ছাতিম ফুল, ক্লিওপেট্রা অথবা নিপুণ ভাস্কর্য বা প্রেম ও ইতিহাস আখ্যান



হেমন্তের রাতে কি ভেবে ছাতিম গাছের নিচে এসে দাঁড়ালে তুমি ?
ছাতিম গাছের কাঠ কি খুব বেশি মূল্যবান, নাকি মূল্যবান ছাতিম ফুল?

সত্যেন বোসের মতো সুবিখ্যাত কোনো গাণিতিক হিসেবনিকেশে ব্যস্ত থাকুক। বেহিসেবি মানুষ আমি, খানিকটা ক্রোধ আর ঘেন্নার সঙ্গে বিনয়ী অহমিকা ও প্রবল আবেগের সমান্তরালে আত্মপরিচয় আমার; হার্দিকতা ঢের আছে জুলিয়াস সিজারের সঙ্গেও।

ছাতিম ফুলের মৌতাত গাঢ় গন্ধের উন্মাদনা তাই মাতাল করে রেখেছে এই আমার আমিকে। বিশ্বাস কর , ছাতিম গাছের নিচে হেমন্তের এই মধ্য রাতে তোমার ভাস্কর্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকা অপার জীবন্ত স্থির চিত্রের সৌন্দর্য বিহ্বল করে রেখেছে আমায়; আমি ভুলেই গেছি এই মুহূর্তের আগের সব মুহূর্তগুলো। এমনকি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ক্রেসাসকে পরাজিত করার যে গৌরব ও আনন্দগাথা... সব কিছু ম্লান হয়ে গেছে এই হেমন্তের মধ্য রাতে ছাতিম গাছের নিচে কালোত্তীর্ণ শিল্পকর্ম আর নান্দনিকতাকে পুঁজি করে তোমার দাঁড়িয়ে থাকা অলৌকিক ভঙ্গির কাছে।

আমার এখন কি করা উচিত ? এই আমি জুলিয়াস সিজার রোমান সাম্রাজ্যের সকল কিংবদন্তি, শৌর্যবীর্য ও উপাখ্যান তুমি চাইলে এই বাংলায় হেমন্তের এই মধ্য রাতে তোমার পায়ের কাছে তোমার নাভিমূল কেশগুচ্ছ বুকের জমিন ও মুখের লালা হতে ছড়িয়ে পড়া  ছাতিম ফুলের গন্ধে বুদ হয়ে রেখে দিতে পারি; এমনকি তুমি চাইলে প্রিয়তমা আমার, আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর ফের ফিরিয়ে দিতে পারি মিসরের সেনাপতি পম্পের কাছে; এমনকি তোমার সহজাত সৌন্দর্যের আগুনে পুড়ে হেমন্তের এই মধ্য রাতে ক্লিওপেট্রার আদলে দাঁড়িয়ে থাকা তোমার শৈল্পিক আবেদনে সমর্পিত হয়ে তোমার নির্দেশে রোমান সাম্রাজ্যের রীতি ভেঙে সেনাপতি হয়েও রোমের সম্রাট ঘোষণা করে অনিবার্য রক্তপাত ও নিয়তি নির্ধারিত সমূহ বিপর্যয় হত্যা ও পরাজয়ের আশঙ্কা নির্দ্বিধায় উড়িয়ে দিয়ে তোমাকে সম্রাজ্ঞী বানাতে নিজেকে ঘোষণা দিতে পারি রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট হিসেবে! এর বদৌলতে এই মোহময়ী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকে ছাতিম ফুলের মতো প্রিয়তমা আমার, তোমার অঙ্গসৌষ্ঠবের অপার্থিব সৌন্দর্যের মোহনায় আমাকে স্নান করতে দেয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া ছাড়া আর কিসেই বা আছে প্রেমিকের গৌরব- তুমিই বলো হেমন্তের আঁধারে নিটোল নিপুণ ভাস্কর্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লিওপেট্রা আমার?

জীবনের কাছে খুব বেশি কিছু চাইনি আমি,কথাটা বলেছিলাম গত সন্ধ্যায় তোমায়; তারপর ছোট্ট নীরবতা। যে রকম নীরবতা কোথাও হতে আকস্মিক অপ্রত্যাশিত দুঃসংবাদ পেলে আমরা নিয়ে থাকি। ‘জীবনকে তুমি সহোদর ভেবেই দেখ না, তারপর দেখবে জীবনের কাছে ঢের বেশি চাওয়ার আছে তোমার’-ভুবন বিখ্যাত কোনো দার্শনিকের মতো কথাটি পেড়েছিলে তুমি। ফের নীরবতা দু’জনার মাঝখানে। যেমন কখনো কখনো কেউ কেউ আপন জন এই মাত্র ছেড়ে যাওয়া দূরগামী ট্রেনে নিরুদ্দেশের পথে চেপে বসলে স্টেশনের হই-হুল্লোড় এড়িয়ে ও নিজের ভেতরে ডুবে থাকে। ‘জীবনকে প্রিয়তমা ভাবলে কেমন হয়?’ আমি বলি। সেলফোনের ওপারে তোমার ধমক ধমক হাসি। আমি অপ্রস্তুত অতর্কিত আক্রমণে পর্যুদস্ত কোনো সম্রাটের মতো। তুমি আমাকে মনে করিয়ে দিলে সম্রাজ্ঞী কর্তৃক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে রাজ্য হারানো তাবৎ পৃথিবীর ট্র্র্যাজিক সম্রাটদের পরিণতির কথা। আমি কোনো মতে টাল সামলে কি ভেবে আকস্মিক বলে বসলাম, ‘বেয়াত্রিসের কথা ভাব না কেন, যে কিনা  দান্তেকে  মহাকবির  মুকুট  পরিয়ে দিয়েছিল।’ তুমি বললে, ‘বরং তাই হোক, আমার হতে আগামীকাল তুমি নিয়ে যেও একটি লাল রঙের রুমাল ও আটপৌরে কলম।’ এবার সমুদ্রে সর্ব শেষ মালবাহী জাহাজ ডুবে যাওয়ার খবর পেয়ে যেমন করে মুষড়ে পড়ে কোনো সওদাগর, তেমন অবস্থা থেকে কাঁপা গলায় বলি,‘এ দু’টোর প্রতীকী অর্থ কি দাঁড়ায়? তুমি মোনালিসার রহস্যের হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বললে, কেন,দান্তের সঙ্গে কি বেয়াত্রিসের মিলন হয়েছিল কখনো? এবার দূর কোনো নাম না জানা পাহাড়ের ওপরের মন্দির হতে মৌনতার চাদরে ঢাকা সন্ধ্যা বেলার বাতাস বয়ে নিয়ে আসে প্রার্থনায় ডুবে থাকার স্পষ্ট ঘণ্টাধ্বনি!





0 comments:

Post a Comment