কোনো এক ধীরগতির পড়ন্ত অক্টোবরের সকালে



ছোট ছোট অনেক সুখের কথাই আমি মনে রাখতে পারি না। অথচ দুঃখগুলো ঠিকই মনের কোথায় যেন ঘাপটি মেরে থেকে যায়। সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় সময়গুলোতে ফিরে এসে মনে করিয়ে দিয়ে যায়- হু হু বাবা আমরা কিন্তু আছি। কোনোকিছুতেই যেন খুশি খুশি না মনে হয়।

ব্ল্যাক সী বা কৃষ্ণসাগর আর মারমারা সাগরকে যে প্রণালীটি সংযুক্ত করেছে তার নাম বোধ করি আমরা সবাই জানি। বসফরাস প্রণালী। এ প্রণালীটির নাম স্থানীয় ভাষায় সোনালী শিং। ওখানে গিয়ে রানী হেরাডিটাস গাভীর রূপ ধারণ করে নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করেছিলেন জিউসের কাছ থেকে। সেই গাভীর শিং ছিল সোনালী বর্ণের।

ভালিটোভা নদীর যেকোন ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিলে আমার মনে হয় ইউরোপের জাগরণের পর থেকে এখন পর্যন্ত পুরো বিবর্তনটার একটা ভাসা ভাসা ছবি দেখা যায়। এক মধ্যরাতে প্রায় দু'টোর বেশি বাজে মতো সময়ে, একদম একা আমি ভালিটোভা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে হঠাৎ পঞ্চদশ শতকের পোশাকে তোমায় দেখেতে পেয়েছিলাম। অথচ আমি সে সময় প্রাগে আরেকজনের স্মৃতি মন থেকে ধুয়ে ফেলে আসার আশায় গিয়েছিলাম।

সে আশা তো পূরণ হয়ই-নি, বরং পুরোনো আরও একটা স্মৃতি এসে পুরো অবস্থাটাকে লেজে গোবরে করে দিয়ে গিয়েছিল। সে সময় থেকে ধীরে ধীরে আমি কান্ট্রি-সং শোনা কমিয়ে হিপ-হপ শোনা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।
তবে লেজে গোবরে অবস্থার মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিল যে জন তার বিদায় কাঁদিয়েছিল আরও বেশি। প্রতিটি ভাঙ্গা-গড়ার খেলা আমায় শক্তিশালী করেছে ঠিকই, কিন্তু পরের ভাঙ্গনের তীব্রতাটাও ছিল অধিকতর শক্তিশালী। ধীরে ধীরে আমি রক্ত-মাংসের মানুষ থেকে, অনুভূতিহীন জড়পদার্থে রূপান্তরিত হয়েছি।

মনের গহীনে একটা টনের্ডো অনেকদিন ঘুরে ঘুরে হাহাকার করেছিল, যদিও কিসের হাহাকার তার কোনো দিশা পাওয়া যায় নি। আমি টনের্ডোটাকে পাত্তা দিতাম না দেখে সেটা রেগে ধীরে ধীরে আমার অনুভব-ক্ষমতাকে পুড়িয়ে দিয়েছে। তাই আজকাল খুব কম বিষয়ের প্রতি নিজের আগ্রহের প্রতিফলন দেখতে পাই। জীব থেকে জড়, জড় থেকে বিলুপ্তি, বিলুপ্তি থেকে নক্ষত্রকণা- এই চক্রের পাকে আটকে পড়ার আগে আমি চেয়েছিলাম একবার হয়তো তোমার সাথে আমার দেখা হবে। যে জলে সেই টনের্ডোর নির্বাণ ছিল, সে জলের একটি কণা আঙুলে তুলে দেবো ছড়িয়ে মেঘপিওনের উদ্দেশে।

একটা বই লিখার ইচ্ছা আমার বহুদিনের। নিজের ভাষায় কিংবা বিদেশি ভাষায়- যেটাতে হয় সেটাতেই। শুরু করি করি করে করা হচ্ছে না। শুরু করে ফেলে রাখার চাইতে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে শুরু করা ভাল, নাকি আগে শুরুটা করে পরে দেখা ভালো যে লেখা হয় কি হয় না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি এখন।

আমার বিশ্বাস আমাদের প্রত্যেকের জীবনই একেকটা উপন্যাস। লাইভ অ্যাকশন সিনেমাও বলা যায়। শুধু লিখে ফেলতে পারলেই হয়। এবং যথারীতি লেখাটা সহজ নয়। সেই সকাল থেকে টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। এরই মধ্যে ঘুম থেকে উঠে কফি বানিয়েছিলাম। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে জিজ্ঞেস করি- in a scale of black coffee to dema coffee, what would you like to have today mir? এক বন্ধুর নামে আমরা একটা কফির নাম দিয়েছি। সাধারণত দুধ-কফিতে কালো-কফির সাথে দুধ মেশানো হয়,কিন্তু ডিমাকে দেখতাম দুধ জ্বাল দিয়ে সেটায় ইনস্ট্যান্ট কফি মিশিয়ে পান করতে। ওটা দুধ কফির চেয়েও বেশি দুধ সমৃদ্ধ। কোনো সকালে ইচ্ছে করে শুধু কালো-কফি পান করতে, কখনো ইচ্ছে করে সাধারণ দুধ-কফি পান করতে, আবার কখনো-সখনো ইচ্ছে করে ডিমা-কফি পান করতে। আজও সকালে উঠে নিজেকে ওই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেছিলাম। উত্তর এসেছিল ডিমা-কফি।

এক মগ কফি আর সিগারেট নিয়ে বসাটা সাধারণত আমার দিনের প্রথম কাজ। বেশিরভাগ দিন এই কাজটাই করা হয় না। ফল হিসেবে বাকি কাজগুলোও করা হয় না। এক পর্যায়ে গিয়ে শেষ করে ফেলি পুরো দিনটিকে। কোনো কিছু করা ছাড়াই। আবার কোনো কোনো দিন প্রথম কাজটা হয় তো পরের গুলোতে গিয়ে গড়িমসি দেখা দেয়।
 শুনেছি যারা নাকি শুয়ে থাকে, তাদের ভাগ্যটাও শুয়ে থাকে। আসলেও তাই। জীবনে কোনো সুখবর নাই আজ বহুদিন। ২০১৮  সালের তৃতীয় ভাগে এসে প্রচণ্ডরকম একঘেঁয়েমি আর আলসেমিতে ভরা একটা পর্যায় কাটছে জীবনের। আমার নিজের ওপর ভীষণ বিরক্তও লাগে এ কারণে। তারপরও কোনোভাবে নিজেকে ইন্সপায়ার করতে পারি না একটা কিছু করার জন্য। এমনও না যে শারীরিকভাবে কোনো সমস্যায় আছি। এমনিতে কোথাও গেলে খুব হইচই করি। স্ট্যামিনা, এনার্জি লেভেল সব টপে আছে। শুধু মোটিভেশনের কাঁটা গিয়ে ঢুকে আছে গর্তে।

গর্তের কথায় মনে পড়লো আইবিএ গ্যারেজের গভীর সেই গর্তটির কথা। আমরা ক'জন গর্তজীবী জীবনের অনেকটা সময় ওখানেও পার করেছি। তন্দ্রাচ্ছন্ন, নোংরা আর অন্ধকার সময়। ফ্রুট নিনজার মতো বিরক্তিকর একটা গেইম খেলে কাটানো অস্বাভাবিক সময়। কোনো ইতিবাচক প্রাপ্তি ছিল না সে সময়গুলোর। বন্ধু-বান্ধব মিলে মদ-গাঁজা টানার একটা মোটামুটি রকমের জায়গা ছিল ওটা- এটুকুই। মদ খেয়ে বেশিরভাগ সময় নিজেদের ইমব্যারাস করা ছাড়া আর কিছু করা হতো বলে মনে পড়ে না। মাঝে মাঝে যারা টুকটাক গান-বাজনা পারে, তারা চর্চা করতো। তবে সেটাও সমুদ্রে শিশির বিলানোর মতো সামান্য।

এই ভাবনাটা একটা কিলার। এসব যখন ভাবতে বসি তখন মনে হয় আসলে আর সবার জীবন নিয়ে উপন্যাস লেখা কিংবা জম্পেশ সিনেমা বানানো গেলেও আমারটা দিয়ে এক বস্তা বিরক্তি উৎপাদন ছাড়া আর কিছুই করা সম্ভব হবে না। কি লাভ তাই ওসব ভেবে। বরং সুতো ছেঁড়া ঘুড়ির মতো এটাকে উড়তে দেয়াই অপেক্ষাকৃত ভাল, তাই না? উড়তে উড়তে যদি কোনো গাছের ডালে আটকে যায় তাহলে হয়তো ক'টা দিন একটু নিশ্চিন্তে কাটবে। তারপর কোনো হয়তো এক ঝড় বাদলের দিনে শেষ হবে সেই ঘুড়িটার আত্মজীবনী। আর ভাগ্য বিরূপ হলে গাছে না আটকে পড়বো গিয়ে ডোবা-নালায়। পুঁতিগন্ধময় সলিল সমাধি।

কখনো এই ঘুড়িটা আবার উড়বে এমন উচ্চাশা আজকাল স্বপ্নেও করি না। একটা সময় অবশ্য আকাশে ওড়ার স্বপ্নই দেখতাম। জীবনের রঙিন কিছু সময়ে মানুষকে সেসব স্বপ্নের ভাগ দিতেও সক্ষম হয়েছিলাম। যদি বাস্তবে সেসব না ঘটতো, তাহলে আজ আমিও সেসবে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু নিজের অতীতকে মানুষ নিজে তো আর ভুলে যেতে পারে না।

যাহোক ঘুড়ি-টুড়ি উড়ুক না উড়ুক, ব্যাপার না। কিছু কিছু আজগুবি প্রবাদে বিশ্বাস করতে আজও ভাল লাগে। ভাগ্যে কার কি লেখা আছে তা নিয়ে ভাবতে ভাল লাগে। আর যেহেতু করার অন্য কিছু নেই, তাই এই সুতোছেঁড়া উড়াউড়িকেই ভাল লাগে। একটা কাজ যতক্ষণ ভাল লাগে, ততক্ষণ সেটা করায় তো কোনো ক্ষতি নেই, তাই না?




0 comments:

Post a Comment