আরণ্যক জীবনের গল্প


"মানুষের বসতির পাশে কোথাও নিবিড় অরণ্য নাই। অরণ্য আছে দূর দেশে, যেখানে পতিত-পক্ব জম্বুফলের গন্ধে গোদাবরী-তীরের বাতাস ভারাক্রান্ত হইয়া ওঠে, ‘আরণ্যক’ সেই কল্পনালোকের বিবরণ। ইহা ভ্রমণবৃত্তান্ত বা ডায়েরি নহে – উপন্যাস। অভিধানে লেখে ‘উপন্যাস’ মানে বানানো গল্প। অভিধানকার পণ্ডিতদের কথা আমরা মানিয়া লইতে বাধ্য। তবে ‘আরণ্যক’-এর পটভূমি সম্পূর্ণ কাল্পনিক নয়। কুশী নদীর অপর পারে এরূপ দিগন্ত-বিস্তীর্ণ অরণ্যপ্রান্তর পূর্বে ছিল, এখনো আছে। দক্ষিণ ভাগলপুর ও গয়া জেলার বন পাহাড় তো বিখ্যাত।"


গভীর মুগ্ধতা নিয়ে প্রথমবার আরণ্যক পড়ার কয়েক বছর পর আবার একই মুগ্ধতা নিয়ে পড়লাম। মনে হলো, আবার যেন নতুন করেই পড়ছি। কাহিনির বিন্যাস, পটভূমি, বর্ণনা এবং সর্বোপরি লেখকের একাত্ম হওয়ার বিষয়টি গল্পের সর্বত্রই যেন জাদুর আমেজ ছড়িয়ে রেখেছে। আরণ্যককে যদি উপন্যাস না বলে লেখকের দিনলিপিও বলা হতো, তাহলে মনে হয় অবিশ্বাস্য কিছু বলা হতো না। আবার এ কথাও সত্যি যে এই উপন্যাসের সবকিছুই কাল্পনিক নয়। ভারতের পূর্ণিয়ায় সত্যি সত্যি এমন কিছু বন আছে। আরণ্যককে সাদামাটা একটি বন-বনানীর গল্প ঠাওরালে ভুল হবে। কারণ, এখানে যেমন প্রান্তিক জীবনের গল্প আছে, তেমনি আছে অরণ্যের বিচিত্র ও প্রাণবন্ত বর্ণনা। আবার প্রান্তিক জীবনের নানা মুখ যেমন আছে, তেমনি আছে অসংখ্য পুষ্প-বৃক্ষের বৈজ্ঞানিক বর্ণনা। এই দুয়ের সংমিশ্রণ গল্পের পরতে পরতে তৈরি করেছে ভিন্ন এক মাদকতা।
গত কয়েক দশকে আমাদের বোধের জগতে যত পরিবর্তন এসেছে, তার প্রেক্ষিতে এর পাঠও বদলে যাওয়ার কথা। ভানুমতীর কুড়িয়ে আনা কয়েকটা ফুল আদিবাসী রাজা দোবরু পান্নার সমাধির ওপর ছড়িয়ে দিয়ে সত্যচরণের মনে হয়েছিল, এই প্রথম আর্যজাতির পক্ষ থেকে কেউ একজন অনার্যকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করল।

উত্তম পুরুষ-এ বর্ণিত এই বন-জীবনের দীর্ঘ আখ্যানে কতকগুলো ছবি আমাদের অনুভবে বারবার মূর্ত হয়ে ওঠে। গনোরী তেওয়ারী, যুগলপ্রসাদ, রাজু পাঁড়ে, আস্রফি টিণ্ডেল, পাটোয়ারী, কুন্তা, মটুকনাথ পণ্ডিত, মঞ্চী, রাজা দোবরু পান্না, রাজকন্যা ভানুমতী—আরও কত কত জীবন। এদের সবারই মনের ভাষা আলাদা আলাদা। লেখক এদের মনের গভীরে ঢুকেছেন, ছুঁয়ে দেখেছেন আর অবলীলায় ওদের মুখের ভাষাগুলো পরম উপাদেয় করে তুলে এনেছেন আমাদের জন্য।
লবটুলিয়া, ফুলকিয়া বইহার, নাড়া বইহার, সরস্বতী কুণ্ডী, মহালিখারূপে, ঝল্লুটোলা, ভাগলপুর-পূর্ণিয়া জেলায় সত্যি সত্যি এমন নামের জঙ্গল আছে কি না, জানা নেই। কিন্তু জঙ্গলের সঙ্গে নামগুলো এতটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ যে এগুলোকে আলাদা করে ভাবার কোনো অবকাশ নেই। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এ গল্পের যত্রতত্র পুষ্প-বৃক্ষের বর্ণনাই বারবার মূর্ত হয়ে ওঠে। আমাদের ডেকে নিয়ে যায় বিজন কোনো অরণ্য প্রান্তরে। ‘পথের সর্বত্র পাহাড়ের ঢালুতে ও ডাঙায় ছাড়া-ছাড়া জঙ্গল, মাঝেমধ্যে সরু পথটাকে যেন দুই দিক হইতে চাপিয়া ধরিতেছে, আবার কোথাও কিছু দূরে সরিয়া যাইতেছে। কী ভয়ঙ্কর নির্জন চারদিক, দিনমানে যা হয় একরূপ ছিল, জ্যো ৎস্না উঠিবার পর মনে হইতেছে যেন অজানা ও অদ্ভুত সৌন্দর্যময় পরিরাজ্যের মধ্য দিয়া চলিয়াছি।’ মূলত লেখকের তীক্ষ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি বনের এক টুকরো সৌন্দর্যকেও উপেক্ষা করে না। প্রতিটি অণু গল্পই বিভিন্ন ধারা-উপধারায় প্রবাহিত হয়ে একেকটি বড় গল্পের আদলে প্রচ্ছন্ন হয়ে ওঠে।

প্রতিটি ঋতুর পালাবদল বন ও মনে যেসব পরিবর্তন আনে, তার অনুপুঙ্খ বর্ণনা আরণ্যককে ভিন্ন সুষমা দান করেছে। 
‘সেই বেগুনি রঙের জংলি ফুলগুলিই আমার কানে শুনাইয়া দিল বসন্তের আগমন বাণী। বাতাবি লেবুর ফুল নয়, ঘেঁটু ফুল নয়, আম্রমুকুল নয়, কামিনী ফুল নয়, রক্তপলাশ বা শিমুল নয়, কী একটা নাম গোত্রহীন, রূপহীন নগণ্য জংলি কাঁটাগাছের ফুল...।’



 পুষ্প-বৃক্ষের এমন প্রাণবন্ত বর্ণনা গ্রন্থের পাতায় পাতায় রূপের পাশাপাশি সুগন্ধও ছড়াচ্ছে। আরণ্যক-এর সবচেয়ে বড় পুঁজি তরুপল্লবের সবিস্তার বৈজ্ঞানিক বর্ণনা। এখানে তিনি যেসব বৃক্ষ-তরুলতার গল্প করেছেন, তার একটিও কাল্পনিক নয়। কখনো কখনো বানানো গল্পের সঙ্গে লেখক বাস্তবের সংমিশ্রণ করেছেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। শুধু তাই নয়, তখনকার দিনেও তিনি প্রজাতি সংরক্ষণের কথা ভেবেছেন। কিংবা বনের সুসামঞ্জস্যতার দিকে নজর দিয়েছেন। নিম্নোক্ত কথোপকথন লেখকের দূরদৃষ্টির ইঙ্গিতই বহন করে। আরণ্যক-এর এ বিভাগের নায়ক যুগল প্রসাদ। সে সারা দিন বন-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন গাছ ও লতাগুল্ম রোপণ করে। যেখানে যেসব বৃক্ষ প্রজাতির ঘাটতি আছে, যুগল প্রসাদ সেখানে সেসব গাছই রোপণ করে। এ ক্ষেত্রে তার ভূমিকা একজন পরিবেশকর্মীর সমতুল্য। গল্পের অনেকটা মাঝামাঝি পর্যায়ে যুগল প্রসাদের আবির্ভাব। ‘এই সরস্বতী কুণ্ডরীর ধারে একদিন দুপুরে এক অদ্ভুত লোকের সন্ধান পাইলাম।...লোকটা কিসের যেন বীজ পুঁতিয়া দিতেছে। আমায় দেখিয়া সে থতমত খাইয়া অপ্রতিভ দৃষ্টিতে আমার দিকে চাহিল। বয়স হইয়াছে, মাথায় কাঁচা-পাকা চুল। সঙ্গে একটা চটের থলে, তার ভিতর হইতে ছোট একখানা কোদালের আগাটুকু দেখা যাইতেছে, একটা শাবল পাশে পড়িয়া, ইতস্তত কতকগুলি কাগজের মোড়ক ছড়ানো।’

আরণ্যক-এ বর্ণিত সুবিস্তৃত অরণ্যানী দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে আসেন ‘লেখক’। বনের বন্দোবস্ত, খাজনা আদায়, প্রজাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখা তাঁর প্রধান কাজ। কিন্তু বনের নির্জনতা এবং মায়াবী সৌন্দর্য তাঁকে এতটাই প্রলুব্ধ করে তিনি এর বাইরে আর কিছুই ভাবতে পারেন না। তাঁর মুখেই শোনা যাক, 

‘এই তিন বছরে আমার অনেক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। লবটুলিয়া ও আজমাবাদের বন্য প্রকৃতি কী মায়া-কাজল লাগাইয়া দিয়াছে আমার চোখে, শহরকে একরকম ভুলিয়া গিয়াছি। নির্জনতার মোহ, নক্ষত্রভরা উদার আকাশের মোহ আমাকে এমন পাইয়া বসিয়াছে যে...পাটনায় গিয়া ছটফট করিতে লাগিলাম, কবে পিচঢালা বাঁধাধরা রাস্তার গণ্ডি এড়াইয়া চলিয়া যাইব লবটুলিয়া বইহারে...।’

গল্পের প্রায় শেষ প্রান্তে রাজকন্যা ভানুমতীর প্রতি তাঁর ভালোবাসায় টইটম্বুর হূদয়ের উষ্ণতা টের পাওয়া যায়। অবশ্য প্রথম দর্শনেই ভানুমতীকে তাঁর ভালোলাগার ইঙ্গিত রয়েছে। ‘স্নেহের সুরে বলিলাম, কেন মনে ছিল না ভানুমতী? আয়নাখানা পাওনি? মনে ছিল, কী ছিল না ভাব।’ কাহিনির শেষ প্রান্তে লেখকের এই হাহাকার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি যখন মনস্থির করেন ছয় বছরের বন-জীবন ছিন্ন করে কলকাতায় ফিরে যাবেন, তখন ধনঝরি শৈলমালায় গিয়ে তাঁর মনের মানুষটিকে একবার দেখে আসার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

‘এখান হইতে চলিয়া যাইবার সময় আসিয়াছে। একবার ভানুমতীর সঙ্গে দেখা করিবার ইচ্ছা প্রবল হইল। ধনঝরি শৈলমালা একটি সুন্দর স্বপ্নের মতো আমার মন অধিকার করিয়া আছে...’ অন্যত্র ‘এখানেই যদি থাকিতে পারিতাম! ভানুমতীকে বিবাহ করিতাম...এই মাটির ঘরের জ্যোৎস্না-ওঠা দাওয়ায় সরলা বন্যবালা রাঁধিতে রাঁধিতে এমনি করিয়া ছেলেমানুষি গল্প করিত- আমি বসিয়া বসিয়া শুনিতাম। আর শুনিতাম বেশি রাত্রে ওই বনে হুড়ালের ডাক, বনমোরগের ডাক, বন্য হস্তীর বৃংহিত, হায়েনার হাসি।’

আরণ্যকের পাতায় পাতায় ছড়ানো সব নির্জন মায়াবী বনের বর্ণনা, সেখানকার হতদরিদ্র মানুষের জীবন সংগ্রাম, তাদের রোগ-শোক-আনন্দ উচ্ছ্বাস, বিচিত্র জীবজন্তু আর পুষ্প-বৃক্ষের গল্প—সবকিছু মিলিয়ে মনের গহিনে বেঁচে থাকার মতো একটি অসাধারণ কাহিনিচিত্র। এই গল্প শুধু দুবার কেন আর কতবার পড়লে তৃপ্তি মিটবে, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।





0 comments:

Post a Comment