এক সমান্তরাল পৃথিবীর গল্প



মরচে ধরা জানলার পাল্লা খুলতেই কিছু খুচরো পাপ ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে, আর মুখের আনাচে কানাচে গুঁড়ো গুঁড়ো অনুভব দমকা হাওয়ায় হ্যাঙ্গারে রাখা জামা দোল খায় ঘর জুড়ে আপন খেয়ালে।
আর বারান্দার কার্নিশে ডানা ঝাপটায় বুড়ো ডাক।
নি:সঙ্গ দুপুর জুড়ে তোমার না আসা চিঠি, লিখে চলি অকারণ হলদে পাতা জুড়ে আর মনের প্রান্তে ক্যানভাসে কেউ এঁকে চলে রং-তুলি।

হঠাৎ একটা চড়ুই জানলা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়তে চায়, শুকনো পাতার ঝরে পড়ায় আর কড়ি বরগার ফাঁকে আটকে থাকা ভাঙা ঘুলঘুলি, পাঁচিলের ওপাশে আটকে পড়া রোদের ছায়া বাঁক ফিরে আধ বন্ধ
হওয়া চায়ের দোকান আর আচমকা হাঁক দিয়ে যায় কোনো ফেরিওয়ালা,…
কুড়িয়ে বাড়িয়ে যেটুকু পড়ে থাকে নীল-তাকে কিংবা চৌকাঠ ভেঙ্গে পেরিয়ে যাওয়া সদর দরজায় আর গলির মোড়ে আসে না সেই অচেনা বাঁশিওয়ালা… কিছু খুচরো পাপ গড়িয়ে পড়ে হাতের নাগাল না পেয়েও!

আজও একবিন্দু অশ্রুজলের মাঝে দেখি  সেই প্রজাপতির রঙিন অস্থির ডানা , যে নাকি উড়ে গেছে আলোকবর্ষ আগে। প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাসেও সে লুপ্তপ্রায় । চুরি হয়ে গেছে সেই সব কিছু যেগুলো আমি কখনই হারাতে চাইনি । বাহিরে অন্তরে তন্ন-তন্ন করে খুঁজেছি উত্তপ্ত অঙ্গার, মেরুর বরফ, আবার বিষের নালায়, কখনও বেপরোয়া হাওয়া হাত পোড়া ছাই উড়িয়েছে, কখনও বা ঝরনা ধারা ছিন্ন দেহ বয়ে নিয়ে গেছে লেলিহান সমুদ্রে, মরুভূমির বালুকারাশি সেই আগুন নেভাতে এসে, করেছে আমায়
সমাধিস্থ । তবে থেমে থাকিনি, সেখানে থেকেই নিয়েছে পুনর্জন্ম অবিরত খুঁজেছি সেই চিহ্ন গুলো,
অনুসরণ করেছি তার পায়ের ছাপ, অবশেষে ক্লান্ত সূর্যের মতো পশ্চিম আকাশে গিয়েছি অস্ত ।

এভাবেই পেরিয়ে গিয়েছি অসংখ্য যুগ, কিন্তু এখনও ফিরে পাইনি তার প্রমাণ চিহ্ন বরঞ্চ হারিয়ে ফেলেছি অবশিষ্ট টুকুও ।

আজকে নিঝুম রাতে ঘুম ভেঙ্গে দেখি, নিকশ কালো অন্ধকারে নির্ঘুম এক চাঁদ নিশাচর আর বন্য, অথচ কি ভীষণ নির্লিপ্ত যেন ঠিক আমারই মত অভিমানে জেগে আছে দুঃখ বুকে চেপে তবু সান্ত্বনা দেয় আমায়, আমি বলি, একদিন আমিও তোর মত পরবাসী হব, একদিন আমিও দলছুট হব , একদিন আমিও অমাবস্যায় হারিয়ে যাব, চাঁদ এখন স্তব্ধ ,কান পেতে শোনে হাওয়ার কলতান, হাওয়ারা হঠাৎ এলোমেলো হয়; আমারই মত ফুঁপিয়ে কাঁদে সন্তর্পণে। হাওয়ারাও যে আমার ই মত গৃহহীন, আমি ভাবি একদিন আমিও তোদের মত করেই হারিয়ে যাবো, একদিন আমিও নষ্ট হব তোদের মত পথভ্রষ্ট হব ভালবেসে। গৃহী না হই আমি নাহয় ছন্নছাড়া একলা পথিক হব, তোদের মত আমিও নাহয় পথ ভোলা এক নিঃসঙ্গতা হব।

কত চিলেকোঠা উড়ে গেল ঝড়ে, কতক প্লাবিত হল জোৎস্নার ঢেউয়ে, পুড়লো কত নিকোটিন
রাত্রিদিন, অথচ এই চিলেকোঠা নিয়ে আমার কোন গল্প নেই। কি করব, উথাল পাথাল জোৎস্নায় আমার প্রিয়তমা আলস্য বড়জোর বিছানার পাশের জানলাটা খোলার অনুমতি দেয়, সিগারেট খেতে হলে বারান্দায় গেলেই হয়, আর সর্বোপরি আমার ছোট্ট হলেও নিজের একটা ঘর আছে।
কি সাধে চিলেকোঠায় সেধোতে যাবো! তবে একদিন একটু এ্যাডভেঞ্চার করে দেখলে মন্দ হয়না!
ওহ প্রিয়তমা আলস্য ছাড়ো আমাকে, আমাকে যেতে দাও তারাজ্বলা রাত্তিরের কুহক মেঘ আর সৃজনশীল ধুম্রকূন্ডলীর কাছে।
ছাড়ো!
যেতে দেবেনা?
আচ্ছা, আমার কলম আর
কাগজটা দাও, এটুকু কর অন্তত! আমার এড্রোনালিন প্রবাহে একটা ঘর, একটা ছাদ, একটা চাঁদ, একজন অচেনা মানুষ আর তার চিন্তাভাবনাগুলো ভেসে আসছে জোয়ারের মত।

আমাকে যেতেই হবে সেই ধ্রুপদী, রহস্যময় অন্ধকারে। আধ খাওয়া সিগারেট ছাদে টানিয়ে রাখা মেয়েলী অন্তর্বাস, ডিমলাইট আর চাঁদের আলোর মিশ্রণ, স্মৃতি এবং বিস্মৃতির সন্তরণ, খুব টানছে আমাকে।

ওহ এই বদ্ধ ঘর!
ভালো লাগেনা ঘর,
ভালো লাগে ঘোর।
চিলেকোঠায় নিয়ে যাও, নিয়ে যাও আমায় পূবালী বাতাস আর হাজার জোনাকপোকা। আমি কাগজ-কলম টেনে নিই। আর কিই বা নিতে পারি!



0 comments:

Post a Comment