রবিবারের রোমাঞ্চ এবং ডালিয়া

আমার রোজ রোজ রবিবার, আর রোজকার রহস্য রোমাঞ্চ। এখনকার একলা ঘরে রোজ রাতে ঘুমের ওষুধের মত রাতভর চলে Sunday Suspenseএর Youtubeএর এপিসোড গুলো। ভিডিও, আসলে কিন্তু অডিও, রেডিও থেকে আমদানি। হেমেন্দ্র কুমার রায় থেকে শরদিন্দু, সত্যজিৎ - কে নেই সেখানে? Autoplay অন করে দিয়ে ঘুমের তোড়জোড় শুরু করি। ঘুমে চোখ যতটা বুজে যায়, কানও কি ততটাই বোজে?
ঘুম আর মৃত্যুর মধ্যে একটা মিল বরাবরই লক্ষ্য করা গেছে। আমি কিন্তু মজা পাই কানের কথা ভেবে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কি শোনা যায়? যায় কি? জানি না; কিন্তু কেন জানি না, আমি নিশ্চিত যে মরা মানুষের কান দিয়ে কথা ঢুকে তার মরমে পশে।

আমাদের পাড়ায় অনেকগুলো আমগাছ ছিল বলে লোকে তাকে আমবাগান বলত। এখনও বলে। কিন্তু আমরা আর সেখানে থাকি না। সেই সব গাছে গুছিয়ে আমও হতো, কিন্তু সেই সব গাছে গুছিয়ে আম হতো, কিন্তু সে আম এতই টক হত যে, চিনি কিনতে গিয়ে বুড়ো হয়ে যেত লোকে। আমগাছগুলো ছিল এক জমিদার বাড়ির সম্পত্তি। তাদের হয়ে এক বুড়ো গাছগুলোর দেখাশোনা করত। আম ঠিকমত পেকে গেলে সেগুলো পেড়ে বিক্রি করে আসত বাজারে। তাকে সবাই ডালিয়া বলে ডাকত। বয়সের গাছপাথর কোনোটাই ছিল না তার। গালগুলো একেবারে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল, চোখ দিন দিন আরো ছোটো হয়ে এসেছিল, বয়সের ভারে কোমর থেকে সরীরটাও ঝুঁকে পড়েছিল সামনের দিকে।
সে যেমনই হোক, ডানপিটে ছেলেরা আম পাড়তে এলেই শূন্য থেকে উদয় হত সে। হাতে থাকত ইয়া বড় এক লাঠি। আমার তো ছোট বেলায় কখনও কখনও মনে হত, ডালিয়া লোকটা আসলে একটা ভুত, যে কিনা যক্ষের মত পাহাড়া দিচ্ছে গাছগুলোকে!

আমি একদিন দোতালার বারান্দা থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলাম ওকে। আমাদের বাড়ির সামনের আমগাছে উঠেছে আম পাড়বে বলে। ডালে ডালে দিব্যি লটকে বেড়াচ্ছে। আমি নিঃশব্দে ওর আম পাড়া দেখছিলাম থামের কোন থেকে। ওমা, হঠাৎ পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আমার দিকে তাকাল ডালিয়া। অথচ আমি একটুও শব্দ করিনি। কি ভয়ঙ্কর সে চাহনি, যাকে বলে একেবারে রক্ত জল করা। আমার কেমন জানি মনে হল, ওর চোখ জোড়া উড়ে এসে আমার কানে সেঁধিয়ে গেল। ডালিয়ার সেই মরা চোখ জোড়া আমার কানে ঢুকে যাবার পর থেকেই আমার এহেন বিশ্বাস যে, মানুষ এবং মানব উভয়েই পটল তুললেও কর্ন নামক এই কুহর আর পটহ থেকেই যায়।

গল্প শোনায় কি ছেলেবেলা ফিরে আসে? ছোটবেলায় বাবা-মা, দাদু-দিদিমার ঝুড়ি ঝুড়ি ঘুমপাড়ানি গল্প। এমন সব গল্প যা আদৌ কখনই লেখা হয় নি। যেসব গল্পের প্রতিটা কথাই  মুখ দিয়ে বেরোনোর সেকেন্ড খানেক আগেই মগজে গজিয়েছে। যেসব গল্প শেষ করতে না পারলে বা ঘুমে চোখ জড়িয়ে এলেই ঘুহার ভেতর landslide আর গল্পের সম্ভাবনাময় অকাল মৃত্যু হত। সারারাত জুড়ে আধো ঘুমে আধো জেগে থেকে ক্ষীণ কান পেতে এইসব রবিবারের রোমাঞ্চ গল্প শুনি।
হেমেন্দ্রকুমারের আগার সাথে কিরিটির পাছা কিংবা ব্যোমকেশের অন্তরার সাথে শঙ্কুর সঞ্চারী। রাতভর এরা মিলমিশ করে। আমার ঘুমন্ত কান কোনো গল্পই পুরোটা শোনে না, আধো আধো রেখে যায় সবাইকে। আর এক গল্পের সঙ্গে অপর গল্পটা জুড়ে গিয়ে মাথার ভেতর কেমন গোলমাল পাকিয়ে তোলে। এইসব গুলোনো গল্পেরা আমার তুমি। তবে আমার কেন জানি মনে হয় গল্প গুলো শেষ না হবার অন্য কোনো কারন আছে। ওদের মিলিয়ে মিশিয়ে গুলিয়ে দেয় ডালিয়ার চোখজোড়া। গল্প গুলো কান দিয়ে ঢুকতে শুরু করলেই ডালিয়ার ওই নিকষ নিকুতি চোখজোড়া ঘিরে ধরে তাদের। ইয়া বড় একটা লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে। ব্যস, তাদের আর আম পাড়া হয় না।

রাতভর গল্পের যাতায়াত চলতে থাকে। এরা আমার স্বপ্নেও ঢুকে পড়ে। তার ভিতর দেখি রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ একটা লোক তার বাড়ির চাবি ছুঁড়ে দেয় আমার দিকে। আমিও হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত। তালা খুলে ঢুকে পড়ি তার বাড়ি। এঘর ওঘর করতে থাকি। কিন্তু ক্রমশই মনে হয়, বাড়িতে আমি ছাড়াও অন্য কেউ আছে, অথচ দেখা দেয় না সে। ঘুমের মধ্যে আমার আরও ঘুম পায়। শোবার ঘরের সাজানো পাট করা বিছানা দেখে লোভ সামলাতে না পেরে শুয়ে পড়ি। চট করে ঘুম চলে আসে চোখে। ঘুম ভাঙলে দেখি, আমার বিছানার উপর আমার ঠিক পাশে কেউ একটা আম রেখে গেছে । আমার চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে আসে। সেই ঝাপসা চোখেও মনে হয় অন্ধকার ঘরের কোন বরাবর কে যেন দাঁড়িয়ে আছে! কোমর থেকে ঝুঁকতে ঝুঁকতে গোটা শরীরটাই দু'ভাগে ভাগ হয়ে গেছে তার। 




0 comments:

Post a Comment