নেশাতুর চোখে তুই...অলকানন্দা




আমার ভাঁড়ারে আছে পুরানো এক পারিবারিক রৌদ্রাগার। বহুকাল ধরে বেচতে চাচ্ছি এটা, কেউ নেয়না। দোকানদারিতে আমি অপটু, এই কথা সত্য। তবু হাল ছেড়ে দেইনি একেবারে। চার রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকেছি বহুক্ষণ। সম্ভবত মায়ায় পড়ে এক রূপান্তরিত বৃহন্নলা ভদ্রমহিলা এসে হাতে তালি দিয়ে গানের সুরে সুরে সামান্য রোদ কিনতে চাইলেন। না করে দিলাম। আমায় ঘিরে গোল হয়ে আছে ট্রাফিক জ্যাম, আমি আকাশে তাকিয়ে দেখি কার্বন আর গন্ধক পুড়ে পুড়ে উড়ে যায়। ডিসেম্বর শেষ হয়ে আসে, কিন্তু শীত আসেনা এখনো শহরের বুকে। আয়োজন কিন্তু সমস্তই আছে। ফুটপাতে শিশুরা সাজ সাজ রবে উল্লাস করে, শীতের নতুন জামা পাবে বলে। বাতাসে বিষণ্ণতা আঁচ করে নিষেক ঘটিয়েছিলো কংলাক পাহাড়ের একটি কমলালেবুর পরিবার। শুধু শীত এলোনা বলে অকালে গর্ভপাত হয়ে গেলো। 

শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব- প্রতি সন্ধ্যায়
কে যেন ইয়ার্কি করে ব্যাঙের রক্ত
ঢুকিয়ে দেয় আমার শরীরে- আমি চুপ করে বসে থাকি- অন্ধকারে
নীল ফানুস উড়িয়ে দেয় কারা, সারারাত বাজি পোড়ায়
হৈ-হল্লা- তারপর হঠাৎ
সব মোমবাতি ভোজবাজীর মত নিবে যায় একসঙ্গে- উৎসবের দিন
হাওয়ার মত ছুঁতে যায়, বাঁশির শব্দ

আর কানে আসে না- তখন জল দেখলেই লাফ দিতে ইচ্ছে করে আমার
মনে হয়- জলের ভেতর- শরীর ডুবিয়ে
মুখ উঁচু করে নিঃশ্বাস নিই সারাক্ষণ- ভালো লাগে না সুপর্ণা, আমি
মানুষের মত না, আলো না, স্বপ্ন না- পায়ের পাতা
আমার চওড়া হয়ে আসছে ক্রমশঃ- ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনলেই
বুক কাঁপে, তড়বড়ে নিঃশ্বাস ফেলি, ঘড়ির কাঁটা
আঙুল দিয়ে এগিয়ে দিই প্রতিদিন- আমার ভালো লাগে না- শীতকাল
কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব

একবার ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই মেঘ ঝুঁকে থাকতে দেখেছিলাম
জানলার কাছে- চারদিক অন্ধকার
নিজের হাতের নখও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না সেদিন- সেইদিন
তোমার কথা মনে পড়তেই আমি কেঁদে ফেলেছিলাম- চুলে, দেশলাই জ্বালিয়ে
চুল পোড়ার গন্ধে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আবার-
এখন আমি মানুষের মত না- রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
হঠাৎ এখন লাফ দিতে ইচ্ছে করে আমার- ভালোবাসার কাছে, দীর্ঘ তিনমাস
আর মাথা নীচু করে বসে থাকতে ভালো লাগে না- আমি
মানুষের পায়ের শব্দ শুনলেই
তড়বড়ে নিঃশ্বাস ফেলি এখন- যে দিক দিয়ে আসি, সে দিকেই দৌড় দি
কেন এই দৌড়ে যাওয়া? আমার ভালো লাগে না
শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব।

গোলাপি গাজর আর সবুজ বাঁধাকপির দল পরিমিত পুষ্টি আর ঠাণ্ডা না পেয়ে পাগলের মতো হয়ে গেছে। বাজারে এদের দাম মুক্তিবেগ অতিক্রম করে আকাশ ছুঁয়ে যাবে শীঘ্রই। বিশেষজ্ঞের মতো এইটাই। অনেকগুলো মাংসল মোরগ অপেক্ষায় ছিলো আসছে শীতে কাবাব হবে ভেবে। কই? কোথাও কোন বার্বিকিউয়ের ঘ্রাণ তো পাইনা! পামিস্ট হলে শহরের হাতের রেখা দেখে বলে দিতাম, ক্রাচে ভর দিয়ে কোথায় চলে গেলো শীত। উষ্ণতার উদ্যান বসে আছি এই নিশাচর নগরীতে। কে নেবে স্বচ্ছল রৌদ্র?

রান্নাঘরের দরজা থেকে আমাদের নাটকের শুরু, নাটকের
প্রধান প্রধান চরিত্রেরা যথাক্রমে ক্ষিদে, 
বুকে ব্যাথা, নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, ভয়, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি ইত্যাদি।
তারা দর্শকদের যথাযথ হাততালি কুড়িয়েছে। 
সভাপতির বিসেষ পদ পেয়েছে বিচ্ছিন্নতা। সে আজ
লাল এলাকায় যাবে; ফুর্তি করবে।
দু-চারদিন পর ক্ষিদে যখন ক্ষুব্ধ হল, আমাদের নাটক 
আবার রান্নাঘরের দিকে ফিরে চলল। 
রান্নাঘরের মেঝে তখন ডাহা শুকনো, উনুন তখন ফাঁকা।
বিষন্নতা তখন মুষঢ়ে পড়েছে, ভয়-দুশ্চিন্তা পিছু হটছে-
নিঃসঙ্গতা শুধু মিলিয়ে যেতে যেতে, মুছে দিচ্ছে আমাদের চোখের জল। 


পকেটের ভাঁজে দুমড়ে যাওয়া ছোট নেভিকোটের গায়ে এখন আর জড়তা বলে কোনও চিহ্ন নেই। শুধু একটা ডিসক্লেইমার পুড়ে যাওয়া ছাই আর তোমাকে ইনফিনিটিতে বিলীন হতে দেখা। পথের দাবিদাওয়া লুটিয়ে পরতে দেখেছি পথেই। এখন এর নেই কোনো শেকল ভাঙ্গার গান। ব্যাথাতুর স্বপ্নেরা সময়ের পাতা উল্টায় শুধু আর মনখারাপের বর্ষা এসে ঢেকে দেয় সাধের টেকনোপলিস। এভাবেই নতুন সম্পর্কেরা বড় হয় দু'আঙুলের ফাঁকে। 
জানালা দিয়ে উঁকি মারছে ভিজে শালিকের জোড়া; খুঁটে খোয়া দানায় পার হয়ে যাচ্ছে  একলা একটা রাত, আর মৃত আলফাজ একটা একটা কোরাস লিখে রেখে যাচ্ছে। বাক্সবন্দি বিকেল যেদিন ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল তার নাম দিয়েছিলাম আত্মজা। তারপর নাইটগাউন পরে যখন শব্দেরা পথ দেখাল হিপ্নোটাইজড হয়ে, রক্তিম উত্তাপে ডুব দিলাম স্ট্রবেরী বাগানে। 

এখন ভেজা রাস্তায় শুধু বৃষ্টি প্রবনতা দেখি। আর নেশাতুর চোখে তুই...অলকানন্দা।

যে সব দুপুর গুলো হারিয়েছি - যে সব বিকেল গুলো
ফিরে পেতে চাইনা আর;
বিষন্নতা, তুমি আজ আমাকে ঘিরো না-
জেনো, আমি
এক ডজন মোমবাতি কিনে
নতুন জীবন শুরু করে দিব আগামী সপ্তাহে... 






0 comments:

Post a Comment