শহুরে শীতের সন্ধানে



ধর্মতলার মোড়। বিকেল পাঁচটা। বছরের অন্য সময় হলে একটা বাড়ি ফেরার তাড়া দেখা যেত শুধু। সেটা অবশ্য এখনও আছে। গলার মাফলার কানদুটোর ওপর একটা সতর্ক আবরণ চাপিয়ে রেখেছে। যেই মাথাগুলোর ওপর তার প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি কোন অছিলায়, সেখানেও সে নিজের বিশ্বস্ত অনুচর পাঠিয়ে রেখেছে। মাঙ্কি কিম্বা ফাঙ্কি ক্যাপের চাঁদোয়া কাটিয়ে কোনোভাবেই আমাদের মাথার উত্তাপ উঠে যেতে পারছে না কোন শূন্যের উদ্দেশ্যে। গেলে ভালো হত। গেলেই ভালো হত। এমনিতেও আজকাল বড্ড তাড়াতাড়ি মাথা গরম হয়ে যায়। সময়েরই দোষ হয়তো বা। কিন্তু সে উত্তাপ নিজস্ব ওয়্যারলেস সিস্টেম তৈরি করে চ্যাট করতে পারছে না নিজেদের মধ্যে। তা বলে চুপ করে বসেও থাকছে না। কাঁধ ছুঁয়ে হাত বেয়ে নেমে আসছে আঙুলে। তারপর ফোনের স্ক্রিন। নীল-সাদা বা সাদা-সবুজ। প্রেক্ষাপট তৈরিই থাকে আজকাল। না হলে একটু চেষ্টা করে সেট তৈরি করে নেওয়া মোটেই কঠিন কিছু নয়। গরম খবর সব সময়েই তৈরি থাকে। গা ভাসিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা শুধু।
শহরটার স্পন্দন পাল্টে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। কেউ সাহস করে একটা গ্রাফ প্লট করতে পারছে না। খুব চাপ। শেষমেশ যদি দেখা যায় গ্রাফ মেলেনি? তারচে কানে হেডফোন গুঁজে নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য পাঁচিল তুলে দেওয়া ভালো। রিয়্যালিটি থেকে বেশ খানিকটা রেহাই পাওয়া যায়। কেউ এস্কেপিস্ট বললে কিন্তু চুপ করে থাকা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুক খুলে দেখিয়ে দিতে হবে নিজেদের টাইমলাইন বা অ্যাক্টিভিটি লগ। নিজেদের স্বার্থেই। নাহলে ঘুম আসবে না। একটা তৃপ্তিকর সঙ্গমের পরেও।

শহরে ঠাণ্ডা পড়ছে। টেম্পারেচার তেমন কমেনি বটে, কিন্তু মনের ভেতর বরফ জমছে। টের পাচ্ছি ভীষণভাবে।
এ বরফ কি গলবে আদৌ?

বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে এসবই ভাবি। একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসতে চায়। বাস এসে যায়। উঠে পড়ার পরেও একই দৃশ্য। স্মার্টফোন, না-জানা কারণে নীচু হয়ে থাকা মাথা, খুচরোর জন্য চেঁচামিচি, শরীরের বিশেষ ভাঁজে ভাঁজে খেলা করা দৃষ্টি...এসবের মাঝখানে নতুন সোয়েটারের গন্ধ, জ্যাকেটের রং, গঙ্গাফেরত ঠাণ্ডা হাওয়া সঅঅব কেমন থম মেরে যায়। চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসটা সব বাধা ঠেলে বেরিয়ে আসে। স্তব্ধতার আস্তরণ নেমে আসে সবার ওপর।

শহর নিঝুম হয়ে আসে। নিঝুম হয়েই থাকে। শহরে শীত আসছে।



0 comments:

Post a Comment