Manuscript Found In Accra - Paulo Coelho - অনুবাদ কবিতা


আক্রায় পাওয়া পান্ডুলিপি থেকে 

নিঃসঙ্গতা ছাড়া ভালোবাসা বেশিক্ষণ তোমার পাশে থাকবে না।
কারণ ভালোবাসার বিশ্রামের প্রয়োজন হয়, যাতে সে স্বর্গের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করতে পারে এবং নিজেকে অন্য আঙ্গিকে প্রকাশ করতে পারে।
ভালোবাসা ছাড়া কোনও প্রাণি বা তরুলতা টিকে থাকতে পারে না, কোনও মাটি উৎপাদনশীল থাকতে পারে না, জীবন সম্পর্কে শিখতে পারে না কোনও শিশু, কোনও শিল্পী  সৃষ্টি করতে পারে না কিছু, কোনও কাজের বৃদ্ধি বা রূপান্তর ঘটে না।
নিঃসঙ্গতা মানে প্রেমের অনুপস্থিতি নয়, বরং এর পরিপূরক।
নিঃসঙ্গতা মানে সঙ্গের অনুপস্থিতি নয়, বরং এমন মুহূর্ত যখন আমাদের আত্মা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে ও জীবনের করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
সুতরাং আশীর্বাদপুষ্ট তারাই যারা একাকিত্বকে ভয় পায় না, যারা আপন সঙ্গী নিয়ে ভীত নয়, যারা সর্বদা কিছু-একটা করার জন্য মুখিয়ে থাকে না, এমনকি কোনও বিনোদন বা কিছু মুল্যায়ন করার জন্যও নয়।
তুমি যদি কখনও একা না-হও, নিজেকে জানতে পারবে না।
আর নিজেকে যদি জানতে না-পারো, তুমি শূন্যতাকে ভয় পেতে শুরু করবে।
কিন্তু শূন্যতার কোনও অস্তিত্ব নেই। এক প্রকাণ্ড বিশ্ব আবিষ্কৃত হওয়ার অপেক্ষায় আমাদের আত্মায় লুকিয়ে থাকে। এটা তার সমস্ত অক্ষত শক্তি নিয়ে আমাদের মধ্যে বিরাজিত। কিন্তু এটা এত নতুন এবং এত ক্ষমতাবান যে আমরা এর অস্তিত্বকে স্বীকার করতে ভয় পাই।
আত্ম-আবিষ্কারের কাজটি আমাদেরকে এটা গ্রহণ করতে বাধ্য করবে যে আমরা আমাদের চিন্তার চেয়েও দূরে যেতে পারি। আর এটা আমাদেরকে ভীত করে তোলে। আমরা তখন ভাবি ভালো হয় কোনও ঝুঁকি না-নিলে। আমরা এও বলতে পারি : ‘আমার যা করা উচিত ছিল আমি তা করি নি কারণ তারা আমাকে তা করতে দেয় নি।’
এটাই বেশ সুবিধার মনে হয়। নিরাপদও বটে। আর একই সাথে এটা তোমার নিজ জীবনকে অস্বীকার করার শামিল।
করুণা তাদের জন্য যারা এ-কথা বলে জীবন কাটিয়ে দিতে পছন্দ করে : ‘আমি কখনও কোনও সুযোগ পাই নি।’
কারণ প্রতিটি দিন চলে যাওয়ার সাথে সাথে তারা তাদের নিজস্ব সীমাবদ্ধতার কুয়োয় তলিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় আসবে যখন তারা কুয়ো বেয়ে ওঠার শক্তি পাবে না এবং মাথার ওপর জ্বলজ্বল-করা উজ্জ্বল আলোটি পুনরাবিষ্কারেরও শক্তি থাকবে না।
তবে তারাই আশীর্বাদপ্রাপ্ত যারা বলে : ‘আমি তেমন সাহসী না।’
কারণ তারা জানে এটা অন্য কারও দোষ না। আর আগে হোক পরে হোক, তারা নিঃসঙ্গতা ও এর রহস্যের মুখোমুখি হতে প্রয়োজনীয় বিশ্বাসটুকু ফিরে পাবে।
****
যারা একাকিত্বকে ভয় পায় না, যা সমস্ত রহস্যের ঢাকনা খুলে দেয়, তাদের জন্য প্রতিটি জিনিসই ভিন্ন ভিন্ন রূপ রস নিয়ে হাজির হবে।
যে-প্রেম অন্য সময় অগোচরে থেকে যেত, একাকিত্বের মধ্যে সে-প্রেম তারা আবিষ্কার করবে। যে-প্রেম তাদেরকে ছেড়ে চলে গেছে, একাকিত্বের মধ্যে তারা সে-প্রেমকে বুঝবে ও শ্রদ্ধা করবে।
হারানো প্রেমকে ফিরে আসতে বলা ঠিক হবে কি না, না কি তারা একে এক নতুন পথে চলতে দেবে — নিঃসঙ্গতার কালে এ বিষয়েও তারা সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে।
নিঃসঙ্গতায় তারা এটা শিখবে যে ‘না’ বলাটা সবসময় উদারতার অভাবকে প্রকাশ করে না, আর ‘হ্যাঁ’ বলাটা চিরন্তন কোনও গুণও নয়।
আর এই সময়ে যারা একাকী থাকে শয়তানের এ-কথায় তাদের ভয় পাওয়ার দরকার নেই : ‘তুমি তোমার সময়ের অপচয় করছ।’
অথবা দানব প্রধানের আরো শক্ত কথায়ও ভয় পাওয়া উচিত নয় : ‘কেউই তোমার খবর রাখে না।’
আমরা অন্য মানুষের সঙ্গে কথা বললে স্বর্গীয় শক্তি তা শোনে। তবে আমরা যখন স্থির ও নীরব থাকি এবং নিঃসঙ্গতাকে আশীর্বাদ হিশেবে গ্রহণ করতে সক্ষম হই, তখনও স্বর্গীয় শক্তি তা শুনে থাকে।
আর সেই মুহূর্তে এর আলো আমাদের চারপাশের সবকিছু আলোকিত করে, আমরাও-যে প্রয়োজনীয়  এটা দেখতে সাহায্য করে, আর পৃথিবীতে আমাদের উপস্থিতি এর কার্যপ্রণালির মধ্যে প্রচণ্ড পার্থক্য রচনা করে।
আর আমরা যখন সেই সম্প্রীতি অর্জন করি, আমরা যা চাই তারচেও বেশি পেয়ে থাকি।
***
যারা নিজেদেরকে একাকিত্ব কর্তৃক নির্যাতিত মনে করে তাদের এটা মনে রাখতে হবে যে জীবনের সবচে’ তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তেও আমরা একা থাকি।
একটি বাচ্চার মায়ের পেট থেকে আবির্ভূত হবার বিষয়টি ধরা যাক: কতজন লোক উপস্থিত আছে তাতে কিছু যায় আসে না, বেঁচে থাকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি বাচ্চাটির মধ্যেই নিহিত থাকে।
ধরা যাক শিল্পী ও তার কাজের বিষয়টি : নিজের কাজটিকে প্রকৃতপক্ষে ভালো করার জন্য তার স্থির থাকা ও শুধু দেবদূতদের কথা শোনার প্রয়োজন হয়।
আমাদের সবার কথাই যদি ধরি, আমরা যখন অপ্রত্যাশিত আগন্তুক মৃত্যুর মুখোমুখি হই : আমরা সকলেই আমাদের অস্তিত্বের সেই সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ ও সবচে’ ভীতসন্ত্রস্ত মুহূর্তেও একা থাকি।
ঠিক যেমন প্রেম এক স্বর্গীয় অবস্থা, তেমনি নিঃসঙ্গতাও হলো এক মানবীয় অবস্থা। আর যারা জীবনের অলৌকিকত্ব অনুধাবন করতে পারে, তাদের ক্ষেত্রে ঐ দুটি অবস্থা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকে।
border
মানুষ সবসময় বলে : ‘ভিতরের সৌন্দর্যই আসল, বাইরের সৌন্দর্য কিছু না’
তবে এটা সঠিক নয়।
যদি তা-ই হতো, তবে ফুল কেন মৌমাছিদের আকৃষ্ট করতে এত শক্তি ব্যয় করে? আর সূর্যের মুখোমুখি হলে কেনই-বা বৃষ্টিবিন্দু নিজেদেরকে রংধনুতে রূপান্তর করে? কারণ প্রকৃতি সৌন্দর্য কামনা করে, আর প্রকৃতি তখনই সন্তুষ্ট হয় যখন সৌন্দর্য বিকশিত হতে পারে। বস্তুগত সৌন্দর্য হলো অন্তর্গত সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ, এবং এটা আমাদের চোখ থেকে প্রবাহিত আলোর মধ্যেই নিজেকে প্রকাশ করে। এটা কোনও বিষয় নয় যদি কোনও ব্যক্তি কুৎসিত পোশাক পরে কিংবা আমাদের রুচিবোধের সঙ্গে এটা যদি না-যায়, কিংবা সে যদি অন্যকে আকৃষ্ট করবার তোয়াক্কা না-করে। চোখ আত্মার আয়নাস্বরূপ, যা গোপনস্বভাবী সবকিছুকে প্রতিফলিত করে; আর, আয়নার মতোই, তারা তাদের গভীরে তাকিয়ে-থাকা মানুষটিকেও প্রতিফলিত করে। কারো চোখের দিকে তাকিয়ে-থাকা মানুষটির আত্মা যদি অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়, তাহলে সে শুধু তার কদর্যতাই দেখতে পাবে।
***
সকল সৃষ্টিতেই সৌন্দর্য নিহিত থাকে। কিন্তু বিপজ্জনক কথাটি হলো এ-ই, আমরা মানুষেরা প্রায়ই স্বর্গীয় শক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকি। অন্যরা কী ভাবে তাতে আমরা প্রভাবিত হই। আমরা আমাদের নিজস্ব সৌন্দর্যকে অস্বীকার করি কারণ অন্যরা হয়তো এটাকে স্বীকৃতি দেবে না। নিজেরা যেমন আছি তেমনি গ্রহণ করার পরিবর্তে আমরা আমাদের চারপাশে যা দেখি তা অনুকরণ করার চেষ্টা করি। অন্যরা যা সুন্দর ভাবে আমরা তা-ই হতে চেষ্টা করি, এবং একটু একটু করে আমাদের আত্মা বিবর্ণ হয়, আমাদের জীবনশক্তি দুর্বল হয়, এবং পৃথিবীকে সুন্দরতম স্থানে পরিণত করার যে-সুপ্তশক্তি আমাদের ছিল তা আস্তে আস্তে শুকিয়ে যায়।
আমরা ভুলে যাই যে দুনিয়াটা তা-ই যেভাবে আমরা একে কল্পনা করি।
আমরা চন্দ্রালোক হওয়ার কথা ভুলে যাই, পক্ষান্তরে চন্দ্রালোক প্রতিফলনকারী ডোবার জলে পরিণত হই। আগামীকাল এই জল সূর্যের আলোয় উবে যাবে। একদিন কেউ হয়তো বলেছিল : ‘তুমি দেখতে অসুন্দর’, কিংবা ‘সে খুব সুন্দরী’। ঐ সামান্য তিনটি শব্দ দিয়েই তারা আমাদের সমস্ত আত্মবিশ্বাস চুরি করে ফেলল।
আর আমরাও অসুন্দর ও তিক্ত-বিরক্ত হয়ে যাই।
***
সেই মুহূর্তে আমরা তথাকথিত ‘প্রজ্ঞা’ থেকে প্রশান্তি পেতে পারি। এই ‘প্রজ্ঞা’ হলো জীবনের রহস্যময়তাকে মর্যাদা দেয়ার বদলে বিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করতে ইচ্ছুক কিছু লোকের দ্ধারা স্তূপিকৃত কিছু ধারণা। এই ‘প্রজ্ঞা’ হলো আচরণের আদর্শ মান নির্ধারণের লক্ষ্যে কিছু অপ্রয়োজনীয় বিধিবিধান ও পরিমাপের সমষ্টি।
সেই মিথ্যে প্রজ্ঞা অনুসারে, আমাদের সৌন্দর্যসন্ধানী হওয়া উচিত নয়, কারণ এটা কৃত্রিম ও ক্ষণস্থায়ী।
সেটা সঠিক নয়। এই সূর্যের নিচে যা-কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে, পাখি থেকে শুরু করে পর্বতমালা, পুষ্প-পল্লব থেকে নদ-নদী, সবাই সৃষ্টিজগতের অলৌকিকতাকে প্রকাশ করে।
আমরা যদি অন্য লোককে আমাদের স্বকীয়তা নিরূপণের সুযোগদানের লোভটা সংবরণ করতে পারি, তাহলে পর্যায়ক্রমে আমরা সূর্যকে আমাদের আত্মার ভিতরে প্রজ্জ্বলিত হতে দিতে সক্ষম হবো।
ভালোবাসা উপেক্ষা করে চলে যায় আর বলে : ‘আগে তো তোমাকে কখনও দেখি নি।’
আর আমাদের আত্মা জবাব দেয় : ‘আরও মনোযোগ দাও, আমি এখানেই। তোমার চোখ থেকে ধুলো সরাতে কিছু মৃদুমন্দ হাওয়া লেগেছিল, কিন্তু এখন যেহেতু তুমি আমাকে চিনতে পেরেছ, আমাকে আর ছেড়ে যেও না, কারণ আমরা সকলেই সুন্দরের পূজারী।’
একরূপতায় সৌন্দর্য থাকে না, থাকে ভিন্নতায়। লম্বা গ্রীবা ছাড়া কে একটি জিরাফকে কল্পনা করতে পারে, কিংবা মেরুদণ্ড ছাড়া একটি ক্যাকটাস? পর্বতচূড়ার অসমতাই একে চিত্তাকর্ষক করে তোলে। আমরা যদি এগুলোকে একই রকম করতে চেষ্টা করি, তাহলে এগুলো আর আমাদের মন কাড়বে না।
অপূর্ণ জিনিসই আমাদেরকে অবাক ও আকর্ষণ করে।
আমরা যখন চিরহরিৎ বৃক্ষের দিকে তাকাই, আমরা এটা ভাবি না : ‘শাখা-প্রশাখাগুলো একই  দৈর্ঘ্যের হওয়া উচিত।’ আমরা ভাবি : ‘কত শক্ত এটি!’
আমরা যখন একটি সাপ দেখি, আমরা কখনোই বলি না : ‘সে মাটিতে ক্রলিং করছে, যখন আমি মাথা সোজা করে হাঁটছি।’ আমরা ভাবি : ‘সে ছোট্ট হতে পারে, কিন্তু তার ত্বক রঙিন, তার চলা আভিজাত্যময়, আর সে আমার চেয়ে অনেক শক্তিশালী।’
যখন উট মরুভূমি অতিক্রম করে এবং আমাদেরকে আমাদের গন্তব্যে নিয়ে যায়, তখন আমরা কখনোই বলি না : ‘সে তো হলো কুঁজো আর তার দাঁতগুলো কুৎসিত।’ আমরা ভাবি : ‘সে তার আনুগত্য ও সাহায্যের জন্য আমার ভালোবাসা দাবি করে এবং তাকে ছাড়া আমি কখনোই বিশ্বটাকে ভ্রমণ করতে পারতাম না।’
সূর্যাস্ত সর্বদাই অনেক বেশি মনোরম যখন তা আঁকাবাঁকা আকৃতির মেঘে ঢাকা থাকে। কারণ শুধু তখনই তা বহু ধরনের রং প্রতিফলিত করতে পারে যা থেকে স্বপ্ন ও কবিতার সৃষ্টি হয়।
করুণা তাদের জন্য যারা ভাবে : ‘আমি সুন্দর নই। এজন্যই ভালোবাসা আমার দরোজায় করাঘাত করে নি।’ প্রকৃতপক্ষে, ভালোবাসা করাঘাত করেছিল, কিন্তু তারা যখন দরোজা খুলেছিল, ভালোবাসাকে স্বাগত জানানোর জন্য তারা তখন প্রস্তুত ছিল না।
প্রথমে নিজেদেরকে আকর্ষণীয় করতে তারা খুব ব্যতিব্যস্ত ছিল, যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের মতো সুন্দর ছিল।
ভালোবাসা যখন আসল কিছু খুঁজছিল তারা তখন অন্যদেরকে অনুকরণ করার চেষ্টা করছিল।
বাহির থেকে আসা জিনিসটাকে তারা প্রতিফলিত করার চেষ্টা করছিল, অথচ এটা ভুলে গিয়েছিল যে উজ্জ্বলতম আলো আসে ভিতর থেকে।
border
প্রেমের কথা শুনতে হলে প্রেমকে অবশ্যই কাছে আসতে দিতে হবে।
তথাপিও, প্রেম যখন নিকটবর্তী হয়, আমরা ভয় পাই এটা আমাদেরকে কী বলতে পারে, কারণ প্রেম স্বাধীন এবং আমাদের ইচ্ছা কিংবা কার্য দ্ধারা তা চালিত নয়।
সকল প্রেমিকই তা জানে কিন্তু তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা ভাবে যে বিনয়, ক্ষমতা, সৌন্দর্য, সম্পদ, অশ্রু এবং হাসির মাধ্যমে তারা প্রেমকে প্রলুব্ধ করতে পারবে।
আসলে প্রকৃত প্রেমই মানুষকে প্রলুব্ধ করে এবং কখনও নিজেকে প্রলুব্ধ হতে দেয় না।
প্রেম পরিবর্তন আনে, প্রেম উপশম করে। তবে মাঝে মাঝে তা ভয়ানক ফাঁদ পাতে এবং যে-ব্যক্তি নিজেকে পুরোপুরি প্রেমের কাছে সঁপে দেয় তাকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়েই এর যবনিকা টানে। যে-শক্তিটি বিশ্বকে চলমান রাখে এবং নক্ষত্রমণ্ডলীকে নিজ নিজ জায়গায় অটল রাখে, কি করে তা একইসঙ্গে এত সৃষ্টিশীল ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে?
আমরা এটা ভাবতে অভ্যস্ত যে আমরা যা দিই প্রতিদানে সে-রকম কিছুই গ্রহণ করি। কিন্তু যেসব মানুষ ভালোবাসা পাওয়ার আশায় ভালোবাসে, তারা তাদের সময়ের অপচয় করছে।
প্রেম বিশ্বাসের বিষয়, বিনিময়ের নয়।
মতানৈক্য প্রেমকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। দ্বন্দ্ব হলো সেই শক্তি যা প্রেমকে আমাদের পাশে রাখে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো রাখার জন্য জীবন খুবই ছোট। উদাহরণস্বরূপ, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ কথাটি আমাদের হৃদয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায়ই থেকে যায়।
কিন্তু প্রতিউত্তরে সর্বদা একই কথা শুনবে এই আশা করো না। আমরা ভালোবাসি কারণ ভালোবাসাটা আমাদের প্রয়োজন। অন্যথায় প্রেম তার সমস্ত অর্থই হারায় আর সূর্যও আলো দেয়া বন্ধ করে দেয়।
একটি গোলাপ মৌমাছিদের সঙ্গ উপভোগের স্বপ্ন দেখে, অথচ কেউই দেখা দেয় না। তখন সূর্য জিজ্ঞেস করে : ‘তুমি কি অপেক্ষায় অপেক্ষায় ক্লান্ত নও?’
‘হ্যাঁ’, গোলাপ জবাব দেয়, ‘কিন্তু আমি যদি আমার পাপড়িদল গুটিয়ে নেই, আমি আর বাঁচব না, ক্ষয়ে যাব।’
তথাপিও, এমনকি যখন প্রেম দেখাও দেয় না, আমরা এর উপস্থিতির প্রতি উন্মুখ থাকি। মাঝে মাঝে যখন নিঃসঙ্গতা সবকিছুকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে হয়, তখনও প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো ভালোবাসতে থাকা।
***
আমাদের জীবনের মহান লক্ষ্য ভালোবেসে যাওয়া। বাকিটা শুধুই নীরবতা।
আমাদের দরকার ভালোবেসে যাওয়া। এমনকি যখন তা আমাদেরকে এমন জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে হ্রদ তৈরি হয় অশ্রু দিয়ে — সেই গোপন রহস্যময় স্থান, অশ্রুজলের উপত্যকা!
চোখের জলেরা নিজেদের জন্য কথা বলে। আর যখন আমরা অনুভব করি যে আমরা কেঁদেছি কারণ আমাদের কান্না করা প্রয়োজন ছিল, তখনও অশ্রু বয়ে যেতে থাকে। আর ঠিক যখন আমরা বিশ্বাস করি যে দুঃখের উপত্যকার মধ্য দিয়ে এক দীর্ঘ যাত্রাই আমাদের জীবনের নিয়তি, তখন অকস্মাৎ চোখের জলও হাওয়া হয়ে যায়।
কারণ অনেক বেদনা সত্ত্বেও আমরা আমাদের হদয়কে উন্মুক্ত রাখতে পেরেছি।
কারণ আমরা অনুধাবন করতে পেরেছিলাম যে যে-মানুষটি আমাদের ছেড়ে চলে গেল, সে সূর্যকে তার সঙ্গে নিয়ে চলে যায় নি কিংবা সে-জায়গায় অন্ধকারও ফেলে রেখে যায় নি। তারা কেবলি চলে গেছে, আর প্রতিটি বিদায়ের সাথে সাথে জন্ম নেয় লুকায়িত আশা।
কখনও ভালো না-বাসার চাইতে ভালোবেসে হেরে যাওয়া অনেক ভালো।
***
আমাদের এক প্রকৃত পছন্দ হলো সেই অদম্য শক্তির প্রহেলিকার মধ্যে ঝাঁপ দেওয়া। আমরা বলতে পারি : ‘আমি আগে অনেক কষ্ট করেছি, এবং আমি জানি যে এই কষ্ট আর থাকবে না’, আর এতে করে আমরা ভালোবাসাকে আমাদের দরোজা থেকে তাড়িয়ে দেই। কিন্তু আমরা যদি তা করতাম আমরা জীবনের প্রতি নিশ্চেতন হয়ে যেতাম।
কারণ প্রকৃতি হলো ঈশ্বরের প্রেমের বহিঃপ্রকাশ। আমরা কি করি না-করি তার হিসেব না-নিয়েও প্রকৃতি আমাদেরকে ভালোবেসে যেতে থাকে। সুতরাং আমরাও চলো প্রকৃতি যা শিক্ষা দেয় তাকে সন্মান ও বুঝতে চেষ্টা করি।
আমরা ভালোবাসি কারণ ভালোবাসা আমাদেরকে স্বাধীনতা দেয়। আমরা এমন-সব জিনিস বলতে শুরু করি একদা যা নিজেদেরকে কানে কানে বলার সাহসটাও আমাদের হতো না।
আমরা সেসব বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারি যেগুলো এতদিন আমরা মন থেকে সরিয়ে রেখেছিলাম।
‘না’ বলতে শিখি আমরা, অনেকটা এ-শব্দটির অভিশাপ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা না-করেই।
আমরা ‘হ্যাঁ’ বলতেও শিখি এর পরিণতিকে ভয় না-পেয়ে।
প্রেম সম্পর্কে যা-ই আমাদের শেখানো হয়েছিল তার প্রতিটি পাঠই আমরা ভুলে যাই। কারণ প্রতিটি সাক্ষাতই স্বতন্ত্র। প্রতিটি সাক্ষাতই এর নিজস্ব যন্ত্রণা ও আনন্দ বয়ে আনে।
ভালোবাসার মানুষটি যখন অনেক দূরে থাকে আমরা তখন উচ্চস্বরে গান গাই, আর যখন সে কাছে থাকে আমরা তখন গুনগুন করে কবিতা আওড়াই। যদিও প্রেমাস্পদ না শোনে আমাদের গান, না মনোযোগ দেয় আমাদের কবিতার প্রতি।
আমরা মহাবিশ্বের প্রতি আমাদের চোখ বন্ধ করে অভিযোগ করি না : ‘এটা অন্ধকার।’ আমরা আমাদের চোখ খোলা রাখি এ-কথাটি জেনে যে আলো আমাদেরকে স্বপ্ন-না-দেখা কাজগুলো করতে তাড়িত করতে পারে। এর সবই প্রেমের অংশ।
আমাদের হৃদয় ভালোবাসার জন্য উন্মুক্ত এবং আমরা কোনও ভয়ভীতি ছাড়াই এর কাছে আত্মসমর্পণ করি। কারণ আমাদের হারানোর বেশিকিছু নেই।
তারপর বাড়ি যাই আমরা। আমরা দেখতে পাই কেউ সেখানে আমাদের জন্য প্রতীক্ষা করছে। আমরা যা খুঁজছিলাম সেও তা-ই খুঁজছিল, আর আমাদের যেমন দুশ্চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষা হচ্ছিল তারও তেমনই হচ্ছিল।
কারণ প্রেম হলো জলের মতো যা  মেঘে পরিণত হয় : প্রেম স্বর্গে আরোহন করে যেখানে তা প্রতিটি জিনিসকেই একটা দূরত্ব থেকে দেখতে পায়, আর এটাও জানে যে, একদিন, তাকে এই ধরণীতে ফিরে আসতে হবে।
কারণ প্রেম হলো মেঘের মতো যা বৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয় : এটাকে পৃথিবীতে আনয়ন করা হয় যেখানে তা বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে জলসিক্ত করে।
প্রেম হলো একটি শব্দ মাত্র, যতক্ষণ না আমরা এটাকে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাদেরকে অধিকার করে নিতে দেই।
প্রেম কেবলি একটি শব্দ, যতক্ষণ না কেউ এসে একে অর্থবহ করে তোলে।
হাল ছেড়ে দিও না। মনে রেখো, চাবির ঝুটার সর্বশেষ চাবিটাই সবসময় দরোজা খোলে।
border
নারী ও পুরুষ একে অন্যের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলে কারণ তারা একটি পবিত্র কাজকে অনাচারী কাজে পরিণত করেছে।
এই পৃথিবীতেই আমরা বাস করি। আর বর্তমান মুহূর্ত থেকে এর বাস্তবতাকে হরণ করা যখন বিপজ্জনক হতে পারে, তবে অবাধ্যতাও হতে পারে একটি গুণ, যদি আমরা তা ব্যবহার করতে জানি।
দুটি দেহ যদি কেবলি মিলিত হয়, এটা যৌনতা নয়। এটা শুধুই আমোদ। যৌনতা ভোগ-সুখের অতীত।
যৌনতায় প্রশান্তি ও দুশ্চিন্তা হাত ধরাধরি করে চলে, যেমন ব্যথা ও আনন্দ এবং লজ্জা ও সাহস একজন মানুষের শেষ সীমা পর্যন্ত পাশাপাশি থাকে।
এ-ধরনের পরষ্পরবিরোধী অবস্থা কিভাবে একত্রে মিলেমিশে থাকে? একটিমাত্র উপায় : নিজেকে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।
কারণ আত্মসমর্পণের কাজটির মানে হলো : ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করি’।
কী ঘটতে পারে তার সবকিছু কল্পনা করা যথেষ্ট নয় যদি আমরা  শুধু দেহ নয় আত্মার দিক দিয়েও মিলিত হই।
আমরা চলো একত্রে জড়াজড়ি করে থাকি, তারপর সমর্পণের বিপজ্জনক পথ দিয়ে নিচে নামি। হতে পারে এ-পথ বিপজ্জনক, তবে এটাই অনুসরণ করার মতো একমাত্র পথ।
আর এমনকি এটা যদি আমাদের পৃথিবীতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে, আমাদের হারানোর কিছুই থাকবে না, কারণ শরীর ও আত্মার মেলবন্ধনকারী দরোজাটি খোলার মধ্য দিয়ে আমরা যা অর্জন করি তা হলো পরিপূর্ণ প্রেম।
আমরা চলো ভুলে যাই সেসব বিষয় যা আমাদেরকে শেখানো হয়েছে : কিছু দেয়া কিভাবে মহৎ আর কিছু গ্রহণ করা কিভাবে অবমাননাকর হয়। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে শুধু দেয়াতেই উদারতা নিহিত থাকে, তথাপি গ্রহণ করাও একটি প্রেমের কাজ। অন্য কাউকে আমাদেরকে সুখী করার সুযোগ দেয়াটা তাদেরকেও সুখী করবে।
***
আমরা যখন যৌনক্রিয়ায় খুব উদার হই এবং আমাদের প্রধান ভাবনা থাকে আমাদের যৌনসঙ্গীর আনন্দ, তখন আমাদের নিজস্ব আনন্দ কমে যেতে পারে কিংবা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
আমরা যখন সমান তীব্রতা নিয়ে দেয়া-ও-নেয়াতে সক্ষম হই, আমাদের শরীর তখন ধনুকের ছিলার মতো টানটান হয়ে যায়, কিন্তু আমাদের মন ছুটে যাওয়া তিরের মতো শিথিল হয়ে যায়। আমাদের মস্তিষ্কের আর দায়িত্ব থাকে না; নৈসর্গিক বুদ্ধিই হয় আমাদের একমাত্র পথপ্রদর্শক।
যখন শরীর ও আত্মা মিলিত হয় এবং স্বর্গীয় শক্তি শুধু সেই অংশগুলোকেই পূর্ণ করে তোলে না অধিকাংশ মানুষ যেটাকে যৌনকামনা উদ্রেককারী বলে ভাবে, প্রতিটি চুল ও ত্বকের প্রতিটি ইঞ্চি বিচিত্র রঙের আলোর উৎসারণও ঘটায়। দুটি নদী মিলিত হয় আরও বেশি সুন্দরী হতে, আরও বেশি ক্ষমতাবান হতে।
যা-কিছু আধ্যাত্মিক, নিজেকে দৃশ্যমান আকারে প্রকাশিত করে, আর যা-কিছু দৃশ্যমান তার সবটাই অন্তর্জাগতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
সবকিছুই অনুমোদিত হয়, যদি সবকিছু হয় গৃহীত।
মাঝে মাঝে প্রেম কোমল কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং প্রেম তার সমস্ত মহিমা নিয়ে প্রকাশিত হোক, সূর্যের মতো জ্বলন্ত আর দমকা বাতাসের পুরোটা বনাঞ্চল ধ্বংসকারী।
যদি একজন প্রেমিক সম্পূর্ণরূপে নিজেকে নিবেদন করে, তখন অন্যজনও ঠিক একই কাজই করবে, কারণ অস্বস্তি ঔৎসুক্যে পরিণত হবে, এবং কৌতূহল আমাদেরকে সে-সমস্ত জিনিস আবিষ্কারের দিকে নিয়ে যায় যেগুলো আমরা আমাদের সম্পর্কে জানতাম না।
যৌনতাকে উপহার হিশেবে দেখো, একে দেখো রূপান্তরের ধর্মীয় প্রথা হিশেবে। এবং যে-কোনও আচার-অনুষ্ঠানে যেমন শেষটাকে গৌরবমণ্ডিত করার জন্য পরমানন্দ উপস্থিত থাকে, কিন্তু এটাই একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। আসল কথা হলো আমরা আমাদের সঙ্গীদের সঙ্গে একটা রাস্তা ভ্রমণ করেছি, যেটা আমাদেরকে এক অজানা ভূখণ্ডের দিকে নিয়ে গেছে, যেখানে আমরা সোনা, ধুপ ও সুগন্ধ পথে পথে কুড়িয়ে পেতাম।
পবিত্র বস্তুকে এর পরিপূর্ণ পবিত্র অর্থ দাও। আর যদি সন্দেহের মুহূর্ত জাগ্রত হয়, সর্বক্ষণ মনে রেখো : আমরা সে-রকম মুহূর্তেও নিঃসঙ্গ নই; আমরা উভয়েই একই জিনিস অনুভব করছি।
নির্ভয়ে তোমার কল্পনার গোপন বাকশোটি খুলে ফ্যালো। একজনের সাহস অন্যজনকে সমভাবে সাহসী হতে সাহায্য করবে।
প্রকৃত প্রেমিকরা মূল্যায়িত হওয়ার ভয় ছাড়াই সৌন্দর্যের বাগানে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে। তারা আর মিলনরত দুটি শরীর বা দুটি আত্মা থাকবে না, তারা হবে একটি একক ঝর্ণা যার মধ্য থেকে জীবনের প্রকৃত জল প্রবাহিত হবে।
নক্ষত্ররা প্রেমিক-প্রেমিকাদের নগ্ন দেহের প্রতি ধ্যানমগ্ন হবে, আর প্রেমিক-প্রেমিকারা তাতে একটুও লজ্জাবোধ করবে না। পাখিরা কাছ দিয়ে উড়ে যাবে, আর প্রেমিকযুগল পাখিদের গান অনুকরণ করবে। বন্য প্রাণিরা সতর্কভাবে কাছে আসবে, কারণ তারা যা দেখছে তা তাদের চেয়েও অনেক বেশি বন্য। এবং শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের নিদর্শন হিশেবে তারা তাদের মাথা অবনত করবে।
এদিকে সময় থমকে দাঁড়াবে, কারণ প্রকৃত প্রেম থেকে জন্ম-নেয়া আনন্দের দেশে সমস্তকিছুই অসীম।





0 comments:

Post a Comment