অদ্ভুত কিছু ইস্তেহার



কি যেন বলতে চেয়েছিলাম তোমাকে সেদিন, মৌন বিষণ্ণতা আমাকে ডেকেছিল। কি জানি কখন সবকিছু নিরব থেকে গেলো ; জানাছিল শুধু ব্যাস-ব্যাসার্ধ্যের কিছু নিয়ম নীতি, আর কিছু কথা, আর কিছু স্মৃতি।  কিছু কিছু ভোরের গল্প , ফুল চুরি করে হাত ধরে শেষবার ফিরেছিলাম  যে যার ঘরে ।
তারপর আর কোথায় দেখা হলো ? তোমার স্কুলের সব মেয়েরাই ছিল স্কুল গেটে। আসা ও ফেরার পথে
সাইকেলে প্যাডেল দিয়ে তোমাকে দেখিনি আর, সেই শেষ দেখা ভোরের সকালে ।

বহু বছর আগে হলুদ ফুলকে প্রথমবার আমি আমার যন্ত্রণার কথা বলি। প্রথমে মনে হয়েছিল কিছুটা হলেও অনুভবে ছিলাম আমি ; আসলে পরে বুঝেছিলাম ফুলেরা যন্ত্রণা বোঝেনা । তারপর পেরিয়ে গেছে শতাব্দী, রাজা থেকে সুলতান - সুলতান থেকে রাজা; তারপর বিদেশী  শাসকদের দাবানলে বার বার হারিয়েছি দেশ, সকাল হবার আগেই  লোটাকম্বল নিয়ে ছুটে গেছি ট্রেন ধরতে; প্রথমে অবশ্য ট্রেনছিল না, হাঁটা পথে পার করেছি ভূমি । জন্মভূমি স্বাদ কতদিন পেয়েছিলাম মনে নেই; মনে নেই প্রথম দেশের নাম; মনে নেই আমার প্রথম প্রেম । মনে নেই আমার দেখা প্রথম কাক তাড়ুয়ার কথা,
মনে নেই আমার শৈশব, মনে নেই রান্নাবাটির খেলাতে কে প্রথম আমাকে তার কুটুম ভেবেছিল ।
মনে নেই কবে প্রথমবার সাঁতরে পার হয়েছিলাম  নদীর মোহনা । এখন শুধু আকাশের তারা গুণে বাড়ি ফিরি ।

সেই যে শতাব্দী আগে হলুদ ফুলকে বলেছিলাম আমার কিছু কিছু যন্ত্রণার  কথা; আমার কিছু গল্প, আমার কিছু চেনা কবিতা, আমার তাল গাছ, আমার রোদ্দুর , যা কিছু আমার ছিল শুধুই আমার ।

এক বসন্তের রাতে চুপি চুপি এসেছিল এক ঝাঁক পাখি, দিগন্তের অনেক দূর থেকে নানা রঙের সেই সব পাখি। কারো হলুদ পাখনার সাথে লাল ফিতের অবগাহন । ভীড় করে এসেছিল এক সাথে- যখন সন্ধ্যার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছিল রাস্তার চারিদিকে, যখন তুমি পাটভাঙা ওড়নায় হেসেছিলে পূব দিকে চেয়ে,
যখন অফিসের লোকজন  ছুটেছিল বাসের পা-দানিতে ভর দিয়ে  বাড়ির ঠিকানায় ।
বাড়ির কার্ণিশে ভীড় করেছিল পাখিদের দল, কেউ কেউ দেখেছিল কেউ কেউ শুনেছিল এমন ঘটনা ।
কেউ কেউ করেছিল চিৎকার, কেউ কেউ লিখেছিল বিকেলের প্রেম। কেউ কেউ বলেছিল "আবার আসিবো ফিরে" । আবার কেউ কেউ মিথ্যে করে বলেছিল প্রেম ও পরিণয় । কেউ তো লিখেছিল "বিধবা যুবতী, দুখানি করুণ আঁখি মানে না যুকতি" ।
দিগন্তের অনেক দূর দেশ থেকে সূর নিয়ে পাখিরা ফিরেছিল সেদিন  বাড়ির কার্ণিশে ।

সে বসন্ত অনেকটাই অতীত, বারো বছর হবে হয়তো, অথবা আর কিছুটা বেশি বা কম । গানগুলো পুরোনো, সুরের বাতাসে এনেছিল কফিনের গান । আজো মনে আছে শব্দগুলো জোড়াতালি দিলেও দেওয়া যেতে পারে । বছর পার হবার সাথে সাথে শব্দের  ঘাত কমে যায় । এখন হরিণীর আলোকিত জঙ্গলে  পূর্ণিমা কখনো কি বাসা বাঁধে জোনাকীর ঝাড়ে? ক্ষুধার যন্ত্রণায় পাখিরা কি কোনদিন সুর দেয়
আমার বাতায়নে ? তবু এসেছিল তারা বহু দূর দিগন্ত পার করে এক ঝাঁক-আকাশের আলো নিয়ে ।
নদী পারাপার সমুদ্রের নোনা জলের ঘ্রাণে, শ্মশানের  স্তব্ধ রাতের আঁধারে ওরা এসেছিল  গান নিয়ে ।

সেদিন তোর কথা বলেছিলাম মিথ্যে করে। তোকে দেখেছিল কেউ মাঠে ঘাটে, মিছিল মিটিঙে  পার্কের গেটে । কখনো কারোর বুকে লুকিয়েছিল মুখ অনেক মানুষের ভীড়ে । তোর  নাম শুনেছিল কেউ কেউ মৃদু বাতাসে,  বারুদের ঘ্রাণে । কেউ কেউ দেখেছিল মুখ ভোরের আলোতে । কেউ বলেছিল কথা হয়েছিল একবার, কেউ বলেছিল কথা বলতে চাইনি কখনো; মুখ বেঁকিয়ে চলে গেছে দূরে ।

এভাবেই রটেছিল সেই রাজকন্যার কথা, যার জন্যে কোন রাজপুত্র আসেনি ঘোড়ায় চেপে, এসেছিল কিছু পাথর ভাঙার দল , দল বেঁধে  রাতভোর গান বেজেছিল সেদিন হিন্দি গানের সুরে । দেশী-বিদেশী-ভূটানী মদে নেচেছিল অনেক মানুষ । শিউলির ঝড়ো হাওয়ার আগে ওরা গেয়েছিল পালকির গান দলবেঁধে । এমন উৎসব তার প্রতিদিন হয় । সেই যে কত যেন সাল ছিল সেটা; নদী পেরিয়ে এসেছিল বাবার হাত ধরে  আদুল গায়ে, অনেকেই এসেছিল সেদিন । আজো আসে যায়  যখন যেদিক থেকে ছুটে আসে বারুদের ঘ্রাণ ।

এমন উৎসব হয় তার প্রতিদিন, ফুলের আকার আকৃতির আলোর আঁধারে । কখনো শঙ্খমালার মতো
হয় রাত্রি যাপন, কখনো বা ফিরে আসে ভাড়াটে অটোর হাত ধরে । কখনো চুম্বনে শেষ হয় রাত্রি যাপন
কখনো কালশিটে শরীর নিয়ে ফেরে ভোরের জানালায় ।




0 comments:

Post a Comment