এক পালকের খোঁজে



প্রতিদিন সকাল হলেই যে পাখিটা উড়ে চলে যায়, তার ঠোটে লেগে থাকে রাত্রির অন্ধকার আর কিছু নির্বাচিত বিষাদ। হাওয়ায় হাওয়ায় কড়া নেড়ে যায় কেউ... গ্রামের খেয়াঘাটে মাঝি নেই... একমনে আনমনা তাকিয়ে থাকে মাছরাঙা; মাছ নয়, আমি বুঝতে পারি সেও তার ঈশ্বরীকে খোঁজে।
আমি খুঁজে বেড়াই সেইসব রমনীদের, যারা হৃদয়ের সব ফুটোফাটা জুড়ে দিতে পারে। রাংতা ঝালাই দিয়ে দুমরে মুচড়ে যাওয়া নাগরিক বিষন্নতা গুলোকে জলতরঙ্গের মত আবার বাজিয়ে তুলতে পারে।

বিষন্নতা, কেন তুমি খেলা কর হলুদ বাগানে? বিকেলের মরমী ছায়ারা তোমাকে কী বলেনি কিছুই সিক্ত মমতায়? দীর্ঘ্য দু'টি পা ফেলে অনিঃশেষ হেঁটে যায় দিগন্ত থেকে দিগন্তে একা এক মানুষ।

আমরা কি কখনও আর নদীকুলে কাশবন ভেঙ্গে উড়ে যাওয়া নীলকণ্ঠ পাখি দেখে চোখে চোখে হাততালি দেব! ভুলে যাওয়া শৈশবের খেলাঘরে মুক্ত দ্বারপথে দখিনা বাতাস আর কি কখনও অকৃপণ দু'হাতে বিলাব? বিচিত্র মিনতি কাঁপে ঘাসে ঘাসে আকাশের নক্ষত্র মালায়। এখানে কুয়াশা নেই; শেষতম পাখি উজ্বল আলোয় ভেসে উড়ে গেছে সেই কবে। ধীরে ধীরে সকাল নামে, সকাল গড়িয়ে দুপুর, বিকেল ছুঁই ছুঁই। ছায়া নামে, দুরের দিগন্তে বলিরেখা ভিড় করে আসে; চিলেকোঠার দখিনের কোন ঘুরে ফিরে যায় উত্তুরে এক বাতাস।
হঠাৎ হঠাৎ যেন মনে পড়ে যায় কাকে কী দেবার ছিল,  কি যেন কি কথা কাকে বলব বলেও বলা হয়নি। শ্যামল হৃদয় জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নীলকন্ঠ পাখি কবে কার ডাক শুনে উন্মনায় উড়ে গেছে উদাসী আকাশে।

এখানে আমার যত ঋণ, যত ভালোবাসা অনিঃশেষ জমা হয়ে আছে। পিতৃপুরুষেরা আজও বুঝি স্নান করে এইখানে, চাষ করে জমি। তাদের গায়ের ঘ্রান আজও পাই আমি সাঁঝবেলাকার কুয়াষায়, ঘুঘু ডাকা নিঝুম দুপুরে কিংবা ঘনিষ্ট রাত্রির বুকে ভাটিয়ালী কির্তনের সুরে।
এখানেই ফিরে আসি, হয়ত বারবার ফিরে আসব। কখনও স্মৃতির টানে, কখনও বা ভালোবাসা আদুড় শরীরে দুই হাতে ছেনে মেখে নিতে।

শীতের রোদে গা ঝেড়ে উড়ে যায় নীলকন্ঠ পাখি; বিভোর বালক ভাববে সব নদী সমুদ্রে মিলাবে। আতপ্ত হরিৎক্ষেত্রে দূরাগত যাকে কাছে পাবে উদ্ভাসিত মুখ তুলে তাকেই সে নিমন্ত্রন জানাবে একাকীঃজানো কী, পথের শেষে আমাদের কুড়েঘর আছে। নিদাল আকাশ ঘিরে ভোরের আলোর রঙ ফিকে হয়ে এলে কাঞ্চনমালার চোখে দেখা যাবে পৃথিবীর অবশিষ্ট স্বপ্ন কার চোখে যেন স্মৃতি হয়ে আছে।
কিছুই আশ্চর্য্য নয়, অথচ এক অদ্ভুত বিকেলে আমাদের তিল তিল সঞ্চয়ের যা কিছু কানাকড়ি ফুরিয়ে যায়  একে একে। শুধু সেই গাঢ় চোখের আশ্চর্য্য বালিকা কাঞ্চনমালার দেশে নিয়ে গিয়ে হাতে দেবে হারিয়ে যাওয়া এক নীলকণ্ঠ পাখির পালক।


0 comments:

Post a Comment