হয়নি যাওয়া কোনদিন।কোথায় যাবো, কোনখানে? কোন্ কোন্ পথে- জানা নেই, ঘরবাড়ি বিত্ত-বৈভব তবে কি আমায়  অন্য একটা পথে- ভুল পথে নিয়ে যায় ?
আমার স্মৃতিতে সাজানো আছে কিছু দৃশ্যাবলী, সেখানে নদীর বুকের পাল তুলে যায় মাঝি, পথে যেতে যেতে কিশোরী বধূ চোখ তুলে চায় সলাজে অথবা রাখাল বালক গরু রেখে ঘুড়ির লাটাই হাতে স্বপ্নের ফানুস ওড়ায় আকাশে। এ সবই আমার একান্ত মনে হয় অন্যকিছু নয়-কিছুই না।

বাড়ি থেকে সিকি মাইল দূরে জমিদারদের পোড়ো বাড়ি, তারই পাশে বটদীঘি- প্রকান্ড বটগাছ; তার কোল ঘেঁষে আরও একটি পুকুর, অদূরে নাপিত বাড়ি। ছনের নয়, গোলপাতার নয়- টিনেরও নয়- প্রাসাদতুল্য অট্টালিকা সেটি! এগুলো দেখতে দেখতেই স্কুলের পথ ফুরাতো  আমার। আবার সেই পথে  বাড়ি ফিরতে বকুল গাছের নীচে কিছুটা আড্ডা- কিছুটা ফুল কুড়ানোর উৎসব।
এ সবই আমার শৈশবের গল্প ...
আমাদের বাড়ির সামনে দিগন্ত ছোঁয়া ধান ক্ষেত মেঠো পথ আঁকাবাঁকা, সে পথে বৃষ্টিতে ভিজে
ডাক নিয়ে আসতো ত্রিশূল হাতে রানার মহব্বত। আমাদের বাড়ির পোস্ট অফিসে বসে
মহব্বতের কাছে ওর গল্প শুনেছি দু:খের-বেদনার, আমার শৈশব মহব্বতকে খুঁজে ফেরে এখনও!

বাড়ির পাশেই ছোট্ট নদী-খাল, ঘাটে বাধা থাকতো জব্বার মাঝির পানসি নৌকা, আমাদেরর ডিঙি ছিল ছোট একটি। চাঁদনী রাতে বাবার সাথে জাল ফেলে মাছ ধরার উৎসবে মেতেছি কত দিন! সে সব এখন
চোখের জলে ভেসে যায় বাড়ির পাশে বাবার জীর্ণ কবর দেখে দেখে!

আমার শৈশব এখন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে বেতস বনে নিকানো উঠানে, বটের ছায়ায় পাখির ডানায় সোনালী রোদের ঝিলিকে; ঝাউবনে জোনাকি পোকার উৎসবে। কাজে-অকাজে, দ্রোহ আর ভালোবাসার জমিনে।

বাবার কথা আছে বুকের মধ্যে গীতি কবিতার খাতায়, একদিন মধ্য রাতে বাবা আমাকে নৌকায় নিয়ে গেলেন ছোট্ট ডিঙি- বাবা মাঝি, আর আমি হলাম চরনদার। সেদিন ছিলো শুক্ল পক্ষ- মধ্য আকাশে ছিলোক পূর্ণ চাঁদ। আমাদের নৌকা এগিয়ে চলতে চলতে বাবা বললেন,
‘কীরে ভয় লাগে বুঝি?’ তারপর বললেন, ‘কাছে আয়, আমার ঠিক পাশে এসে বোস, ভয় থাকবে না তোর’ আমি ঠিক বাবার কাছে গিয়েছিলাম। নৌকা তখন চলছিল।

আছে, মাকে নিয়ে অনেক স্মৃতি আছে তার মধ্যে একটা বলি আজ। একদিন মা খুব পেটালেন আমাকে
আমি হাসছি, শুধু হাসছি, যেন কান্না ভুলে গেছি আমি মা অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বললেন- ‘দু:খ- তোকে কাঁদাতে পারলাম না কখনো!’
একটি মেয়ে আমাকে বেঁধে রেখেছিলো অনেকদিন। তারপর একদিন বাঁধন কেটে গেলো সে’ও।
কেমন অচেনা অজানা হয়ে গেলো সব; সেই দু’টি চোখও, যে চোখে আমি সাগর দেখতাম।

এতোটা বছর শেষে পেছন ফিরে তাকাতে ইচ্ছে হয়। দিগন্ত জোড়া ধান ক্ষেত আঁকাবাঁকা পথ, নদ-নদী
ঝোপঝার, বট গাছ এসবই টানে আমায়। মনে পড়ে স্নিগ্ধ কিছু সন্ধ্যা, কিছু দুপুর, বিকেল আর
খুব প্রত্যুষের কোন কোন দিন। তখন- সবকিছু ভুলে যাই আমি, নাগরিক গার্হ্যস্থ জীবন হঠাৎ থমকে যায়; খুব বিব্রতবোধ করি কারো কারো কাছে।

আর কোনদিনই দেখা হবে না! কখনোই আর স্পর্শের আশায় একটি বিকেল একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্যা এবং গোটা রাত্রিকে অপেক্ষা করতে বলবো না তুমি আসবে বলে। শরতের শিউলি ঝরে পড়ুক
ঘাসের ডগায় চিক্ চিক্ করুক ভোরের শিশির মাছরাঙা ধ্যানী পাখিটি অপেক্ষার প্রহর গুনুক,বআমি চণ্ডিদাস হবো না শুকনো পুকুর ঘাটে।
কৈশোরের সেই পুকুরটি আজো আছে, পূর্ব আর দক্ষিণ পাড়ের বৃদ্ধ কাঁঠাল গাছটি, ঠিক তার কাছেই পেয়ারা গাছটিও আছে; তুমি নেই, আমি আছি স্বপ্নাহত কিশোর বালক। কালিদাসের বাগান আছে সে রকমই, যে সুপারির গাছের শরীরে তোমার নাম লিখেছিলাম, বার্ধক্যের কারণে মরে গেছে গাছটি অনেক দিন আগে, নারকেল গাছটিও নেই, যেখানে আমি ছিলাম!
তোমাকেও এখন আর খুঁজে পাই না কোথাও।
শান বাঁধানো পুরনো ঘাটে, শান্ত কাকচক্ষু জলে কোথাও তোমার ছায়া পড়ে না আগের মতো; ঝাপসা চোখে স্মৃতিগুলোও খুব জীর্ণ এখন। এখন এই যন্ত্রণার জীবন ছেড়ে উড়ে যেতে চাই আমি দূরে থেকে দূরে, যেখানে দিগন্তে তুমি আছো,  আকাশ আর মাটির স্পর্শে আমি এই পৃথিবীর ধুলো হবো তোমারই কারণে।




0 comments:

Post a Comment