দু ঢোক স্মৃতির গল্প



স্মৃতির অলিন্দে দাঁড়ালেই মনে পড়ে একদা ফেলে এসেছি যে জীবন হিজল গাছের তলায়, বেতস বনের ধারে আমার সেই আজন্ম শৈশব কালের কথা। সে জীবন বর্ষার জলের মত ছিল টইটুম্বুর আর হাসি-খুশি ও আনন্দে ভরা। একেবারেই যে নিরবচ্ছিন্ন সুখ এবং শান্তিতে ভরা ছিল তা বললে অবশ্য সত্যের অপমান করা হবে। মাঝে মাঝে কোথা থেকে একটা বেদনার কালো মেঘ এসে সেই সুখের দিনগুলোকে ঢেকে দিত। তবে তা ক্ষণিকের জন্য। দুঃখের কালো মেঘ অপসৃত হলেই বিবিক্ষ মনের আঙ্গিনায় ভেসে উঠত সূর্যের ঝলমল আলোর হাসি। তা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে মনকে আচ্ছন্ন করে রাখত একটা অস্পষ্ট অজানা ব্যথা।

এই রাত আর এই অন্ধকার
তুমি তার মুখোমুখি একা;
শান্ত একটা হাওয়া আর রেডিও চালিয়ে কেউ ঘুমিয়ে পড়েছে।
যে জীবন পেলে তুমি কেমন লাগছে সে জীবন?
কষ্টকর? খুব একা? খুব বেশি একা?
যেখানে পায়ের ছাপ পড়ে
দেখি সেখানেই রক্ত ফুটে ওঠে। 


পূবালী হাওয়ার সুখের স্পর্শে যে মনটি পূলকিত হয়ে উঠত সেই মন আবার উদাস করা দখিণা হাওয়ায় এবং তার সাথে কোকিলের কুহু ডাকে বিরহ কাতর হয়ে উঠত। আনন্দ এবং বেদনা, সুখ ও দুঃখ সব কিছুর সংমিশ্রনে বৈচিত্রময় ছিল ফেলে আসা জীবনের সেই সব অধ্যায়।  সেই সব ঝলমলে সোনালী বিকেল কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।  জীবনের শেষ লগ্নে এসে হারানো দিনের সেই সব মধুর স্মৃতি-কথা মনে হলে কেন যেন দু’চোখ বেদনায় ছলছল করে উঠে। গভীর বেদনায় ছায়া ফেলে মনে। তাই স্বাভাবিক ভাবে মনে একটা শূণ্যতার সৃষ্টি হয়। গভীর বেদনায় একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেড়িয়ে আসে। আর মনে মনে ভাবি কোথায় হারিয়ে গেল সেই সব সোনালী  অতীত? কালের কি বিচিত্র খেলা। একটা নির্দিষ্ট বলয়ে কাল কখনই স্থির হয়ে থাকে না। স্থিরকৃত বলয়ে সে ধীর গতিতে বয়ে যায়। জীবনও তেমনি এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে না। নদীর জলের মত স্রোতমান। এক মোহনা থেকে বাঁক ঘুরিয়ে মিশে যায় অন্য এক মোহনায়।

এই সব সারেগামা পেরিয়ে তোমার কাছে দু-ঘন্টা বসতে ইচ্ছে করে;
আমার তৃতীয় চোখ হারিয়ে গিয়েছে।
সিঁড়ি দিয়ে যে উঠে আসছে আজ, আমি তার মুখ দেখিনি;
তোমাকে দুঃখিত করা আমার জীবনধর্ম নয়।
চলে যেতে হয় বলে যাচ্ছি,
না হলে তো আরএকটু থাকতাম।



একসময় জানালার পাশে দাঁড়ালে দেখতে পেতাম সীমাহীন নীলাকাশ,  নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করত কেয়া কেতকী, যুঁই চামেলী, বেলী, শেফালী, সন্ধামালতী, রজনীগন্ধা ও গন্ধরাজের সুমিষ্ট সুবাস, চোখে পড়ত সেীন্দর্যের রাণী গোলাপের মনমাতানো রূপ। আরো দেখতাম থির থির করে কেঁপে উঠেছে গাছের সবুজ পাতা। কোন কোন নাগরিক সন্ধ্যার আকাশেও মেঘটেঘ এলোমেলো দাঁড়িয়ে পড়ে কোন শিল্পকলার ধার না ধারে। কংক্রিট ছাদে দাঁড়িয়ে মলিন শিল্পরসহীন আকাশের দিকে চোখ পড়ে মাঝে মাঝে এবং এই সব বহু দেখা নীরস আকাশ দেখেও কখনো কখনো ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে অলস চুমুক দিতে দিতে প্রিয় কবির বইয়ে পাতা উল্টে যাওয়া যায়। 

রাত্রিবেলা চৈত্রের আকাশ আজ কিছু কথা বলতে চাইছে;
বাংলা কবিতার মত নির্জনতা ছুঁয়ে
এখন দাঁড়িয়ে আছি - জানালায়, এখন চোখের জল নেই;
আমার চোখের জল নিজেই দালাল হয়ে বিক্রি করেছি।
মা, তুমি কেন যে এই
অসহায়তার ডিম ফেলে রেখে গেছ  এই ঘরে!
শুধু নিকোটিন আর নিকোটিনে পুড়ে যাচ্ছি
তবু এই বিষের রাজত্ব থেকে
দাঁত আর নখের আড়াল থেকে দু-লাইন লিখছি এই
শুধু মনে পড়ছে তোমাকে। 










0 comments:

Post a Comment