কিশোরী, গভীর রাতে ভীষণ ভীষণ কান্না পেলে এই পাখির কাছে এসো


পৃথিবীর এক নির্জন শহরতলির বাদামী শীতের রাতে বসে আছি,এই এই আমি। আমি,মানে আমার এই বোধ।এই রক্ত,মাংস দিয়ে গড়া শরীরের কাছাকাছি থাকা এক অস্তিত্বের বোধ।প্রতিদিন এক নতুন আশঙ্কায় বেঁচে থাকা একটি ক্ষুদ্র মানুষ যে যাকে প্রতি মুহূর্তেই বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে এই জগৎ তোমার উপযুক্ত নয়।তুমি তো হাত শক্ত করতে পারোনি।অনায়াসে কাটিয়ে উঠতে পারোনি সমস্ত বিচ্ছেদ।যে মেয়েটির হাসিতে গোটা শ্রেণীকক্ষ তুমি ভরে থাকতে দেখেছিলে,আচমকা একদিন তুমি দেখলে উঠোনে শোয়ানো আছে তার মায়ের মৃতদেহ।কী বলতে পেরেছিলে সেদিন সন্ধেবেলা তাকে?তুমিও জানো না তোমার হাত পা কাঁপছিল,খুব কাঁপছিল,প্রবল জ্বরের ঘোরে তুমি কেমন প্রলাপ বকে চলছিলে,কেমন হাত পা অসাড় হয়ে আসছিল তোমার, তোমার প্রতিটা শব্দ কেমন সময় পেড়িয়ে চলে যাচ্ছিল সেই কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর দিকে,সেই আদিমতম মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিল সেই আদিম শব্দ- বিচ্ছেদ?

নিজের হাতে যেদিন পুড়িয়ে ফেললে অতোগুলো ছবি,যাদের দিনের পর দিন যত্ন করেছো,রঙ মাখিয়েছ,রাতের বেলা একবার দেখে ঘুমোতে গেছো,তাদের চোখের সামনে অভাবে জ্বলতে দেখে তুমি জানো তোমার পলক পড়েনি,তোমার পুরনো বাড়ীর ভগ্নাবশেষের পাশে এখনো সেই চিতার কাঠকয়লা পড়ে থাকে, প্রবল শীতে ঠাণ্ডা লাগে না আর তোমার।অনায়াসে পুড়িয়ে এসে ভাত খেয়েছিলে,মায়ের প্রশ্নে জবাব দিয়েছিলে-যেখানে আমার এতবছরের বিশ্বাস করা মানুষ নিজের কথা রাখে না,নিজের কাছে সৎ থাকে না সেখানে আমার এসব কিছুর মূল্য নেই।এসব তোমার নেহাত ছেলেমানুষি।ধৈর্য-হীনতা।কার উপর রাগ করলে তুমি? যে কোনদিন নিজেকেই চেনেনি। কিন্তু তুমি? তুমি তো চিনেছিলে। এই জল বাতাস আগুন দিয়ে তৈরি করা নিজেকে চিনেছিলে তুমি, চিনেছিলে তোমার শব্দদের,তবু…। কোন কোন রাত্রিবেলা মৃত্যুর কত কাছাকাছি চলে যাই,অনুভব করি আমি।জীবন মৃত্যুর এক চমৎকার রেখা ধরে এগিয়ে চলা। ভারতবর্ষ এক চমৎকার রাষ্ট্র শক্তি হবে,কলকাতা এক মৃত শহর হিসেবে নিজে করে তুলবে আরো আরো মসৃণ এবং সকলে আমরা মহানন্দে উৎসব করতে করতে গলা টিপে ধরব গাছেদের, তারপর কয়েকটা লাল, হলুদ, সোনালি বোতামের খেলায় উড়িয়ে দেব আমাদের পারমাণবিক মুণ্ডুগুলি।মুণ্ডহীন সকল আতশবাজি জ্বালাতে জ্বালাতে নেমে আসব বাগানে।

বৃক্ষহীন বাগান,ফুলহীন,পাখি-হীন বাগান।সেই বাগান থেকে নেমে আসে এক অরণ্য-বালক।তীক্ষ্ণ চোখ তার,আদুর গা, মাথা-ভর্তি ঝাঁকরা চুলে মুখখানি মায়ার।তার উষ্ণ হাতে সে ধরে রাখতে চায় সকলের হাত।সেই মা মরা মেয়েটির হাত,সেই অর্থকষ্টে ভোগা ছেলেটির হাত,সেই যুবতীর হাত যে প্রেমিককে বুক দিতে চেয়েছিল,প্রেমিক ঝলসে নিয়েছে মাংস,চিবিয়ে খেয়েছে। বালক সকলের হাত ধরে থাকে,বলে আমাদের পথ আজ থেকে হবে আগুন,আমাদের পথ আজ থেকে হবে সততা।ধর্ম যেদিন বারুদ হয়ে ওঠে,রাষ্ট্র হয়ে ওঠে জুয়োখেলার মাঠ এবং অনেক অনেক মানুষ যখন আয়না বিক্রি করে দেয় সস্তা দামে তখন সেই বালক হাত ধরে রাখে।আটকে দেয় পেয়াদাদের।শীতের রাতে যে খোঁজ নিতে যায় পুরনো গাছেদের,তাদের শিকড়,তাদের ডালপালা…। যে চিঠি লেখে এখনো পুরনো মানুষদের এমনকি মৃত মানুষদের সাথেও যার চিঠিপত্র আদানপ্রদান প্রবল।

সেই বালককে খুঁজতে আসবে কিশোরী-সততা একদিন।ছুঁতে পারবে না সহজে।একদিন সমস্ত কিছু তুচ্ছ করে আসবে,বুঝবে হৃদয় কেবল মুখের কথা নয়।অনেক বিশ্বস্ত মানুষের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ দিয়ে গড়ে ওঠে হৃদয়।যাকে মানুষ ভালবাসে, সম্মান করে। যে অনায়াসে বুকে টেনে নিতে পারে দুঃখকে। ছদ্ম-মানুষ নয়, আগুন-পাখি।
কিশোরী, গভীর রাতে ভীষণ ভীষণ কান্না পেলে এই পাখির কাছে এসো।

0 comments:

Post a Comment