এ অঞ্চলে কোনো পকেটমার নেই



বাস চলছে। আমি তোমাকে দেখছি। দেখছি ফরসা জানালায় তোমার রোগা কালো কনুই; একটুখানি ছড়ে গেছে কি? দেখছি পাশের লোকটির থেকে কেমন মিহি দুরত্ব রেখেছ। তোমার সস্তা ব্লাউজের হুক আপাতত কেউ গুনতে পারবে না। শাড়ি পড়া পছন্দ কর কি তুমি? শাড়ি তো বড্ড বিচ্ছিরি পোশাক। আজকের পর অবশ্য আর না পরলেও চলবে।
চোখ বাইরের দিকে। অঘ্রাণের ঘষা রঙ রাঢ় মাইলের পর মাইল বিজন হয়ে আছে। ময়লা বাতাস। হঠাৎ দেখা দিচ্ছে দেওয়ালের আলকতরা রঙ। চালের খড়। উঁচু উঁচু বেঢপ আল। যেখানে সেখানে নিয়ম ছাড়াই দাঁড়িয়ে পড়া তালগাছ। কয়েকটা তালগাছ একজোট হলেই তাদের পেছনে কিছুটা জল হাজির হয়।
ওসব তোমার চেনা। তুমি দেখছো না। ভাট-শ্যাওড়া, জিউলি, ময়না কাঁটা আলোকলতা, বন ধুধুল এইসব জীবনানন্দীয় নাম তুমি জানো না। লক্ষ্য করেছ কি, তোমাদের দেশে বাঁশের সবুজ গোড়া কেমন মাটির থেকে লাল ছোপ তুলে নেয়!
গতকাল বিকেলে তো ওই লাল রঙ খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ ছিল; কিন্তু তুমি আগাগোড়া চোখ বুজিয়ে ছিলে।

স্বস্তি নার্সিং হোমে কাজ পেয়েছো। আজ জয়েন করতে যাচ্ছ। আজ বাড়িতে শান্তি? অশান্তি? উল্লাস? মা কেন আজ রান্নাঘর থেকে বেরোয় নি?
মাঝে মাঝে চোখ ফিরিয়ে সিলিং এর রডে আটকে থাকা সারি সারি হাতগুলো দেখছো। হয়তো খুজছো এক বিড়িগন্ধ মাখা হাত, তামাম আবহাওয়ার ছাপ তার তৈলাক্ত শিরাগুলোতে। তোমার রুঢ় বাবা কি আজ তোমার সঙ্গে যাচ্ছে? তিনি বোধহয় সিট পাননি। তোমার দাদাকে দেখতে পাচ্ছি না। পরিবর্তন কি তাকে ঘরছাড়া করেছে?
প্রেমিকটি কি আজ সকালে ফোন করেছে ? না কি তুমিই লুকিয়ে...
ও মনে হয় মুম্বাই যেতে পারেনি এবারও।
অবশ্য তোমারও একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ক্যামেরা ওয়ালা ফোন হয়েছে।
স্কুল কি বাড়ির কাছেই ছিল? সাইকেলে যেতে? তোমাকে তো টিকিট কাটতে দেখলাম না। রোজকার খুচরোর আওয়াজ এইবার তোমার শুরু হবে। দুটো আঙুলের ফাঁকে টিকিট রাখতে এবার তুমি শিখে নেবে। শিখে নেবে কন্ডাক্টরের সাথে কেমন করে ভাব করতে হয়। টিকিট কাটতে ভুলে যাবে, স্টপেজ ছাড়াই নামিয়ে দেবে সে তোমাকে; হেল্পারের ইয়ার্কি গ্রাহ্য না করেই।

ডানহাতটার ব্যাপারে একটু আনমনা হও; বরং বাম হাতে শক্ত করে বাসের ছাদের রডটা ধরবে। এ অঞ্চলে পকেটমার নেই কোনো।

যখন এই বাস থেকে নামবে, মনে রেখো হেঁটে নয়, সকলের গোড়ালির ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছ তুমি।।




0 comments:

Post a Comment