এক অবেলায়




In search of you....in search of You....

ওইখানে তুমি থাকো। ওই সাদা বাড়িটায়, যার চূড়ায় শ্বেতপাথরের পরীটাকে বহুদুর থেকে দেখা যায়। নির্জন তোমাদের ব্যালকনি, বড় বড় জানালায় ভারী পর্দা ঝুলছে; মসৃন সবুজ লনে বুড়ো একটা স্প্যানিয়েল কুকুর ঘুমিয়ে আছে।
পরিষ্কার বোঝা যায়, এসব এক পুরুষের ব্যাপার নয়। জন্মের পর থেকেই তুমি দেখছ খিলান গম্বুজ, বড় ঘর, ছাদের উপর ডানা মেলে দেওয়া পরি - যা কেবলই উড়ে যেতে চায়, যায় না।

বড় সুন্দর অভিজাত নিস্তব্ধতা তোমাদের, তাই যদিও আমার পথে পড়েনা, তবু আমি মাঝে মাঝে তোমাদের এই নির্জন পাড়ার রাস্তা দিয়ে ঘুরপথে যাই।
আজ দেখলুম তোমাকে। তুমি একা হেঁটে যাচ্ছিলে।
যখন কচ্চিৎ কখনও তুমি হেঁটে যাও, তখনই বলতে কি তোমার সঙ্গে একসমতলে আমার দেখা হয়।

অনেকদিন দেখা হয় নি। দেখলুম এই শীতকালে তুমি বেশ কৃশ হয়ে গেছ। সাদা শাড়ি পড়েছিলে, তবু কচি সন্যাসিনীর মত দেখাচ্ছিল তোমাকে। সুন্দর অভ্যাস তোমার - শাড়ির আঁচল ডান দিক দিয়ে ঘুরিয়ে এনে সমস্ত শরীর ঢেকে দাও, মুখ নিচু করে হাঁটো - যেন কিছু খুঁজতে খুঁজতে চলেছ। নাকি পাছে কারোও চোখে চোখ পড়ে যায় সেই ভয়েই তোমার ওই সতর্কতা।  মুখ নিচু করে যাও বলেই বোধহয় তুমি কোনোদিন লক্ষ্য করোনি আমায়। আজকেও না।

মোড়ের মাথায় কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় যে লাল ডাকবাক্সটা আছে তুমি সেটা পেরিয়ে গিয়ে বাঁক নিলে। তোমাকে আর দেখা গেল না। এতো কাছ দিয়ে গেলে আজ যে, বোধহয় তোমার আঁচলের বাতাস আমার গায়ে লেগেছিল। ইচ্ছে হয়েছিল একটুক্ষনের জন্য তোমার পিছু নেই। নিলুম না। কেননা, ফাঁকা রাস্তার মোড় থেকে বেঁটে, মোটাসোটা কালো টুপি পরা লাল ডাকবাক্সটা স্থির গম্ভীরভাবে আমার দিকে চেয়েছিল। মনে হচ্ছিল তোমার পিছু নিতে গেলেই সে গটগট করে হেঁটে এসে আমার পথ আটকাবে।

মোড় ফিরতেই দেখা হল সেই মোটা লাল ডাকবাক্সটার সঙ্গে। দূরে দেখা যায় তোমাদের বাড়ির চূড়ায় পরীটাকে - আকাশের দিকে বাড়ানো এক হাত - অন্য হাতে সে তার বাঁ দিকের স্তন ছুঁয়ে আছে।

ভাঙ্গা ছেঁড়া অবান্তর দৃশ্য ভেসে যায় একের পর এক। কিছুতেই মেলানো যায় না। কখনও দেখি একটা বল গড়িয়ে যাচ্ছে ঘাসের ওপর। খেলুড়ির দেখা নেই। তবু বল গড়িয়ে যাচ্ছে । একা, সাদা, রৌদ্রের ভিতর। কখনও দেখি ভাঙ্গা এক মসজিদ বাড়ি। আগাছায় ভরা, পরিত্যাক্ত, দেউলিয়া। তবু পড়ন্ত বেলায় তার উঠোনে কে একজন নীরবে নামাজ পড়ছে।

দেখি কুয়াশার মধ্যে তুমি দূরে চলে যাচ্ছ। অস্থির লাগে। সিগারেট ফেলে দিয়ে আবার ধরাই। কিছুই মেলাতে পারি না। শুধু দেখি হিংসা শূন্য স্থবির রত্নাকর বসে আছে গাছতলায়, পথিকের অপেক্ষায়। আমার ছেলেবেলার হারানো বল হাতে করে বসে আছে আল্লা বুড়ো দরজি। দেখতে পাই দুপুরের ঘুমে শুয়ে আছে মা; এলো চুলের উপর প্রকান্ড খোলা মহাভারত উপুড় করে রাখা।

অপরাহ্নের আলোয় আমার দীর্ঘ্য ছায়ার উপর দিয়ে হেঁটে চলেছে অসংখ্য অচেনা মানুষ। তাদের ছায়া ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাকে। সামনেই ট্রাফিক পুলিশের উত্তোলিত হাত আর গাড়ির মিছিল দাঁড়িয়ে আছে। একজন হকার আমাকে উদ্দেশ্য করে ধীর গম্ভীর গলায় হাঁকল ...গেঞ্জি... এসব আমি তেমন খেয়ালই করলুম না।

জমা খরচের খাতা খুলে বসি। হিসেবে বড্ড গড়মিল। খরচের খাতা ভরে আছে বেহিসেবি হিসেবে। আর জমার খাতায় জমা পড়েছে কয়েক ফোঁটা চোখের জল।
কিছুতেই মেলাতে পারি না। চোখে জল আসে। আমি ধীরে ধীরে তোমার জন্য কাঁদতে থাকি।

Featured post on IndiBlogger, the biggest community of Indian Bloggers

0 comments:

Post a Comment